
আমার দাদু
(দাদা-বাবার পিতা) গিরিশচন্দ্র ভৌমিক ২৭ বছর বয়সে ১১ বছরের সুখদা সুন্দরীকে
বিয়ে করেন। তাঁদের তিন ছেলে চার মেয়ে। দু’মেয়ে বিয়ের পর মারা যান অল্প
বয়সে। আমি তাঁদের দেখিনি। তাঁদের কোনো সন্তান-সন্ততি ছিল না। আমি দাদুর
জ্যেষ্ঠ ছেলের জ্যেষ্ঠ সন্তান। এ প্রসঙ্গ এ পর্যন্তই। দাদুর বিয়ের ঘটনাটি
তাঁর মুখেই শুনেছি। সে সময় ছেলেরা একটু বেশি বয়সেই বিয়ে করতেন বা তাঁদের
বিয়ে দেয়া হতো। মেয়েদের অল্প বয়সে তথা আট থেকে বার বছর বয়সে অধিকাংশের বিয়ে
দেয়া হতো। দাদুর বিয়ে ঠিক হয় প্রায় চার মাইল দূরে এক গ্রামে,
নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে। তখন ছেলেরা মেয়ে বা পাত্রী দেখার রেওয়াজ ছিল না।
দাদুর বাবা, মামা-পিশেমশায়-কাকা এবং পরিবারের ঘনিষ্ঠ ২/১ জনসহ পাত্রী দেখতে
গিয়েছিলেন এবং পাত্রী দেখার পর পছন্দ হওয়ায় তাঁদের আমন্ত্রণ জানিয়ে
এসেছিলেন। যেদিন পাত্রী পক্ষ এলেন তাঁরা সংখ্যায় ৮/৯ জন। আসার পর আপ্যায়ন
করা হয়। গ্রামের তখনকার প্রাথমিক আপ্যায়ন শুরু হয় তামাক সেবনের মধ্য দিয়ে,
সম্মুখে পান-সুপারির পসরা, এর মধ্যে ছেলেকে ডাকানো হলো। দাদু ধুতি-গেঞ্জি
পরে সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। তিনি কাউকে প্রণাম করছেন না দেখে দাদুর কাকা
প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক বনমালী ভৌমিক বলে উঠলেন-আজকালকার ছেলেরা কোনো আদব
কায়দা মোটেই শিখে না। যাক পাত্রী পক্ষের একজন মুরুব্বি প্রশ্ন শুরু
করলেন-নাম কি-শ্রী গিরিশচন্দ্র ভৌমিক। পিতার নাম কি-শ্রীযুক্ত কৃষ্ণচন্দ্র
ভৌমিক। জেঠার নাম কি-শ্রীযুক্ত রাম চন্দ্র ভৌমিক। তিনি জীবিত আছেন? না।
জীবিত ব্যক্তির নামের আগে ‘শ্রীযুক্ত’ হয় না, ‘স্বর্গীয়’ বলতে হয়। অন্যজনের
মন্তব্য-‘অজ্ঞতা’। পড়াশোনা কতটুকু করেছ-আট ক্লাস পর্যন্ত। বাংলা ছাড়া
ইংরেজি জান? ততটা নয়-তবে ইংরেজিতে নাম-ঠিকানা লিখতে পারি। এখন কি
কর-গেরস্থিবাস। জায়গা-জমি কি পরিমাণ আছে-‘বাবা বলতে পারবেন।’ তবে আঠারটি
ক্ষেত চাষবাস করি। মন্তব্য-‘বৈষয়িক বুদ্ধি কম।’ ২/৩টি ধানের নাম
বলো-আমন-পানকাইচ-হাইট্টা-ধাইরল... থাক থাক। আর পাট চাষ হয়-‘হয়’। এক কানি কত
