রোববার ২৫ জানুয়ারি ২০২৬
১২ মাঘ ১৪৩২
ফুকোর -ইরান-ভ্রম ও বিপ্লব ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের সমকালীন রাজনীতি
কায়সার হেলাল
প্রকাশ: রোববার, ২৫ জানুয়ারি, ২০২৬, ২:০৬ এএম আপডেট: ২৫.০১.২০২৬ ২:৩৯ এএম |

ফুকোর -ইরান-ভ্রম ও বিপ্লব ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের সমকালীন রাজনীতি
ইরান প্রশ্নে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী এবং জনগণ কোন পক্ষে থাকবে সে অস্বস্তিকর সংকটের একটা সুরাহা তো দরকার। ঠিক কী না? তবে আপনারা জেনে খুব আনন্দবোধ করবেন যে আপনি একা নন, কেননা একইরকম ধরা খেয়েছিলেন মহান ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকোও। ফুকো সাহেব আমার অন্যতম প্রিয় দার্শনিক। তাঁর জ্ঞান-ক্ষমতা তত্ত্বের আমি একজন বিরাট ফ্যান। সে যাই হোক, ফুকোগিরি যে সবসময় সঠিক হবে না একথা অস্বাভাবিক নয়। সে গল্পটা আগে করি।
২.
জুলাই-অগাস্টের ঘটনাবলীর পরপর বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের যে অদূর ভবিষ্যতে ফুকোর মত মোহভঙ্গ ঘটবে সেকথা লিখে আবার অনলি মি করে রেখে দিয়েছিলাম। এখন ইরানের চলমান ‘উইমেন, লাইফ, ফ্রিডম’ আন্দোলনের প্রেক্ষিতে মনে হচ্ছে ফুকো সাহেব আবারও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছেন। বিশেষ করে তাঁর ১৯৭৮-৭৯ সালের ইরানের ইসলামি বিপ্লবের সময়ে শাহ’দের পতনের পক্ষে ন্যারেটিভ উৎপাদন এবং খোমেনিদের তথাকথিত বিপ্লবের পক্ষাবলম্বন ইতিহাসে একটি উজ্জ্বল ‘মিসইন্টারপ্রিটেশন’ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
ফুকোর ইরান-অভিজ্ঞতা বুঝতে হলে প্রথমে পাহলভি শাসনের চরিত্র বুঝতে হবে। ১৯৫৩ সালে সিআইএ এবং এমআই-৬ সমর্থিত অভ্যুত্থানে জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেকের পতনের (বলা যায় এটাই বিশ্বে বিপ্লব ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের ১ম উদাহরণ) পর থেকে মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভি ইরান শাসন করছিলেন। তাঁর শাসনকালে একটি অদ্ভুত দ্বন্দ্ব ছিল। একদিকে তিনি ‘শ্বেত বিপ্লব’ নামে এক আধুনিকীকরণ কর্মসূচি চালু করেছিলেন যার মধ্যে ছিল ভূমি সংস্কার, নারী শিক্ষা ও ভোটাধিকার, এবং দ্রুত শিল্পায়ন; অন্যদিকে তাঁর শাসন ছিল নির্মম দমনমূলক। সাভাক নামের গোপন পুলিশ বিরোধীদের নির্যাতন করত, বিরোধী দল নিষিদ্ধ ছিল, সংবাদপত্র নিয়ন্ত্রিত ছিল, এবং হাজার হাজার মানুষ কারারুদ্ধ বা নির্বাসিত হয়েছিল। তেল-সম্পদের প্রাচুর্য সত্ত্বেও ব্যাপক অর্থনৈতিক বৈষম্য, দুর্নীতি, এবং গ্রামীণ দারিদ্র্য ছিল এই শাসনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
