
লাইব্রেরীতে
গিয়েলিাম আশাপূর্ণা দেবীর কোন গল্প-সংকলন পাই কিনা। সেই খোঁজে।
গ্রন্থাগার কর্তা ঈষৎ হেসে বললেন, আশা পুরণ হবে বলে মনে হয় না। আশাপূর্ণা
দেবীর বই লাইব্রেরীর অন্দর মহলে বড় একটা থাকে না, পাঠক মহলেই ঘুরে বেড়ায়,
আর একবার বেরোলে সহজে ফেরে না। আমিও হেসে বললাম, খুব ভাল কথা। গ্রন্থাগার
তো গ্রন্থের কারাগার বাইরে বেরোতে পারলে একটু হাঁপ ছেড়ে বাঁচে।
সত্যি
সত্যি একাধিক সংকলনের মধ্যে একখানাও খুঁজে পাওয়া গেল না। যে উদ্দেশ্যে আসা
তা সিদ্ধ হল না বটে, কিন্তু এই ভেবে খুশি হয়েছিলাম যে আশাপূর্ণা দেবী
সিদ্ধি লাভ করেছেন। গ্রন্থের সচলতা যতখানি, গ্রন্থকারের সফলতা ততখানি।
চিত্তচমৎকারিণী কাহিনী রচনা করে আজ মুষ্টিমেয় যে ক'জন আমাদের সাহিত্যের আসর
জমিয়ে রেখেছেন আশাপূর্ণা তাঁদের অন্ততম। একদা বাঙালী পাঠক সমাজে শরৎচন্দ্র
এবং পরবর্তী কালে তারাশংকর এবং বিভূতিভূষণ যে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন,
আজ আশাপূর্ণা দেবী সেই জনপ্রিয়তার অধিকারিণী। বলা বাহুল্য জনপ্রিয়তাই
সার্থকতার একমাত্র প্রমাণ নয়। জনপ্রিয়তার সঙ্গে উৎকর্ষ যুক্ত হলে তবেই সে
জনপ্রিয়তা স্থায়িত্ব লাভ করে। লক্ষ্য করবার বিষয় যে এই যাঁদের নাম করলাম,
এঁদের রচিত কোন কাহিনীতে কোথাও অযথা রোমাঞ্চ বা চাঞ্চল্য সৃষ্টির চেষ্টা
নেই। জীবনকে যেমন দেখছেন ঠিক তেমনটি করেই দেখাচ্ছেন। জীবনের একটা ছন্দ আছে
সেটা মোটামুটি অব্যাহত গতিতে চলে। সাময়িকভাবে কখনো বড় ঝাপ্টা আসে, বড় রকমের
ঢেউ ওঠে। ডেউ-এর মাথায় যে ফেনা দেখা দেয় সেই ফেনা দিয়েও সাহিত্য হয় কিন্তু
ফেনা যেমন দেখতে না দেখতে মিলিয়ে যায় তার সাহিত্যিক মূল্যও তেমনি দু'দিনেই
ক্ষয়ে যায়। মহৎ সাহিত্যের কারবার জীবনের ঐ ছন্দটাকে নিয়ে। আকস্মিক কোন
ঘটনায় বিপর্যস্ত হলেও ছন্দটা আবার ফিরে আসে। যুদ্ধ বিগ্রহ, দুর্ভিক্ষ
মহামারি, ভূমিকম্প বল্লা, কত কি ঘটছে কিন্তু মানুষের ক্ষুধা তৃষ্ণা, স্নেহ
প্রীতি, রাগ রঙ্গ, ঘৃণা, বিদ্বেষ সমস্তই যেমন ছিল তেমনি থেকে যায়।

ঘরে
ঘরে মানুষ যেখানে সুখে দুঃখে, হাসি কান্নায় নিত্যদিনের জীবন যাপন করছে
সেখানেই মানুষের সত্যিকার ইতিহাস রচিত হচ্ছে। আমরা যাকে কথাসাহিত্য বলি তার
উপকরণ সেই ইতিহাস থেকেই সংগ্রহ করতে হয়। ঐ ইতিহাসটিকেই আমি বলেছি জীবনের
যারা বা ছন্দ। আমাদের সাহিত্যে ঐ ছন্দটিকে সর্বপ্রথম ধরিয়ে দিয়েছিলেন
রবীন্দ্রনাথ তাঁর গল্পগুচ্ছের গল্পের মধ্যে। এ কাজটি দেশ বিদেশের কোন
সাহিত্যই খুব সহজে সম্পন্ন হয় নি। গল্প বলার আর গল্প শোনার আগ্রহ মানুষের
স্বভাবজাত। কিন্তু অচেনা অজানার প্রতি মানুষের যতখানি আগ্রহ, চেনা জানার
প্রতি ততখানি নয়। অচেনার মধ্যেই রোমাফ। সেজন্যে কথাসাহিত্যের আদিতে উপকথা।
উপকথার রাজ্যে সম্ভব অসম্ভব সীমানা বিরোধ নেই। সেখানে বাথে গরুতে এক ঘাটে
জল খায়। দৈত্য দানব, মানুষ এক রাজ্যের অধিবাসী। এটা কথা সাহিত্যের নাবালক