শতকে-দাদু চুপ। তুমি কি বলতে পারবে-এক কানিতে কতসের ধানের বীজ লাগে-চুপ।
কৃষিকাজ কর, তা জানে না। দাদু দেখলেন-প্রশ্নের উত্তর না দিতে পারলে বিয়ে
ফিরে যেতে পারে। তাই বললেন-আমাদের কোন জমিতে কতটুকু বীজ লাগে তা বলতে পারি।
মন্তব্য-বাস্তব জ্ঞান থাকলেও হিসাব জানে না। টাকা পয়সার হিসাব জানো ত? তা
জানি। তোমার কাছে টাকা-পয়সা আছে কি-না। কেন-তা বাবার কাছে থাকে, দরকার হলে
চেয়ে নিই, বাজে খরচ করার অভ্যাস নেই। এ কথা শুনে পাত্রীপক্ষ মুখ চাওয়া
চাওয়ি করে কেউ কেউ মাথা নাড়লেন। মন্তব্য-বাবার বাধ্যগত। তারপর আর কোনো
প্রশ্ন নেই। দাদুকে যেতে বললেন।
তিনি বের হবেন, মামা তখন রাগতভাবে
বললেন-কোথায় যাস। গুরুজনদের প্রণাম করতে হয়, তাও কি শিখাতে হবে? দাদু তখন
একে একে পা ছুঁয়ে সকলকে প্রণাম করতে লাগলেন। তন্মেধ্যে একজনকে প্রণাম করতে
যাবেন, অন্যজন বললেন-তাকে নয়, সে পাত্রীর থেকে বয়সে বড় হলেও পাত্রীর ভাইপো।
এভাবে ইন্টারভিউ পর্ব শেষ হলো। তারপরের পর্ব হলো-জলপান। প্রত্যেককে বড় বড়
থালায়-চিড়া-মুড়ি-খই-এর মোয়া, নাড়ু-বাতাসা-দুধ প্রচুর পরিমাণে দেওয়া হলো।
সকলেই তৃপ্তি সহকারে খেলেন। পান-তামাক সেবন চলছে। এখন অন্যান্য অপ্রাসঙ্গিক
আলোচনা। পাত্র-পাত্রী পক্ষের আত্মীয় স্বজন কারা, এতে পরিবারগত আভিজাত্যের
বিষয়টি প্রতিযোগিতামূলক পরিচিতি দেয়া হচ্ছে, কখনও কখনও একই ব্যক্তি উভয়
পরিবারের আত্মীয় হওয়ায় বৈবাহিক সম্পর্কটা সঠিক এবং উত্তম হবে বলে কেউ কেউ
মন্তব্য করলেন, তাতে মিথ্যাচারও ছিল। বেলা অপরাহ্ন। ভাত খাওয়ার আয়োজন।
অতিথি অভ্যাগত ও বাড়ির কর্তারা খেতে বসেছেন-চিকন চাউলের ভাত, আলু-বেগুন-মাছ
ভাজা, সুক্তার খেসারি ডাল, মাছের মাথা দিয়ে লাউ তরকারি, মাছের কালিয়া,
মুগডাল এবং শেষে বড় কাঁশার বাটিতে পায়েস। সকলেই তৃপ্তিমত পেট ভরে খেলেন।
রান্নার তারিফ হলো। বড় বড় ঢেকুর দেয়া হলো, পান-তামাক তো আছেই এবং বিয়ের
দিনক্ষণ তারিখ ঠিক করতে আনুসঙ্গিক লেনদেন নিয়ে কিছুটা অম্লমধুর আলোচনা
অন্তে পাত্রীপক্ষ বিদায় হলেন।
দাদুর বিয়ে। দাদু পাত্রী দেখেন নাই, দেখার
সুযোগ নেই। রেওয়াজ নেই। পারিবারিক ধারা-এমনভাবে চলে আসছে। যাঁরা পাত্রী
