
রাজধানীসহ সারা দেশে গ্যাস সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। দেশের অর্ধেকের বেশি এলাকায় পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাসের সরবরাহ নেই। বিকল্প হিসেবে এলপিজির ব্যবহার করে ভোক্তারা। সেখানেও চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। ১০ দিন ধরে হঠাৎ করে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) সরবরাহ কমে গেছে। ভোক্তারা এক দোকান থেকে অন্য দোকান ঘুরেও পাচ্ছেন না চাহিদামতো গ্যাস। ১ জানুয়ারি থেকে এলপিজি গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় ডিলার থেকে শুরু করে খুচরা বিক্রেতারাও বেশি দামে বিক্রি করছেন। ১২ কেজির গ্যাস সিলিন্ডার সরকার নির্ধারিত দামে ১৩০৬ টাকায় পাওয়া দুষ্কর হয়েছে। ২ হাজার টাকা দিয়েও খুচরা বিক্রেতা ও ভোক্তারা তাদের চাহিদামতো গ্যাস পাচ্ছেন না। বাধ্য হয়ে সরকার ভোক্তা অধিদপ্তরকে অভিযান পরিচালনা করতে বলেছে। তা আমলে নিয়ে ভোক্তা অধিদপ্তরও প্রতিদিন রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করছে। বেশি দামে এলপিজি গ্যাস বিক্রির অভিযোগে বিভিন্ন ডিলারকে জরিমানাও করছে। তার পরও পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না। এদিকে বেশি দামে এলপিজিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে অস্বাভাবিক ও অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির তীব্র নিন্দা জানিয়েছে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। একই সঙ্গে মূল্য কারসাজির সঙ্গে জড়িত সিন্ডিকেট ও অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। সম্প্রতি দেশের বাজারে এলপিজি, সয়াবিন ও পাম তেলের দামে ধারাবাহিক বৃদ্ধি সাধারণ ভোক্তাদের মধ্যে চরম হতাশা, উদ্বেগ ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। এ মূল্যবৃদ্ধির ফলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, যা তাদের জীবনযাত্রায় মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করছে। সরকার ও বিইআরসির নির্ধারিত দামের তোয়াক্কা না করে অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত দামে এলপিজি বিক্রি করা হচ্ছে। চাহিদা বৃদ্ধির অজুহাতে আমদানিকারক ও পরিবেশকদের একটি অংশ বাজারে কারসাজি করছে। এটি বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও কার্যকর নজরদারির অভাবেরই প্রতিফলন।
তথ্য মতে, দেশে দিনে ৫ হাজার টন এলপি গ্যাস লাগে। কয়েক দিন ধরে ভোক্তাদের কাছে গড়ে ৪০০ টাকা বেশি নিচ্ছে বিক্রেতারা। এতে করে ভোক্তাদের পকেট থেকে লুট হচ্ছে প্রায় ১৭ কোটি টাকা। এভাবে গত ১০ দিনে ভোক্তাদের পকেট থেকে বের হয়ে গেছে ১৭০ কোটি টাকা। আগে ১ লাখ ৩০ হাজার টন আমদানি হলেও গত মাসে কমে ৯৬ হাজার টনে নেমেছে। সরবরাহ কমার সুযোগ নিচ্ছে দুষ্টু চক্র। এমন অবস্থার মধ্যে জালানি বিভাগ বলছে, এলপিজির সংকট নেই। খুচরা বিক্রেতারা বাজারে সংকট তৈরি করেছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে ভ্রাম্যমাণ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে জানিয়ে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের প্রধান বিকাশ চন্দ্র দাস বলেন, চলমান পরিস্থিতিতে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী অতি মুনাফার জন্য বেশি দামে এলপি গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি করছেন। আমরা গত তিন দিন বাজারে অভিযান চালিয়ে এ চিত্র পেয়েছি। এ পর্যন্ত বেশ কিছু ডিলারকে জরিমানাও করা হয়েছে। রসিদ দেখে তাদের হাতেনাতে ধরা হচ্ছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে ডিলারের দোকান সিলগালাও করা হচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র সরকার বিশ্বের ৯ থেকে ১০টি জাহাজের মালিককে নিষেধাজ্ঞার আওতায় ফেলেছে। ফলে আমদানি নভেম্বরের তুলনায় গত ডিসেম্বরে ৪০ শতাংশ কমেছে। এর প্রভাব পড়েছে বাজারে। এ ছাড়া আট থেকে নয়টি কোম্পানি আমদানির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। বাকিরা না পাওয়ার কারণ হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংকের সমর্থন না পাওয়া। তারা বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সহযোগিতা পেলে সরবরাহ সংকট দ্রুত কেটে যাবে।
এলপিজির চলমান সংকট সমাধানে লোয়াবের সঙ্গে বৈঠক করেছে জ্বালানি বিভাগ। বৈঠকে আমদানি বাড়ানোর অনুমতি চাওয়ার পাশাপাশি উৎপাদন ও আমদানি পর্যায়ে মূল্য সংযোজন কর না রাখার প্রস্তাব করেছেন ব্যবসায়ীরা। এতে বৈষম্য কমবে। চলমান সংকট নিরসনে জ্বালানি বিভাগ পাঁচটি উদ্যোগ নিয়েছে। উদ্যোগগুলোর যথাযথ বাস্তবায়নে সরকারকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। বিকল্প উৎস থেকে এলপিজি আনার ব্যবস্থা করতে হবে। গ্যাস আমদানি সহজ করতে হবে। ডিলারদের চাহিদা মোতাবেক গ্যাসের সিলিন্ডার সরবরাহ বাড়াতে হবে। ভোক্তাদের স্বার্থেই দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। সরকার অচিরেই সংকট নিরসনে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে, এটাই প্রত্যাশা।