১৯৭৮ সালে ইরানের রাজপথে শাহ-বিরোধী আন্দোলন যখন তুঙ্গে, সেই সময়ে ফুকো ছিলেন তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক খ্যাতির চূড়ায়। ফুকো তেহরানে পৌঁছান কুখ্যাত ব্ল্যাক ফ্রাইডের কিছু পরে, যখন ৮ সেপ্টেম্বর জালেহ স্কোয়্যারে সেনাবাহিনী বিক্ষোভকারীদের উপর গুলি চালায় এবং শত শত মানুষ নিহত হয়। তিনি পরে লিখেছিলেন যে তিনি সেই মুহূর্তে তেহরানে ছিলেন যখন শাহের শাসনের শেষ দিনগুলো গণনা করা হচ্ছিল, রাস্তায় রাস্তায় এক অদ্ভুত আবহ বিরাজ করছিল এবং সর্বত্র ছিল ভয় ও আশার এক অবর্ণনীয় মিশ্রণ। তিনি বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সাক্ষাৎকার নেন। বাজারি বণিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, মোল্লা থেকে এমনকি সাভাক কর্মকর্তা পর্যন্ত। ইতালির বিখ্যাত পত্রিকা ঈড়ৎৎরবৎব ফবষষধ ঝবৎধ'র হয়ে তিনি ইরান সফরে গিয়েছিলেন। তিনি সেখানে কেবল একজন সাংবাদিক হিসেবে যাননি, গিয়েছিলেন একজন দার্শনিক হিসেবেও, যিনি পশ্চিমা মার্কসবাদ এবং লিবারেল গণতন্ত্রের বাইরে রাজনীতির এক ‘নতুন রূপ’ খুঁজছিলেন। ফুকোর এই ইরান-প্রীতি বা মোহভঙ্গ কেন এবং কীভাবে ঘটেছিল, এর একটি তৎকালীন কারণ তো আছেই। ফুকো তখন পশ্চিমা রাজনৈতিক মডেলগুলোর ওপর ত্যক্ত-বিরক্ত ছিলেন। তিনি মনে করতেন, সমাজতন্ত্র এবং পুঁজিবাদী গণতন্ত্র- উভয়ই শেষ পর্যন্ত মানুষকে নিয়ন্ত্রণের যন্ত্র বা ‘ডিসিপ্লিনারি পাওয়ার’ হিসেবে কাজ করে। তিনি খুঁজছিলেন এমন একটি আন্দোলন, যা এই গতানুগতিক ক্ষমতা-কাঠামোর বাইরে। ইরানের রাজপথে নিরস্ত্র মানুষের ঢল এবং আন্দোলনের পক্ষে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সাক্ষাৎকার তাঁকে মুগ্ধ করেছিল। তিনি দেখেছিলেন, হাজার হাজার মানুষ ট্যাংকের সামনে বুক পেতে দিচ্ছে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের নির্দেশ ছাড়াই, যেন একধরণের ‘আধ্যাত্মিক তাড়না’ মানুষকে উজ্জীবিত করছে।
ফুকোর ইরান নিয়ে ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই ‘পলিটিক্যাল স্পিরিচুয়ালিটি।’ বাংলায় বলা যায় ‘রাজনৈতিক আধ্যাত্মিকতা।’ ফুকো এই আন্দোলনের কিছু অসাধারণ বৈশিষ্ট্য প্রত্যক্ষ করেছিলেন। প্রথমত, এর আপাত শ্রেণি-নিরপেক্ষতা। উঁচুস্তরের বণিক থেকে কারখানার শ্রমিক, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক থেকে গ্রামের কৃষক, সবাই যেন এক কাতারে দাঁড়িয়েছে। দ্বিতীয়ত, এই প্রতিবাদের অহিংস চরিত্র- মিছিল, ধর্মঘট, প্রার্থনা সমাবেশ, কালো কাপড় পরা নারীদের সারি সারি মিছিল। তৃতীয়ত, এর গভীর ধর্মীয় প্রতীকবাদ যা আশুরার শোক বা কারবালার হুসেইনের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। এবং চতুর্থত, সবচেয়ে বেশি যা ফুকোকে টানল তা হলো- একটি সমগ্র জনগোষ্ঠী যেন এক সংকল্পে বাঁধা পড়েছে, সকলেই একস্বরে শাহ’কে চলে যেতে বলছে। তিনি লিখেছিলেন, ইরানিরা যা করছে, তা নিছক ক্ষমতার পালাবদল নয়; তারা চাইছে নিজেদের জীবন ও সত্তার আমূল পরিবর্তন। ফুকো মনে করতেন, আধুনিক পৃথিবী থেকে ‘আত্মা’ হারিয়ে গেছে এবং ইরানি বিপ্লব হলো মার্ক্সের ধর্ম সংক্রান্ত মনোভাবের বাইরে ‘নিরাত্মার জগতে আত্মার সন্ধান।’ শিয়া ইসলামের ‘শহীদি তামান্না’ বা মৃত্যুকে ভয় না পাওয়ার সংস্কৃতি ফুকোকে বিস্মিত করেছিল। তিনি একে দেখেছিলেন ‘বায়োপলিটিক্স’ বা শরীর-রাজনীতির উল্টো পিঠ হিসেবে যেখানে রাষ্ট্র মানুষকে বাঁচিয়ে রেখে শাসন করতে চায়, সেখানে এই মানুষগুলো মরতে প্রস্তুত হয়ে রাষ্ট্রের ক্ষমতাকে অকার্যকর করে দিচ্ছে। ফুকো মার্কসবাদী ছিলেন না, বরং মার্কসবাদের কট্টর সমালোচক ছিলেন। ইরানে তিনি খুশি হয়েছিলেন এটা দেখে যে, সেখানে কোনো লেনিনবাদী নেতৃত্ব নেই। কিন্তু এখানেই তিনি মস্ত বড় ভুলটি করলেন। তিনি মনে করেছিলেন, যেহেতু এটি মার্কসবাদী বিপ্লব নয় এবং পশ্চিমা স্টাইলের গণতন্ত্রও নয়, তাই এটি অবশ্যই ‘নিপীড়নমূলক’ হবে না। ইসলামকে তিনি দেখেছিলেন শোষিতের আশ্রয় হিসেবে। তিনি বুঝতে পারেননি যে, এই ধর্মই যখন সংবিধান হবে, তখন তা আফিমের চেয়েও শক্তিশালী চাবুক হয়ে উঠবে।
খোমেনি এবং মোল্লাতন্ত্রের প্রতি ফুকোর একধরণের অন্ধত্ব কাজ করেছিল। নভেম্বরে ফুকো দ্বিতীয়বার ইরান সফর করেন। তিনি প্যারিসের উপকন্ঠে নির্বাসিত আয়াতুল্লাহ খোমেনির সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন এবং তাঁর চোখে খোমেনি কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন না; তিনি ছিলেন এক ‘পৌরাণিক চরিত্র’ বা সন্ত। তাঁর বিশ্লেষণে খোমেনি কোনো সাধারণ রাজনৈতিক নেতা নন যিনি ক্ষমতা চান। তিনি তাঁকে আন্দোলনের ফোকাল পয়েন্ট হিসেবে তুলে ধরেন। ফুকো মোহাচ্ছন্ন হয়েছিলেন এই ভেবে যে খোমেনির কোনো সেনাবাহিনী নেই, অর্থ নেই, রাষ্ট্রযন্ত্র নেই, আছে শুধু জনগণের বিশ্বাস। এটি তাঁর কাছে ক্ষমতাহীনদের ক্ষমতার এক অভূতপূর্ব উদাহরণ মনে হয়েছিল। কিন্তু তিনি বোধহয় খোমেনির কট্টর শাসনতান্ত্রিক লেখাগুলো পড়েননি বা পড়লেও গুরুত্ব দেননি। ফুকো ভেবেছিলেন, মোল্লারা শুধু আন্দোলনের অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে, তারা রাষ্ট্র চালাবে না; ক্ষমতা চলে যাবে সরাসরি জনগণের হাতে। এটি ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক অদূরদর্শিতা। ইরান সফরের সময় অনেক নারীবাদী এবং সেক্যুলার ইরানি তাঁকে সতর্ক করেছিলেন। আতুসা এইচ নামে এক ইরানি নারীবাদী ফুকোকে চিঠিতে লিখেছিলেন যে, এরা ক্ষমতায় এলে নারীদের হিজাব পরতে বাধ্য করবে এবং দেশটিকে মধ্যযুগে নিয়ে যাবে। ফুকো এই চরম বাস্তবতাকে ‘পাশ্চাত্যের ইসলামভীতি’ বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। তিনি নিজের তাত্ত্বিক ফ্যান্টাসির জন্য মাটির বাস্তবতাকে অস্বীকার করেছিলেন।
১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিপ্লব সফল হবার পর ফুকোর সেই ‘আইডিয়া’ যখন রূঢ় ‘বাস্তবতায়’ রূপ নিল, তখন একে একে সামনে আসা শুরু হলো ভয়াবহ দৃশ্যগুলো। খোমেনি ইরানে ফিরলেন। মার্চে ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের গণভোট হলো যেখানে একমাত্র বিকল্প ছিল ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ (উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশেও কিছুদিন পর একই পদ্ধতি প্রয়োগ হতে যাচ্ছে এবং অবিশ্বাস্যভাবে সরকার হ্যাঁ-এর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে)। কোনো সংবিধান নেই, কোনো বিস্তারিত পরিকল্পনা নেই, শুধু খোমেনির নেতৃত্বে আস্থা ভোট। এপ্রিলে বিপ্লবী আদালত গঠিত হলো এবং শুরু হলো পদ্ধতিগত গণহত্যা। প্রথমে শাহের অনুগতদের, তারপর ক্রমশ বিস্তৃত হতে থাকল। সমকামীদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলো। মে মাসে মহিলাদের জন্য হিজাব বাধ্যতামূলক ঘোষণা করা হলো এবং যে নারীরা বিপ্লবে সক্রিয় অংশ নিয়েছিলেন তাঁরা রাস্তায় নেমে যদিও প্রতিবাদ করলেন, কিন্তু তাঁদের কঠোরভাবে দমন করা হলো। জুনে বামপন্থী ও উদারপন্থী সংবাদপত্র বন্ধ করে দেওয়া হলো। নভেম্বরে মার্কিন দূতাবাস জিম্মি সংকট শুরু হলো যা ৪৪৪ দিন চলল। ১৯৮০-৮১ সালে ‘সাংস্কৃতিক বিপ্লব’র নামে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বন্ধ করে দেওয়া হলো এবং বামপন্থী, উদারপন্থী, এমনকি ইসলামি কিন্তু খোমেনি-বিরোধী এমন সকল ধারাকে নির্মূল করা শুরু হলো। ১৯৮১ থেকে ১৯৮৩’র মধ্যে