
আনুমানিক
খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ৫০০ বছর আগে প্রাচীন গ্রিসের অ্যাথেন্স থেকে জনগণের
ভোটের মাধ্যমে রাজ্য বা সরকার প্রধান নির্বাচনের ধারণা এসেছিল। গণতন্ত্রের
বিকাশ হতে শুরু করে মূলত ১৬৮৮ সালে ইংল্যান্ডের ‘গৌরবের বিপ্লব’ -এর
মাধ্যমে। তবে ১৭৭৬ সালে আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণার মাধ্যমে গণতন্ত্রের
প্রথম ভিত্তি স্থাপিত হয়, যা পরবর্তীতে ১৭৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লব এর মাধ্যমে
আরো বিশাল আকারে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জনের পর হতে অদ্যাবধি
১২টি সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে অনুষ্ঠিত এসব নির্বাচনে
তিনটি রাজনৈতিক দল জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে।
অনেক প্রত্যাশা নিয়ে নতুন বছর
২০২৬ শুরু হয়েছে। এ বছর আমাদের রাষ্ট্রীয় জীবনে অত্যন্ত গুরুত্ববহ একটি
বছর। আমাদের এ প্রিয় বাংলাদেশের ভবিষ্যত পথ চলায় এ বছরের ঘটনাপ্রবাহ খুবই
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে অনেক আকাঙ্খিত
একটি প্রতিযোগিতামূলক, গ্রহণযোগ্য, সংসদীয় নির্বাচনের মাধ্যমে নিজেদের
পছন্দসই সাংসদ তথা জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের জন্য জাতি উন্মুখ হয়ে আছে। দেশকে
অর্ন্তভূক্তিমূলক উন্নয়নমুখী যাত্রায় শামিল করে কাঙ্খিত লক্ষ্যে এগিয়ে
নিতে নির্বাচনের মাধ্যমে যে নতুন সরকার নির্বাচিত হবে তার ভূমিকার দিকে এখন
থেকেই সবাই অধির আগ্রহে তাকিয়ে আছে।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তফসিল
অনুযায়ী, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ
নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তফসিল অনুযায়ী ধাপে ধাপে নির্বাচন অনুষ্ঠানের
প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে এবং এটি চলমান আছে। এ নির্বাচন
উপলক্ষে এরই মধ্যে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই ও আপিল শুনানি
সম্পন্ন হয়েছে, প্রতীক বরাদ্দ করা হয়েছে। ২২ জানুয়ারি থেকে নির্বাচনি
প্রচার-প্রচারণা শুরু হয়েছে। সম্ভাব্য জনপ্রতিনিধিরা তাদের পক্ষে ভোটারদের
সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন নির্বাচিত টাইমলাইন অনুযায়ী প্রচারনা
শুরু করেছেন। সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে প্রার্থীদের মধ্যে বেশ উত্তেজনা বিরাজ
করছে। উত্তেজনার রেশ ছড়িয়ে পড়ছে খোদ রাজধানী থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত
গ্রামাঞ্চলে।
নির্বাচন আয়োজনের দায়িত্ব নির্বাচন কামিশনের হলেও এর সাথে
পুরো প্রশাসন কাঠামোর অনেক অংশীজনদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। উপরন্তু
ব্যক্তিখাত, উন্নয়ন সহযোগী, সুশীল সমাজসহ আরো অনেকের সংযোগ রয়েছে। যে
নাগরিকদের ভোটে জনপ্রতিনিধিরা নির্বাচিত হবেন সেই ভোটারদের দায়িত্ব অনেক
বেশী। সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী সারা বাংলাদেশে ৩০০ টি আসনে সংসদীয় নির্বাচন
অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এ ৩০০ টি আসনে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই এর পরে মোট ১৯৮১
জন প্রার্থী নির্বাচন করার যোগ্যতা অর্জন করেছেন। এবারের নির্বাচনে যে
গুরুত্বপূর্ণ দলগুলো অংশ নিচ্ছে তাদের আসন বিন্যাস হিসেবে দেখা যাচ্ছে
বিএনপি ২৮৮ আসনে, জামায়াত ইসলামী ২২৪ আসনে, এনসিপি ৩২ আসনে, সিপিবি ৬৫
আসনে, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ৩৪ আসনে, ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশ ২৫৩ আসনে,