দেখতে গিয়েছিলেন, তাঁরা গুরুজন। জিজ্ঞাসা করার সুযোগ নেই। শুধুমাত্র
বাবা-মার কথোপকথন যতটুকু শুনেছেন, তাতেই প্রাথমিক একটা ধারণা নিয়েছেন। এ
ধারণা খুবই অস্পষ্ট, সুতরাং এক অজানা-অচেনা বালিকার অবয়ব কল্পনার মায়াজালে
বিনিদ্র রজনীতে অধরা হয়ে বার বার মনের কাছাকাছি আসা-যাওয়া করেছে বিয়ের আগ
দিন পর্যন্ত। দাদুর বিয়ে হয়ে গেলো। বিয়ের পরের দিন নব বিবাহিত স্ত্রীকে
নিয়ে দাদু ও বরযাত্রীসহ আপন আলয়ে ফিরে এলেন। কালরাত্রি-বৌভাত-শুভরাত্রি
হলো। সেদিন ঠাকুরমা ঘুমালেন, দাদু বিনিদ্র রাত কাটালেন, কোনো সাহসী ভূমিকা
নিতে সাহস পেলেন না দাদু। একজন বালিকা পাশে শুয়ে আছে অন্ধকার রাতে। বিয়ের
সময় শুভদৃষ্টিতে যতটুকু এক পলক দেখেছেন, তাও অস্পষ্ট। অন্ধকার থাকতেই একজন
বয়স্কা নববধূকে ডেকে তুলে নিয়া যায়। স্নান করতে পুকুরে নামায়। দাদু ঘুম
থেকে উঠে গরু-বাছুর নিয়ে মাঠে চলে গেলেন। বিয়ের দশ দিনের মধ্যে দ্বিরাগমন
করা রীতি আছে, তাই ছয় দিন পর পাত্রীপক্ষের একজন এসে দাদু ঠাকুরমাকে নিয়ে
যায়, সঙ্গে ভগ্নিপতি, ভাতিজাসহ ৪/৫ জন। দাদুর শ্বশুরবাড়ি যাওয়া-অনেক
আনুষ্ঠানিকতা, কিন্তু স্ত্রীকে পাশে পান, কাছে পান না, কথাও হয় না। ২৭
বছরের যুবক ১১ বছরের বালিকা-বধূ-দূরত্বটা কম না।
দ্বিরাগমন থেকে
দাদু-ঠাকুরমা ফিরলেন, দাদু ঠাকুরমাকে কাছে পেতে চান, বালিকাবধূ রাতে শুধু
ঘুমায়, পাশের ব্যক্তিটিকে যেন চিনে না, তাই বুঝে না-বুঝতে চেষ্টাও করে না।
৫/৬দিন পর বাপের বাড়ি চলে গেলেন ঠাকুরমা। দাদু বুঝতে পারলেন-বালিকা-বধূ,
বালিকা। ঠাকুরমা এক নাগাড়ে ছয়মাস বাপের বাড়ি থাকলেন। তাঁর ঠাকুরমা ও দিদিমা
সংসার কর্ম করা ও স্বামী সান্নিধ্য ইত্যাদি ব্যাপারে তালিম দিতে লাগলেন।
দাদু শ্বশুর বাড়িতে কোনো অনুষ্ঠান উপলক্ষে দু’দিন কাটিয়ে আসলেন, ঠাকুরমার
সঙ্গে দেখা হয়েছে, কথা হয়নি। তবে পরস্পর পরস্পরের দিকে তাকিয়ে হাসি
দিয়েছেন। এসব দাদুর মুখে শোনা কথা। ছয়মাস পর ঠাকুরমা স্বামীর কাছে এলেন।
রাতে দাদুর প্রথম সংলাপ-তোমার নামটি জানা হয়নি। দু’বার বলার পর ঠাকুরমা
বললেন-সুখদা সুন্দরী। দাদু বললেন-নামটি খুবই সুন্দর। দ্বিতীয় সংলাপ-আমি
