
বুড়িগঙ্গায়
পানি প্রবাহ না থাকায় পানি কালচে রঙ ধারণ করে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ।
বুড়িগঙ্গার পাড় দিয়ে চলাচল করাই দুঃসাধ্য হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে শীতকালে এর
পানি থেকে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়ায়। এ পানিতে সৃষ্টি হয়েছে নানাহ রোগজীবাণু।
বুড়িগঙ্গার পাড়ে ঢাকা শহরের বিকাশ যখন থেকে শুরু তখন থেকে দূষণের ইতিহাসও
শুরু। তবে নদীর অভ্যন্তরের দূষণ গত চার দশকে তীব্র হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের
মতে, বুড়িগঙ্গা দূষণের ৮৮ শতাংশ কারণ হল ঢাকার বর্জ্য নদীতে ফেলা। এছাড়া
দুই পাড় চলে যাচ্ছে প্রভাবশালীদের দখলে। শুধু তীর নয়, নদীর মাঝ পর্যন্ত দখল
করা হয়েছে। এখন অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌছেছে যে, বিশে^র দূষিত নদীর তালিকায়
বুড়িগঙ্গার নাম উঠে এসেছে।
বুড়িগঙ্গার তীরে প্রায় ৪০০ বছর আগে গড়ে
উঠেছিল ঢাকা শহর, যা এখন বাংলাদেশের রাজধানী। এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,
বিশে^র যে ১০ টি নদী এখন সবচেয়ে বেশি দূষিত, তার মধ্যে বুড়িগঙ্গার অবস্থান
ছয় নম্বরে। পরিবেশ বিষয়ে কাজ করা কনজার্ভ এনার্জি ফিউচারের তথ্য অনুযায়ী,
বিশে^র সবচেয়ে দূষিত নদীগুলোর মধ্যে ঢাকার এই নদীটির অবস্থান পঞ্চম। দূষণের
মাত্রা বিবেচনায় অত্যন্ত সমস্যাসংকুল। নদীটির পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন
পৌঁছেছে শুন্যের কোটায়। ফলে একসময় যে নদীতে ঝাঁকে ঝাঁকে মাছ পাওয়া যেত, সে
নদীতে আর মাছের দেখা মেলে না। এখানে বিশেষ উল্লেখ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন
Ñ২০০৭ অনুযায়ী মৎস্য ও জলজপ্রাণীর জন্য প্রতি লিটার পানিতে দ্রবীভূত
অক্সিজেন থাকা দরকার পাঁচ মিলিগ্রাম বা তার বেশি।
২০১১ সালের ১লা জুন
হাইকোটের এক রায়ে বলা হয়েছিল বুড়িগঙ্গার পানি দূষণ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে
যে, এ পানিকে আর পানি বলা যায় না। ঐ সময় বুড়িগঙ্গা নদীর সঙ্গে যুক্ত সব
পয়ঃপ্রণালী এবং শিল্প কারখানার বর্জ্য নিষ্কাশন লাইন বন্ধ করতে ওয়াসার
চেয়ারম্যানকে নির্দেশ দেন আদালত। কিন্তু এসব নির্দেশের বাস্তবায়ন হয়নি। বরং
নদীদূষণ দিন দিন আরও ভয়ংকর আকারে বাড়ছে। বুড়িগঙ্গা নদীর দূষণরোধে
একাধিকবার জরিমানাসহ নানা ধরনের শাস্তি দেওয়া হয়েছে নদীর পাড়ে গড়ে উঠা
শিল্প-কারখানাগুলোকে। কিন্তু এত কিছু করা স্বত্বেও নদী দূষণ বন্ধ করা
যাচ্ছে না। বুড়িগঙ্গা দূষণমুক্ত করার জন্য বিভিন্ন সময় ড্রেজিং, হাজারী
বাগের ট্যানারি স্থানান্তর করা হয়েছে তারপরও পানির রং কালচে থেকে স্বচ্ছ
হচ্ছে না ও দূর্গন্ধমুক্ত হচ্ছে না।
২৯ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদীকে একসময়
বলা হইত ঢাকার প্রাণ। বর্তমানে দখলে দূষণে বুড়িগঙ্গা একটি প্রাণহীন নদী।
জানা গেছে, জলযান আর গৃহস্থালী থেকে প্রতিদিন প্রায় ২১,৬০০ ঘনমিটার
কঠিনবর্জ্য বুড়িগঙ্গাং এসে পড়ে। অতীতকাল থেকেই বুড়িগঙ্গা বিভিন্নভাবে দূষিত
হয়ে আসছে। আগে শুধু ময়লা আবর্জনা ফেলে নদীকে দূষিত করা হত, বর্তমানে এর
সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অপরিশোধিত শিল্প ও পয়ঃবর্জ্য। দখল-দূষণের এইসব আনাচারের
কবলে পড়ে বুড়িগঙ্গা আজ সংকটাপন্ন। পয়ঃ বর্জ্য পরিশোধনগার স্থাপন,
গৃহস্থালির বর্জ্য ফেলা থেকে বিরত থাকা, নৌযানের বর্জ্য ও তেল নদীতে ফেলা
থেকে বিরত থাকা ইত্যাদি পদক্ষেপ নেওয়া জাতীয় জরুরী গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার।
বুড়িগঙ্গা রক্ষায় সংশ্লিষ্ট আইনগুলো কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে এবং
কর্তৃপক্ষের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা বুড়িগঙ্গা রক্ষার উপায়। সর্বোপরি
নদীদূষণ থেকে পরিবেশদূষণ থেকে জাতিকে সুরক্ষায় জনসচেতনতা বৃদ্ধির সকল
পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।
লেখক: সাবেক অধ্যক্ষ, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ
