
ষাট-সত্তর দশকের
মূলত মধ্যবিত্ত বাঙালির প্রতিনিধি তরুণ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বিষয়,
দৃষ্টিভঙ্গি ও ভাষা ব্যবহারে বিভূতিভূষণ, তারাশঙ্কর, মানিক
বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঔপন্যাসিক পরিসর থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন। দেহে আর মনে এমন
অবাধ নিঃসঙ্কোচ পারাপারই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের জীবনীশক্তি।
মতামত বা
দৃষ্টিভঙ্গির মিল থাকা না-থাকাটা বড় কথা নয়, বড় কথা নিজের অভিজ্ঞতাকে
কোনওরকম নিষেধ বা সংস্কারের তোয়াক্কা না করে আখ্যানে ও সংলাপে সোজাসুজি বলে
যাওয়া। নানান উঞ্ছবৃত্তির জীবনে-নেশায় খেয়ালে আবেগে-জীবন, জীবিকা ও
যৌনতাকে চেখে দেখার এই যে মোহমুক্ত নিঃসঙ্কোচ প্রকাশ, এটাই সুনীল
গঙ্গোপাধ্যায়কে তাঁর ‘আত্মপ্রকাশ’ উপন্যাসে আমাদের কথাসাহিত্যের ঐতিহ্য
পরম্পরায় একেবারেই নজিরবিহীনভাবে ধরে দিয়েছিল।
আমাদেরই সমসাময়িক এই লেখক
গত শতকের পঞ্চাশের দশকে এবং পঞ্চাশ-ষাটের সন্ধিকালে, দেশভাগের
পরিপ্রেক্ষিতে এবং আন্তর্জাতিক নানা যোগাযোগের বিভ্রান্ত প্রেক্ষাপটে জীবন
নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে খেলতেই মানুষের অন্তর্নিহিত বিবেককে নতুন করে পরখ করার
চেষ্টা করেছিলেন। প্রবৃত্তির বশে জীবনটাকে ভোগ করতে গেলে কত বিচিত্র
অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, নেশা-ভাঙ করে কত বিচিত্র সুখদুঃখ ও স্বপ্নকে
তারিয়ে তারিয়ে অনুভব করতে হয় তারই ‘তথ্যচিত্র' সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের
'আত্মপ্রকাশ' উপন্যাস। এই উপন্যাসের নায়কের নিজের কথায়, সেই পঞ্চাশ-ষাট
দশকের সন্ধিকালে তার আত্মপরিচয়টা শুনে নেওয়া যাক: ‘নীল ব্যাটটার গায়ে লেগে
সাদা বলটা [টেবিল টেনিস খেলা চলছে] আগুনের ফুলকির মতো ছিটকে উঠছে, যমুনার
ঠোঁট ও নাকের মাঝখানে-যেখানে কোনো কোনো মেয়ের গোঁফ থাকে সেখানে সামান্য
ঘাম, ঈষৎ ছোটাছুটিতে রঙিন মেয়েলি ছাতার মতন ফুলে উঠছে স্কার্ট, আমি যমুনার
ঊরুর কিয়দংশ দেখতে পাচ্ছি। এতদিনে যমুনার শরীরের দিকে একটুও লোভ করিনি। এখন
হঠাৎ ইচ্ছে হল, খেলা থামিয়ে যমুনাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরি। ...এই প্রথম
যমুনার শরীরের জন্য আমার সর্বশরীর উন্মুখ হয়ে উঠল। কথাটা সজাগভাবে ভেবেই
আমার খুব কষ্ট হল। বুকের মধ্যে মুচড়ে উঠল অকস্মাৎ। যেন আমি এই মুহূর্ত থেকে
কিছু একটা হারাতে শুরু করলুম। আমি এত অসহায়-সে কথা পৃথিবীর আর কেউ জানে?
আমি খুবই কাতরভাবে মনে মনে বললুম, সরস্বতী আমায় ছেড়ে দাও না! আমাকে তুমি
দয়া করো, আমাকে শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে দাও যমুনাকে-আমি এর চেয়ে বেশি
কিছু চাই না!’