তোমার কে? উত্তর নাই। কেবল অন্ধকারের মধ্যে ফিক করে হাসির শব্দ শুনতে
পেলেন। দাদু মৃদু হাসলেন, ঠাকুরমা টের পেলেন না। তৃতীয় সংলাপ-আমরা একত্রে
ঘুমাই কেন? উত্তর থাক-ঠাকুরমা বিছানায় উঠে বসলেন। বললেন-আমি এখানে ঘুমাব
না। দাদু বিব্রতবোধ করলেন। পরিবেশ স্বাভাবিক করার উপায় বা পথ খুঁজে
পাচ্ছিলেন না। শুধু বিনয়ের সঙ্গে বললেন-তুমি ঘুমাও, আমি বসে থাকি। সারারাত
দু’জনই বসে কাটালেন অন্ধকারে। একজনের মনে ভীতি, অন্যজনের মধ্যে তোলপাড়।
তারপর শেষ হিসেব হলো-তিন পুত্র-চার কন্যার জনক-জননী তাঁরা।
বর্তমান হালচাল
আগেই
নিজ সম্পর্কে বিষয়টি পরিষ্কারভাবে বলে নিই। আমি বিয়ে করার আগে পাত্রী
দেখতে কোথাও যাইনি। কারণ, উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণিতে পড়াকালীন যাকে
ভালোবেসেছিলাম, তাকেই বিয়ে করব অথবা কোনো কারণে বিয়ে না হয় তবে উভয়ই
প্রতিশ্রুত ছিলাম-জীবনে অন্য কাউকে বিয়ে করব না। সেজন্য পাত্রী দেখার মতো
সমকালের এক ধরনের আনন্দঘন শিহরণমূলক ঘটনার মোকাবিলা করার প্রয়োজন পড়ে নাই।
তবে বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজনের পাত্রী দেখার অভিযানে যোগ দেবার সৌভাগ্য
হয়েছিল।
মেয়ে বা পাত্রী দেখার আয়োজনটিকে একটা ইন্টারভিউ বোর্ড হিসেবে
বিবেচনা করা যায়। ইন্টারভিউতে পাস করলে বিয়ে, ফেল করলে বিয়ে নয়। বরপক্ষ
প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে এক সময় মেয়ের চুল কতটা লম্বা বেণি খুলে ঘুরিয়ে
ঘুরিয়ে দেখাতে হতো বরপক্ষকে। মেয়ে ল্যাংড়া কিনা তা দেখার জন্য হাঁটানো হতো।
পায়ের নীচে জল দিয়ে জায়গাটা পিচ্ছিল করে তাকে হাঁটতে বলা হতো। পরীক্ষা করে
দেখা হতো পিচ্ছিল জায়গায় মেয়ে ঠিকমতো হাঁটতে পারে কি-না। হাতের কোষে জল
দিয়ে দেখা হতো আঙুলের ফাঁক দিয়ে জল পড়ে কি-না। মেয়ের দাঁতগুলো মুক্তার মত
ঝকঝকে, না আঁকাবাঁকা হাঁ করে দেখাতে হতো, পায়েরপাতা, আঙুল ঠিক আছে কিনা।
সর্বোপরি গায়ের রং বিবেচনায় নিয়ে রান্নাবান্না, আচার-পিঠা তৈরিতে
শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা করবে কি-না ইত্যাদি ঠিকঠাক থাকলে বরপক্ষের পছন্দ হলে
মেয়ের হাতে কিছু নগদ টাকা অথবা আঙুলে আংটি পরিয়ে দিত এবং পরবর্তী
