
মানুষের গড়
আয়ু বাড়ছে, ফলে বয়স্ক মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে। আর বাড়ছে বয়স্কজনিত
রোগব্যাধিও। প্রকৃতিগতভাবেই বিভিন্ন রকমের শারীরিক পরিবর্তনও আসে। ষড়ঋতুর এ
দেশে বিভিন্ন সময়ে আবহাওয়ার আকস্মিক পরিবর্তনের সঙ্গে তরুণ বা মধ্যবয়সীরা
খাপ খাইয়ে নিতে পারলেও বয়স্কদের বেশ ভুগতে হয়। ধীরে ধীরে শীত বাড়ছে আর
শীতকালে বয়স্কদের মাঝে এর প্রকোপটা গভীরভাবেই পরিলক্ষিত হয়। কেননা, তাদের
রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় খুব সহজেই তারা অসুস্থ হয়ে যান। এ সময় তাদের
বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়। বাত ও যাদের হাঁপানি বা সিওপিডির সমস্যা
আছে, তারা শীতে খুব কষ্ট পান। উচ্চরক্তচাপ ও হার্টের রোগীদের বেশ সাবধানে
থাকতে হয়। ত্বকের সমস্যাসহ নানা ধরনের অসুবিধা দেখা দেয় বয়স্কদের। শীতকালে
বয়স্কদের সুস্থ থাকা জরুরি। তাই তাদের জন্য দরকার বিশেষ কিছু সতর্কতামূলক
ব্যবস্থা।
শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত সমস্যা: শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত সমস্যা বা
শ্বাসনালির প্রদাহ বয়স্কদের খুবই স্বাভাবিক। সাধারণ সর্দিকাশি বা ফ্লু এবং
নিউমোনিয়া, যারা এজমা, ব্রঙ্কাইটিস, সিওপিডি, এমফাইসিমা ইত্যাদি রোগে
ভোগেন, শীতের সময় এসব সমস্যা আরও প্রকট আকার ধারণ করে। এগুলো থেকে
পরিত্রাণের জন্য উচিত সব সময় গরম কাপড় পরিধান করা, গরম পানি পান ও ব্যবহার
করা। ঘর গরম রাখার জন্য সম্ভব হলে হিটার ব্যবহার করা উচিত। ঠাণ্ডা আবহাওয়ায়
প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে যাওয়া উচিত নয়। একান্ত প্রয়োজনে বাইরে গেলে
যথেষ্ট পরিমাণ শীতের কাপড় পরিধান নিশ্চিত করতে হবে। মাথা ও কানের টুপি,
মাফলার, হাতে উলের গ্লাভস ব্যবহার করা উচিত। যাদের এজমা বা শ্বাসকষ্ট আছে,
তারা সব সময় ইনহেলার সঙ্গে রাখুন এবং প্রয়োজনে ব্যবহার করুন। খুব বেশি
সমস্যা হলে ঘরে নেবুলাইজার ব্যবহার করা উচিত, প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের
পরামর্শ নিতে হবে।
আর্থ্রাইটিস বা গিরায় ব্যথা: এ বয়সে অনেকেই
অস্টিওআর্থ্রাইটিস, অস্টিওপরোসিস বা অন্যান্য হাড় ও অস্থিসন্ধির ব্যথায়
ভোগেন। এমনকি অনেকের রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, এনকাইলোজিং স্পন্ডডিলাইটিস,
সারভাইকাল স্পন্ডইলোসিস জাতীয় রোগ থাকতে পারে। শীতে এ ধরনের রোগীর ব্যথার
সমস্যা আরও বেড়ে যেতে পারে। এর মূল কারণ শুধু শীত নয়, বরং শীতকালে
কাজকর্মে, শারীরিক পরিশ্রম বা নড়াচড়া কম হয় বলে এ সমস্যাগুলো আরও বেড়ে যায়।
এর থেকে মুক্তির জন্য ঠাণ্ডা পরিহার, সম্ভব হলে ঘরের ভিতর হাঁটাহাঁটি,
হাত-পা নড়াচড়ার মতো হালকা ব্যায়াম করতে হবে। এতে শরীরে তাপ উৎপন্ন হবে, শীত
কম লাগবে। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
রেনোড ফেনোমেনন: তীব্র
ঠাণ্ডায় হাত-পা নীল হয়ে যাওয়াকে রেনোড ফেনোমেনন বলে। হাত ও পায়ের আঙুলে
রক্ত সরবরাহ কম হওয়ায় এমন হতে পারে। সাধারণত ধূমপায়ী ও বাতে আক্রান্ত
