
গত পরশু অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে নবম বেতন কমিশন প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। সেই প্রতিবেদনে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
সরকার নবম বেতন কমিশন গঠন করেছিল ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই। কমিশনের প্রতিবেদন দাখিলের নির্ধারিত শেষ তারিখ ছিল ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬। বেতন কমিশনের তিন সপ্তাহ আগে প্রধান উপদেষ্টার কাছে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, বেশ তাড়াহুড়ো করে এই প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে।
বেতন স্কেলের উল্লেখযোগ্য দিক হলো, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে ১০০ থেকে ১৪৭ শতাংশ। সর্বনিম্ন, অর্থাৎ ২০টি ধাপের সর্বশেষ ধাপে ২০ হাজার টাকা আর সর্বোচ্চ প্রথম ধাপে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকার সুপারিশ করা হয়েছে। অন্য সুযোগ-সুবিধাও বাড়ানো হয়েছে।
বেতন বৃদ্ধি নিয়ে বলার কিছু নেই। গত কয়েক বছরে যেভাবে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে, তাতে এই বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে যৌক্তিক। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা অন্য প্রশ্ন তুলেছেন। এই বেতন দেওয়ার সামর্থ্য কী রাষ্ট্রের আছে? বিশেষ করে অর্থনৈতিক সক্ষমতা কী বাংলাদেশের রয়েছে? কিংবা এই বেতন স্কেল কার্যকর করার এখতিয়ার কী এই সরকারের আছে?
পত্রিকান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, দেশের দুজন প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদ এই সামর্থ্য নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেছেন, সমগ্র অর্থনীতি নানা চাপের মধ্যে আছে। এই পরিস্থিতিতে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হলে সরকারের খরচ বাড়বে। এই খরচ সরকার কোথা থেকে জোগাড় করবে, স্পষ্ট নয়। অভিন্ন মত সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো অর্থনীতিবিদ মোস্তাফিজুর রহমানেরও। তিনি বলেছেন, বেতন বাড়ানোর অজুহাতে অসাধু ব্যবসায়ীরা জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে দেবেন। সরকার গত সতের মাসে বাজার নজরদারিতে ব্যর্থ। বেতন বৃদ্ধির ফলে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়বে। বাজেটের সিংহভাগই খরচ হচ্ছে বেতন-ভাতা, সুদ পরিশোধ, ভর্তুকিতে; সেই তুলনায় আয় নেই। অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে রাজস্ব আদায় বাড়ছে না। অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে এই বেতন বৃদ্ধির বিষয়টি তাই বাংলাদেশকে আরও নাজুক অবস্থায় ঠেলে দেবে।
সন্দেহ নেই, গত এক দশকে বৈশ্বিক ও জাতীয় পর্যায়ে অর্থনীতির প্রায় সব সূচকে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বহুগুণ বেড়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহ ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়েছে। গত ১২ বছরে বেতন কমিশন গঠিত না হওয়ায় বেতনও বাড়েনি। এই প্রেক্ষাপটে বেতন-ভাতা এবং অন্যান্য সুবিধা পর্যালোচনা করে এসব বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে।
সবই ঠিক আছে, কিন্তু প্রশ্ন হলো নির্বাচনের আগে কেন? এই বেতন বৃদ্ধি কী সরকারি কর্মচারী-কর্মকর্তাদের জন্য বিশেষ কোনো প্রণোদনা?
এ ছাড়া শুধু সরকারি কর্মজীবীদের জন্য বেতন স্কেল কেন? বেসরকারি কর্মজীবীদের বেতন সম্পর্কে কিছু না বলে শুধু সরকারি কর্মজীবীদের বেতন বৃদ্ধির কথা বলা তো একধরনের বৈষম্য। অথচ এই বৈষম্য দূর করার অঙ্গীকার নিয়ে বর্তমান সরকার গঠিত হয়েছিল।
এক পরিসংখ্যানে বলা হচ্ছে, দেশে কর্মজীবী মানুষের সংখ্যা প্রায় সাড়ে সাত কোটি। এর মধ্যে চার কোটির মতো মানুষ বেসরকারি কর্মজীবী। তাদের বেতন স্কেলের কথা না বলা শুধু বৈষম্যই নয়, দেশের শ্রমবাজারে তাদের অবদানকে অগ্রাহ্য করা। বেতন স্কেলের এই যে সমন্বয়হীনতা, এতে কর্মজীবীদের সিংহভাগ অসন্তুষ্ট থাকবে এবং তার প্রভাব পড়বে পরিবারে-সমাজে-রাষ্ট্রে।
বুঝতে অসুবিধা হয় না যে জনতুষ্টিই হচ্ছে সরকারের লক্ষ্য। বেতন বৃদ্ধির অবশ্যই প্রয়োজন আছে। সামনে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন। সরকারের মেয়াদ আছে নির্বাচন ও ক্ষমতা হস্তান্তর পর্যন্ত বড়জোর চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ। বেতন স্কেলের বিষয়টি পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের ওপর ছেড়ে দেওয়াই হতো যুক্তিযুক্ত। নতুন সরকার সব দিক বিবেচনা করে বেতন স্কেলের সুপারিশ গ্রহণ এবং পর্যালোচনার পর কার্যকর করতে পারত। কিন্তু সেটা না করে ১ জানুয়ারি থেকেই আংশিকভাবে নবম বেতন স্কেলের সুপারিশ কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে। আমরা মনে করি, এই বাস্তবায়নের বিষয়টি নতুন সরকারের ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত।