দশা। ইংরেজি উপন্তাসের শতবর্ষ ব্যাপী অভিজ্ঞতা চোখের সমুখে হাজির ছিল বলে
বাংলা উপন্যাস অল্পকাল মধ্যেই নাবালক অবস্থা কাটিয়ে উঠতে পেরেছিল। তা ছাড়া
জন্ম মুহূর্তেই বাংলা উপন্যাস একটি প্রথম শ্রেণীর প্রতিভার স্পর্শ পেয়েছিল।
তাই বলে বস্তিমবাবু ধরেই নির্ভেজাল উপন্যাস রচনা করেছিলেন এমন কথা বলব না।
গোড়ার দিকে যা লিখেছেন ইংরেজিতে তাকে বলে রোমান্স, খাঁটি উপন্যাস নয়।
উপন্নাসের উপকরণের সঙ্গে ইতিহাদের ব্যসন মাখিয়ে খুব রোমাঞ্চকর সব কাহিনীর
সৃষ্টি করেছিলেন। রাজা উজীর বাদশা বেগমের কাহিনী উপকথারই সামিল। কারণ এদের
জীবনের সঙ্গে আমাদের সাক্ষাৎ যোগ নেই। স্বর্গের ইন্দ্রপুরী সম্পর্কে যতটুকু
জানি, মোগল অন্তঃপুর সম্পর্কে বোধকরি তার চাইতেও কম জানি। বঙ্কিমচন্দ্র
যেদিন ভ্রমর- গোবিন্দলাল রোহিণীর কাহিনী নগেন্দ্র কুন্দনন্দিনীর কাহিনী
রচনা করলেন, সেদিন কথা সাহিত্যের রাজ্যে আমাদের আসন পাকা হল। বঙ্কিমের হাতে
আমাদের উপল্লাসের পরিণতি খুবই দ্রুতগতিতে হয়েছে। দীর্ঘজীবন পেলে বাংলা
গল্প উপন্তাষকে তিনি সাধারণ গৃহস্থ ঘরে এনে প্রতিষ্ঠিত করে যেতে পারতেন।
বঙ্কিমের
অসম্পূর্ণ কাজটি সুসম্পন্ন করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ তাঁর গল্পগুচ্ছের গল্পে।
সে কথা আগেই বলেছি। সন্ধ্যা সংগীতের কবিতা পড়ে বঙ্কিম মুগ্ধ হয়েছিলেন। রমেশ
দত্তর দেওয়া মালা নিজের গলা থেকে রবীন্দ্রনাথের গলায় পরিয়ে দিয়েছিলেন।
বঙ্কিমচন্দ্রের সুযোগ্য উত্তরাধিকারী হিসাবে এ সম্মানের যাথার্থ্য পরে
গল্পগুচ্ছের গল্পেই নিশ্চিতরূপে প্রমাণিত হয়েছে। গল্পগুচ্ছের গল্প পড়ে
বঙ্কিমবাবু এই ভেবে বিস্মিত হতেন যে আমাদেরই পাড়া প্রতিবেশী, আমাদের ঘরের
সুমুখ পথে নিত্য যারা যাওয়া-আসা করে তাদের জীবন নিয়েও অপূর্ব রসের সৃষ্টি
হতে পারে। ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাসেও এ জিনিসটি লক্ষ্য করা গিয়েছে। ঘট-এর
উপল্লাসে রাজা রাজড়া, যুদ্ধ বিগ্রহ, অস্ত্রের ঝনঝনা। তাঁরই সমসাময়িক লেখিকা
জেন অস্টিন নিম্ন মধ্যবিত্ত সমাজের দৈনন্দিন জীবনকে অবলম্বন করে অনবদ্য
কাহিনী রচনা করেছেন। স্কট তাই দেখে যেমন চমৎকৃত তেমনি আবার অপ্রতিভ বোধ
করেছেন। বলেছেন আমার 'নড়ি ড়িহ ংঃৎধরহ'অর্থাৎ আমার চেঁচামেচি করে বলা
জবরজন্ড সব গল্পের তুলনায় এ'র সাদামাটা কাহিনীতে আমাদের জানা চেনা জীবনের
যে ছবি ফুটে উঠেছে তাতে অনেক উঁচু দরের শিল্প নৈপুণ্য প্রকাশ পেয়েছে।
বলেছেন এ জিনিস আমার সাধ্যাতীত। বাস্তবিক পক্ষে ইংরেজি সাহিত্যের
সর্বোৎকৃষ্ট দশখানা উপল্লাসের নাম করতে গেলেও জেন অস্টিন-এর চৎরফব ধহফ
চৎবলঁফরপব-এর নাম অবশ্যই অন্তর্ভুক্ত হবে।
সমাজ এবং সাহিত্যের এক মতি,
এক গতি। সমাজ যে পথে যায়, সাহিত্য সে পথে। সমাজের ্যায় সাহিত্যেও কৌলীন্ন
প্রথার প্রচলন ছিল। শুধু আমাদের সাহিত্যে নয়, পৃথিবীর সকল সাহিত্যে
রাজারাজড়ার প্রাধান্য। অ্যারিস্টটল তাঁর সাহিত্য-সংহিতায় বলেই দিয়েছিলেন যে