হাজার হাজার বামপন্থী, যে বামপন্থীদের ফুকো বিপ্লবের অংশ ভেবেছিলেন, বিশেষত মুজাহিদিন-এ-খালক এবং তুদেহ পার্টির সদস্যদের গণহারে গ্রেপ্তার করা হলো এবং নৃশংসভাবে নিধন করা হলো। ফরাসি বুদ্ধিজীবী মহলে ফুকো তখন হাসির পাত্রে পরিণত হয়েছিলেন। ম্যাক্সিম রডিনসনের মতো বিশেষজ্ঞরা তাঁকে মনে করিয়ে দিয়েছিলেন যে তিনি ইসলামি মৌলবাদের বিপদ বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে ফুকোর প্রতিক্রিয়া কী ছিল? তিনি ১৯৭৯’র মে মাসে লা মোঁদ পত্রিকায় একটিমাত্র প্রবন্ধ লেখেন যার শিরোনাম ছিল ‘বিদ্রোহ কি অর্থহীন?’ এই প্রবন্ধে তিনি বিদ্রোহের সাধারণ অধিকারকে সমর্থন করেন এবং যুক্তি দেন যে ক্ষমতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো সবসময়ই অর্থপূর্ণ, এমনকি ফলাফল যাই হোক না কেন। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে তিনি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের দমনমূলক চরিত্রের সরাসরি সমালোচনা এড়িয়ে যান। ফুকো এরপর ইরান নিয়ে আর কখনো বিস্তারিত লেখেননি, সরাসরি নিজের ভুল স্বীকারও করেননি; বরং তাঁর পরবর্তী কাজে তিনি ‘রাজনীতি’ থেকে সরে গিয়ে ব্যক্তিগত ‘নৈতিকতা’র দিকে ঝুঁকে পড়েন। ১৯৮৪ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ইরান প্রসঙ্গটি তাঁর জন্য এক অস্বস্তিকর কাঁটা হয়ে ছিল।
রাজনৈতিক স্তরে ফুকোর বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা আসে ফেমিনিস্ট তাত্ত্বিকদের কাছ থেকে। কেট মিলেট ১৯৭৯’র মার্চে তেহরান সফর করে নারীদের উপর দমনের প্রত্যক্ষ রিপোর্ট করেন। সিমোন দ্য বোভোয়ার এবং অন্যান্য ফরাসি নারীবাদীরা প্রকাশ্যে ফুকোর বিরোধিতা করেন। মিলেট লিখেছিলেন যে ফুকো যখন ‘রাজনৈতিক আধ্যাত্মিকতা’ দেখছিলেন তখন ইরানি নারীরা তাদের অধিকার হারানোর শঙ্কায় ছিলেন, এবং ফুকো তাদের কথা শোনেননি। প্রশ্ন উঠে যে, ফুকো আসলে কাদের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন! মোল্লা, ব্যবসায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রের বাইরে তিনি কী নারী, শ্রমিক, জাতিগত সংখ্যালঘু বা সেকুলার বামপন্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন যারা পরে গণহত্যার শিকার হবেন? তাছাড়া, পদ্ধতিগত স্তরে দেখা মেলে আরো গভীর সমস্যার। ফ্রান্সে ফুকো যে পদ্ধতি (আর্কাইভ গবেষণা, দীর্ঘমেয়াদি বিশ্লেষণ, ক্ষমতার সূক্ষ্ম পাঠ, সন্দেহবাদী দৃষ্টিভঙ্গি) অনুসরণ করতেন, এর কিছুই তিনি ইরানে প্রয়োগ করেননি। পরিবর্তে তিনি সংক্ষিপ্ত সাংবাদিক সফর করেন, তাৎক্ষণিক মন্তব্য করেন, রোমান্টিক সাধারণীকরণে লিপ্ত হন, এবং আশাবাদী প্রক্ষেপণ চালান।
ফুকোর এই ‘বুদ্ধিবৃত্তিক রোমান্টিসিজম’ প্রমাণ করে যে, দর্শন যখন মাটির রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বিমূর্ত কল্পনায় ভাসে, তখন তা অজান্তেই ফ্যাসিবাদের পথ পরিষ্কার করে দেয়। ফুকোর প্রথম বড় ভুল ছিল ধর্মকে ক্ষমতার উৎসের বাইরে ক্ষমতার প্রতিরোধ হিসেবে কল্পনা করা। তিনি বুঝতে পারেননি যে, ধর্ম হোক বা যেকোন মতাদর্শই হোক, একবার রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে ঢুকে পড়লে সব মতাদর্শের চরিত্রই সম্পূর্ণ বদলে যায়। ফলে যে ভাষা শুরুতে প্রতিরোধের কথা বলে, শেষে সেটিই হয়ে উঠে শাসনের চরম ভাষা। ইরানি-আমেরিকান ইতিহাসবিদ জ্যানেট আফারি এবং কেভিন অ্যান্ডারসন তাঁদের গ্রন্থ ‘ফুকো অ্যান্ড দ্য ইরানিয়ান রেভোলিউশন: জেন্ডার অ্যান্ড দ্য সিডাকশনস অফ ইসলামিজম’-এ এই সমালোচনার সবচেয়ে বিস্তারিত এবং তীক্ষè রূপ উপস্থাপন করেন। তাঁদের মতে ফুকো শিয়া ইসলামের জটিল ইতিহাস বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। তিনি জানতেন না যে শিয়া ইসলামে ধর্মীয় নেতৃত্বের কী ভূমিকা, বেলায়েতে ফকিহ (ধর্মতাত্ত্বিক শাসন) ধারণার কী তাৎপর্য, বা ইরানের ইতিহাসে উলামাদের রাজনৈতিক উচ্চাকাক্সক্ষা কতটা শক্তিশালী। তাঁরা আরো যুক্তি দেন যে ফুকো এক ধরনের ‘ওরিয়েন্টালিস্ট’ ফ্যান্টাসিতে আক্রান্ত ছিলেন। ‘পশ্চিমের বিকল্প’ হিসেবে প্রাচ্যকে ভুলভাবে রোমান্টিসাইজ করেছিলেন তিনি এবং এডওয়ার্ড সাঈদ তাঁর সমসাময়িক গ্রন্থে এটির সমালোচনাও করেছিলেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্যযে সাঈদের ওরিয়েন্টালিজম বইটি ফুকোর ডিসকোর্স তত্ত্ব থেকেই অনেকটা অনুপ্রাণিত ছিল, অথচ ফুকো নিজেই এই ফাঁদে পা দিলেন। আফারি এবং অ্যান্ডারসন আরেকটি সংবেদনশীল বিষয় তোলেন। ফুকোর নিজের কুইয়ার আইডেন্টিটি (তিনি সমকামী ছিলেন এবং সমকামীতা সংক্রান্ত আন্দোলনের সমর্থকও ছিলেন) এবং শিয়া ইসলামের কিছু ঐতিহাসিক উদাহরণে ‘পুরুষ-প্রেম’র উল্লেখ তাঁকে প্রভাবিত করে থাকতে পারে বলে তাঁরা মত দেন। তাঁরা দেখান, ফুকো ইসলামি আন্দোলনের মধ্যে থাকা পিতৃতান্ত্রিক এবং সমকামী-বিদ্বেষী উপাদান ধরতে পারেননি, যা পরবর্তীতে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের আইনে প্রতিফলিত হয় (সমকামিতার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড)।
৩.
এবার পুনরায় বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আসি। বাংলাদেশের প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীগণও ২০২৪’র জুলাই-অগাস্ট ঘটনা-পরম্পরাকে ঠিক ফুকোর মতোই ভুল পাঠ করেছিলেন যার প্রমাণ দেড় বছর পর তাদের অনেকের সরল স্বীকারোক্তি বা অনুশোচনা। অনেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁদের ভ্রান্তি ও আশাভঙ্গের কথা বলছেন। হয়তো মববাজ ও তৌহিদী জনতা নামক প্রেশার গোষ্ঠীর নিরন্তর আস্ফালন এবং অর্থনীতির ক্রমশ নিম্নগতি দেখে তাদের কারও কারও বোধোদয় ঘটে থাকবে।
এখন কথা হলো ইরানের বর্তমান অস্থিরতাকে সেই বুদ্ধিজীবীগণ কী ‘বিপ্লব’ বা ‘মুক্তি’র চশমায় দেখবেন? নাকি মার্কিন ষড়যন্ত্র হিসেবে বিচার করবেন? হরেদরে এরা অবশ্য দ্বিতীয় সহজ পন্থাই বেছে নিচ্ছেন (মজার ব্যাপার হলো, এই এরাই কিন্তু বাংলাদেশের চব্বিশের জুলাই-অগাস্ট ভায়োলেন্সকে মার্কিন মদদপুষ্ট বলতে অস্বীকার করেন)। কিন্তু এক্ষেত্রেও ফুকোর মতো সেই ভুল পথেই হাঁটবার সম্ভাবনা থেকে যাচ্ছে। কারণ, ইরানের সমকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতা সরলরৈখিক নয়। বাংলাদেশের মত আপাত স্ট্যাবিলিটি থেকে এরা হুট করে আজকের বৈপ্লবিক-বাস্তবতার মুখোমুখি হয় নি। তাদের অভ্যন্তরীণ দমন-পীড়ন বা হিজাব ইস্যু নিয়ে যে সামাজিক অসন্তোষ বহুকাল ধরেই বিদ্যমান তা অস্বীকার করবার উপায় নেই। খোদ ইরানি দার্শনিক রামিন জাহানবেগলোও স্বীকার করেন যে দেশটিতে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং প্রজন্মের ত্রিমাত্রিক সংকট চলছে। এই আলাপে ঢুকলে লেখা আরও বড় হয়ে যাবে। তবে বলা যায় এখনই ইরান-সংকট নিয়ে রায় দেবার সময় হয়নি। পূর্বের এক লেখায় স্লাভো জিজেকের জবানীতে বলেছিলাম যে পৃথিবী এখন বিভিন্ন কোয়ান্টাম সম্ভাবনার সম্মুখীন এবং ঠিক কোন সম্ভাবনায় এটি কোলাপ্স করবে তা এখনই বলা যাচ্ছে না। ফলে ইরানের ক্ষেত্রেও এই সিদ্ধান্ত নেয়াটাই যুক্তিযুক্ত। যদিও আগে-পরে ইরানের বর্তমান বাস্তবতায় সাম্রাজ্যবাদী পরাশক্তির অনুপ্রবেশ ঘটবেই, সেটা রেজা পাহলভীর হাত ধরেও হতে পারে, কিংবা কোনো শান্তির দূতের সহায়তায়ও হতে পারে। মনে রাখতে হবে যে, এইমুহূর্তে যুদ্ধটা পেট্রোডলার বনাম পেট্রোইউয়ানের।
এমনিতে, দুনিয়ার এই জটিল সময়ে ‘বিপ্লব’ শব্দটি শুনলে আমার উত্তেজনার চাইতে সন্দেহ হয় বেশি। কারণ, বিপ্লব এখন উৎপাদন করা যায়। সাধারণত পশ্চিমা রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানগুলোর সচেতন প্রচেষ্টায় কোনো দেশে রাজনৈতিক পরিবর্তন বা ‘বিপ্লব’ সংগঠিত করা ২০০০’র দশক থেকে আলোচিত হয়ে আসছে। আর্থিক সহায়তা, এনজিও ফান্ডিং, মিডিয়া প্রশিক্ষণ, সিভিল সোসাইটি গঠন, ইত্যাদি হলো এই বিপ্লব উৎপাদন প্রক্রিয়ার প্রাথমিক ধাপ। দ্বিতীয়ত, বৈধতা নির্মাণ করবার জন্যে আন্তর্জাতিক মিডিয়া কভারেজ, মানবাধিকার ডিসকোর্স, পশ্চিমা