ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে কাজী ফাইয়াজ রিশানের সকালটা শুরু হয়েছিল একেবারেই স্বাভাবিকভাবে। দুই বছরের রিশান এখনো ঠিকমতো কথা বলা শেখেনি। বাবা, মা, শব্দ দুটোই ছিল তার ছোট্ট পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ভাষা। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ পড়ে গেলে কান্নায় ডাকত মাকে, আর বাবার কোলে উঠলেই চোখ দুটো ভরে যেত নিশ্চিন্ততায়। সে জানত না আগুন কী, ধোঁয়া কী, মৃত্যু কী জানার বয়সও হয়নি তার। মা আফরোজা আক্তার সুবর্ণা হয়তো রান্নাঘরে নাশতার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, বাবা ঘরে কোন না কোন কাজ করছিলেন আর ছোট্ট রিশান খেলনা হাতে ঘরের ভেতর এদিক-ওদিক হাঁটছিল। প্রতিদিনের মতোই ছিল সেই সকাল কোনো অশুভ ইঙ্গিত ছাড়াই। কিন্তু সেই সকালই মুহূর্তেই বদলে দিল একটি পরিবারের পুরো স্বপ্ন, ভালোবাসা আর আগামী দিনের সব পরিকল্পনা।
শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) সকাল পৌনে ৮টার দিকে রাজধানীর উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টর এলাকার ৬তলা একটি আবাসিক ভবনের দ্বিতীয় তলায় আগুন লাগে। মুহূর্তেই ঘন কালো ধোঁয়ায় ছেয়ে যায় পুরো ভবন। আগুনের লেলিহান শিখার চেয়েও ভয়ংকর হয়ে ওঠে ধোঁয়া। সেই ধোঁয়াই কেড়ে নেয় একই পরিবারের বাবা, মা ও তাদের দুই বছরের শিশুপুত্রের প্রাণ।
নিহতরা হলেন, কুমিল্লা নগরীর নানুয়া দিঘির পাড় এলাকার কাজী খোরশেদ আলমের ছেলে কাজী ফজলে রাব্বি রিজভী (৩৮), তাঁর স্ত্রী আফরোজা আক্তার সুবর্ণা (৩৭) এবং তাদের দুই বছরের ছেলে কাজী ফাইয়াজ রিশান। নিহত কাজী ফজলে রাব্বি রিজভী এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালসে চাকরি করতেন। তাঁর স্ত্রী সুবর্ণা চাকরি করতেন স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসে। দুর্ঘটনার সময় উত্তরায় নানীর বাসায় থাকায় বেচে যান তাদের আরেক ছেলে ফাইয়াজ।
এছাড়াও এ ঘটনায় আরেক পরিবারের তিজনের মৃত্যু হয়েছে। অন্য পরিবারের সদস্যরা হলেন মো. হারিছ উদ্দিন (৫২), তার ছেলে মো. রাহাব (১৭) এবং হারিছের ভাতিজি রোদেলা আক্তার (১৪)। তাদের গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে।
এদিকে, রাত সাড়ে ৮টার দিকে দুটি অ্যাম্বুলেন্সে করে কুমিল্লা নগরীর নানুয়া দিঘির পাড় এলাকার নিজ বাড়িতে পৌঁছায় নিহত তিনজনের নিথর মরদেহ। মর্মান্তিক এই খবরে মুহূর্তেই বাড়িতে ভিড় জমান আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব ও স্থানীয় বাসিন্দারা। মরদেহগুলো দেখামাত্রই স্বজনদের বুকফাটা কান্নায় পরিবেশ ভারি হয়ে ওঠে। কারও আহাজারিতে, কারও নীরব অশ্রুতে শোকের ছায়া নেমে আসে পুরো এলাকায়। মরদেহবাহী এ্যাম্বুলেন্সে সন্তানের নিথর দেহ, পাশে দাঁড়িয়ে আছে নির্বাক বাবা কাজী খোরশেদ আলম।
রাত ১০টার দিকে নগরীর দারোগা বাড়ি মাজার মসজিদ মাঠে তিনজনের প্রথম জানাজা হয়। শনিবার সকালে চৌদ্দগ্রাম উপজেলার চিওড়া গ্রামে নিজ বাড়ির পাশে দ্বিতীয় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে বলে জানায় নিহতের বাবা কাজী খোরশেদ আলম।
নিহত রিজভীর চাচাতো ভাই কাজী ইরফানবলেন, রিজভী ভাই কুমিল্লা জিলা স্কুলের ২০০৫ ব্যাচের ছাত্র ছিলেন। সবার পরিচিত একজন ভদ্র, মেধাবী ও বিনয়ী মানুষ ছিলেন। তিনি স্কুলজীবন থেকেই শান্ত স্বভাবের ছিলেন। জীবনে কাউকে কষ্ট দিতে দেখিনি। আর দুই বছরের রিশান ছিল পুরো পরিবারের আনন্দের উৎস। আমরা পুরো পরিবার শোকে স্তব্ধ। কিন্তু আগুনে এক নিমিষেই সব নিভিয়ে দিল।
চাচা কাজী ফখরুল আলম কান্নাজড়িতকন্ঠে বলেন, সকাল ১১টায় আগুন লাগার খবর পাই, এরপর আমরা খোজ নিয়ে জানতে পারি তারা ওই ভবনেই আগুনে ধোয়া শ^াসরোধ হয়ে মারা যায়। আগুন লেগেছে দুতলায় তারা থাকত ওই বাড়ির ৬ তলায়।
নিহত কাজী ফজলে রাব্বির বাবাকাজী খোরশেদ আলম বলেন, সকালে নাস্তার পর তার এক বন্ধু ফোন করে আগুনের খবর জানায় পরে সঙ্গে সঙ্গে আমি আমার ছেলে ও তার বউয়ের নম্বরে কল করিকিন্তু তারা কেউ ফোন রিসিভ করেনি। পরে আমি ঢাকায় রওয়ানা করি। ঢাকায় গিয়ে জানতে পারি ছেলেকে রাখা হয়েছে কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে, ছেলের বউ ঢাকা মেডিক্যালের বার্ন ইউনিটে আর নাতীকে রাখা হয়েছে এভারকেয়ার হাসপাতালে। তাদের গায়ে আগুনের পোড়ার কোন চিহ্ন ছিলনা, তাঁরা বাঁচার জন্য বাড়ির ছাদে যেতে চাইছিল কিন্তু ছাদের দরজা তালা লাগানো যেতে পারেনি। ধোয়া শ্বাস বন্ধ হয়ে মারা যায়।