এই উদ্ধৃতিটা দিচ্ছি দু'টি কারণে। প্রথমটি হল, সুনীল
গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘আত্মপ্রকাশ’-এর নায়ক ‘সুনীল’ যেভাবে আত্মীয়ের যোগাযোগের
সূত্রে চাকরি জোগাড় করে শেখর, সুনির্মল, তাপস আর নুরুলের সঙ্গে নেশাভাঙ করে
জীবন কাটিয়েছে এবং মেয়েদের সঙ্গে মেলামেশার ‘খেলা’য় মেতে উঠেছে, তার হুবহু
না হলেও অনেকটা অনুসরণ আছে ‘অরণ্যের দিনরাত্রি', ‘যুবক-যুবতীরা' থেকে শুরু
করে ‘সরল সত্য’, ‘গভীর গোপন’, ‘জীবন যে রকম’, ‘নদীর পারে খেলা’, ‘বসন্ত
দিনের ডাক’, ‘পুরুষ’, ‘তুমি কে?' এমন অনেক অনেক উপন্যাসের মধ্যে। সেই সব
আখ্যানের মধ্যে চোখে পড়বে বেশ কিছু বন্ধুগোষ্ঠী (কেউ বেকার, কেউ বা চাকুরে)
নানাভাবে মেয়েদের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে ভালবাসার সূক্ষ্ম, জটিল, অনিবার্য
টান বুঝতে পারে, কোথাও কোথাও সে-ভালবাসা আবার চিরকালীন সন্ধানের বিষয়,
কিংবা শুদ্ধ বিবেকের মতো-যার কাছে বারবার নতজানু হয়ে ফিরে আসতে হয়। কিন্তু
ওরই মধ্যে একটু নতুনত্ব আছে কোথাও কোথাও। যেমন, ‘আত্মপ্রকাশ' উপন্যাসের
প্রথমেই নায়কের বন্ধু শেখরের ভাই পরিতোষ এসে বলেছে, 'এসব আপনারা কী আরম্ভ
করেছেন? সব কিছুরই একটা সীমা থাকা উচিত!' তারপর একেবারে গল্পের শেষে পরিতোষ
আবার এসে বলছে, তার দাদা কাল বাড়ি ফেরেনি। পাগলামি শুরু করেছে। অলৌকিক
অভিজ্ঞতার লোভে প্রাণায়াম করছে! তিনদিন ধরে উপোস করে ধ্যানে বসেছে। আগের
দিন রাত থেকে টলে টলে পড়ে যাচ্ছে। তারপর বলেছে, ‘যত সব সিলি ব্যাপার!' খুবই
নর্মাল লাইফ লিড করতে অভ্যস্ত বন্ধুর ভাই ভাল ছাত্র। তার মুখ থেকে গল্পের
প্রথমে আর শেষে এই জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলাকে 'সিলি ব্যাপার' বলে মন্তব্য
শোনার পিছনে একটা চাপা কৌতুকের ঘেরাটোপে ‘আত্মপ্রকাশ’ যে একটু অন্য মাত্রা
পেয়ে যায়, তা হল জীবন নিয়ে ‘সেয়ানা’দের এই খেলা।
ওই উদ্ধৃতিতে আর একটি
প্রবণতারও ইঙ্গিত আছে। তা হল, শরীরের চাহিদা জেগে ওঠার প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই
কিংবা একটু পরে, স্থিরচিন্তায় একটা অসহায় দূরত্বের অনুভবও এসেছে এবং তার
জন্যে বেশ কষ্টও আছে। অর্থাৎ, ভালবাসা যেমন শারীরিক আকর্ষণকে জাগায়, তেমনই
একটা শুদ্ধ বিবেককেও জাগায়। কষ্টের অনুভব সেজন্যেও, সংবরণে ঔদাসীন্য আসার
জন্যেই সে কষ্ট। আত্মপ্রকাশ- এর মতো ‘সরল সত্য' উপন্যাসের নায়ককেও এই
কাম-নিষ্কামের দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়তে দেখি। কখনও সে দ্বন্দ্বটা থাকা অন্যায়
বলে মনে হয়, কখনও মনে হয়, না, এই দ্বন্দ্বই মানুষকে সৎ শুদ্ধ উদাসীন হতে
