সারা পৃথিবীতে
ব্লু-ইকোনমি বা সুনীল অর্থনীতির বিকাশ থেমে নেই। আমাদের দেশেও এর বিকাশে
নেওয়া হয়েছে নানামুখী উদ্যোগ। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় কম। আরও যুগোপযোগী
উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন সহজ হবে।
সরকারি একটি গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, বঙ্গোপসাগরের সমুদ্র সম্পদের ব্যবহার
বাংলাদেশকে যেমন দিতে পারে আগামী দিনের জালানি নিরাপত্তা, তেমনি বদলে দিতে
পারে সামগ্রিক অর্থনীতির চেহারা। এমনকি দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে
সামুদ্রিক খাদ্যপণ্য রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব।
উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারলে মাছ আহরণ অনেক বাড়বে। অর্থনৈতিক
অঞ্চলের ২০০ মিটারের অধিক গভীরতায় অতি পরিভ্রমণশীল মৎস্য প্রজাতি তথা গভীর
সমুদ্রে টুনা বা টুনা জাতীয় মাছের প্রাচুর্য রয়েছে। সামুদ্রিক বিভিন্ন জীব
থেকে উন্নত প্রসাধনী, পুষ্টি খাদ্য ও ওষুধ পাওয়া যায়। এ ছাড়া সমুদ্র
নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎসের একটি বিশাল ভান্ডার। সমুদ্রের অফশোর অঞ্চলে
বাতাসের গতিবেগ বেশি থাকায় সেখানে উইন্ডমিল স্থাপন করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি
পাওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি ক্রুজ শিপ ও দ্বীপকে উন্নয়নের মাধ্যমে নিরাপদ
ভ্রমণের ব্যবস্থা করতে পারলে এ পর্যটন খাতটি দেশের আয়ের প্রধান উৎস হয়ে
উঠতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
বিভিন্ন প্রকাশনা বিশ্লেষণ করে দেখা
গেছে, বিশ্ববাণিজ্যের ৯০ শতাংশই সম্পন্ন হয় সামুদ্রিক পরিবহনের মাধ্যমে।
এতে বাণিজ্যিক পরিবহন খরচ যেমন তুলনামূলক অনেক কম হয়, তেমনি নিরাপদও।
বিভিন্ন দেশ ব্লু-ইকোনমি-নির্ভর উন্নয়ন কৌশল প্রণয়ন করে তাদের মোট দেশজ
উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। বাংলাদেশের বিশাল সমুদ্রসীমা তথা সমুদ্র
সম্পদ কাজে লাগিয়েও দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির বিষয়ে তাগিদ দিচ্ছেন
বিশেষজ্ঞরা। এজন্য সমুদ্রে নিয়োজিত নৌবাহিনীসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন
সংস্থা ও দপ্তরকে আরও বেশি সক্ষমতা দিয়ে গড়ে তোলার আহ্বান জানাচ্ছেন তারা।
সুনীল
অর্থনীতি জোনের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার মূল দায়িত্ব পালন করছে নৌবাহিনী। এ
বিশাল জলরাশিকে সরাসরি টহল এবং রাডার সিস্টেমের পাশাপাশি নানা প্রযুক্তির
মাধ্যমে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ নৌবাহিনী, যার মূল
উদ্দেশ্য হচ্ছে দেশের সমুদ্রসীমা এবং সুনীল অর্থনীতির সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
এর মাধ্যমে যাতে বাংলাদেশের আগামীর অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ব্যাপকহারে বৃদ্ধি
পায়, সেজন্য সমুদ্রে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর আরও বেশি সক্ষমতা ও গবেষণা
কার্যক্রম বাড়ানোর বিষয়ে তাগিদ দিয়েছেন সমুদ্র বিশেষজ্ঞরা। পত্রিকান্তরে
প্রকাশিত প্রতিবেদন বলছে, উপকূল থেকে গভীর সমুদ্র সবখানে দেখা যায় বাংলাদেশ
নৌবাহিনীর টহল। নৌবাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাগর পথে অবৈধ বা চোরাই
পরিবহন, মানব পাচার, মাদক চোরাচালান প্রতিরোধ এবং বিদেশিদের অনুপ্রবেশ
প্রতিরোধে সার্বক্ষণিক নজরদারি ও টহল চালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ নৌবাহিনী। ‘সি
লাইন অব কমিউনিকেশনস’-এর সুরক্ষা, বিদেশি জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচল ও দেশের
অর্থনৈতিক খাতে অবদান রাখছে নৌবাহিনী। উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দারা জানান,
ইলিশসহ দেশের মৎস্য সম্পদের সুরক্ষা, নিষিদ্ধকালে মৎস্য আহরণ বন্ধে
নৌবাহিনীর কঠোর অবস্থান রয়েছে। উপকূলে বা গভীর সাগরে তাদের ভরসার জায়গা
নৌবাহিনী। তাদের নিরাপত্তা, ট্রলার বা জাহাজের সুরক্ষাসহ নানা ধরনের
সুযোগ-সুবিধা তারা নৌবাহিনীর কাছ থেকেই পেয়ে থাকেন।
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্রবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান ড. আবু হেনা মুহাম্মদ
ইউসুফ বলেন, বঙ্গোপসাগরের আয়তন প্রায় ১ লাখ ১৯ হাজার বর্গকিলোমিটার, যা
অনেকটা বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডের কাছাকাছি। এ বিশাল সমুদ্র অঞ্চলের খুবই
অল্প পরিমাণ এলাকা ব্যবহৃত হচ্ছে। অধিকাংশ জায়গা ‘আনটাচ’ অবস্থায় রয়েছে।
আমরা বিভিন্ন গবেষণা ও বাস্তবতায় দেখতে পাচ্ছি, বঙ্গোপসাগরে অনেক সম্ভাবনা
রয়েছে। এতে রয়েছে পর্যাপ্ত মৎস্য ও খনিজ সম্পদ। এমনকি বিভিন্ন দ্বীপকে কাজে
লাগিয়ে পর্যটনের ব্যাপক বিকাশ ঘটানো যায়। পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে আরও
বন্দর সৃষ্টি করা গেলে ব্যবসা-বাণিজ্যের বিপ্লব ঘটবে। গত ৫০ বছরের চিত্র
পাল্টে দিয়েছে গত এক বছরের আয়। ফলে এসব সুযোগ ও সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো
অত্যন্ত জরুরি। তার জন্য প্রয়োজন সাগরে বাস্তবসম্মত সার্ভে (গবেষণা), সঠিক
পরিকল্পনা এবং সে অনুসারে বাস্তবায়ন।
বাংলাদেশের অর্থনীতির সমৃদ্ধির
জন্য সমুদ্র খুবই গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। যেটি নৌবাহিনীর নিরলস
প্রচেষ্টায় সম্ভব হয়েছে। এজন্য বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে আরও কাজে লাগাতে হবে।
গবেষণার ক্ষেত্রে তাদের ব্যবহার করা যেতে পারে। পাশাপাশি অভিজ্ঞ ও
বিশেষজ্ঞদের নিয়ে আলাদা একটি কর্মপরিকল্পনা তৈরি করতে হবে এবং সে অনুযায়ী
বাস্তবায়ন করতে হবে। আশা করছি, সরকার অর্থনীতির ভিত মজবুত করতে সমুদ্রের
অজস্র সম্পদকে কাজে লাগিয়ে সুনীল অর্থনীতির ভিত উন্মোচন করবে।