কার্যক্রমের প্রস্তুতি চলত। এতকিছুর পর কিছু কিছু ব্যতিক্রম ঘটনা, যা আমার
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, তা-ই বলতে চাই।
১. আমার কাকার জন্য পাত্রী দেখতে
যাবেন দাদু, জ্যাঠামশায়, বাবা, পিসেমশায়, কাকার একজন বন্ধু এবং আমি। আমি
তখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি। পাত্রীর বাড়ি আমাদের গ্রাম থেকে চারমাইল দূরে,
হেঁটে যেতে হবে। পাত্রী পছন্দ হলে এবং পরিবার সমকক্ষ হলে তাদেরকে নিমন্ত্রণ
জানানো হবে। কাকা ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়ে ফেল করেছেন, নারায়ণগঞ্জে কাপড়ের
মিলে চাকরি করেন ৬০/৬৫ টাকা বেতনে। বিংশশতাব্দীর পঞ্চাশের দশকের কথা। বাড়ি
থেকে যাত্রা করে একথা-সেকথা এবং সেখানে গিয়ে পাত্রীকে কি প্রশ্ন করা হবে,
লেখাপড়া জানা থাকলে নাম-ঠিকানা লিখতে বলা হবে এবং কে কোন প্রশ্ন করবেন তা
নির্ধারণ করা হয়। আমি খালি পায়ে গিয়েছিলাম, অন্যরা হাতে করে জুতা-সেন্ডেল
নিয়ে গেছেন, পাত্রীর বাড়ির কাছে গিয়ে পুকুরে পা ধুয়ে জুতা-সেন্ডেল পরেছেন।
এটাই তখনকার রেওয়াজ। তারপরও পাত্রীর বাড়ির পক্ষ থেকে কাঠের খড়ম ও জলের ঘটী
উঠানের কোণায় দেয়া ছিল। আমন্ত্রণ জানিয়ে বাড়ির কর্তাব্যক্তি ঘরে নিয়ে
আমাদের বসালেন। চেয়ার-চৌকি ও টোল ছিল, যথা সময়ে পান-তামাক চলে এলো। কুশল
সমাচার পর্বে পারিবারিক বিষয়গুলো জেনে নেওয়া হলো এবং একসময় পাত্রী দেখার
পর্ব শুরু হলো। পাত্রীর ঠাকুরমা পাত্রীকে নিয়ে উপস্থিত এবং পা ছুঁয়ে
নমস্কার। প্রণাম পর্ব চলল, তাতে পাত্রীর হাঁটা-চলা লক্ষ্য করা গেল, তারপর
চলল প্রশ্ন-পর্ব। কার আগে কে প্রশ্ন করবেন-প্রতিযোগিতা প্রায়। পাত্রী
বিভ্রান্ত এবং বিরক্ত বুঝা গেল। যখন প্রশ্ন করা হলো-‘ভাত রাঁধার পর ফেন
(মার) কি করা হবে।’ পাত্রী চুপ, পুনরায় প্রশ্নটি করার পর বলে উঠল-‘যে বেশি
কথা কয়, তার মাথায় ঢেলে দেওয়া হবে।’ আসর স্তব্ধ ও বিহ্বল। পাত্রীপক্ষের
মাথা হেঁট করে আছে, পাত্র পক্ষ বোবা। আমি কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না।
গুরুজনদের মুখের দিতে তাকিয়ে আর চুপ থাকতে পালাম না, বলে উঠি-‘ঠিকই বলেছে’।
তারপর...
