যে কয়টি
গুণ মানুষকে আল্লাহর প্রিয় করে তোলে তার অন্যতম হলো একমাত্র আল্লাহর
সন্তুষ্টির জন্য মানুষকে ভালোবাসা। মানুষকে ভালোবাসা শুধু একটি মানবিক
আবেগের বিষয় নয়, বরং এটি ঈমানের দাবি। জান্নাতের পাথেয়। যে হৃদয় আল্লাহর
মাখলুকের প্রতি নরম হয়, আল্লাহর রহমত তার সঙ্গে থাকে।
ইসলাম এমন এক মহান
ধর্ম, যেখানে ইবাদত শুধু নির্দিষ্ট কিছু কাজ যেমন-নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত
ইত্যাদিতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং মানুষের উত্তম আচরণ, সহানুভূতি, ক্ষমা ও
ভালোবাসার মধ্যেও ইবাদতের রুহ লুকিয়ে আছে। তাই নিম্নে ভালোবাসা নিয়ে
কোরআন-হাদিসের আলোকে কিছু তথ্য তুলে ধরা হলো-
মুমিন অপর মুমিনকে
ভালোবাসে : মুমিনের ভালোবাসার ভিত্তি হলো ঈমান। মুমিনে ঈমানের দাবিতে একে
অপরকে ভালোবাসে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাঁর মুমিন বান্দাদের ব্যাপারে
বলেন, ‘মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১০)
তাই
মুমিনের উচিত সর্বদা অপর মুমিনকে ভালোবেসে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন অটুট রাখা।
তার কল্যাণকামী হওয়া। কারো মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে তাদের মধ্যে সমঝোতা করে
দেওয়া।
মানুষকে ভালোবাসলে আল্লাহর ভালোবাসা মেলে : মহান আল্লাহর ভালোবাসা পাওয়ার একটি সহজ মাধ্যম হলো আল্লাহর বান্দাদের ভালোবাসা।
হাদিস
শরিফে ইরশাদ হয়েছে, আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.)
বলেন, দয়াশীলদের ওপর করুণাময় আল্লাহ দয়া করেন। তোমরা দুনিয়াবাসীকে দয়া করো,
তাহলে যিনি আসমানে আছেন তিনি তোমাদের দয়া করবেন। (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯৪১)
সুবহানাল্লাহ!
আসমানের মালিকের প্রিয় হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করার সূত্র তিনি নিজেই আমাদের
বাতলে রেখেছেন, কিন্তু আমরা নিজেদের অবহেলা, অহংকার, বিদ্বেষ ও হিংসার
কারণে এই অমূল্য নিয়ামত থেকে বঞ্চিত হয়ে যাচ্ছি কি না, তা খেয়াল রাখা উচিত।
মানুষের
প্রতি ভালোবাসা ছাড়া ঈমান পূর্ণ হয় না : অন্যের প্রতি কল্যাণকামী হওয়া
ঈমানের দাবি। হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী
(সা.) বলেছেন, তোমাদের মধ্যে কোনো ব্যক্তি নিজের জন্য যা পছন্দ করে সেটা
তার ভাইয়ের জন্যও পছন্দ না করা পর্যন্ত ঈমানদার হতে পারবে না।(তিরমিজি,
হাদিস : ২৫১৫)
এই হাদিস দ্বারা বোঝা যায়, আত্মকেন্দ্রিকতা ঈমানকে পূর্ণ
করতে পারে না, বরং প্রকৃত ও পরিপূর্ণ ঈমানদার হতে গেলে অন্য মুমিনকে
ভালোবাসতে হবে, তার কল্যাণকামী হতে হবে।
আল্লাহর জন্য মানুষকে ভালোবাসলে
আরশের ছায়া দানের ওয়াদা : কিয়ামতের ভয়াবহ দিনে যখন কোনো ছায়া থাকবে না,
সেদিন মহান আল্লাহ কিছু বিশেষ বান্দাদের আরশের ছায়ায় আশ্রয় দানের ওয়াদা
করেছেন। তার মধ্যে অন্যতম হলো যারা একমাত্র আল্লাহর জন্য একে অপরকে
ভালোবাসে।
মহানবী (সা.) বলেছেন, সাত রকমের লোক, যাদের আল্লাহ কিয়ামতের
দিন তাঁর আরশের ছায়ায় আশ্রয় দেবেন, যেদিন তাঁর ছায়া ছাড়া অন্য কোনো ছায়া
হবে না...। এমন দুই ব্যক্তি, যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় পরস্পর ভালোবাসা
রাখে...। (বুখারি, হাদিস : ৬৮০৬)
এই হাদিস দ্বারা বোঝা যায়, মানুষকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসলে আখিরাতে নিরাপত্তা লাভের আশা করা যায়।
ভালোবাসা
ও নম্রতায় মানুষের মন জয় করা যায় : মানুষের মন জয় করার অন্যতম শক্তি হলো
ভালোবাসা ও নম্রতা। দাওয়াতি কাজ থেকে শুরু করে যেকোনো প্রতিষ্ঠান
সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করতে গেলে এই দুটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে
গুরুত্বারোপ করতে গিয়ে মহান আল্লাহ তাঁর নবীকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, ‘অতঃপর
আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমতের কারণে তুমি তাদের জন্য নম্র হয়েছিলে। আর যদি
তুমি কঠোর স্বভাবের, কঠিন হৃদয়সম্পন্ন হতে, তবে তারা তোমার আশপাশ থেকে সরে
পড়ত। সুতরাং তাদের ক্ষমা করো এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করো। আর
কাজকর্মে তাদের সঙ্গে পরামর্শ করো। অতঃপর যখন সংকল্প করবে তখন আল্লাহর ওপর
তাওয়াক্কুল করবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওয়াক্কুলকারীদের ভালোবাসেন।’ (সুরা :
আলে ইমরান, আয়াত : ১৫৯)
আল্লাহর প্রিয় হওয়া যায় : যে ব্যক্তি মানুষকে
ভালোবেসে তাদের উপকার করে, সে আল্লাহর প্রিয় হয়ে ওঠে। হাদিস শরিফে ইরশাদ
হয়েছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় মানুষ সে, যে
মানুষের জন্য সবচেয়ে উপকারী।’ (মু‘জামুল আওসাত, তাবারানি)
মানুষের উপকার
করা, তাদের কষ্ট লাঘবের চেষ্টা করা, হাসিমুখে কথা বলা, তাদের দুঃখ ভাগ করে
নেওয়া ইত্যাদি সবই ফজিলতপূর্ণ ইবাদত। যার মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি পাওয়া
যায়।
মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে প্রকৃত মুমিন হওয়ার তাওফিক দান করুন।
আমাদের অন্তরকে পাপাচার, অহংকার ও হিংসা-বিদ্বেষের আবর্জনা থেকে মুক্ত
করুন। আমিন।
