শবে মেরাজে মসজিদুল আকসায় পূর্ববর্তী নবীদের নিয়ে ইমামতি করেছিলেন মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)। পূর্ববর্তী নবীদের নিয়ে মহানবীর (সা.) ইমামতি শুধু কোনো অলৌকিক ঘটনা নয়, বরং তা ছিল ইসলামের বার্তা, নেতৃত্ব ও সর্বজনীনতার এক শক্তিশালী ঘোষণা। এ ঘটনাকে নবুয়তের ধারাবাহিকতা ও ইসলামের পূর্ণতার প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন অনেক আলেম।
শবে মেরাজ : কীভাবে শুরু হয়েছিল সেই মহাযাত্রা
হাদিস ও ইসলামী বর্ণনা অনুযায়ী, এক রাতে মক্কায় চাচাতো বোন উম্মে হানির ঘরে ঘুমিয়ে ছিলেন মহানবী (সা.)। এ সময় তার কাছে আসেন ফেরেশতা জিবরাইল (আ.)। তিনি তাকে জাগিয়ে মসজিদে হারামে নিয়ে যান। সেখানে তিনি দেখতে পান আশ্চর্যজনক বাহন বুরাক।
মহানবী (সা.) বুরাক সম্পর্কে বলেছেন, বুরাক এমন দ্রুত চলছিল যে এক পা রাখার আগেই দৃষ্টিসীমার শেষ প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছিল।অল্প সময়েই তারা পৌঁছে যান ফিলিস্তিনের জেরুজালেমে, মসজিদুল আকসায়।
মসজিদুল আকসায় ঐতিহাসিক নামাজের ইমামতি
সেখানে হজরত ইব্রাহিম, মুসা, ঈসা (আলাইহিমুস সালাম)সহ বহু নবীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় মহানবীর। মহানবী তাদের সবাইকে নিয়ে জামাতে নামাজ আদায় করেন। এ নামাজে তিনি নিজেই ইমামতি করেন।
নামাজ শেষে তাকে তিনটি পানপাত্র দেওয়া হয়, একটিতে দুধ, একটিতে পানি ও আরেকটিতে মদ। তিনি দুধ পান করেন। তখন জিবরাইল (আ.) বলেন, আপনি ও আপনার উম্মত সঠিক পথ বেছে নিয়েছেন।
সপ্তম আসমানে আরোহণ
এরপর শুরু হয় মেরাজ বা আসমানে আরোহণের অধ্যায়। মহানবী (সা.) ও জিবরাইল (আ.) একে একে সাত আসমান অতিক্রম করেন। প্রত্যেকে আসমানে প্রবেশের সময় জিবরাইল (আ.) প্রহরী ফেরেশতাকে জানান যে, মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর পক্ষ থেকে নবুয়তের দায়িত্বপ্রাপ্ত। এই যাত্রায় তিনি হজরত আদম, ঈসা, ইয়াহইয়া, ইউসুফ, মুসা ও ইব্রাহিম (আলাইহিমুস সালাম)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তিনি।
জাহান্নামের কিছু ভয়াবহ দৃশ্যও প্রত্যক্ষ করেন, যেখানে কিছু মানুষ তাদের কৃতকর্মের শাস্তি ভোগ করছে। সেই দৃশ্য এতটাই হৃদয়বিদারক ছিল যে, তা মানুষকে গুনাহ থেকে দূরে থাকতে সতর্ক করে দেয়।
নবীদের ইমামতি : ইসলামের পূর্ণতার ঘোষণা
মসজিদুল আকসায় মহানবীর (সা.) নেতৃত্বে সব নবীর একসঙ্গে নামাজ আদায় করার ঘটনা বিভিন্ন দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ।
ইসলামে একটি মৌলিক বিশ্বাস হলো, সব নবীর মূল বার্তা ছিল এক, তা হলো এক আল্লাহর ইবাদত করা। মহানবী মুহাম্মদ (সা.)-এর মাধ্যমে সেই বার্তা পূর্ণতা লাভ করে এবং নবুয়তের ধারার সমাপ্তি ঘটে।
জেরুজালেমে নবীদের এক কাতারে দাঁড়িয়ে তার ইমামতি করার অর্থ হলো-
সব নবীর বার্তা একই ধারাবাহিকতার অংশ।
তাদের লক্ষ্য ও মর্যাদা অভিন্ন।
আর ইসলামের মাধ্যমেই সেই বার্তা চূড়ান্ত ও সংরক্ষিত রূপ পেয়েছে।
এ ঘটনার মাধ্যমে আরও বুঝা যায় যে, জেরুজালেম শুধু ইহুদি বা খ্রিস্টানদের জন্য নয়; মুসলমানদের কাছেও পবিত্র শহর। কারণ এখানেই মহানবী সব নবীর স্বীকৃত নেতা হিসেবে ইমামতি করেছেন। এই কারণে শহরটি আসমানি সব ধর্মাবলম্বীর কাছেই বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন।
ইসলামের সর্বজনীন বার্তা
মেরাজের আরেকটি বড় শিক্ষা হলো ইসলামের সার্বজনীনতা। আল্লাহ চাইলে মহানবীকে মক্কা থেকেই সরাসরি আসমানে তুলে নিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তাকে প্রথমে তৎকালীন অনারব অধ্যুষিত শহর জেরুজালেমে নিয়ে যান। সেখানে তাকে নবীদের ইমাম বানিয়ে তারপর আসমানে তোলা হলো।
এর মাধ্যমে স্পষ্ট করে দেওয়া হয় যে, ইসলাম শুধু আরবদের জন্য নয়, বরং সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রেরিত ধর্ম।
ইসলামী গবেষকদের মতে, এই ঘটনাই ইঙ্গিত করে যে আগের ধর্মগ্রন্থগুলোতে যে বিকৃতি এসেছিল, ইসলাম এসে তা সংশোধন করেছে এবং একটি পরিপূর্ণ ও সংরক্ষিত জীবনব্যবস্থা উপহার দিয়েছে।
মেরাজের রাতে নবীদের নিয়ে মহানবীর (সা.) ইমামতি শুধু একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়; এটি ইসলামের নেতৃত্ব, পূর্ণতা ও বিশ্বজনীনতার এক জীবন্ত ঘোষণা। মুসলমানদের জন্য এতে রয়েছে আত্মবিশ্বাসের বার্তা-ইসলাম কোনো বিচ্ছিন্ন মতবাদ নয়, বরং সব আসমান ধর্মের চূড়ান্ত ও সংরক্ষিত রূপ।
সুরা ইয়াসিনের ৬ শিক্ষা
পবিত্র কোরআনের হৃদপিন্ড বলা হয় সুরা ইয়াসিনকে। সুরা ইয়াসিন মানুষকে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের আহ্বান জানায়। একইসঙ্গে চিন্তা, উপলব্ধি ও আত্মসমালোচনার শিক্ষা দেয়। আল্লাহর বাণী ও সৃষ্টিজগত, এই দুই মহা নিদর্শনের দিকে তাকিয়ে মানুষ যেন নিজের অবস্থান নতুন করে বুঝতে পারে, সে কথাই স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে এই সুরায়। সুরা ইয়াসিনের ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা তুলে ধরা হলো-
১. আল্লাহর বাণী ও উদাসীন মানুষের মনোভাব (আয়াত ১-১২)
সুরা ইয়াসিনের শুরুতেই কোরআনের অবতরণ ও তার উদ্দেশ্যের কথা বলা হয়েছে। আরব সমাজে আগে নবী-রাসুল পাঠানোর ধারাবাহিকতা তেমন ছিল না। তাই আল্লাহ বলেন- ‘যেন আপনি এমন এক জাতিকে সতর্ক করেন, যাদের পূর্বপুরুষদের সতর্ক করা হয়নি, ফলে তারা গাফেল হয়ে আছে।’ (ইয়াসিন, আয়াত : ৬)
এই গাফিলতি বা উদাসীনতা মানুষের হৃদয়ের এক ভয়ংকর রোগ, যা তাকে সত্য গ্রহণ থেকে বিরত রাখে। কোরআনে বলা হয়েছে— আমি তাদের সামনে ও পেছনে প্রাচীর স্থাপন করেছি, আর তাদের চোখ ঢেকে দিয়েছি, ফলে তারা দেখতে পায় না।’ (ইয়াসিন, আয়াত : ৯)
২. ইতিহাস থেকে শিক্ষা নাও (আয়াত, আয়াত : ১৩-৩০)
এরপর সুরায় বর্ণিত হয়েছে একটি জনপদের ঘটনা, যেখানে একসঙ্গে তিনজন রাসুল প্রেরিত হয়েছিলেন। আশ্চর্যের বিষয়, এখানে রাসুলদের নাম বা বক্তব্য নয়, বরং এক সাধারণ মানুষের সাহসী ভূমিকা বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
আল্লাহ বলেন, ‘আমি তাদের কাছে দুইজন রাসুল পাঠালাম, তারা উভয়কেই অস্বীকার করল। এরপর তৃতীয় একজনকে দিয়ে তাদের শক্তিশালী করলাম।’ (ইয়াসিন, আয়াত : ১৪)
বর্ণিত হয়েছে, শহরের দূর প্রান্ত থেকে এক ব্যক্তি দৌড়ে এসে বলল, হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা রাসুলদের অনুসরণ করো।’ (ইয়াসিন, আয়াত : ২০)
৩. চারপাশের সৃষ্টিজগতের দিকে তাকাও (আয়াত ৩১-৪৪)
ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নিলে অন্তত বর্তমানের নিদর্শনগুলো দেখার আহ্বান জানানো হয়েছে। বর্ণিত হয়েছে, ‘তাদের জন্য নিদর্শন হলো মৃত ভূমি, যাকে আমি জীবিত করি এবং তা থেকে শস্য উৎপন্ন করি।’ (ইয়াসিন, আয়াত : ৩৩)
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন, ‘রাতও তাদের জন্য এক নিদর্শন; আমি দিনকে তা থেকে আলাদা করে দিই, তখন তারা অন্ধকারে ঢেকে যায়।’ (ইয়াসিন, আয়াত : ৩৭)
৪. একগুঁয়েমি ও আত্মিক অন্ধত্ব (আয়াত ৪৫-৪৭)
আল্লাহ বারবার সতর্ক করলেও অনেকে উদাসীন থাকে। তাদের সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘যখন তাদের বলা হয়, সামনে ও পেছনের পরিণাম সম্পর্কে সতর্ক হও, যাতে তোমরা দয়া লাভ করো, তখন তারা প্রতিটি নিদর্শন উপেক্ষা করে।’ (ইয়াসিন, আয়াত : ৪৫-৪৬)
৫. কিয়ামতের দিনের পরিণতি (আয়াত ৪৮-৭০)
এই অংশে পুনরুত্থান দিবসের দৃশ্যপট তুলে ধরা হয়েছে। বর্ণিত হয়েছে, ‘এটাই সেই আগুন, যার ব্যাপারে তোমাদের সতর্ক করা হয়েছিল। আজ তাতে প্রবেশ করো, কারণ তোমরা সত্য অস্বীকার করেছিলে।’ (ইয়াসিন, আয়াত : ৬৩-৬৪)
৬. অহংকার : হৃদয়ের আরেক বড় ব্যাধি
সুরার শেষাংশে মানুষের অহংকারের কথা বলা হয়েছে, যা গাফিলতির মতোই তাকে সত্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘মানুষ কি দেখে না যে আমি তাকে সৃষ্টি করেছি এক ফোঁটা বীর্য থেকে? অথচ সে প্রকাশ্যেই তর্কে লিপ্ত হয়- বলে, পচে যাওয়া হাড় কে আবার জীবিত করবে?’ (ইয়াসিন, আয়াত : ৭৭-৭৮)
উত্তর দেওয়া হয়েছে- যিনি প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন, তিনিই আবার জীবিত করবেন। তিনি সব সৃষ্টির খবর রাখেন। (ইয়াসিন, আয়াত : ৭৯)
