
ইরানে বিপর্যয়কর অর্থনৈতিক পরিস্থিতির বিরুদ্ধে ক্ষোভের সূত্রপাত থেকে বিক্ষোভ শুরু হয়। হাজার হাজার ইরানি রাস্তায় নেমে বিক্ষোভে অংশগ্রহণ করেন। একের পর এক সংঘর্ষ-সহিংসতায় হতাহত হয়েছে হাজারো লোক। হাসপাতালগুলোতে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। তাদের চিকিৎসা দিতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকসহ হাসপাতালের কর্মীরা। অর্থনৈতিক অসন্তোষ থেকে শুরু হওয়া এ ক্ষোভ খুব দ্রুতই রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ থেকেই দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার পরই কড়াকড়ি আরোপ করে সরকার। জনবিক্ষোভ দমাতে সরকার ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন এবং মোবাইল নেটওয়ার্ক সেবা বন্ধ করেছে। প্রশাসন ও সর্বোচ্চ নেতা খামেনির হুঁশিয়ারি কোনো কিছুই এখন আর তোয়াক্কা করছেন না বিক্ষোভকারীরা। ক্ষমতাসীনদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তারা সরকার পতনের দাবিতে স্লোগান দিচ্ছেন। সরকার বিক্ষুব্ধ জনতার উদ্দেশ্যে ‘রেড লাইন’ ঘোষণা করেছে। এদিকে বিক্ষোভকারীদের হত্যা করলে ইরানে কঠোর হামলা চালানো হবে বলে নতুন করে হুমকি দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানের অভিজাত বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) সতর্ক করে বলেছে, দেশের নিরাপত্তা রক্ষায় তাদের জন্য ‘শেষ কথা’। বিদ্যমান পরিস্থিতি আর কোনোভাবেই চলতে পারে না। সেনাবাহিনী বলেছে, সরকারি সম্পদ সুরক্ষায় তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সাহসী জনগণের পাশে আছে। অনেকেই মনে করছেন এ বিক্ষোভের সামনে ইরানের জেন-জির পেছনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাত রয়েছে।
বিক্ষোভকারীরা বর্তমান শাসনের অবসান দাবি করছেন। অবশ্য ইরানি কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এসব দাঙ্গা উসকে দিচ্ছে। এ ছাড়া ১৯৭৯ সালের বিপ্লবে ক্ষমতাচ্যুত শেষ শাহর ছেলে রেজা পাহলভি বিদেশ থেকে বিক্ষোভের সমর্থন জুগিয়ে যাচ্ছেন। বিদেশি ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতে যেসব তথ্য পাওয়া যাচ্ছে সে অনুযায়ী অর্থনৈতিক ক্ষোভ বর্তমানে সরকারবিরোধী আন্দোলনের রূপ নিয়েছে। বিক্ষোভকারীরা ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির পতন চাইছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একাধিক হুমকি, ইসরায়েলের মন্ত্রী ও গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সমর্থন জানানোও ‘সরকার বদলের’ চেষ্টার সন্দেহকে জোরালো করেছে। ফলে সাধারণ মানুষ তাদের জীবনমান উন্নয়নের দাবিতে যে বিক্ষোভে শরিক হয়েছিলেন এখন তা বৈশ্বিক রাজনীতির মঞ্চে ঝড় তুলেছে।
দেশজুড়ে বিক্ষোভ প্রশাসনকে নাজুক অবস্থায় ফেলেছে। এ ছাড়া বাইরে থেকে যে চাপ তা হলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পক্ষ থেকে। যথেষ্ট আন্তর্জাতিক মিত্রের সমর্থন না থাকায় ইরানের দুর্বলতার ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে নিজ দেশের ভেতর থেকেই। জার্মান-ইরানি অধিকারকর্মী ডানিয়েলা সেফেরিও ডয়চে ভেলেকে বলেন, আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যে ইরানের নেতৃত্ব অনেক দুর্বল অবস্থায় আছে। ইরানের প্রচলিত পারস্পরিক সহযোগী শক্তিও ধীরে ধীরে কমছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত চাপ একত্রে বাড়ছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের সূত্রমতে, তৃতীয় দেশের হস্তক্ষেপে খামেনি ও পেজেশকিয়ান প্রশাসনের পতন হলে তা ১৯৫১ সালের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হিসেবেই গণ্য হতে পারে। আড়ালে পড়তে পারে সাধারণ মানুষের তোলা জীবনমান উন্নয়নের দাবি।’
ইরানের বিক্ষোভকারীরা প্রধানত দুর্নীতি ও নিপীড়ন বন্ধ এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের দাবি জানাচ্ছেন। এ মুহূর্তে তাদের মধ্যে বিকল্প নেতৃত্বের বিষয়টি জোরালো নয় এবং রাজনৈতিক দাবিদাওয়াও স্পষ্ট হয়নি। এ রাজনৈতিক শূন্যতা রেজা পাহলভির জন্য নেতৃত্বের সুযোগ তৈরিতে বেশ ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করা হচ্ছে। এ ছাড়া রাজতন্ত্রের প্রতিনিধি হিসেবে তার একটি বড় সমর্থক গোষ্ঠী রয়েছে। আমরা সব ধরনের যুদ্ধ এবং আগ্রাসনের বিরুদ্ধে। আমরা লক্ষ্য করেছি দেশে দেশে যুদ্ধের এক নীরব দামামা বাজছে। একটি দেশের অভ্যন্তরীণ শাসন কাঠামোর দুর্বলতা সামনে এলেই বিশ্ব মোড়লদের নাক গলানোর প্রবণতাও বেড়ে যায়। শান্তি স্থাপনের চেয়ে সেসব দেশের জনগণকে প্রলুব্ধ করতে ‘আগুনে ঘি’ ঢালার ব্যবস্থা করতে থাকে। এতে করে রক্তপাত ও মানবিক বিপর্যয় ক্রমাগত বাড়তে থাকে। এ ধরনের বিপর্যয় এড়াতে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এগিয়ে আসতে হবে। ইরানে আর কোনো রক্ত না ঝড়ুক, তাদের ভাগ্য যেন আন্তর্জাতিক শক্তির কৃপায় পুতুল সরকার বসানোর অপচেষ্টা না হয়, এটাই প্রত্যাশা।