শেখায়। ‘গভীর গোপন' উপন্যাসের নায়ক তপুকেও দেখি, আহত ভালবাসা নিয়ে (তপুর
জবানিতে ‘শ্মশান থেকে মানুষ যেভাবে ফেরে’) সে ধীরে অভিজ্ঞ এবং আরও বয়স্ক
মানুষের পর্যায়ে চলে আসছে। আবার এমনও হয়েছে, আহত ভালবাসা যে-অভিজ্ঞতা নিয়ে
আসে একটি তরুণের জীবনে, তাতে ভালবাসার ‘চরিত্র’টাও তার কাছে স্পষ্ট হয়ে
ওঠে।
এই ভালবাসাই আবার নারীকে দেবীর পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছে। ‘আত্মপ্রকাশ'
উপন্যাসে সরস্বতী যদি শারীরিক টানে এগিয়ে আসে, তো যমুনা দেবীর মতোই, তার
পায়ের কাছে মাটিতে বসতে ইচ্ছে করে। ‘আত্মপ্রকাশ'-এর নায়কও প্রেমিকার পায়ের
দিকে চেয়ে থেকে ভেবেছে ‘আমার চোখে যদি অনেক জল থাকত আমি চোখের জল দিয়ে ওর
পা ধুয়ে দিতাম।'
২
একটু অন্য ধরনের খোঁজ চলেছে ‘অরণ্যের দিনরাত্রি'র
মধ্যে। শহুরে জটিলতায় ও অপরিসরে যা পেতে সময় লাগে, বাধা হয়ে দাঁড়ায়
ব্যবহারের রুচি ও সংযম, তা জঙ্গলের পরিবেশে থাকে না বলেই তুলনায় যেন
সহজলভ্য হতে পারে এমনই প্রত্যাশায় জঙ্গলে নিজেকে অনেকটা মুক্ত মনে করে
‘যৌবনী’ মানুষ। ব্যর্থ প্রেমের জ্বালার মধ্যে অনেকসময়ই যে-শারীরিক অতৃপ্তি
মিশে থাকে, তা জঙ্গলে মিটিয়ে নেওয়ার সুযোগ এসে যেতেই পারে। ‘অরণ্যের
দিনরাত্রি’র তপতীর কাছে রবি যে-আঘাতটা পেয়েছে, তাতে দুলির সঙ্গে সম্পর্ক
অনেকটাই ‘পাশবিক’ ভাবে প্রকাশ পেয়েছে। তবে রবির এই প্রতিক্রিয়া কিন্তু
শেখরের নয়। সে যে জানত ভালবাসা নেহাতই শুধু চাওয়া, তৃপ্তির দিকে এগোয় না,
জয়ার কোলে মাথা রেখে তার সেই চাওয়া-পাওয়ার মাঝখানের দেওয়ালটা ভাঙতে থাকে।
কিন্তু রবির মতো সে চড়া মাত্রায় যায় না। একটু যেন বাঁধনছেঁড়া ছেলেমানুষির
মতোই সেই প্রতিক্রিয়া। যাই হোক, ‘অরণ্যের দিনরাত্রি'র পরিবেশে সম্পর্কের
নানা রকমফের আছে। শহরেও যে এমনটা হয় না, তা হয়তো বলা যায় না, কিন্তু
খোলামেলা আরণ্যক পরিবেশে সম্পর্কগুলো অনেকটাই যে অবাধে প্রকাশ পায়, তা তো
মানতেই হয়। ব্যক্তিগত নানা দুঃখ-আঘাত কিংবা ধ্যান- ধারণা বদলে যাওয়ার এই তো
উপযুক্ত পরিবেশ। শারীরিক বা মানসিক ভালবাসার প্রকাশের দুটো দিকই এখানে
বেপরোয়া বেকার ছেলেদের জীবনে ঘটে গিয়েছে।
যাই হোক, ভালবাসার নানা মাত্রা
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের তথাকথিত ছোট উপন্যাসে বিচিত্রভাবে এসেছে। কখনও তা
‘ছেলেমানুষি’, কখনও তা স্বপ্নময়, কখনও তা উদাসীন। আবার কখনও সে ভালবাসা
সুস্থির সংসারজীবনের দিকেও উন্মুখ।
এছাড়াও কিন্তু ভালবাসার শক্তিকে
দু'টি সত্তায় ভাগ করে একটা ফ্যানটাসি তৈরির চেষ্টাও আছে ‘তুমি কে?’