ট্রাজেডি শুধু মহামা এবং মহাপরাক্রমশালীদের জীবনেই ঘটে। সাধারণ মানুষের
জীবনে ট্রাজেডি নেই। কেননা তারা এতই নগণ্য যে তাদের দুঃখ, দুঃখ বলেই গণ্য
নয়। সাধারণ মানুষের জীবন, তাদের সুখ দুঃখের কথা নিয়েও যে উঁচু দরের সাহিত্য
রচিত হতে পারে উনিশ শতকের আগে কবি সাহিত্যিকরা সে কথা খুব একটা ভেবে দেখেন
নি। এটা বলতে গেলে ফরাসী বিপ্লবের স্থান। ইংরেজি সাহিত্যে ওয়ার্ডসওয়ার্থই
সর্বপ্রথম দরিদ্র অবহেলিত গ্রাম্য মানুষদের নিয়ে কাব্য রচনা করেছিলেন।
রবীন্দ্রনাথকে অভিজাত আখ্যা দিয়ে জাতে ঠেলা হয়েছে।
অথচ আমাদের দেশে
সাহিত্যের ঐ আভিজাত্যকে রবীন্দ্রনাথই সর্বপ্রথম আঘাত করেছিলেন। ছিদাম রুই
এবং তাঁর বউ চন্দরাকে সাহিত্যে স্থান দেবার কথা সেদিন কেউ ভাবতেও পারতেন
না।
সেকালের হিতবাদী পত্রিকার তরফ থেকে অনুরোধ এসেছিল প্রতি সপ্তাহে
একটি করে ছোট গল্প লিখে দেবার জ্যে। রবীন্দ্রনাথ সাগ্রহে সম্মত হয়েছিলেন।
পর পয় ছ'টি গল্প লিখেছিলেনও। পত্রিকা কর্তৃপক্ষ এসে সবিনয়ে জানালেন খুবই
উচু দরের জিনিস কিন্তু এ জিনিস বাজারে চলছে না, পাঠকরা রস পাচ্ছে না।
রবীন্দ্রনাথ বুঝতে পেরেছিলেন। বলেছেন, ওরা ঠিক কথাই বলেছিলেন। সেদিনকার
পাঠক মন বঙ্কিমের রোমাঞ্চকর রোমান্স কাহনীতে এতই আচ্ছন্ন ছিল যে পাড়াগাঁয়ের
আপাতদৃষ্ট নিস্তরঙ্গ জীবনে কোন প্রকার রোমাঞ্চ থাকতে পারে তা তারা ভাবতে
পারত না। উত্তেজনাবিহীন নিরুত্তাপ কাহিনীতে রস পেতে বিলম্ব হয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ নিরাশ হন নি, বিরক্তও হন নি। ঐ ছ'টি গল্প লিখে নিজেই এর রস বা
রোমান্সটিতে তিনি মজে গিয়েছিলেন। লিখে গিয়েছেন একের পর এক গল্প, সৃষ্টি
হয়েছে গল্পগুচ্ছের অতুলনীয় রসের ভাণ্ডার। আজকে এ কথা বললে খুব ভুল হবে না
যে রবীন্দ্রনাথ সব চাইতে বড় সাফল্য অর্জন করেছেন এই ছোটগল্পের ক্ষেত্রে।
দেখা যাচ্ছে আজকের বাংলা কাব্য রবীন্দ্রনাথকে ছেড়ে অন্ন দিকে মোড় নিয়েছে;
বাংলা নাটক রবীন্দ্রনাথের পথ কোন কালেই অনুসরণ করেনি। এমন যে
রবীন্দ্রসংগীত, তাকে পাশ কাটিয়ে 'আধুনিক' নামে এক জাতীয় সংগীতের আবির্ভাব
ঘটেছে। একমাত্র বাংলা ছোটগল্প আজও রবীন্দ্র প্রদর্শিত পথেই অগ্রসর হচ্ছে
এবং এই একটি ক্ষেত্রে বাংলা সাহিত্য যতখানি সফলতা লাভ করেছে এমন আর কিছুতে
নয়। সত্যি বলতে কি, বাংলা ছোট গল্প আজ গুণে গরিমায় পৃথিবীর যে কোন দেশের
শ্রেষ্ঠ ছোট গল্পের সমকক্ষ।
মানুষের কথা নিয়েই সফল সাহিত্য। গল্প
উপরাসকে আবার বলা হয়েছে কথা সাহিত্য। কথা শব্দটির অর্থ গল্প, উপাখ্যান।
তাহলে কথা সাহিত্য বলতে বুঝতে হবে মানুষের কথা বা মানুষের উপাখ্যান।
প্রকৃতপক্ষে প্রত্যেকটি মানুষই একটি গল্প। যথেষ্ট কৌতূহল নিয়ে দেখি না বা
ভাবি না বলেই আমাদের চতুর্দিকে ছড়ানো এই সব সজীব কাহিনী আমাদের দৃষ্টি
এড়িয়ে যায়। যাঁরা দেখেন তাঁরাই লেখেন। ছাপার অক্ষরে পড়ে পাঠক অবাক হয়ে
