
‘যাত্রী’ সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠন,
কুমিল্লা নামে একটি জ্ঞানভিত্তিক, প্রগতিশলী, দেশপ্রেমিক এবং অসাম্প্রদায়িক
চেতনা ও আদর্শ ঐতিহ্য অক্ষুণ্ন রাখতে বিগত আঠার বছর নিরন্তর কাজ করে
যাচ্ছে। এ ধারায় বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মধ্যে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপনে
‘যুতি’ নামে সাহিত্য-সংকলন বা সাময়িকী, ‘যাত্রী’র সদস্যদের লিখিত
‘কবিতা-পত্র’ এবং গুণিজন সংবর্ধনা (প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপনকালীন) ও
বিভিন্ন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিদের স্মরণে স্মারকগ্রন্থ ও অন্যান্য প্রকাশনা
রয়েছে।
এবার (২০২৬) যাত্রী’র সতেরোতম ‘কবিতাপত্র’ বের হলো। যাত্রী-সদস্য
২৯ জনের কবিতা নিয়ে এ আয়োজন। কবিতাগুলোর মান বিচার করবেন পাঠক, আমি
যাত্রীর একজন উপদেষ্টা, যাত্রী পরিবারের সদস্য। সুতরাং সতেরোটি সংখ্যায়
আমার একটি করে কবিতা ছাপা হয়েছে। এ প্রাপ্তি আমার জন্য গৌরবের যাত্রীর জন্য
দায়। কিন্তু কবি হতে পেরেছি কীনা জানি না কবিতাগুলো যে আমার সম্পদ।
সাধারণভাবে
বলা যায় আমি কবিতা লিখতে পারি না, কবিতা আমার লেখনিতে আসে না। অর্থাৎ
কবিতা হয় না। তবে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ছাত্র ও শিক্ষক ছিলাম, কবিতা
পড়েছি, কবিতা পড়াতে হয়েছে। এজন্য কবিতার রূপ-রস-ছন্দ-প্রকরণ অর্থাৎ কাঠামো
সম্বন্ধে জ্ঞান অর্জন করেছি কিন্তু কবিতা লিখলে তা হয় না, এটা বুঝি ও জানি।
কথাটা হলো ‘কবি’ হতে অন্য একটি গুণ বা যোগ্যতা এমনিতে জেগে ওঠে। তবে ইচ্ছে
করলেই প্রকৃত কবিগণ তাৎক্ষণিকভাবে কোনো কবিতা লিখতে পারেন না।
কবিতা
পত্র-সতেরোর জন্য যাত্রীর সাহিত্য সম্পাদক আমার কাছে কবিতা চেয়েছে। বলেছি-
ইন্ড্রাস্টিয়েল প্রেসের কম্পিউটার অপারেটার হারুনের কাছে জমা দিয়ে দিব।
যথারীতি একদিন পর কবিতা লিখে জমা দিই, সম্পাদককে জানিয়েও দিই।
কয়েকদিন
পর অন্যসব কবিতা ছাপাতে দিতে গিয়ে আমার কবিতা আর খুঁজে পাচ্ছে না। আমাকে
জানাল। খোঁজাখুঁজি হলো। বললাম- ‘কোনো চিন্তা নেই। আমি তো জাত কবি নই।
আরেকটি লিখে দিচ্ছি।’ আমি হলাম এমন একজন কবি যখন ইচ্ছে কবিতা লিখে দিতে
পারি। কারণ কবি হিসেবে আমার কোনো দায় বা যোগ্যতা নেই। স্বীকৃতিও নেই। কেউ
আমাকে ‘কবি’ বলে না, বলবেও না। প্রেসের মালিক সুলতান শাহরীরয়ার প্রায়শ
কবি-সাহিত্যেকের সাক্ষাৎ লাভ করে। এমন কবিও আছে, বলে যে লেখতে বসলে শুধুই
কবিতা বের হতে থাকে। আমি সে জাতের কবি।
কবিতাপত্রের ২/১জন কবি আছেন,
তারা বললেই কবিতা লিখে দিতে পারেন না। কারণ, তিনি যে সত্যিকারের কবি। তাদের
লিখিত কবিতার পাণ্ডুলিপি যদি হারিয়ে যায়, তাহলে অস্থিরতা দেখা দেয়। তখনই
