
দেশের সড়ক ও পরিবহন ব্যবস্থা এখনো নিরাপদ নয়। অদক্ষ ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকের কারণে দুর্ঘটনা বাড়ছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশন ২০২৫ সালের সড়ক দুর্ঘটনার বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনের তথ্যমতে, গত বছর সারা দেশে ৭ হাজার ৫৮৪টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৩৫৯ জন নিহত এবং ১৬ হাজার ৪৭৬ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৬৭১ জন নিহত হয়েছেন, যা দুর্ঘটনাকবলিত যানবাহনের মধ্যে সর্বোচ্চ মৃত্যু। মোট নিহতের ৩৬ দশমিক ২৯ শতাংশ। নিহতদের মধ্যে ৯৬২ জন নারী এবং ১ হাজার ৮টি শিশু রয়েছে। এ ছাড়া ১ হাজার ৫৬৪ জন পথচারী নিহত হয়েছেন, যা মোট প্রাণহানির ২১ দশমিক ২৫ শতাংশ। একই সময়ে নৌ-দুর্ঘটনায় ১৪৯ জন এবং রেলপথ দুর্ঘটনায় ৪৭৮ জন নিহত হয়েছেন।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে, নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ৫৩৭ শিশু ছিল যানবাহনের যাত্রী। আর ৪৭১ শিশু পথচারী। পথচারী হিসেবে মৃত্যুতে ১৮৭ শিশু বাস ও পণ্যবাহী যানবাহনের চাপায়, ৩২ শিশু প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস, জিপ বা অ্যাম্বুলেন্সে, ১৯৮ থ্রি-হুইলার ও নছিমন-ভটভটির ধাক্কায় এবং ৫৪ শিশু মোটরসাইকেলের ধাক্কায় নিহত হয়েছে। এ হিসাবে মোট নিহতের ১৩ দশমিক ৭ শতাংশই শিশু। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের বিশ্লেষণে দেখা যায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়া-আসার সময় এবং আশপাশের সড়কে খেলাধুলার সময় নিহতের ঘটনা বেশি ঘটেছে। পথচারী হিসেবে শিশুরা গ্রামীণ সড়কে বেশি হতাহত হচ্ছে। কারণ গ্রামীণ সড়কগুলো বসতবাড়ি-ঘেঁষা। এসব সড়কে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি থাকে না। ফলে যানবাহনসমূহ বেপরোয়াভাবে চলাচল করে। আবার শিশুরাও সড়ক ব্যবহারের কোনো নিয়ম জানে না। এ অব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে শিশুরা নিহত হচ্ছে, পঙ্গু হচ্ছে। এটা জাতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।
দেশের বিভাগগুলোর মধ্যে ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে। দুর্ঘটনার মূল কারণ হিসেবে বাইপাস রোড না থাকায় রাতে ভারী যানবাহনের বেপরোয়া গতি এবং যানজটের কারণে চালকদের অসহিষ্ণু আচরণকে চিহ্নিত করা হয়েছে। ফাউন্ডেশনের হিসাবমতে, ২০২৫ সালের সড়ক দুর্ঘটনায় মানবসম্পদের যে ক্ষতি হয়েছে তার আর্থিক মূল্য প্রায় ২৫ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা। অপ্রকাশিত ও তথ্য বিবেচনায় নিলে এই ক্ষতির পরিমাণ জিডিপির ১.৫ শতাংশের বেশি হতে পারে। নিহতদের ৭৭.৭৬ শতাংশই ছিলেন ১৮ থেকে ৬৫ বছর বয়সী কর্মক্ষম মানুষ।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এ আই মাহবুব উদ্দিন আহমেদ বলেন, আসলে অধিকাংশ সড়ক দুর্ঘটনাই ‘কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড’। যথাযথ প্রযুক্তি, অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব নয়।
সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। নিরাপদ সড়কের জন্য কাঠামোগত সংস্কার ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শিশুদের নিরাপদ সড়ক ব্যবহার বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। সার্বিক পরিস্থিতিতে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন যে সুপারিশ করেছে তা বিবেচনায় নিয়ে একটি নিরাপদ, টেকসই সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। আশা করছি, সরকার সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং জনগণের নিরাপত্তার বিষয়টি আমলে নিয়ে একটি কার্যকর সিদ্ধান্তে উপনীত হবে।