যাবে-বাঃ রে, এদের তো আমি জানি, চিনি। এদের জীবনে যে এমনটা ঘটেছে কিংবা
ঘটতে পারে, সে তো কখনো ভাবতেই পারি নি। সব সাহিত্যেরই মূল কথা ঐ। কবি
সাহিত্যিকরা যা বলেন তা আকাশ থেকে পেড়ে আনেন না-যা দেখেছেন শুনেছেন এবং তা
নিয়ে যা ভেবেছেন তাই লিখেছেন। আমরা সে জিনিস পড়ে অবাক হয়ে বলি-তাইতো এ তো
খুবই খাঁটি কথা, কিন্তু আগে কখনো মনেই হয় নি, ইনি বললেন বলে খেয়াল হল।
এঁদের দৃষ্টি এত তীক্ষ্ণ যে কিছুই তাঁদের দৃষ্টি এড়ায় না, আর মনটি এত সজাগ
যে যা দৃষ্টিগোচর নয় তাও তাঁদের অনুভূতিগোচর। কবি সাহিত্যিকদের ঐ গুণ তাঁরা
দৃষ্টিহীনকে দৃষ্টি দ্বান করেন। হভূতিহীনকে উদ্বুদ্ধ করেন।
আমাদের
ভাষায় ভূদর্শন বলে একটা কথা আছে। এই যে গল্প উপভাষ বা কথা সাহিত্যের কথা
বলছি এ সবই ভূয়োদর্শন অর্থাৎ প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ফল। বহুদর্শী চোখ আর
অন্তর্র্দশী মন থাকলে তবেই এ জিনিস সম্ভব-ন সেধয়া ন বহনা শ্রুতেন। এর জন্যে
এক ধরনের মনের গড়ন আবক্ষক। যত্নকৃত সাধ্যসাধনায় অনেক কিছু করা যায় কিন্তু
যে জিনিস শিল্পের প্রসাদগুণে প্রসন্ন সে জিনিস আয়াস-সাধ্য নয়, অনায়াস লভ্য।
সে জিনিস আপনি এসে ধরা দেয়। রবীন্দ্রনাথ, তাঁর সংগীত সম্বন্ধে বলেছিলেন
গান আমি শিখিনি, গান গেয়েছিলাম। এই পাওয়া জিনিসটা একটা মস্ত বড় কথা। বিশেষ
করে কোন শিল্প যেখানে প্রতিভার স্তরে পৌঁছোয় সেখানে সেটা এই পাওয়ার ফল।
সোজা কথায় পাওয়া আর প্রতিভা সমার্থক। প্রতিভার রহস্য বোঝা বড় কঠিন। শিখে
পড়ে চেষ্টা চরিত্র করে তাকে লাভ করা যায় না। দিলে তবেই তাকে পাওয়া যায়।
বলেছেন তোরা পারবি নে ফুল পারে সে ফুল ফোটাতে। আপনি এসে ধরা রবীন্দ্রনাথ ঐ
কথাটিই আবার অম্লভাবে ফোটাতে। যে পারে যে আপনি পারে এই যে খাঁটি নির্জলা
প্রতিভার কথা বলছিলাম আশাপূর্ণা দেবী সেই প্রতিভার অধিকারিণী। এর জরে
একেবারে কিছুই তাঁকে করতে হয় নি, এমন নয়। করেছেন কৌতূহলী চোখ মেলে দেখেছেন,
কান পেতে শুনেছেন, অত্যন্ত সজাগ সঙ্গীর সপ্রতিভ মন নিয়ে যা কিছু দেখেছেন
শুনেছেন তাই নিয়ে ভাবছেন। মনের এ্যালকেমি গুণে চোখে দেখা, কানে শোনা
সামান্তটুকু অসামান্ন রূপ পরিগ্রহ করেছে। সেখানেই প্রতিভার প্রকাশ। আমরা
যাকে পঞ্চেন্দ্রিয় বলি তার প্রত্যেকটিই অশেষ জ্ঞানের উৎস। যারা জাত লিখিয়ে,
গাত শিল্পী তাঁদের শিক্ষা একদিকে ইন্দ্রিয়গত, অপরদিকে হৃদয়গত। তাঁরা
আমাদের রায় বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষিত নন, তাঁদের শিক্ষা এর চাইতে ঢের বড়
বিশ্ববিঘ্নালয়ে, জীবনের বিশ্ববিদ্যালয়ে। জীবন তার বহু রহস্য তাঁদের কাছে
উদঘাটিত করেছে।
একথা আশাপূর্ণা দেবীর বেলায় যতখানি সত্য এমন সকলের বেলায়
নয়। কেননা কলেজ বিশ্ববিদ্মালয় তো দূরের কথা আশাপূর্ণা একটি দিনের জয়েও কোন
ইস্কুলে পড়েন নি। সেকেলে পরিবারের জন্ম। দাদির নিশ্চিত ধারণা লেখাপড়া
শিখলে মেয়েদের বৈধব্য অনিবার্য। আশাপূর্ণা একটু বড় হয়ে বালিকা বয়সেই এর
কৌতুকটা বুঝতে পেরেছিলেন। ভাবতেন ঠাকুমা নিজে তো নিরক্ষর, কিন্তু বৈধব্য তো
ঠেকাতে পারেন নি। মা লেখাপড়া জানতেন, পড়াশুনা ভালোবাসতেন। কিন্তু শাশুড়ীর
ভয়ে তটস্থ থাকতেন, লুকিয়ে চুরিয়ে পড়তেন। মেয়ের পড়াও ঐ লুকোচুরি খেলাই বলা
চলে। আশাপূর্ণা নিজেই বলেছেন, কবে যে পড়তে শিখেছি মনেই পড়ে না। মা বই হাতে
দিয়ে বসিয়ে রাখতেন, ছবি দেখতাম, পড়বারও চেষ্টা করতাম। এইটুকু মনে আছে, বছর
পাঁচেক বয়সে মায়ের আঁতুড় ঘরের দোরে বসে মাকে আমি গড়ে শুনিয়েছি। বলেছেন,
দাদি মাকে কোন কালেই সুনজরে দেখেন নি, হেনস্তা করেছেন। মনে হয় মায়ের এই
শাশুড়ীটিই পরে সুবর্ণলতার শাশুড়ী হয়ে দেখা দিয়েছেন।
একটু বড় হয়েও পড়ার
সামগ্রী বাড়িতে খুব একটা পেতেন না। পাশের বাড়িতে আসত ছোটদের পত্রিকা
'শিশুসাথী'। সেটাই ছিল একটা মস্ত বড় আকর্ষণ। ও বাড়িতে গিয়ে পড়ে আসতেন। বয়স
তখন তেরো কি চৌদ্দ তখন এক মজা হল, কাউকে না বলে লুকিয়ে একটা কবিতা লিখে
পাঠিয়ে দিয়েছিলেন 'শিশুসাথী'র দপ্তরে। কিছুদিন পরে একদিন দাদা এসে বলল,
শিশুসাথীতে ঠিক তোর নামের কে একজন একটা কবিতা লিখেছে। দাদা ভাবতেই পারে না
যে ব্যাপারটা বোনটিরই কাণ্ড। খবরটা শুনে বোনের তো উত্তেজনায় নিঃশ্বাস রোধ
হবার উপক্রম। এর ফাঁকে ছুটে গিয়ে পাশের বাড়িতে দেখে এলেন। শুধু চোখ বুলিয়ে
মন ওঠে না। ছাপার অক্ষরে প্রথম লেখার আমেজ প্রথম প্রেমের মতোই। পত্রিকাটি
ঘরে এনে বালিশের তলায় লুকিয়ে রাখলেন অন্যদের চোখের আড়ালে। বারম্বার বের
করেন আর পড়েন। মনে মনে এত খুশি হয়েছেন অথচ কবিতাটি যে তাঁরই লেখা সে কথা
সাহস করে বাড়িতেও কাউকে বলতে পারেন নি। এতই ভীরু এবং লাজুক প্রকৃতির মানুষ
ছিলেন যে নিজেই বলেছেন-সেই প্রথম লেখাটি যদি অমনোনীত হয়ে ফিরে আসত তাহলে
সারা জীবনে আর লেখার কাজ তাঁর দ্বারা হয়ে উঠত না।
সেই চৌদ্দ বছর বয়সে যে
কাজের শুরু হয়েছিল আজ পর্যন্ত তার বিরাম নেই। এর পরের লেখাটি
'শিশুসাথী'তেই পাঠিয়েছিলেন। এটি একটি গল্প। পত্রিকার কর্মাধ্যক্ষ এলেন,
জানতে চাইলেন গল্পটি সত্যি তাঁরই লেখা কিনা। সন্দেহ ভঞ্জনের পরে ছাপা হল।
তখন তাঁয় বয়স পনেরো। ছোটদের গল্প দিয়েই কথা সাহিত্যের জগতে প্রবেশ।
বলেছেন-ছোটদের কথা ভাবতে বলতে ভাল লাগত। বড়দের জয়ে লিখতে ভয় পেতেন। ভাবতেন,
বড়দের গল্প তো হবে প্রেমের গল্প। প্রেমের গল্প লিখতে গেলে পাছে বড়রা। কিছু
মনে করেন, গাল-মন্দ করেন। আঠাশ বছর বয়সে লিখলেন বড়দের জল্প গল্প।
আনন্দবাজার শারদীয়া সংখ্যায় বেরিয়েছিল 'প্রেম ও প্রেয়সী' নামে সেই প্রথম
গল্প। সাহিত্যিক-সাংবাদিক মন্মথ সারাল এসে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। গৃহবধূ
হিসাবে অপরিচিত পুরুষের সঙ্গে সেই প্রথম সাক্ষাৎ। দেওরের উপস্থিতিতে/মন্মথ
স্যানালের সঙ্গে কথাবার্তা বলেছিলেন। স্বামী এবং, সমবয়স্ক ঐ দেওরটি লেখার
ব্যাপারে তাঁকে সব সময়ে উৎসাহ দিয়েছেন। ঐটি না হলে কোন গৃহবধূর পক্ষে