উপন্যাসে। ‘জ্যোতি' যেমন নিজেকে ‘অসিত' ভেবেছে, সুস্মিতাকেও তেমনই নিজেকে
“মায়া” ভেবে তার সঙ্গে ভালবাসার 'খেলা' চালিয়ে যেতে বলেছে। সুস্মিতা
প্রথমটায় এ-খেলা পছন্দ করেনি। পরে ঘটনাচক্রে অসিত ও জ্যোতি পাশাপাশি এক
বিয়েবাড়িতে সুস্মিতার সামনা-সামনি হওয়ার পরে জ্যোতি সুস্মিতাকে বলেছে,
নিজের পরিচিত সত্তা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যে সে যেমন অসিত সেজেছে,
সুস্মিতাও তেমনই ভাবে নিজেকে মায়া হিসেবে জানবার চেষ্টা করুক। শেষ পর্যন্ত
এই মজার খেলাটা বুঝতে পেরে সুস্মিতা জ্যোতির সঙ্গে বোঝাপড়ায় পৌঁছেছে। শেষে,
সুস্মিতা জ্যোতির মনের মতো করে নিজেকে সাজিয়েছে।
এবার গঙ্গার ধারে জ্যোতি হারিয়ে যাবে, আর সুস্মিতা খুঁজতে খুঁজতে তাকে পেয়ে বলবে (অনেকটা বনলতা সেন-এর মতো) আপনি এতক্ষণ কোথায় ছিলেন?
‘হ্যামলেট’
নাটকের তৃতীয় অঙ্কের তৃতীয় দৃশ্যে মা-কে বলা হ্যামলেটের একটা কথা জ্যোতি
বলেছিল 'ঙ, ঃযৎড়ি ধধিু ঃযব ড়িৎংবৎ ঢ়ধৎঃ ড়ভ রঃ,/ অহফ ষরাব ঃযব ঢ়ঁৎবৎ রিঃয
ঃযব ড়ঃযবৎ যধষভ'অসিতের ছদ্মবেশে জ্যোতির সেই পবিত্রতর মানুষটিকে ভালবেসে
সঙ্গী করে নেওয়ার গল্প আসলে ভালবাসার শুদ্ধ রূপকে খোঁজার চেষ্টা। ‘সরল
সত্য' উপন্যাসের নায়কও তার ভালবাসার মেয়েটির কাছে যোগ্য হতে চেয়ে এই একই
কথা উচ্চারণ করেছিল। অর্থাৎ ওই ‘ষরাব ঃযব ঢ়ঁৎবৎ রিঃয ঃযব ড়ঃযবৎ যধষভ'। এই
সব ছোট ছোট উপন্যাসে হয়তো গত শতকের পঞ্চাশ-ষাট দশকের বাঙালি সমাজের
সামগ্রিক ছবি নেই, কিন্তু মধ্যবিত্ত সমাজের বেপরোয়া, স্বপ্নময় যুবকযুবতীদের
যে-অসংখ্য খণ্ড খণ্ড ছবি আছে, তাদের সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বড়
উপন্যাসগুলির তুলনায় সব সময় হয়তো ছোট করা যাবে না। হয়তো সেই তখনকার
যুবক-যুবতীদের সেই পারিপার্শ্বিক অনেকটা পাল্টে গেছে, কিন্তু সেই সময়কার
‘স্বপ্ন ও বাস্তবে মেশা জীবন'-এর খোঁজে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় যেভাবে
সম্পূর্ণ নির্মোহ হয়ে এগিয়ে গিয়েছেন, তার তুলনা পাওয়া মুশকিল। কাছাকাছি
পূর্বসূরী সমরেশ বসু ছাড়া আর কাউকে ভাবা যায় না। তাও দেশবিদেশের
পট-বৈচিত্রে ও কাব্যিক আবেশে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় অনেক বেশি পাঠকের দৃষ্টি
আকর্ষণ করেন।
৩
এইবার সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের যেসব উপন্যাস আকারে বড়,
তাদের প্রসঙ্গে আসি। সঙ্গে সঙ্গে কিছু ছোট ও একটু বড় উপন্যাসের প্রসঙ্গও
এসে পড়বে, যেহেতু বড় উপন্যাসগুলি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাসমালার কোনও
আলাদা পর্ব নয়, তাই ‘একা এবং কয়েকজন’, ‘সেই সময়’, ‘পূর্বপশ্চিম’, ‘প্রথম
আলো’ কিংবা ‘মানুষ, মানুষ'-এর মতো বৃহদায়তন উপন্যাসের পাশাপাশি আসতে পারে
‘রাণু ও ভানু’, ‘মনের মানুষ' কিংবা শেষ উপন্যাস 'সরস্বতীর পায়ের কাছে'র