২. শোনা কথা
বিনয়ের বাপ বিনয়ের জন্য পাত্রী দেখতে যাবেন।
কে কে যাবেন, তা ঠিক করা আছে। তন্মধ্যে ভগ্নীপতি পরেশের বাপ অখিলকে যে নিতে
হয়। কিন্তু দ্বিধা আছে। পরেশের বাপ কথায় একটি অশ্লীল কথা বলে।
সবকথায়
আগে-পাছে ‘চ্যাট’ শব্দটি উচ্চারণ করে, এমনিতেই তার ভাল-খারাপ,
স্থান-কাল-পাত্র বিবেচনা না করেই। এটা তার মুদ্রা দোষ। তাই বিনয়ের বাপ
পরেশের বাপকে বলছে-‘বিনয়ের জন্য পাত্রী দেখতে যাব, তোমাকে নিতে চাই, কিন্তু
তোমার মুদ্রা দোষের জন্য সাহস পাচ্ছি না।’ পরেশের বাপ বলছে-‘আমি
যাব-চ্যাটটা না কইলে কী চ্যাট হইব।’‘এই তো বললা’। আরে ঠিক সময়ে বলব না। কথা
স্থির হলো-পরেশের বাপ কোনো প্রশ্ন করবে না। পাত্রী দেখতে গেলো। পাত্রীকে
নিয়ে এসেছেন দিদিমা। প্রথম প্রশ্ন-‘মা তোমার নাম কি?’ কোনো উত্তর নেই।
কিছুক্ষণ পর আবার প্রশ্ন। দিদিমা বলছে-‘বল না, তোর নাম কমলা।’ পাত্রী চুপ।
তারপর বিনয়ের বাপ বলছে-‘মা, তুমি নাম না বললে তুমি বোবা, না কথা বলতে পারো
কীভাবে বুঝব?’ তারপর কাঁপা কন্ঠে পাত্রী বলল-‘কমলা’,। পরেশের বাপ আর চুপ
থাকতে পারল না। বলে উঠল- ‘এ চ্যাটটা বলতে এতক্ষণ লাগল?’ আসর নিস্তব্ধ হয়ে
গেলো। পাত্রপক্ষ একজন অপরজনের মুখের দিকে তাকাল, বিরক্ত প্রকাশ করল।
৩.
বিএ অনার্স শ্রেণিতে পড়ি। সহপাঠীর বোনকে পাত্রপক্ষ দেখতে আসবে। সহপাঠীর
অনুরোধে তাদের বাড়ি যাই। সহপাঠীর বোন, সুতরাং আমারও বোন। তারপরও আমি বাইরের
ছেলে, প্রথম গিয়েছি তাদের বাড়ি। সহপাঠীর মা-বাবার সঙ্গে পরিচয় হলো।
আন্তরিকভাবে ছেলের বন্ধুকে গ্রহণ করলেন। সহপাঠীর বোনটি এসএসসি পাশ করেছে,
কলেজে ভর্তি হওয়ার আগেই বিয়ে দিতে চায় মা-বাবা। বোনটি দেখাশোনায় ভালো। আমার
তখনকার বয়সে এরূপ মেয়েদের সবসময় ভালোই লাগে। কথা হয়নি, চোখের দেখা হয়েছে,
চোখেরও তো একটা ভাষা থাকে, তা কেউ পড়তে পারে, কেউ বুঝতে পারে। পরের দিন
পাত্রপক্ষ এলো, সাথে পাত্রও। পাত্র বিএ পাশ, স্কুলের শিক্ষক, ধুতি-পাঞ্জাবি
পরে এসেছে। দেখাদেখির সময় আমি ছিলাম না। পাত্রপক্ষ চলে যাওয়ার পর
পারিবারিকভাবে যখন নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা হচ্ছে তখন বোনটি মুখর হয়ে বলে
উঠল-আমি ধুতিপরা লোকটিকে বিয়ে করব না। কেন? গেঁয়ো। বিএ পাশ ছেলে পাওয়া
গেছে-কেমন কথা। বাবা চুপ। মা বুঝাতে চাচ্ছেন। বোনটি ভিতর দরজায় হেলান দিয়ে
দাঁড়িয়ে আছে। আমি ও সহপাঠী বন্ধুটি ঘরে ঢুকেছি, পরিবেশটা কেমন জানি থমথমে।
কিছুক্ষণ পর জানা গেলো বিষয়টি। বন্ধুটি বোনকে ধমক দেয়, তার মতামত দেওয়াটা
অধিকার বহির্ভূত। তার আবার মতামত কি। অভিভাবক যা ভালো বুঝবেন তাই করবেন
