
দেশে নিপাহ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বাড়ছেই। এটি মারাত্মক ভাইরাস। এটি প্রাণী থেকে মানুষের শরীরে সংক্রমিত হয়। সাধারণত ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সময় নিপাহ ভাইরাসের মৌসুম হিসেবে ধরা হয়। টেরোপাস প্রজাতির ফল খেকো বাদুড় এই ভাইরাসের প্রকৃত বাহক। শীতকালে খেজুরের রস সংগ্রহের সময় বাদুড় সেই রসে মুখ লাগালে এবং মলমূত্রের মাধ্যমে ভাইরাসটি রসে মিশে যায়।
ওই কাঁচা রস পান করেই মানুষ সংক্রমিত হয়। এ ছাড়া আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এসেও নিপাহ ভাইরাস ছড়াতে পারে। যা এই রোগকে আরও বিপজ্জনক করে তোলে। এ রোগে আক্রান্ত হলে প্রথমে জ্বর, মাথাব্যথা, বমি ও শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। চিকিৎসকদের মতে, নিপাহ ভাইরাসে মৃত্যুহার অত্যন্ত বেশি হলেও এখন পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ বা টিকার উদ্ভাবন হয়নি। ফলে উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা একমাত্র ভরসা। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, নিপাহ ভাইরাসের ঝুঁকি জানা সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ে প্রস্তুতি অত্যন্ত দুর্বল। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের অনেক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নেই পর্যাপ্ত আইসোলেশন সুবিধা। প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী এবং প্রয়োজনীয় সুরক্ষা সামগ্রীর অভাব তো রয়েছেই। যে কারণে রোগী শনাক্ত দ্রুত পরীক্ষা ও রেফার করার ব্যবস্থাও অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর নয়। নিপাহর মতো সংক্রমণ ও উচ্চ মৃত্যুহার যুক্ত ভাইরাস মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাস্তবে সচেতনতা কার্যক্রম সীমিত থাকায় ঝুঁকি আরও বাড়ছে। তারা বলছেন নিপাহ ভাইরাস যদি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে তাহলে তা নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে। তাই এখনই সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, সংক্রমণের সক্ষমতার দিক থেকে নিপাহ ভাইরাস করোনাভাইরাসের তুলনায় অনেক বেশি ভয়ংকর। মানুষের মধ্যে এর সংক্রমণের হার প্রায় ২৮ শতাংশ। যেখানে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের হার ছিল মাত্র ৮ থেকে ১০ শতাংশ। নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণের হার তুলনামূলকভাবে কম মনে হলেও মানুষের শরীরে কোনো প্রাকৃতিক প্রতিরোধ না থাকার কারণে এটি মারাত্মক ঝুঁকি।
চলতি বছরে বাংলাদেশের নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্তের কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য সরকারিভাবে প্রকাশ করা হয়নি। তবে রোগ তত্ত্ব রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) গত ৭ জানুয়ারি এক সভায় জানায়, দেশে ২০০১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ৬৪টি জেলার মধ্যে ৩৫টিতে নিপাহ ভাইরাসের রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী পাওয়া গেছে ফরিদপুর, রাজবাড়ী, নওগাঁ ও লালমনিরহাট জেলায়। ২০২৪ সালে নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত পাঁচজনের সবার মৃত্যু হয়েছে। ২০২৫ সালে আক্রান্ত চারজন মারা যান। সর্বশেষ দুই বছরে আক্রান্ত হওয়া ৯ জনের প্রত্যেকের মৃত্যু হয়েছে, যা খুবই উদ্বেগজনক। অর্থাৎ ২০০১ থেকে ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত ৩৪৭ জন আক্রান্ত হয়েছেন। যার মধ্যে ২৪৯ জন মারা গেছেন।
নিপাহ ভাইরাসবিষয়ক গবেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অণুজীব বিষয়ের অধ্যাপক ড. মাহমুদা ইয়াসমিন বলেন, নিপাহ ভাইরাসের একটি ভয়ংকর বৈশিষ্ট্য হলো এটি সরাসরি মানুষের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র বা মস্তিষ্ককে আক্রান্ত করে। এতে মস্তিষ্কে তীব্র প্রদাহ বা ‘এনসেফালাইটিস’ তৈরি হয়। যার ফলে রোগী দ্রুত কোমায় চলে যেতে পারে। কেউ কেউ সুস্থ হলেও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন না। এর সুনির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা ও টিকা নেই। তাই আমাদের ‘কালচারালি’ সচেতন হতে হবে। শুধু খেজুরের রসই নয়, যেকোনো পাখির খেয়ে যাওয়া ফল না খাওয়াই ভালো মানুষের জন্য।
নিপাহ ভাইরাসকে একটি সাইলেন্ট কিলার বা নীরব ঘাতক হিসেবেও মনে করা যায়। সামান্য ভুল বা অসতর্কতায় মানুষের মারাত্মক প্রাণহানি ঘটতে পারে। তাই জনসচেতনতা বাড়াতে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দেশের তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত জনসচেতনতা বাড়াতে সম্মিলিতভাবে কাজ করে যেতে হবে। জীবন বাঁচাতে এর বিকল্প নেই।