নাম। কেউ কেউ বলেছেন, ষাট-সত্তর দশকের মূলত মধ্যবিত্ত বাঙালির প্রতিনিধি
তরুণ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বিষয়, দৃষ্টিভঙ্গি ও ভাষা ব্যবহারে বিভূতিভূষণ,
তারাশঙ্কর, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঔপন্যাসিক পরিসর থেকে বেরিয়ে এসে
যে-ভণ্ডামি ও দ্বিচারিতার মুখোশ খুলে দিয়েছিলেন স্ল্যাং-মেশানো চলতি ভাষায়,
সেই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় নাকি ‘সেই সময়’, ‘পূর্বপশ্চিম’ বা ‘প্রথম আলো'-র
মতো উপন্যাসে বাংলা উপন্যাসের ‘মূল স্রোতে’ ফিরে গিয়েছেন এবং সেদিক থেকে
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের এই বড় উপন্যাসগুলি তাঁর নতুন ‘আত্মপ্রকাশ’-ধর্মী
উপন্যাসের জীবন-নিরীক্ষার বেপরোয়া ভঙ্গি থেকে সরে গিয়েছে। ‘সেই সময়’,
‘পূর্বপশ্চিম’ ও ‘প্রথম আলো’র ক্ষেত্রে উপন্যাসের প্রথাগত আখ্যানধর্মিতাকে
মেনে নেওয়া হয়েছে ঠিকই, কিন্তু শুধু ওই ত্রয়ীতেই নয়। ‘একা এবং কয়েকজন' গল্প
শুরু হয়েছে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের একবছর আগে। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের শেষ
জাতীয় পর্বে আগস্ট আন্দোলন, পূর্ব প্রাচ্যে মিত্রশক্তি বাহিনীর পরাজয়, অসম
পূর্ববঙ্গ ছেড়ে ব্রিটিশ গভর্নমেন্টের পিছু হটার সিদ্ধান্ত, এই সব উদ্বেগের
পরিবেশে সম্পূর্ণ ভিন্ন স্বভাবের দু'টি কিশোর দুর্ভিক্ষ, দাঙ্গা ও
ভারতবিভাগ এবং স্বাধীন ভারতের উত্তপ্ত রাজনীতির মধ্যে পড়েছে। কিন্তু এই
সমস্ত বৈচিত্রময় জীবনকে ফিরে তাকিয়ে দেখছে এক ভাই পরিচিত একটি মেয়ের সঙ্গে
শারীরিকভাবে সম্পৃক্ত হয়ে। এ-আখ্যান যেহেতু লেখকেরই সমকালীন শৈশবজীবনের
ইতিহাস দিয়ে শুরু (তিরিশের দশক থেকে), সেই জন্য ইতিহাসের শাসনকে বেশ কিছুটা
মেনে নিতেই হয়েছে। কিন্তু ঘটনার আড়ালে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বেশ কিছু
প্রবণতা মিশে গিয়ে (প্রতিবাদ, ভালবাসার রোম্যান্টিক আবেগ, শারীরিক সম্পর্ক
ইত্যাদি) ইতিহাসের বুনটে রক্তমাংসের মানুষেরই গল্প হয়ে উঠেছে।
কিন্তু
সেই সময় উপন্যাসে উনিশ শতকের একটা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ সময়কে ধরা হয়েছে। এবং
এখানেও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লক্ষ্য আরও একটি বর্ণাঢ্য সময়। উনিশ শতকের
নব্যশিক্ষিত যুবসমাজ-বাবুসমাজ ‘সুরা-নারী আর বুলবুলি বিলাসে মগ্ন। একদিকে
শিক্ষিত সমাজে ইংরেজ অনুকরণ-অনুসরণ চলছে, গ্রামজীবন শোষণ করে চলছে নাগরিক
সমৃদ্ধি, সংস্কৃতিচর্চা, চলছে সমাজ ও ধর্মসংস্কার। পরস্পরবিরোধী নানা
প্রবণতায় দ্বারকানাথ ঠাকুর, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রামকমল সিংহ ও তাঁর
পরিবার, রানি রাসমণি, বিটন সাহেব, রামগোপাল, দক্ষিণারঞ্জন, মদনমোহন, মাইকেল
মধুসূদন, হরিশচন্দ্র, কেশবচন্দ্র, বিদ্যাসাগর এগিয়ে চলেছেন। আর এই সব
মণিমুক্তোর মতো মানুষের মিছিলে নবীনকুমার নামে এক কল্পচরিত্র, বিখ্যাত উদার
বিদ্যোৎসাহী পণ্ডিত, যিনি এই বিচিত্র ধর্ম-সমাজ আন্দোলনের কোনও পক্ষ না
নিয়েও শ্রদ্ধেয়, অথচ যাঁর জন্মরহস্য ও অচেনা এক নারীর মধ্যে মাতৃরূপ দর্শন
এবং যুগোচিত নানা প্রবণতায় সমসাময়িকদেরই একজন। এই নবীনকুমারের মাধ্যমেই
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর উদ্দিষ্ট সময়কালকে প্রথাগত সংস্কার, অধ্যয়ন,
অধ্যবসায়, পাণ্ডিত্য, পানাসক্তি, পরদারগমন ইত্যাদি বিচিত্র স্ববিরোধিতায়
জীবন্ত করে তুলেছেন। বিশ শতকের মধ্যভাগে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সমসাময়িক
যুবক- যুবতীরা যে-জীবনের চেনা ছকের বাইরে চলে গিয়েছে, তার পূর্বরূপ কি ‘সেই
সময়’-এর জীবনধারায় বেশ খানিকটা ছিল না? মাইকেলের সঙ্গে নবীনকুমারের দাদা
গঙ্গানারায়ণের সংলাপ পড়লে পাঠক একশো বছর আগেকার একজন স্বপ্নময় তীব্র
আবেগপ্রবণ শক্তিমান স্রষ্টার সঙ্গে সমসময়ের জীবনসন্ধানী এক লেখককে খুঁজে
পাবেন নিশ্চয়ই। চিন্তা ও সৃষ্টির যে-কোনও ক্ষেত্রে প্রতিভাবান মানুষের ছক-
না-মানা জীবনযাপনের মধ্যে যে স্ববিরোধিতা থাকে, সে-বৈপরীত্য সব যুগেই
কমবেশি পাওয়া যায়। উনিশ শতকের নব্য বাঙালি ও সংশ্লিষ্ট সমাজ আর বিশ শতকের
সদ্য স্বাধীনতা-পাওয়া পূর্ব-পশ্চিমে আলাদা হওয়া বাঙালির মধ্যে এই স্বভাবগত
বৈপরীত্য সহজেই চোখে পড়ে। তাই উনিশ শতকের ইতিহাসের ঘটনাজালে কৌতূহলী হয়ে
পড়া সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের পক্ষে মোটেই অস্বাভাবিক নয়।
‘পূর্বপশ্চিম’
উপন্যাস তো সমকালের দেশভাগ নিয়েই লেখা এবং ‘সেই সময়' উপন্যাস লেখার বছর
পাঁচেকের মধ্যেই উনিশ থেকে বিশ শতকের নাটকীয় এক ঐতিহাসিক কালে ফিরে এসেছেন
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় । কাজেই অতীত-বর্তমানে যাতায়াত চলছেই। উনিশ শতক যেমন
বাঙালির জীবনে নানান টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে তার আত্মবিকাশের কাল, বিশ শতকের
মধ্যভাগে দেশভাগ-পরবর্তী পঞ্চাশ থেকে আশির দশক শুধু পূর্ব-পশ্চিমে ভেঙে
যাওয়া বাঙালির জীবনের ওলটপালটের কালই নয়, পূর্ব-পশ্চিমে অর্থাৎ এই পূর্ব
গোলার্ধ ছেড়ে পশ্চিম গোলার্ধে ইউরোপ-আমেরিকায় ছড়িয়ে যাওয়ারও কাল, সুনীল
গঙ্গোপাধ্যায় নিজেও যে-কালস্রোতে পূর্ব ও পশ্চিম গোলার্ধের জীবনধারার
সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন। তাঁর আত্মজীবনী ‘অর্ধেক জীবন'-এ তার পরিচয় আছে।
‘নীললোহিত' ছদ্মনামে লেখা ‘সুদূর ঝর্ণার জলে’-ও তার সাক্ষী। আরও কয়েকটি
উপন্যাস এবং গল্পেও তার পরিচয় আছে। পূর্ববাংলা, পশ্চিমবাংলা এবং পশ্চিম