ইত্যাদি। আমি তো তৃতীয় ব্যক্তি। মনে বড় দ্বিধা লাগল। তখনকিছু বললাম না।
রাত্রে খাওয়া দাওয়ার পর বন্ধুটিকে বললাম-‘তোমার বোন বিয়ে করবে, তার মতামতের
কোনো মূল্য নেই?’ এমনিতেই বন্ধুর মনটি বিগড়িয়ে আছে। সে বলে উঠল-‘তুমি বিয়ে
করবে আমার বোনকে?’ বলে কী। আর কোনো কথা চলে, সারা রাত ঘুম হলো না, খুব
সকালে কাউকে না বলে ব্যাগটি কাঁধে ঝুলিয়ে চলে আসি।
৪. আমি তখন বিবাহিত।
আমার বন্ধু খগেনের বিয়ে হয়নি। কারণ-এ পর্যন্ত ৮/৯টি পাত্রী দেখেছে। কোনোটি
পছন্দ হয় না, কোনোটি ঘর বনে না, কোনোটি চাহিদা পূরণ হয় না। খগেন সাহা
সম্প্রদায়ের। সুতরাং বিয়ের বাজারে একটু চাহিদাআছে, তবে দাবির তালিকা
অনেকক্ষেত্রেই অসহনীয়। টাঙ্গাইলে পাত্রী দেখতে গেলাম। পাত্রীপক্ষ আমাদের
অভ্যর্থনা জানাল জমকালোভাবে। খাওয়া-দাওয়া, আদর-আপ্যায়ন, থাকবার
ব্যবস্থা-এককথায় চমৎকার। পাত্রীর বড় ভাই বামপন্থী রাজনীতি করে, বাবা নেই,
তিনিই মূলত অভিভাবক। পাত্রী দেখে আমাদের পছন্দ হলো না, আমাদের মতামত যাই
হোক আমার অবস্থান ভিন্ন। মেয়েটি শ্যামলা, উচ্চমাধ্যমিক পড়ে মির্জাপুর
কলেজে। এ নিয়ে যখন আমাদের মতামত জানতে আগ্রহী হয়, আমরা পরে জানাব-এরূপ বলায়
দেখা গেলো-বাড়ির আর কেউ আমাদের খোঁজ খবর নিচ্ছে না, জল চেয়ে খাব লোক
খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। চা-হলে ভালো হয়-কিন্তু এমন কি আমরা যখন বিদায় হই,
কেউ এগিয়ে দিতে আসেনি। কী যে লজ্জা ও অপ্রস্তুত অবস্থা তা বুঝিয়ে বলা যাবে
না। তখন থেকে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম-আর পাত্রী দেখতে কারো সঙ্গে যাবো না।
তারপর
ভাইদের জন্য পাত্রী দেখতে গেছি, বোনদের জন্য পাত্র দেখতে গেছি। ছেলে-মেয়ের
জন্যও এ কাজটি করেছি-তবে সঙ্গে কাউকে নিইনি। মেয়েকে বলেছি-ছেলে এরূপ,
আসবে-কথা বলবে, মতামত জানাবে। ছেলেকে বলেছি-মেয়েটির পরিচয় এরূপ-নিজেই
যোগাযোগ কর, তিনমাস সময় দিলাম, মতামত দিলে অগ্রসর হবো।
বর্তমানে আগের মতো পাত্র-পাত্রী দেখার কোনো রেওয়াজ তেমন আর নেই। এটাই বর্তমানের হালচাল। আমার ভালো লাগে।
৫.
তবে মাংস কিনতে গিয়ে কসাইকে বলি হাড় দিবে না, শুধু মাংস দাও। খাওয়ার সময়
বলি হাড়সহ মাংস দাও, পাত্রী দেখতে রূপ দেখি। বিয়ের পর গুণ বিচার করি।
কিন্তু এখন ছেলে-মেয়ে নিজেরাই পছন্দ করে নেয়, কনে দেখার চল তেমন একটা নেই।
তাই মাংস বা রূপ দেখে না। মনের মিল হলেই বুঝাপড়ার হিসাবনিকাশ। অভিভাবক শুধু
অনুষ্ঠান নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। তারপরও...