জেনে যাই কবি হওয়া বা কবিতা লেখা সহজ নয়।
একটি ঘটনার কথা বলি। ১৯৯৯ সালে
কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন হবে জাতীয়ভাবে। তখন নজরুল
ইন্সটিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ছিলেন কবি নূরুল হুদা। আমি গেলাম। তাঁর রুমে
গেছি। তিনি তখন চা পান করছেন। বড় একটি কাপে প্রায় দু’কাপ চায়ের পরিমাণ।
আমাকে চা দিতে বললেন- আমি পরিমাণ কম দিতে বললাম। কবি নূরুল হুদা চায়ের
গুণাগুণ এবং চীনারা চা পান করে দুধ-চিনি ছাড়া, একটি মশলা দিয়ে ইত্যাদি সব
আমাকে জানান দিলেন। আমি লক্ষ্য করে দেখি- টেবিলে তাঁর সম্মুখে চার রং-এর
চারটি বলপেন ও একটি কাগজে চার রংয়ে রঞ্জিত কিছু একটা লেখা। জিজ্ঞাসা করলাম-
‘এটা কী’। তিনি জানালেন- ‘এটা একটি কবিতা।’ ছয়মাস পর কবিতাটি পূর্ণাঙ্গ
রূপ পেলো। বললাম- ‘চার প্রকারে কালি কেন ?’ জানালেন- ‘মাথায় যখন একটি ভাব
আসে, কবিতা লেখার তাগিদ অনুভব করি, তখন কালোকালি দিয়ে একটানে কবিতাটি লিখে
ফেলি। এক/দু’মাস পর কবিতাটি লালকালি দিয়ে বানান বা অন্যসব ভুলগুলো ঠিক করি।
আরও কিছুদিন পর সবুজ কালি দিয়ে যথাশব্দ-ছন্দ-বক্তব্য অবয়ব ঠিক করি। পরে
নীলকালি দিয়ে নতুন করে কবিতাটি লিখে শেষ করি।’ জিজ্ঞাসা করলাম- ‘একটি কবিতা
লিখতে কতদিন সময় নেন?’ জানালেন যে তা সময়ের বিষয় নয়, মনের ভিতর ভাবের একটি
তাগদা বা উত্তেজনা থাকে, তখন কবিতাটি লেখা শেষ হয়। অর্থাৎ কবিতাটির আসল
অবয়ব নিয়ে ভূমিষ্ঠ হয়। আমি অবাক হয়ে কবির কবিতা লেখার
ধৈর্য-ধ্যান-ভাব-ব্যঞ্জনাসহ অভিযাত্রায় আপ্লুত হলাম।
সাহিত্য পত্রিকা
জগতে ‘দেশ’ পত্রিকা খুবই পাঠক ও জনপ্রিয়। এই পত্রিকার এককালের খ্যাতিমান
সম্পাদক ছিলেন সাগরময় ঘোষ (চাঁদপুরবাসী)। তাঁর ‘সম্পাদকের বৈঠক’ নামে
সম্পাদকের অভিজ্ঞতা নিয়ে একটি চমৎকার বই আছে। অনেক ঘটনা এতটা রসালো করে
বর্ণিত হয়েছে, প্রভূত আনন্দের একটি উল্লেখযোগ্য ভান্ডার। তিনি একটি ঘটনার
কথা সম্বন্ধে লিখেছেন।
‘দেশ’ পত্রিকার শারদীয়া সংখ্যার জন্য কবি
প্রেমেন্দ্র মিত্রকে ছয়মাস আগে অনুরোধ করে বলেছেন যে একটি কবিতা দিতে হবে।
প্রেমেন্দ্র মিত্র বললেন- ‘আচ্ছা দেখি’। দু’মাস পর যখন খবর নিলেন,
মিত্রমশাই জানতে চাইলেন- ‘মনে পড়েছে, লিখব। মাথায় নিলাম।’ পত্রিকা বের হতে
চারমাস বাকি। একমাস পর খবর নিলেন। জানালেন- ‘কবিতার বিষয়বস্তু মাথায়
নিয়েছি, বসলেই লিখা হয়ে যাবে।’ নাছোড়বান্দা সাগরময় ঘোষ কবিতা আদায় করবেনই।
এদিকে
শারদীয়া সংখ্যার সূচিপত্র আনন্দবাজার পত্রিকা ও দেশ পত্রিকার নিয়মিত
সংখ্যায় বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়ে গেছে। সেখানে প্রেমেন্দ্র মিত্রের কবিতাও থাকবে
উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু কবিতা তো এখনও হাতে আসেনি। পত্রিকা প্রকাশের