বুদ্ধিজীবীদের সমর্থন আদায়ের ডিপস্টেট কর্মসূচি। তৃতীয় ধাপে আসবে কৌশলগত সহায়তা। এই ধাপে অহিংস প্রতিরোধ প্রশিক্ষণ, সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার, প্রতীক ও স্লোগান নির্মাণের পক্ষে চতুর কর্মযজ্ঞ চালানো হয়। তারপরের ধাপে আসে রাজনৈতিক সমর্থন-নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক চাপ, গণতন্ত্রের প্রচারণা। ফলে বোঝা যাচ্ছে যে বিপ্লব এখন নব্য-উদারনীতি ও পুঁজিবাদের একটি ‘ওপেন-সিক্রেট’ প্রজেক্ট। তাই হঠাৎ ‘মুক্তি’র ডাক এলে বা মুক্তির আকাক্সক্ষার বয়ান শুনলে ধীরেসুস্থে সিদ্ধান্ত নেয়া ভালো মনে করি। কেননা, ম্যানুফ্যাকচার্ড বিপ্লবের পর শূন্যস্থানে সাম্রাজ্যবাদের ডিজাইন করা কোনো ব্যবস্থা বা ধর্মীয় উগ্রবাদ এসে ভর করবার সম্ভাবনা প্রায় শতভাগ। ফুকো রাষ্ট্রক্ষমতার এই অনিবার্য পরম্পরাটি বিবেচনায় নেননি। এমন নষ্ট ‘বিপ্লব’ জিতে গেলে কে শাসন করবে? কোন আইন? এবং কোন শরীরের ওপর? এইসব গুরুতর প্রশ্ন করবার জরুরতই রাষ্ট্র কর্তৃক ভবিষ্যৎ দমন-পীড়নের ব্যাপারে আভাস দিতে পারে। অবশ্য বাংলাদেশি বুদ্ধিজীবীদের লজ্জা একটু কম। এরা বিচিত্র ট্র্যাজেডির শিকার হলেও আনন্দবোধ করে।
লেখকঃ চিকিৎসক, অনকোলজি গবেষক, চিন্তক।
১২ জানুয়ারি, ২০২৬; চীন।
সূত্রঃ
1. Foucault, Michel. "A quoi rêvent les Iraniens?" Le Nouvel Observateur, 1978.
2. Foucault, Michel. "Inutile de se soulever?" Le Monde, 1979.
3. Foucault, Michel. Dits et Écrits Vol. III
4. Afary, Janet & Kevin Anderson. Foucault and the Iranian Revolution. University of Chicago Press, 2005.
5. Millett, Kate. Going to Iran. Coward, McCann & Geoghegan, 1982.
6. Sharp, Gene. From Dictatorship to Democracy. Albert Einstein Institution, 1993.
7. Sussman, Gerald & Sascha Krader. "Template Revolutions." International Journal of Communication, 2008.
8. Blum, William. America's Deadliest Export: Democracy. Zed Books, 2013.















http://www.comillarkagoj.com/ad/1752266977.jpg
সর্বশেষ সংবাদ
আজ কুমিল্লায় আসছেন তারেক রহমান
৩ জনসভা ঘিরে ব্যাপক প্রস্তুতি
কুমিল্লায় সরস্বতী পূজা উদযাপিত
আমি নির্বাচিত হলে এলাকার চিত্র পাল্টে যাবে - মনির চৌধুরী
এবারের নির্বাচন দেশগঠনের, কেন্দ্রে দখল নয়
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
শতাধিক নেতা-কর্মী নিয়ে বিএনপিতে যোগ দিলেন এনসিপির প্রধান সমন্বয়ক
ভোট কেন্দ্র দখলের চেষ্টা হলে জনগণ জবাব দিতে প্রস্তুত
দিনব্যাপী মনিরুল হক চৌধুরীর গণসংযোগ
রাজনীতি যেন লুটেরাদের বিনিয়োগের ক্ষেত্র না হয় : হাসনাত আবদুল্লাহ
ছুটির দিনে জমজমাট প্রচারণা
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: newscomillarkagoj@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২