এতখানি করা কখনই সম্ভব হত না। আশাপূর্ণা দেবী নিজেও আদর্শ পত্নী এবং আদর্শ
গৃহিণী। সংসার-ধর্মে এবং সাহিত্য-কর্মে কোন বিরোধ ঘটেনি। সাহিত্যের প্রতি
যতখানি তাঁর আনুগত্য, সংসারের প্রতি ততখানি। একটি আরেকটিকে ছাড়িয়ে যায়নি,
বরং একটি অন্নটির সহায়তা করেছে। এই সহজ সত্যটি তিনি উপলব্ধি করেছেন যে
সাহিত্য কখনো জীবনকে লঙ্ঘন করে যায় না, জীবনের সঙ্গে সঙ্গতি রক্ষা করে চলে।
নিজের সংসার, প্রতিবেশীর সংসার, নিত্য দিনের জীবন, চোখের সমুখে চলমান
জীবনের যে ছবি সাহিত্যে তারই প্রতিচ্ছবি। নদীর এক নাম চিত্রবহা, সে তার দুই
তীরের চিত্র বহন করে চলে। নদীর ন্যায় সাহিত্যকেও বলা চলে চিত্রবহা। আমাদের
নিত্যদিনের যে জীবন তারই ছবিটি সে সযত্বে ধরে রাখছে।
আশাপূর্ণাদেবী
কখনো তাঁর নিজস্ব অভিজ্ঞতার বাইরে যান নি। এত যে গল্প উপন্যাস লিখেছেন, কত
সব মানুষের কথা বলেছেন তারা সবাই চেনা মাহব-শুধু তাঁর নয়, আমার আপনারও
চেনা। যে সব ঘটনার কথা বলেছেন তার কিছুই আজগুবি নয়, এর ওর ঘরে হামেশাই
ঘটছে। আশাপূর্ণাদেবীর সাহিত্য কর্মে একটি সহজের সাধনা আছে। এজন্মে তাঁর
সমস্ত গল্পে কাহিনীতে একটি নিঃসংশয় সততার ছাপ পড়েছে। তাঁর সৃষ্ট চরিত্র এবং
বিবৃত ঘটনাকে অকৃত্রিম সত্য বলে গ্রহণ করতে একটুও বাধে না। সাধারণ
মধ্যবিত্ত বাঙালী জীবনের এমন অন্তরঙ্গ ছবি আর কে আমাদের দিয়েছেন! জীবনের
অকৃপণ দান এবং নিষ্ঠুর কৌতুক, কিছুই তাঁর দৃষ্টি এড়ায় নি। যে মনটি এখানে
কাজ করেছে সে একটি অতি সুক্ষ দৃষ্টি সম্পন্ন অনুভূতিশীল কবি-মন। সে কারণেই
বাঙালী জীবনের দিবারাত্রির কাব্য রচনা করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়েছে। আরেকটি
কথাও উল্লেখযোগ্য। এমন সুদীর্যকাল ধরে এমন বিপুল পরিমাণে লিখেও তিনি আজ
পর্যন্ত যে লেখায় একটি গুণমান বা স্ট্যান্ডার্ড কোয়ালিটি রক্ষা করে চলেছেন
তাও বিস্ময়কর বলতে হবে।
অনেকের মুখে শুনি, কারো কারো লেখায়ও দেখেছি
আশাপূর্ণাদেবী আমাদের পুরুষ-শাসিত নিপীড়িত নারীজাতির মুখপাত্রী। নারীসমাজের
দুর্গতি দূরীকরণের জয়ে তিনি লেখনী ধারণ করেছেন। এভাবে দেখলে
আশাপূর্ণাদেবীর ন্যায় একজন সাহিত্যশিল্পীর প্রতি বেশ খানিকটা অবিচার করা
হয়। সাহিত্যিক হিসাবে এই সহজ সত্যটি তাঁর জানা আছে যে স্ত্রী-পুরুষ একই
বৃন্তে দুটি ফুল। একটিকে বাদ দিয়ে অপরটির কথা বলা যায় না। গোটা সমাজটার
ছবিই এ'কেছেন। অবহেলিত দলিত নারীর কথা যেমন বলেছেন, তেমনি দুঃশাসন পুরুষের
কথাও বলেছেন। তাছাড়া মনে রাখতে হবে যে শিল্পী-মানুষ কখনো প্রচারক নন, তিনি
জীবন-রসিক। জীবনের চলচ্চিত্র যেমন দেখেন ঠিক তেমনটি আঁকেন, তাতে কিছুই বাদ
পড়ে না। আশাপূর্ণা- দেবী খুব ভালো করেই জানেন যে নারী নির্যাতনে পুরুষের
হাত যতখানি নারীর হাত ততখানি। সুবর্ণলতার জীবন জ্বলে পুড়ে থাক হয়ে গেল, সে
কি শু তার পিতা আর স্বামীর দোষে? তার দাদি এবং তার শাশুড়ির দোষ কি কিছু কম?