রোগীদের এটি বেশি হয়। এর ফলে ত্বকে অস্বাভাবিক অনুভূতি হওয়া, রক্তপ্রবাহ
সঠিকভাবে না হওয়া, হাতের আঙুল নীল এবং ব্যথা, কবজি ফুলে যাওয়া, ত্বকের
ক্ষত, মাংসপেশিতে ব্যথা ইত্যাদি হতে পারে। এমনকি ঠাণ্ডায় আঙুলে ইস্কিমিক
আলসারও হতে পারে। একে ফ্রস্ট বাইট বলে। যাদের এ সমস্যা হয়, তাদের উচিত মোজা
পরিধান করা, গরম সেক দেওয়া, ঘরেই হালকা মুভমেন্ট করা ও চিকিৎসকের
নির্দেশনা মতো চলা। অবশ্যই ধূমপান পরিহার করতে হবে। এসব রোগীর গরম পানি
ব্যবহার করতে হবে।
হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোক: শীতে বয়স্কদের হার্ট
অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকিটাও বেশি থাকে। কারণ শরীর থেকে গরম বের হতে পারে
না, ঠাণ্ডায় ধমনি সংকুচিত হয়ে রক্ত চলাচলে বিঘ্ন ঘটায়। এ ছাড়া রক্তের ঘনত্ব
বৃদ্ধি পায়, ফলে রক্তনালিতে রক্ত সহজেই জমাট বেঁধে দেখা দেয় স্ট্রোক ও
হার্ট অ্যাটাক। এর থেকে পরিত্রাণের জন্য গরম কাপড় পরিধান করতে হবে, গরম
পানি পান ও ব্যবহার করতে হবে। ঘরে রুম হিটার ব্যবহার করা যেতে পারে। যারা
অন্যান্য রোগে ভোগেন যেমন ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ ইত্যাদি তাদের অবশ্যই এসব
রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। বুকে ব্যথা অনুভব করলে তা আমলে এনে দ্রুত
চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।
হাইপোথার্মিয়া: যখন শরীরের তাপমাত্রা
স্বাভাবিকের তুলনায় কমে যায়, তাকে হাইপোথার্মিয়া বলে। বয়স্কদের শীতের সময় এ
ঝুঁকিটা বেশি থাকে। হাইপোথার্মিয়া হলে বিপাকীয় কার্যাবলি স্বাভাবিকভাবে
সম্পন্ন হয় না। শরীরে কাঁপুনি হয়, স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারে না,
দিকভ্রান্ত হয়, হোঁচট খেতে থাকে, গতি ধীর হয়ে যায়, কথাবার্তা জড়িয়ে যেতে
থাকে। পরবর্তী পর্যায়ে শ্বাস-প্রশ্বাস এবং হৃৎস্পন্দন আশঙ্কাজনক মাত্রায়
কমে যায়। যেকোনো সময় জ্ঞান হারিয়ে এমনকি মৃত্যুবরণও করতে পারে। এ সমস্যা
থেকে বাঁচার জন্য গরম কাপড় পরিধান করতে হবে, গরম পানি পান, অজু বা গোসলের
সময় অবশ্যই গরম পানি ব্যবহার করতে হবে।
চর্মরোগ: শীত এলেই কিছু চর্মরোগ
নতুন করে আবির্ভূত হয়, যা গরমকালে দেখা যায় না। বিশেষ করে চামড়ার শুষ্কতা,
চুলকানি, ঠোঁট ফাটা ও হাত-পা ফেটে যাওয়া, মুখে ও জিহ্বায় ঘা ছাড়াও নানা
ধরনের চর্মরোগ বা খোসপাঁচড়া বেশি দেখা দেয়। এ ছাড়া ভাইরাসের কারণে মুখে
জ্বরঠোসা, ত্বকে ফাঙ্গাসের সংক্রমণ, স্ক্যাবিস ইত্যাদি দেখা দেয়। এ সময়
বয়স্কদের বিশেষ যত্ন নিতে হবে। কেননা, এসব রোগের প্রবণতা তাদের বেশি থাকে।
তাদের বিছানা বা পরনের কাপড় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। এক বিছানায়
গাদাগাদি করে ঘুমানো উচিত নয়। ত্বকের সুরক্ষায় ময়েশ্চারাইজার যেমন
ভ্যাসলিন, গ্লিসারিন, অলিভ অয়েল বা সরিষার তেল ব্যবহার করতে পারেন। গরম
পানিতে গোসলের পর গা ভেজা ভেজা থাকতেই এগুলো ব্যবহার করা ভালো।
মানসিক
সমস্যা: প্রবল শীতে অনেকেরই অবসাদগ্রস্ত হয়ে বিষণ্নতাসহ বিভিন্ন মানসিক