জাতীয় পার্টি ১৯২ আসনে নির্বাচন করছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও
গণভোটে ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৫ জন ভোট দিতে পারবেন। মোট ভোটারের মধ্যে
পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ১৫১ জন। নারী ভোটার সংখ্যা ৬ কোটি ২৮
লাখ ৮৫ হাজার ৫২৪ জন। এছাড়া, তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ১ হাজার ১২০ জন।
তিনশ আসনের মধ্যে সর্বোচ্চ ভোটার রয়েছে গাজীপুর-২ আসনে আর সর্বনিম্ন ভোটার
ঝালকাঠি-১ আসনে। এ নির্বাচনে পোলিং সেন্টারের সংখ্যা ৪২,৭৬১ টি এবং পোলিং
বুথের সংখ্যা ২,৪৪,৭৩৯ টি। উল্লেখ্য যে এবার ১৫,৩৩,৬৮৩ জন পোস্টাল ভোটার
হিসেবে রেজিষ্ট্রেশন করেছেন। এবার প্রায় চার কোটি নতুন তরুণ ভোটার
ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন, যা মোট ভোটারের প্রায় ৩০ শতাংশ । আগামী
নির্বাচনে কোন দল সরকার গঠন করে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করবে তা
অনেকাংশে এ ভোটারদের উপর নির্ভর করবে বলে অনেকে ধারণা করছেন। এ বিবেচনায়
রাজনৈতিক দলগুলোও এই বিশাল ভোটারদের প্রাধান্য দিয়ে আগামীর নির্বাচনী
রণকৌশল ও নির্বাচনী ইশতেহারে নানামুখী কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
ট্রান্সপারেন্সি
ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)- এর তথ্য থেকে জানা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয়
সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের মধ্যে ৪৮ শতাংশ ব্যবসায়ী এবং ১ দশমিক ৫৬ শতাংশ
প্রার্থীর পেশা রাজনীতি। এবারের নির্বাচনে ৪.০২ শতাংশ নারী প্রার্থী
অংশগ্রহন করছেন। ৭৬.৩২ শতাংশ প্রার্থী স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের
লেখাপড়া সম্পন্ন করেছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চূড়ান্ত প্রার্থী
১৯৮১ জন প্রার্থীর মধ্যে ১৬৯৬ জন প্রথমবার নির্বাচন করছেন। এতে ১৩ শতাংশ
স্বতন্ত্র, ৮৭ শতাংশ রাজনৈতিক দলের প্রার্থী রয়েছেন। নির্বাচনে প্রার্থীদের
মধ্যে ৮৯১ জন কোটিপতি। বছরে ১ কোটি টাকা আয় করেন এমন প্রার্থী সংখ্যা ১২৪
জন। ১০০ কোটি টাকার বেশি অস্থাবর সম্পদ আছে এমন প্রার্থী ১৩ জন। টিআইবি’র
তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থীদের মধ্যে ৫৩০ জন প্রার্থীর
বিরুদ্ধে মামলা আছে, যা মোট প্রার্থীর ২২ দশমিক ৬৬ শতাংশ। এ ছাড়া মোট
প্রার্থীর সাড়ে ২৫ শতাংশ ঋণগ্রস্ত।
ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশন, সংসদ
নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা -২০২৫ প্রকাশ করেছে।
এবারের নির্বাচনী প্রচারণা পরিবেশবান্ধব করার চেষ্টা লক্ষ্য করা গেছে।
নির্বাচনী প্রচারনায় এবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
থাকবে। একটি শান্তিপূর্ণ, উৎসবমুখর ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের
স্বার্থে নির্বাচন কমিশন বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য
কয়েকটি হলো : নির্বাচনি প্রচারণা শুরুর পূর্বে রাজনৈতিক দল বা প্রার্থী
কর্তৃক যথাযথ কর্তৃপক্ষের নিকট নির্বাচনি প্রচারণা কর্মসূচির প্রস্তাব
প্রদান করতে হবে, নির্বাচন প্রচারণায় কোনো প্রকার পোস্টার ব্যবহার করা যাবে
না; অপচনশীল দ্রব্য, পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর এরূপ কোন উপাদানে তৈরি কোনো
প্রচারপত্র, লিফলেট বা হ্যান্ডবিল, ফেস্টুন ও ব্যানার ব্যবহার করা যাবে না;
কোনো জনসভায় একইসঙ্গে তিনটির অধিক মাইক্রোফোন বা লাউড স্পিকার ব্যবহার করা
যাবে না। নির্বাচনি প্রচারণায় কোনো বাস, ট্রাক, নৌযান, মোটরসাইকেল কিংবা
অন্য কোনো যান্ত্রিক বাহন সহকারে কোনো মিছিল, জনসভা কিংবা কোনরূপ শোডাউন
করা যাবে না: নির্বাচনি প্রচারে কোনো ধরনের মশাল মিছিল করা যাবে না।
দেওয়ালে লিখে বা অংকন করে কোনো প্রকার নির্বাচনি প্রচারণা চালানো যাবে না।
কোনো গেইট বা তোরণ নির্মাণ করা যাবে না। কোনো নির্বাচনী এলাকায় কোনো
প্রার্থীর বিশ’টির অধিক বিলবোর্ড ব্যবহার করা যাবে না। বিলবোর্ড স্থাপনের
মাধ্যমে কোনক্রমেই জনসাধারণের বা যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি এবং পরিবেশের
ক্ষতি বা নিরাপত্তা বিঘ্নিত করা যাবে না । নির্বাচনি প্রচারণাকালে
ব্যক্তিগত কুৎসা রটনা, অশালীন এবং আক্রমণাত্মক ব্যক্তিগত চরিত্র হনন করে
বক্তব্য প্রদান বা কোনো ধরনের তিক্ত বা উস্কানিমূলক বা মানহানিকর কিংবা
লিঙ্গ, সাম্প্রদায়িকতা বা ধর্মানুভূতিতে আঘাত লাগে এমন কোনো বক্তব্যপ্রদান
করা যাবে না। কোনো ধর্মীয় উপাসনালয়, কোনো সরকারি অফিস বা শিক্ষা
প্রতিষ্ঠানে কোনো প্রকার নির্বাচনি প্রচারণা চালানো যাবে না। নির্বাচন আচরণ
বিধিমালা-২০২৫ এ আরো বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে
নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণা পরিচালনা করা যাবে, তবে সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নাম, একাউন্ট আইডি, ই-মেইল আইডিসহ অন্যান্য
সনাক্তকরণ তথ্যাদি উক্তরূপে প্রচার-প্রচারণা শুরুর পূর্বে রিটার্নিং
অফিসারের নিকট দাখিল করতে হবে; প্রচার-প্রচারণাসহ নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কোনো
বিষয়ে অসৎ উদ্দেশ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা যাবে না। ঘূর্ণাত্মক
বক্তব্য, ভুল তথ্য, কারো চেহারা বিকৃত করা ও নির্বাচন সংক্রান্ত বানোয়াট
তথ্যসহ কোনো প্রকার ক্ষতিকর কন্টেন্ট তৈরি ও প্রচার করা যাবে না;
নির্বাচনি স্বার্থ হাসিল করার জন্য ধর্মীয় বা জাতিগত অনুভূতির অপব্যবহার
করা হয় এইরূপ কোনো কর্মকাণ্ড করা যাবে না; ভোটগ্রহণ সমাপ্তির পরবর্তী
আটচল্লিশ ঘন্টার মধ্যে নির্বাচনি এলাকায় ব্যবহৃত নিজ নিজ প্রচারণা সামগ্রী
প্রার্থী নিজ দায়িত্বে অপসারণ করতে হবে। এগুলো ছাড়াও আরো বেশ কিছু নিয়ম
কানুন মেনে চলার জন্য নির্বাচন কমিশনের রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ
বিধিমালা-২০২৫ তে উল্লেখ করা হয়েছে।
আমাদের প্রিয় বাংলাদেশের স্বাধীনতার
৫৫ বছর অতিক্রান্ত হতে চলেছে। আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় আমাদের
অর্জন অনেক। এখন সময় এসেছে আমাদের অর্জনকে টেকসই রুপ দেয়ার। নির্বাচন কমিশন
কতৃক নির্ধারিত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরন
বিধিমালা অনুসরণ করে একটি শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে
দল-মত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল নাগরিকের দায়বদ্ধতা রয়েছে। বহুল প্রত্যাশিত
এবারের নির্বাচনটি একটি উদাহরণ তৈরি করবে এ আশা সকলের। নির্বাচনে কেউ
জিতবেন, কেউ হারবেন- এটাই স্বাভাবিক। তাই ‘হার জিত’- কে সহজভাবে গ্রহন করে
সহনশীলতার পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। নির্বাচনে জেতা বা হারার চেয়ে দেশকে
ভালোবেসে দেশের ভালোর জন্য কাজে নেমে পড়াটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রিয়
মাতৃভূমির উন্নয়নমুখী যাত্রা টেকসই হোক। ভালো থাকুক প্রিয় বাংলাদেশ ।
লেখকঃ পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগে অতিরিক্ত সচিব হিসেবে কর্মরত।