একমাস আগে স্বয়ং সম্পাদক প্রেমেন্দ্র মিত্রের বাড়ি গিয়ে হাজির এবং কবিতা
চাইলেন। মিত্র মশায় আপ্যায়নের ব্যবস্থা করে ডাইরি খুলে দেখলেন তিনদিন পর
কলকাতা বিশেষ কাজে যাবেন। তাই জানালেন- আগামী তিনদিন পর কলকাতা আসছেন,
কবিতা হাতে হাতে পৌছিয়ে দিবেন। এ আশ^াসও দ্বিধাগ্রস্থ মন নিয়ে সম্পাদক ফিরে
আসলেন। কথানুযায়ী কবিতাটি পেয়েছিলেন এবং শারদীয়া সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল।
এত কথা কেন ? সোজা কথা- ইচ্ছে করলেই কবিতা লেখা যায় না। আবার মনের মধ্যে
ভাবের তাগাদা এলে সহজেই কবিতা লেখা হয়ে যায়। জলধর সেন এক পত্রিকার সম্পাদক।
দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের বাড়িতে গেছেন বিশেষ কাজে। জল খাবারের ব্যবস্থা
করলেন। ৩০টি লুচি, আলুর দম, রাবড়ি, খানেক দশেক রসগোল্লা। সেনবাবু খানেওয়ালা
হিসেবে পরিচিত। কিন্তু এত আয়োজন দেখে বলেছেন, ‘করেছেন কী, এত কি খাওয়া যায়
? একটি লুচি নিয়ে যান।’
এরকম মজার সব ঘটনার বর্ণনা রয়েছে ‘সম্পাদকে বৈঠক’ গ্রন্থে।
আমার
লেখকজীবনে একটি কবিতার বই বের করার ইচ্ছে হলো। নানাভাবে ৬৪টি কবিতা দিয়ে
একটি কবিতার বই বের করলাম। নামকরণ হলো ‘কথা ও কবিতা’। উৎসর্গ করলাম ‘আমার
আজীবন সাথি আরডি-কে, যে কবিকে চিনে না, কবিতা বুঝে না।’ কবিতার বইগুলো
বাসায় নিয়ে আসলাম। অনুকূল পরিবেশে আরতিকে (১৬ বছর আগে প্রয়াত হয়েছেন)
বললাম, ‘আমি একটি কবিতার বই বের করেছি, তোমাকে উৎসর্গ করেছি। সময় করে দেখে
নিও।’ ১০/১২ দিন পর রাত্রে আমি শুয়ে পড়েছি, তার জন্য অপেক্ষাও করছি। আমার
চোখে ঘুম এসে গেছে। সে আয়নার সামনে বসে চুলের বিন্যাস করছে। বলছে- ‘ঘুমিয়ে
পড়েছ ?’ আমি প্রথম শুনিনি। দ্বিতীয়বার বলায় উত্তর দিলাম, ‘না, কী বলবে
বলো।’ সে বলল, ‘বলছিলাম কী, তোমার কবিতার বই দেখলাম। ২/৩টি কবিতাও পড়লাম।
সেখানে ‘তুমি’ সম্বোধন করে কবিতা লেখা হয়েছে, মেয়েছেলের কথাও আছে। মেয়ে
লোকটি কে গো।’ আমি কি কোনো উত্তর দিতে পারি ? তাই এমন ঘুম দিলাম, এ ঘুম যেন
মরণের চেয়েও শীতল ও আতঙ্কের। কবিকে যদি জবাবদিহি করতে হয়, আমার মত কবিদের
অবস্থা কী দাঁড়ায় বুঝে দেখুন। তাই অকবির কবিতা আর স্ত্রীকে পড়াতে সাহস
পাইনি।
যাত্রীর কবিদের কবিতা যদি কোনো সহৃদয় পাঠক না বুঝেন, তবে আমরা
স্বউদ্যোগে গিয়ে বুঝিয়ে আসব। গালমন্দ করবেন না। আমাদের অবহেলা করলেও
কবিতাটিকে অপমান করবেন না। অথবা কবিতাটি না বুঝলেও আমরা যে কবি- এ বোধ
বিশ^াসে যাপিত কথা বলবই, অন্তত কবিতাপত্রের মাধ্যমে।
শেষ কথা- ‘ফুল
ফুটুক, না ফুটুক আজ বসন্ত।’ যাত্রীর সদস্যদের কবিতা হউক বা না হউক আমরা
কবি। যাত্রীর প্রেমিক পাঠকদের প্রতি আমাদের অনাবিল ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা
রলো।