মহাদেশ এই ত্রিমাত্রিক পটে পূর্বপশ্চিম উপন্যাস লেখা। বিভক্ত দু'টি দেশ এবং
বিদেশের বিশালভূমিতে ‘অনেক' চরিত্রই গুরুত্ব পেয়েছে ‘এক-নায়কতন্ত্র’ নয়।
এত বিস্তৃত ইতিহাস ও কল্পনার দক্ষ মিশ্রণে ও বিন্যাসে সুনীল
গঙ্গোপাধ্যায়ের দক্ষতাকে মানতেই হয়।
৪
এই উপন্যাস রচনার পর বছর
পাঁচ-ছয়েকের মধ্যেই আর-একটি বিশাল বর্ণাঢ্য উপন্যাস প্রথম আলো লেখা শুরু
হয়েছে। ‘সেই সময়'-এর বিষয়গত কালসীমা শেষ হয়েছিল ১৮৭০ সালে। ঠিক পরবর্তী
সময়টাকেই যে ‘প্রথম আলো’-য় ধরা হয়েছে তা নয়, তবে উনিশ শতকের শেষ দু'দশক ও
বিশ শতকের প্রথম দশ বছর এই উপন্যাসের সময়সীমা। সেই সময় ছিল ব্রিটিশ সরকারের
অধীনে থাকা অবস্থায় সমাজ-সংস্কার। শিক্ষাপ্রসার ইত্যাদিতে ব্যস্ত নতুন
মধ্যবিত্ত শ্রেণি। মুক্ত চিন্তা ও চেতনা ছিল অবশ্যই, কিন্তু উদ্যোগটা তেমন
ছিল না। কিন্তু ‘প্রথম আলো'-র সময়সীমায় জাতীয়তাবোধ ও রাজনৈতিক চেতনারই
উদ্বোধন হয়েছে। ফলে ব্রাহ্মধর্ম ও হিন্দুধর্মের আন্দোলন, সাহিত্যে, নাটকে ও
থিয়েটারে তার স্পষ্ট ছায়া, জাতীয় কংগ্রেসের প্রবীণ নেতাদের সঙ্গে নবীন
নেতাদের বিরোধ, দুর্ভিক্ষ ও প্লেগ, হিন্দু-মুসলমানের বিভেদ সৃষ্টি, বিজ্ঞান
ও প্রযুক্তিবিদ্যার চর্চা ইত্যাদি বিচিত্র ও জটিল ইতিহাস ‘প্রথম আলো'-র
পটভূমি। আর এই পটভূমিতেই এসেছে ত্রিপুরার রাজপরিবার, কলকাতার ঠাকুর পরিবার
এবং বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথ। এই উপন্যাসের পাঠ্যগুণ পূর্বপশ্চিম-এর চেয়ে যে
বেশি, তার কারণ, ইতিহাস এবং কাহিনির মিশ্রণে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের
সামঞ্জস্যবোধ এ উপন্যাসে অনেক বেশি এবং ‘সেই সময়’-এর আখ্যানে যেমন
ধীরে-ধীরে নবীনকুমারই মূল লক্ষ্য হয়ে উঠেছেন, তেমনই ‘প্রথম আলো’-য় বিচিত্র
ঘটনা, সমাজ ও পরিবারের প্রসঙ্গ এলেও রবীন্দ্রনাথেরই প্রাধান্য ঘটেছে
ধীরে-ধীরে। তিনিই 'প্রথম' ও 'প্রধান' আলো। তাঁরই চরণধ্বনিতে উপন্যাসটি শেষ
হয়েছে। বিচিত্র ঘটনাজালের মধ্য দিয়ে পরস্পর আকৃষ্ট, কিন্তু ঘটনাচক্রে
বিচ্ছিন্ন দু'টি চরিত্র ভরত আর ভূমিসূতা শেষ পর্যন্ত বারাণসির দশাশ্বমেধ
ঘাটের সিঁড়িতে তারাভরা আকাশের নীচে বসে পরস্পরের হাত ধরেছে। ঠিক তার আগেই
ভূমিসুতা বলেছিল, “আমি কোনো পুরুষকে স্পর্শ করি নি, কিন্তু মন দিয়েছিলাম
একজনকে। দেবতাকে মানুষ যেমন ভালোবাসে সেইরকম আমিও একজন মানুষকে...।' ভরত
বলেছিল, ‘কে তিনি? তিনি ধন্য। নাম শুনলে কি চিনতে পারব?' ভূমিস্তা বলেছিল,
'হ্যাঁ। তিনি একজন কবি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।' তারপর দু'বার কথার পরে ভূমি
বলেছে, তাঁকে সে দেখেছে তাদের থিয়েটারে। 'কোনো কথা হয়নি। শুধু একদিক
থেকেই...।' ভরত বলেছিল, কবিদের মন দেওয়া যায়। আর তারপরেই তো হাতে হাত।
তারপর গল্পের বক্তা বলছেন, 'এই দুজনের যেন কোনও ঘরবাড়ি নেই, কোথাও ফিরতে
হবে না। এরকম একটি অনন্তকালের দৃশ্য হয়ে তারা বসে রইল।' এই অন্তিম বাক্যটির
পরে বলতে ইচ্ছে করে রবিঠাকুরেরই একটি লাইন: ‘দেবতারে যাহা দিতে চাই/ দিই
তাই প্রিয়জনে।'
খুব কাছের জীবনস্রোতের গভীর গোপন আবর্ত, উ™£ান্তি,
দিশাহীনতা, শারীরিক বা মানসিক বিশেষ লোভনীয় মুহূর্তগুলিকে ধরতে ধরতে সুনীল
গঙ্গোপাধ্যায় চলে গিয়েছেন কখনও অতীতে, কখনও ফিরে এসেছেন বর্তমানে, দুটো
ধারার টানই তাঁর কাছে কম ছিল না। ফলে এই দুটো টানকে ধরতে গিয়ে সুনীল
গঙ্গোপাধ্যায় তথ্য-ইতিহাস, সে বর্তমানই হোক বা অতীত, ঘাঁটতে শুরু করেছেন
এবং তাকে আখ্যানের নিজস্ব বিন্যাসে বাঁধতে চেয়েছেন। আর এই চাওয়া থেকেই তাঁর
আত্মশাসন শুরু হয়েছে, যা শিল্পীর পক্ষে খুবই মূল্যবান অর্জন। জন্ম-উৎস
যা-ই হোক, মানুষের প্রথম ও শেষ পরিচয় সে মানুষ। ‘সেই সময়’ উপন্যাসের
নবীনকুমার দোষে-গুণে মানুষ, উদার প্রতিভাবান মানুষ। জন্ম তার যেভাবেই হোক,
শেষ পর্যন্ত মানুষ মানুষই, নিজস্ব পথ খুঁজে নিতে পারলে তো কথাই নেই। আবার
তেমনই, শকুন্তলার জন্ম প্রচলিত মতে অবৈধ, তাঁর ছেলে ভরত-এরও বিবাহবহির্ভূত
বংশে জন্ম। চন্দ্রবংশের রাজা তিনি, তাঁর নামেই দেশটির নাম ভারতবর্ষ। সেই
ভারতবর্ষই এখন তিনখণ্ডে ভেঙে গিয়ে হয়েছে ভারত, পাকিস্তান আর বাংলাদেশ। সেই
তিন দেশের জন্মের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, ধর্মীয় বিভেদে হারিয়ে যাচ্ছে
মানবাধিকার। এই ধরনের বিভাজনের ন্যায়-অন্যায় বিচার না করে কেবল মানুষ
হিসেবেই তিনটি দেশ নিজের নাগরিকদের নিছক মানসিক সমস্যা মেটাতে তৎপর হোক এবং
এইরকম একটা সর্বজনীন মানবিকতার ধারণাতেই বিভিন্ন দেশ উন্নত হোক, এমনই একটি
ধারণা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘মানুষ, মানুষ' উপন্যাসে।
ধর্মের মানুষ মানুষের ধর্মে ফিরে যাক, এই কথাই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলতে
চেয়েছিলেন।
আর সেই মানুষের ধর্মের টানেই তো 'মনের মানুষ' লেখা। তাঁর
লেখাতে লালনের কী লীলা? সর্বখেপি তাকে দেখার বাসনায় এসে গান ধরেছিল, ‘দেখে
যাও ময়ূরী, ও কোকিলা/ আমার এই শূন্য ঘরে ভালবাসার কেমন লীলা।' গান শেষ করে
নিঃসঙ্কোচে লালনকে যখন সে কোমর দুলিয়ে নেচে নেচে গাইতে বলে, তখন লালন গাইতে
শুরু করে 'মিলন হবে কতদিনে/ আমার মনের মানুষের সনে।' কিন্তু সেই সর্বখেপি
যখন গান ধরেছিল, তখন গল্পের বক্তার বর্ণনায় পড়ি। “অতবড় চেহারার রমণীটি গান
গায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে, নেচে নেচে, মাথার ওপর দুহাত তুলে তালি দেয়। তার বিশাল
স্তন দুটি দোলে।’ ওই চিত্ররূপময় বর্ণনাতেও সেই ধর্মের মানুষ পৌঁছে গিয়েছে
মানুষের ধর্মে। দেহে আর মনে এমন অবাধ নিঃসঙ্কোচ পারাপারই কথাশিল্পী
ঔপন্যাসিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রাণশক্তি।
