
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে পেশাদার অপরাধীদের অপতৎপরতা বেড়ে চলেছে। তারা বিভিন্ন সময়ে খুন-জখমসহ নানা ধরনের অপরাধ করছে। এতে নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অস্ত্রকারবারিদের গ্রেপ্তারের নজির খুব একটা লক্ষ করা যাচ্ছে না। বাড়তি উৎকণ্ঠায় ফেলেছে জুলাই অভ্যুত্থানের সময় থানা থেকে লুট হওয়া মারণাস্ত্রগুলো। বিশ্লেষকরা মনে করেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যবহৃত লুণ্ঠিত ১ হাজার ৩০০-এর বেশি অস্ত্র পেশাদার অপরাধীদের হাতে রয়েছে। ফলে অবৈধ অস্ত্র এবং লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্রের কারণে মারাত্মক নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হয়েছে, যা মূলত রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের ভীতি বাড়িয়ে দিচ্ছে। সম্প্রতি রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা-কর্মী দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে এরকম আরও কয়েকটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানীতে আততায়ীর গুলিতে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান বিন হাদি ছয় দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর সিঙ্গাপুরের হাসপাতালে মারা যান। বহুল আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডের পর অবৈধ অস্ত্রের তৎপরতা নিয়ে সমালোচনা বাড়তে থাকে। আতঙ্ক দেখা দেয় রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের মধ্যে। এরপরও রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে খুনের ঘটনা ঘটছে। সে তুলনায় অবৈধ বা লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারে সাফল্য দেখছেন না বিশ্লেষকরা।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, গোটা দেশের মানুষ নির্বাচনের অপেক্ষায় থাকলেও বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে সন্তুষ্ট নন তিনি। রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ওপর যেভাবে একের পর এক হামলা ও খুনের ঘটনা ঘটছে, বিশেষ করে বিএনপির অনেক নেতা-কর্মী এর শিকার হচ্ছেন। এ বিষয়ে সরকার কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচনের সময় অবৈধ অস্ত্র কেনাবেচা এবং সন্ত্রাসীদের তৎপরতা বেড়ে যায়। পাশাপাশি লুট হওয়া অস্ত্রও সন্ত্রাসীদের হাতে রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এ প্রেক্ষাপটে আগ্নেয়াস্ত্রের তৎপরতা নিয়ন্ত্রণ বা অস্ত্র উদ্ধার করা খুব জরুরি। কেননা, নির্বাচনসহ যেকোনো পরিবেশকে অস্থিতিশীল করার ক্ষেত্রে অবৈধ অস্ত্রধারীরা ব্যাপক ভূমিকা পালন করে থাকে। এজন্য অভিযান পরিচালনা করতে হবে সফলভাবে। বিভিন্ন স্তরে বিশ্বস্ত সোর্স তৈরি করে তথ্য সংগ্রহের দিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে।
সামাজিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, বৈধ অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ এবং অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র জব্দ বা আটকের বিষয়গুলো জননিরাপত্তার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। অবৈধ অস্ত্র সন্ত্রাসীদের হাতে থাকলে অপরাধ ভয়ানক মাত্রায় বাড়বে, এটাই স্বাভাবিক। বর্তমানে দেশে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নির্বাচনমুখী নানা তৎপরতা চলছে। এ সময়ে অবৈধ অস্ত্র বা অস্ত্রকারবারিদের তৎপরতা কঠোরভাবে দমন করতে না পারলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।
দেশে ঘটে যাওয়া সম্প্রতি বেশ কিছু ঘটনায় রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীসহ সাধারণ মানুষ চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় রয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে অস্ত্রকারবারিসহ পেশাদার অপরাধীরাও বেশ সক্রিয়। নির্বাচনে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিতে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার আরও বাড়ার শঙ্কা রয়েছে। তাই পেশাদার অপরাধীদের অপতৎপরতা ঠেকাতে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সরকারের গোয়েন্দা বিভাগগুলোকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থতির উন্নতি হলে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা কাটবে এবং জনমানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। আশা করছি, সরকার অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার রোধে এবং অপরাধীদের ধরতে আরও তৎপর হবে।