শিল্পীর দৃষ্টি কখনো একপেশে নয়, তার মধ্যে ব্যালেন্স থাকে। তার স্পষ্ট
প্রমাণ আশাপূর্ণাদেবীর নিঙ্গ মুখের উক্তি। বলেছেন-অধিকারহীন অবলাদের দুঃখের
কথা বলেছি বৈকি কিন্তু আজকের স্বাধিকারমত্তা সবলাদের দেখেও খুব একটা আনন্দ
পাচ্ছি না! অথচ আশাপূর্ণাদেবীকে কেউ পুরাতন পন্থী বলবে না, মনটি অতিশয়
আধুনিক। আধুনিক-আধুনিকারা একটু স্বস্থির মতি হউক, এটুকু শুধু চেয়েছেন।
তাদের প্রতি তাঁর পূর্ণ সহানুভূতি।
প্রথম প্রতিশ্রুতি, বাবর্ণলতা,
বকুলকথা তিনে মিলে আশাপূর্ণাদেবীর অবৃহৎ উপন্যাস থাকে তাঁর গধমহঁস ড়ঢ়ঁং বলা
যেতে পারে, বাংলা সাহিত্যে তার জুড়ি নেই বললেই চলে। এমন বিরাট ক্যানভাসে
বাঙালী মধ্যবিত্ত সমাজের চিত্র ইতিপূর্বে কেউ এ'কেছেন বলে মনে করি না।
বাংলাদেশের তিনটি জেনারেশানের ইতিহাস এখানে বিবুত। তিন জেনারেশনের তিনটি
রমণী-মা, মেয়ে ও নাতনিকে ঘিরে এই কাহিনী। তিনজনেরই জীবন ব্যর্থ। আগেই
বলেছি, এ অঘটন একমাত্র পুরুষের দ্বারাই সংঘটিত নয়, স্ত্রী পুরুষ দু-এরই হাত
আছে। ছএ মিলে যে সমাজে, সেই সমাজেরই এই কীর্তি। কত কত মানুষের জীবন নিয়ে
সমাজ ছিনিমিনি খেলছে। এই যে মানুষের দুর্বিষহ দুঃখ, সে কাহিনী এর আগে এমন
করে আর কেউ বলেন নি।
আশাপূর্ণাদেবীই সর্বপ্রথম বাংলা সাহিত্যে একটি
নিখুঁত ট্রাজিক চরিত্রের সৃষ্টি করেছেন-না চেনায়, না জানার, না বোঝার
ট্রাজেডি। সুবর্ণলতাকে সংসারে কেউ বোঝেনি মাতা পিতা স্বামী পুত্রকন্না
সকলের দ্বারা প্রত্যাখ্যাতা। মাতা সত্যবতী নিজে সুশিক্ষিতা, সাধ ছিল করা
সুবর্ণলতাকে শিক্ষায় দীক্ষায় মনের মতো করে গড়ে তুলবেন। কুমোর পরামর্শে,
বাপের সম্মতিতে সে কল্লার ন' বছরে গৌরীদান হয়ে গেল, মাকে না জানিয়ে।
সত্যবতী তেজস্বিনী মহিলা: নিদারুণ অভিমানে আপন সংসার থেকে নিজেকে সরিয়ে
নিলেন। স্বামী কন্যা কারো সঙ্গেই আর সম্পর্ক রাখেননি। সুবর্ণলতা বালিকা
বয়সেই মায়ের স্নেহ থেকে বঞ্চিতা; ব্যক্তিত্বহীন পিতা থেকেও নেই, স্বামীটি
অত্যন্ত স্কুল প্রকৃতির সন্ধিত্ব-চিত্ত একটি পুরুষ, সুবর্ণলতার স্বামী হবার
সম্পূর্ণ অযোগ্য। স্বর্র্বণলতা উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়নি কিন্তু মায়ের
মাদিত রুচি এবং চিত্ত বৃত্তির কিছু সে নিঃসংশয়ে পেয়েছিল। ফলে স্বামীগৃহে
অর্ধশিক্ষিত গেঁয়ো ধরনের পরিবারটির সঙ্গে নিজেকে সে একেবারেই খাপ খাওয়াতে।
পারেনি। জীবনভর সকলের প্রধানত স্বামী-শাশুড়ির গল্পনা সইতে হয়েছে। বহু
সন্তানবতী, কিন্তু ছোট দুই কন্তাকে বাদ দিলে ছেলেমেয়ে সব ক'টিই কোকিলের
বাসায় কাকের ছান।। কাকের বাসায় পালিত হলেও কোকিলের ছানা বড় হয়ে কোকিলকণ্ঠীই
হয় কিন্তু এ ক্ষেত্রে হয়েছে উল্টো। সন্তান ক'টি বায়স- কণ্ঠী, মায়ের কিছুই
পায়নি। বংশগত স্কুল স্বভাবটি পেয়েছে পুরো মাত্রায়। সুবর্ণ- লতার সারা জীবন
কেটেছে যেন বিদেশ বিভুঁইতে বিজাতীয় সব মানুষের মধ্যে যেখানে কেউ তাকে জানে
না, চেনে না, বোঝে না। মনের কথা বলার মানুষটি পায়নি। এক সময় সে অভাব সে
নিজেই মিটিয়েছিল। অবসর মুহূর্তে বসে বসে নীরবে নিভৃতে তার মনের ভাবনাকে যে
মেলে ধরেছিল একটি খাতার পাতায়। সকলে মিলে কণ্ঠটি যার রোধ করে রেখেছিল সে
মানুষের কাছে এই আত্মপ্রকাশের আনন্দটুকু ছিল জীবনের এক পরম ধন। আত্মীয়দের
