
বিশ্বব্যাপী
অন্যতম প্রধান সমস্যা হলো দরিদ্র্যতা, যা ক্ষুধা, স্বাস্থ্যহীনতা, শিক্ষার
অভাব, এবং সামাজিক বৈষম্যের মতো বহুবিধ সংকটের জন্ম দেয়। যুদ্ধ ও সংঘাত,
জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অর্থনৈতিক বৈষম্য: জনসংখ্যার চাপ,
দুর্বল অবকাঠামো ও সুশাসনের অভাব ইত্যাদি বহুবিধ কারণে দারিদ্র্যের সমস্যা
তৈরি হয়।
দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে দারিদ্র্য ও দুর্বলতার হাত থেকে রক্ষা করার
জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
সকল নাগরিকের জন্য একটি মৌলিক জীবনযাত্রার মান নিশ্চিত করে অর্থনৈতিক
স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি, জনস্বাস্থ্যের উন্নতি, সামাজিক ন্যায়বিচার
নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে দারিদ্র্য হ্রাস করার ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করা যায়।
দারিদ্র্য দূরীকরণে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, এবং সামাজিক
সুরক্ষা কর্মসূচিতে বিনিয়োগ অত্যন্ত জরুরি ভূমিকা পালন করে। সামাজিক
নিরাপত্তা কর্মসূচি হলো রাষ্ট্র কর্তৃক পরিচালিত এমন একটি ব্যবস্থা, যার
মাধ্যমে সমাজের অসহায়, দরিদ্র ও পিছিয়ে পড়া মানুষদের (যেমন- বয়স্ক, বিধবা,
প্রতিবন্ধী, গর্ভবতী মা) নিয়মিত আর্থিক বা খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়, যাতে
তাঁরা দারিদ্র্য, অসমতা এবং প্রাকৃতিক বা মানবসৃষ্ট দুর্যোগের শিকার না হয়
এবং তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণে সহায়তা করা যায়। এর মূল লক্ষ্য দারিদ্র্য ও
বৈষম্য হ্রাস করে সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা। ‘সামাজিক নিরাপত্তা জাল’,
‘সামাজিক সুরক্ষা’ এবং ‘সামাজিক নিরাপত্তা’ শব্দগুচ্ছ প্রায়শই
বিনিময়যোগ্যভাবে ব্যবহৃত হয়, যদিও বাস্তবে এগুলোর প্রয়োগের ক্ষেত্রে কিছুটা
ভিন্নতা রয়েছে ।
সামাজিক নিরাপত্তা এর প্রেক্ষাপট অতি পুরোনো হলেও এটি
আধুনিক কল্যাণ রাষ্ট্রের সামাজিক নীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ, সমাজ ও
রাষ্ট্রব্যবস্থার অপরিহার্য কার্যক্রম । প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) ৬২২
খ্রিস্টাব্দে (হিজরি বর্ষ) মদিনায় যে কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন, তার
মূল ভিত্তি ‘মদিনা সনদ’ ছিল স্বাধীনতা, সাম্য ও ন্যায়বিচারের একটি ঐতিহাসিক
দলিল, যা ইতিহাসে প্রথম লিখিত সংবিধান হিসেবে পরিচিত। রাসূল (সা.)-এর পর
প্রথম চার খলিফা (আবু বকর, উমর, উসমান, আলী) এই নীতির উপর ভিত্তি করে এমন
একটি সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু করেন, যেখানে অভাবী, এতিম, বিধবা এবং
সমাজের দুর্বল অংশ সুরক্ষিত ছিল। ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলের অধিকার ও
কল্যাণের কথা বলা এই আদর্শিক ব্যবস্থা কেবল তৎকালীন মুসলিম সমাজের জন্য নয়,
বরং বিশ্ব মানবতার জন্য একটি রোল মডেল হিসেবে কাজ করে আসছে । প্রাচীন
মিসর, গ্রিস, রোম, চীন, ভারতে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি এর দৃষ্টান্ত খুঁজে
পাওয়া যায়। জার্মানির চ্যান্সেলর অটো ভন বিসমার্ক ১৮৮৩ সালে সামাজিক
নিরাপত্তা কর্মসূচি’র কথা ভাবেন এবং ১৯১৭ সালে বলশেভিক তথা রুশ বিপ্লবের পর
সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন ভাবনা দেখা যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের
প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট ১৯৩৫ সালে সামাজিক নিরাপত্তা আইন
প্রণয়ন করেন।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের রাষ্ট্র পরিচালনার
মূলনীতির ১৫ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্বের
মধ্যে পড়বে সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার অর্থাৎ বেকারত্ব, ব্যাধি বা
পঙ্গুত্বজনিত কিংবা বৈধব্য, মাতাপিতৃহীনতা বা বার্ধক্যজনিত কিংবা অনুরূপ
অন্যান্য পরিস্থিতিজনিত আয়ত্তাতীত কারণে অভাবগ্রস্ততার ক্ষেত্রে সরকারী
সাহায্য লাভের অধিকার। বাংলাদেশ সরকার সামাজিক নিরাপত্তাকে মানবাধিকারের
দিক থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়নমূলক এজেন্ডা এবং দারিদ্র্য বিমোচনের
হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ‘খানা আয় ও ব্যয়
জরিপ ২০২২’ অনুযায়ী বর্তমানে বাংলাদেশে দারিদ্রের হার ১৮.৭ শতাংশ এবং অতি
দারিদ্রের হার ৫.৬ শতাংশ । মানুষের জীবন জীবিকার মান উন্নয়নসহ সার্বিকভাবে এ
দেশের উন্নয়নের গতিধারাকে এগিয়ে নিতে বাংলাদেশের সরকার বিভিন্ন ধরণের
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি পরিচালনা করছে, যেমন—বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা,
প্রতিবন্ধী ভাতা, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা, ভিজিডি ও ভিজিএফ কর্মসূচি প্রভৃতি।
এসব কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হলো দারিদ্র্য বিমোচন, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি
বৃদ্ধি এবং মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে সহায়তা প্রদান। দরিদ্র, প্রান্তিক ও
ঝুঁকিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্য হ্রাস, সামাজিক বৈষম্য হ্রাস এবং
জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন নিশ্চিত করতে ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের বাজেটে
সুবিধাাভোগীর সংখ্যা এবং মাথাপিছু বরাদ্দ উভয়ই বৃদ্ধি করার দিকে নজর দেয়া
হয়েছে। ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে এ খাতে বেশ কিছু ভাতার হার বৃদ্ধি করার পাশাপাশি
যৌক্তিক পরিমাণে উপকারভোগীর সংখ্যাও বৃদ্ধি করা হয়েছে। সামাজিক নিরাত্তার
কর্মসূচির আওতায় সঠিক ব্যক্তি যাতে উপকারভোগী হিসেবে নির্বাচিত হন সে
লক্ষ্যে ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশের
সরকারের বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বরাদ্দ ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি
পাচ্ছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির জন্য ৩৫,৯৭৫
কোটি টাকার বাজেট বরাদ্দ ছিল । ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ
৩.২৭ গুণ বৃদ্ধি পেয়ে ১,১৬,৭৩১ কোটি টাকা হয়েছে, যা জাতীয় বাজেটের ১৪.৭৮
শতাংশ এবং জিডিপির প্রায় ১.৮৭ শতাংশ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বিভিন্ন স্তরের
স্টেকহোল্ডারদের অংশগ্রহণমূলক সম্পৃক্ততার মাধ্যমে সতর্কতার সাথে ৯৫টি
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি নির্বাচিত করা হয়েছে। মালয়েশিয়ার সামাজিক
নিরাপত্তা বেষ্টনী বরাদ্দ ২০২৬ সালের বাজেটে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে ১৫
বিলিয়ন আরএমবি দাঁড়িয়েছে, (যা ২০২৪ সালে ছিল ১০ বিলিয়ন আরএমবি)।
ইন্দোনেশিয়ার সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বরাদ্দ বাজেটের প্রায় ১৫%
(বার্ষিক প্রায় $৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার)। ভারত সরকার ২০২৫-২৬ বাজেটে
জাতীয় সামাজিক সহায়তা কর্মসূচি খাতে প্রায় ৯,৬৫২ কোটি ভারতীয় রুপি বরাদ্দ
দিয়েছে। পাকিস্তানের ২০২৫-২৬ বাজেটে, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি উপর ৭৩৪
বিলিয়ন পাকিস্তানি রুপি বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।
একটি সুপ্রতিষ্ঠিত এবং
ব্যাপক সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা যে কোনো দেশে টেকসই উন্নয়নকে উৎসাহিত
করতে পারে। জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় দারিদ্র্য ও ক্ষুধা
দূরীকরণের লক্ষ্যে সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ক্রমবর্ধমান গুরুত্বের উপর
জোর দেওয়া হয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা অত্যন্ত জরুরি। জরুরি বিষয় হলো, বরাদ্দকৃত অর্থ যেন এ
ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠী সঠিকভাবে পায়, তার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। দলীয় ও
স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব থেকে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচির
বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে মুক্ত রাখার উপর এর কার্যকারিতা অনেকাংশে নির্ভর
করে।
সকল জাতির জন্য সমভাবে প্রযোজ্য ও কার্যকর সামাজিক সুরক্ষার কোন
সার্বজনীন নীতি নেই। বিভিন্ন দেশ ও জাতি প্রয়োজনীয়তার নিরিখে সেই দেশের
সামষ্টিক অর্থনৈতিক অবস্থা এবং সামাজিক চাহিদার উপর ভিত্তি করে সামাজিক
সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার পদ্ধতি গ্রহণ করে, যা মানুষের আয়ের স্তর বাড়া
কমার সাথে সংগতি রেখে পরিবর্তীত হয়। বাংলাদেশের মতো, অনেক উন্নয়নশীল দেশের
সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মানুষের জন্য
উন্নয়নের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন সহায়ক নীতি
পরিচালনার মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি দারিদ্র বিমোচন
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব।
দারিদ্র্যের কারণে মানুষের সক্ষমতা তৈরির পথে বাঁধা সৃষ্টি হয়, মানুষ
হতাশায় নিমজ্জিত হয় এবং সে ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ে। সামাজিক নিরাপত্তা হচ্ছে
এমন একটি ব্যবস্থা, যা বিভিন্ন কর্মসূচি এবং আইনগত উদ্যোগের মাধ্যমে সমাজের
মানুষের মধ্যে পরস্পর সহাবস্থান এবং সম্প্রীতির এক ধরনের সুষম পরিবেশ তৈরি
করে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দারিদ্র্য নিরসনে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি
কোনো স্থায়ী সমাধান নয়, সম্বলহীন ও অসহায় মানুষকে স্বাবলম্বী করে তোলা গেলে
সে তাঁর প্রয়োজন মিটানোর সক্ষমতা নিজেই অর্জন করতে পারে। মহৎ এ উদ্দেশ্য
পূরণে সকল নাগরিকের সম্মিলিত প্রয়াস জরুরি।
লেখকঃ পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগে অতিরিক্ত সচিব হিসেবে কর্মরত।