সমস্যা হতে পারে, যা সাধারণত প্রবীণ বা বৃদ্ধদেরই বেশি হয়। তখন তারা সবকিছু
থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন ভাবতে শুরু করেন। মানসিক ট্রমা ও বিষণ্নতায় ভোগা
এসব মানুষের দিকে বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে। এ সময় পরিবারের অন্য সদস্যদের
তাদের সঙ্গে বেশি সময় দেওয়া উচিত। বিশেষ করে তাদের নিয়ে একসঙ্গে গল্প করা
যেতে পারে। তারা যেন একা একা না থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। মোট কথা
পরিবারের সবারই উচিত তাদের উৎফুল্ল রাখার চেষ্টা করা।
আরও কিছু সমস্যা ও
পরামর্শ: ১. ভোরে হাঁটাহাঁটি না করা ভালো। ভোরে বাইরে গেলে ঠাণ্ডা লেগে
যাওয়ার ভয় থাকে। তাই যখন হালকা রোদ উঠবে, তখন আপনার পরিবারের প্রবীণদের
হাঁটতে নিয়ে যেতে পারেন। আবার সন্ধ্যার দিকেও হাঁটতে যাওয়া ঠিক হবে না।
কেননা, সন্ধ্যায় ঠাণ্ডা বাড়তে থাকে। তবে বাইরে বের হলে বয়স্করা যেন গরম
জামাকাপড় পরে যান, তা নিশ্চিত করুন। ২. শীতে বয়স্কদের শুধু মোটা কাপড় নয়
বরং আরামদায়ক গরম কাপড় পরাতে হবে। এর সঙ্গে মাথায় টুপি বা মাফলার পরা উচিত।
৩. তাদের ত্বক, ঠোঁট, হাত-পা, নখসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে বাঁচাতে
বিভিন্ন ক্রিমসহ প্রয়োজনীয় ওষুধ ব্যবহার করা উচিত। ৪. সব সময় তাদের শোবার
ঘরটির দিকে নজর দিতে হবে। বিছানা যেন শীতল না হয়ে যায়, ঘরে পর্যাপ্ত
আলো-বাতাস এবং গরম রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। সম্ভব হলে রুম হিটার ব্যবহার
করা যেতে পারে। ৫. অজু, গোসলসহ নানা কাজে গরম পানি ব্যবহার করতে হবে, যাতে
রক্ত চলাচল স্বাভাবিক থাকে। ৬. শীতের রোদ খুব জরুরি: ভিটামিন ডি শরীরের
জন্য খুবই দরকারি, যার মূল উৎস সূর্যের আলো। এর অভাবে অস্থিসন্ধি বা
বাতব্যথা বাড়ে। তাই সম্ভব হলে বয়স্কদের প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ মিনিট রোদ
পোহাতে হবে। শীতের দুপুরে রোদে বেশ কিছুক্ষণ থাকতে পারলে শরীরের
ব্যথাবেদনাও অনেক কমবে। ৭. সুষম ও পুষ্টিকর খাবারসহ শীতের শাকসবজি, গাজর,
টমেটো, ফুলকপি, বাঁধাকপি ইত্যাদি এবং খাদ্য তালিকায় ভিটামিন, মিনারেল রাখতে
হবে। সব সময় গরম খাবার পরিবেশন করতে হবে। ৮. শীতের সময় রাতজাগা ক্ষতিকর।
তাই দ্রুত শুয়ে পড়ার অভ্যাস এবং পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করতে হবে। ৯.
মদ্যপান, ধূমপান, অতিরিক্ত চা, কফি পান করা থেকে বিরত রাখতে হবে। ১০. পানি
কম পান করলে কোষ্ঠকাঠিন্য এবং কিডনির কার্যক্ষমতা নষ্টসহ নানা জটিলতা তৈরি
হতে পারে। এ জন্য গরম পানি ও কেমিক্যালমুক্ত ফলের রস পান করা উচিত। ১১.
নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে। ঠাণ্ডার কারণে বাইরে না গিয়ে ঘরের মধ্যে
হাঁটাহাঁটি, হাত-পা নাড়াচাড়া করা ভালো, এতে শরীরে তাপ উৎপন্ন হবে।
এই নিয়মগুলো মেনে চললে শীতের সময়েও বয়স্করা অনেকটা সুস্থ থাকতে পারেন। এ ক্ষেত্রে পরিবারের দায়িত্বটাই জরুরি।
লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক
