
নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, বট বাহিনীর আগ্রাসন ততই বাড়ছে। এই বট বাহিনীর অপতৎপরতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এটি এখন শুধু রাজনৈতিক জাতি-গোষ্ঠী, ধর্ম বা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন ব্যাপকভাবে সাধারণ মানুষকেও প্রভাবিত করছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা, সাধারণ ভোটারদের বিভ্রান্ত করে অজনপ্রিয় প্রার্থীদের জনপ্রিয় হিসেবে দেখানোর নানা অপচেষ্টা লক্ষ করা যাচ্ছে। ভোটের দিন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে এসব তৎপরতা। এতে কেবল প্রার্থীরা নন, বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হচ্ছে সরকারের দায়িত্বশীলদের; এমনকি বিভিন্ন বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদেরও। সামাজিক মাধ্যমে এসব অপতৎপরতা চালানো হয় বট বাহিনী দিয়ে। একাধিক স্বয়ংক্রিয় রোবট একসঙ্গে একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য পূরণের জন্য ব্যবহৃত হয়। সাধারণত সোশ্যাল মিডিয়ায় গুজব ছড়ানো, নির্দিষ্ট মতামত প্রচার ও ওয়েব প্রতিক্রিয়া ম্যানিপুলেট করার জন্য ব্যবহৃত হয়। নির্বাচনে ভোট গ্রহণ সামনে রেখে সাধারণত প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য বিদ্বেষমূলক পোস্ট বা কমেন্ট করে থাকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ বট বাহিনী। এক ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে কয়েক হাজার পর্যন্ত বট অ্যাকাউন্ট থাকতে পারে। এতে বিনিয়োগ থাকে। এগুলোতে কোনো হিউম্যান টাচ থাকে না। নির্বাচনের ঠিক আগে এ ধরনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ভুয়া ভিডিও ছবি ও অডিও ছড়ানোর আশঙ্কা আরও বাড়বে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হলে নির্বাচন নিয়ে শেষ মুহূর্তে বড় ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
সম্প্রতি দেশে গত ১০ দিনে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভুয়া, অসত্য, বানোয়াট তথ্য ও ভিডিও এই বট বাহিনীর কার্যক্রমকে সামনে আলোচনায় এনেছে। বটের অ্যাকাউন্টগুলো আলাদাভাবে কোনো মানুষ পরিচালনা করে না। সেট করে দেওয়া প্রোগ্রাম/কমান্ড অনুসারে এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করে। বিভিন্ন ফেসবুক অ্যাকাউন্টের কমেন্টের ঘরে গিয়ে নির্দিষ্ট করে কিছু বলতে বললে বট বাহিনী তাই করবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বটের প্রভাবে একজন প্রার্থীর পক্ষে বাস্তবতার বাইরে গিয়ে অস্বাভাবিক ইতিবাচক বা নেতিবাচক আবহ তৈরি করা সম্ভব, যা দেখে সাধারণ ভোটাররা প্রভাবিত বা প্রতারিত হতে পারেন। বিভ্রান্ত হতে পারেন। এ বিষয়ে আগেভাগে এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে এসব অপপ্রচার থামানো দরকার। তা না হলে প্রতিরোধের আগেই অনেক ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এসব অপপ্রচার দেশের ভেতরে যেমন হচ্ছে, দেশের বাইরে থেকেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচালিত হচ্ছে। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হবে এসব ঝুঁকি শনাক্ত, আগাম সতর্কতা, নীতিগত দিকনির্দেশনা এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া। এর মোকাবিলায় প্রয়োজন রিয়েল টাইম ফ্যাক্ট চেকিং, সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে সক্রিয় মনিটরিং এবং স্বচ্ছ ইনফোর্সমেন্ট। একই সঙ্গে নাগরিকদের প্রযুক্তি জ্ঞান বাড়ানোই এ আগ্রাসন থেকে টেকসই পরিত্রাণের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. সাইফুল হক বলেন, সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বট বাহিনী যেভাবে আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছে, তা বন্ধ করার মতো কোনো সুনির্দিষ্ট মন্ত্র বা একক পদক্ষেপ নেই। তবে এ সংকট মোকাবিলায় সামাজিক সচেতনতা তৈরি এবং সম্মিলিত আন্দোলন গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। বট বাহিনী মোকাবিলায় নির্বাচন কমিশনের চেয়ে সাংবাদিকদের ভূমিকা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাদের অনুসন্ধানী ও তথ্যভিত্তিক সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করা সম্ভব, আর সে সচেতনতার মাধ্যমে এ অপতৎপরতা নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে।
বট বাহিনীর সমস্যা শুধু বাংলাদেশের একার সমস্যা নয়; বরং এটি একটি বিশ্বব্যাপী সংকট। এ সংকট মোকাবিলায় সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বিশেষ করে ভুয়া খবর এবং গুজবনির্ভর তথ্য যাচাই অর্জন করার জন্য দীর্ঘ মেয়াদে সামাজিক সচেতনতা খুবই জরুরি। সেই সঙ্গে ডিজিটাল প্রযুক্তির দক্ষতা অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। তরুণসমাজকে দক্ষ করে তুলতে পারলে অনেকটা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে পারবে তারা। নির্বাচন ব্যবস্থাপনার দায়িত্বেযেহেতু নির্বাচন কমিশন রয়েছে, সে ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দল, প্রার্থী এবং সংশ্লিষ্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে পরামর্শ করে একটি সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। আশা করছি, সরকার বট বাহিনীর আগ্রাসনের বিরুদ্ধে একটি টেকসই সমাধান খুঁজে বের করবে।