মধ্যে একজনের ছিল এক প্রেস। তাকে ধরেছিল বইটি ছাপিয়ে দিতে। মানুষটি ভালো,
রাজি হল। বই ছাপা হয়ে বেরোবে, নিজের লেখা ছাপার অক্ষরে দেখবে, অপরে দেখবে,
সকলে পড়বে-স্বর্র্বণলতা ভেবে রোমাঞ্চিত। কী অধীর আগ্রহে যে বসেছিল, কবে
স্বচক্ষে দেখবে তার নিজের রচিত বই। শেষ পর্যন্ত বই বেরোল। মান্ধাতার আমলের
ছাপাখানা, ভাঙা টাইপ, পাঁজি পুঁথির কাগজে ছাপা। তার এমন সাধের
মানস-সন্তানটির মূর্তি দেখে সুবর্ণর হৃদয় বিদীর্ণ। তার উপরে আবার
বাড়ি-তোলপাড়। অ্যা, ঘরের বউ বই লিখে বই ছাপাচ্ছে। বড়রা গাল দিচ্ছে, নিজের
ছেলেরা হাসি তামাসা করছে আমাদের মা লেখিকা হয়েছেন! বস্তা ভর্তি সমস্ত বই
ছাদে নিয়ে গিয়ে সুবর্ণলতা নিজ হাতে তাতে আগুন ধরিয়ে দিল। কনিষ্ঠা কন্যা
বকুল সেই আগুনের ঝলকে বিদ্যুৎ চমকে মূহূর্তের জন্যে দেখতে পেয়েছিল মায়ের
যথে অসীম ক্লান্তি আর অপরিসীম অন্তর্বেদনার ছাপ- এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে
জলন্ত বইগুলোর দিকে, বুঝি ভাবছে 'ব্যর্থ প্রাণের আবর্জনা পুড়িয়ে ফেলে আগুন
জ্বালো।' বকুলকে নিয়ে গ্রন্থের তৃতীয় খণ্ড।
নানীর মতো বকুলের জীবনও
ব্যর্থই বলতে হবে। কিশোরী বকুল মনে- প্রাণে ভালোবেসেছিল একটি ছেলেকে।
ছেলেটিও তাকে ভালোবাসত। কিন্তু বহু ক্ষেত্রে যেমনটা হয়-ছেলেটি লক্ষ্মী
ছেলের মতো অভিভাবকের আজ্ঞা মতো অপর একটি করার পাণিগ্রহণ করেছে। বকুলের
বিবাহের সাধ এখানেই মিটে গিয়েছে। বিয়ের চিন্তা আর মনে স্থান দেয়নি। মায়ের
মতোই নিঃসঙ্গ তার জীবন, মনোজগতে বিচরণ। পিতৃগৃহেই বাস কিন্তু সুবর্ণলতার
মতো সেও নিজ বাসভূমে পরবাসী কিন্তু এরই মধ্যে সে হয়েছে লেখিকা। গল্প
উপন্যাস লিখে অশেষ নাম করেছে। গুণগ্রাহীর অন্ত নেই, সারাক্ষণ লোকজনের
আনাগোনা, সভা-সমিতিতে আহ্বান। তবু মন ভরে না। ভাবে, সেই ব্যক্তিত্বহীন
অপদার্থ ছেলেটা আজও যদি এসে বলে, এসো দুজনে নতুন করে সংসার পাতি, তাহলে এত
যে নাম খ্যাতি-সব ছেড়ে ছুড়ে এ মুহূর্তে চলে যায়। কিন্তু সেও আর সম্ভব নয়,
সে ছেলেটা অকালে ইহলোক ছেড়ে চলে গিয়েছে।
সর্বপ্রকারে বঞ্চিতা সুবর্ণলতার
আশা-আকাঙ্ক্ষা কিছু তবু পূরণ হয়েছিল কনিষ্ঠা দুই কন্যার মধ্যে। একজন কবিতা
লিখেছে, বই ছাপেনি কিন্তু কবিসুলভ জীবনযাপন করেছে, অপরজন খ্যাতনামা গল্প
উপন্যাস রচয়িতা কিন্তু সুবর্ণলতা এর কিছুই দেখে যায়নি, জেনে যায় নি। সে তার
আগেই চলে গিয়েছে। যখন যেখানে কিছু আশা করেছে সেখানেই নিরাশ হয়েছে। শৈশবে
মায়ের কাছে পেয়েছিল শোভন রুচিবোধ, কিন্তু সারা জীবন কাটাতে হল স্থুলতার
সংস্পর্শে, পঙ্কের মধ্যে।
আজকে ট্রাজেডির ধারণা বদলিয়েছে। আধুনিক
ট্রাজেডিতে সেই প্রচণ্ডতা নেই। কিন্তু তাই বলে তার মর্মান্তিকতা কিছুমাত্র
হ্রাস পায়নি। নীরবে লোকচক্ষুর অগোচরে মানুষ কী দুঃসহ দুঃখ ভোগ করে, ভাগ্য
বিড়ম্বিত জীবন কিভাবে তিলে তিলে পুড়ে ছাই হয়ে যায়, আধুনিক ট্রাজেডি তার
প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ করেছে। নিঃশব্দে ঘটে বলে এর নির্মমতা কিছুমাত্র কম
নয়। সকল দেশের সকল সাহিত্যেই ট্রাজেডি আজ নতুন রূপে দেখা দিয়েছে। আমাদের
সাহিত্যে এর সার্থকতম রূপায়ণ ঘটেছে আশাপূর্ণাদেবীর হাতে। সুবর্ণলতা নিখুঁত
ট্রাজিক চরিত্র। ঐ গ্রন্থটি এবং সুবর্ণলতার চরিত্র সৃষ্টি আশাপূর্ণাদেবীর
এক অক্ষয় কীর্তি।