
যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশিদের জন্য দেশটি যে বন্ড বা জামানত প্রথা আরোপ করেছে, তা কেবল আর্থিক দণ্ড নয়, ভাবমূর্তিরও প্রশ্ন বটে। আমরা জানি, যুক্তরাষ্ট্র ভিসা বন্ডের আওতাধীন কয়েকটি দেশের তালিকা কয়েক মাস পূর্বেই প্রকাশ করেছে; মঙ্গলবার সে তালিকায় বাংলাদেশকেও যুক্ত করা হয়েছে। এ অবস্থানের নেপথ্যে যদ্রুপ দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিবাসনবিরোধী কঠোর অবস্থান, তদ্রূপ ভ্রমণকারীদের ভিসার মেয়াদ-অতিরিক্ত সময় অবস্থানের প্রবণতাও দায়ী।
প্রসঙ্গত, যুক্তরাষ্ট্র সাময়িক সময়ে অবস্থানকারীদের জন্য যে বি১ ও বি২ ধরনের ভিসা দিয়ে থাকে, সে দুটিতেই বন্ড আরোপিত হয়েছে। এই দুই ধরনের ভিসায় সাময়িকভাবে ব্যবসার উদ্দেশ্যে, শিক্ষামূলক, পেশাগত কারণে এবং ভ্রমণ, বিনোদন কিংবা চিকিৎসার জন্য মানুষ যুক্তরাষ্ট্রে যায়। এর আওতায় দেশটিতে একাদিক্রমে ৯০ দিনের অধিক থাকার অবকাশ নেই। অথচ দেশটির হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশ হতে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে অতিরিক্ত সময় অবস্থানের হার সর্বাধিক ব্যবসা ও ভ্রমণ ভিসাধারীদের। ২০২৪ ও ২০২৩ সালে যে সকল বাংলাদেশি ঐ দেশের ভিসা পেয়েছিলেন, তাদের একটি অংশ অতিরিক্ত সময় অবস্থান করেছেন। এই সংকট কাটার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র জামানতের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।
স্মরণে রাখতে হবে, পাঁচ হাজার হতে পনেরো হাজার ডলার অর্থাৎ অন্তত তিন লক্ষ টাকা হতে ১৮ লক্ষ টাকা জামানতের পরিমাণ খুব কম নয়। এই অর্থ বহন করা অনেকের পক্ষেই কঠিন হবে, যদিও তা ফেরতযোগ্য। ভ্রমণ, পেশাগত কর্ম কিংবা চিকিৎসার জন্য ভিসার আবেদন করলে এ অর্থ প্রদান করা অনেকের পক্ষেই কষ্টসাধ্য হবে। যার ফলে ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং রাষ্ট্রও অনেক ক্ষেত্রে পেশাগত সেবা হতে বঞ্চিত হতে পারে। তবে সর্ববৃহৎ সংকট হবে ভাবমূর্তিগত। আমরা দেখেছি, যুক্তরাষ্ট্র মোট ৩৮ দেশের উপর এই বন্ড আরোপ করেছে। সে তালিকায় বাংলাদেশ প্রবেশ করার অর্থ হল বিশ্বের নিকট আমাদের সম্পর্কে নেতিবাচক বার্তা যাবে। অনেক সময় আমরা দেখি, যুক্তরাষ্ট্র কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে পশ্চিমা দেশগুলো এর অনুসরণ করে থাকে। ভিসা বন্ডের ক্ষেত্রেও তা ঘটিলে বাংলাদেশের জন্য মন্দ বৈ উত্তম হবে না।
বলার অপেক্ষা রাখে না, ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয়বার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হবার পর হতে নূতন এমন কিছু বিষয় আমরা দেখছি, তাতে বাংলাদেশের মতো যে সকল দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সাথেদীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছে, তারা বিস্মিত। ইতোপূর্বে বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় সকল দেশের পণ্যের উপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এখন নতুন করে ভিসার জামানত নির্ধারণের মাধ্যমে যে সংকটের উদ্ভব হয়েছে, তার প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের উপরেও পড়তে বাধ্য। এবার কেবল বন্ডই আরোপ করা হয় নি, প্রবাসী আয়ে ১ শতাংশ করও নির্ধারণ করেছে যুক্তরাষ্ট্র এবং নির্দিষ্ট তিনটি বিমানবন্দর নির্ধারণ করে ভ্রমণেও কড়াকড়ি আরোপ করেছে দেশটি।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে যারা যুক্তরাষ্ট্রে স্বল্প সময়ের জন্য যাবেন, তাদের নির্দিষ্ট ভিসার মেয়াদ শেষ হবার পর ফেরত আনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সক্রিয়তা জরুরি। দেশ যদি এভাবে উদাহরণ তৈরী করতে পারে, তবে তাতে আশ্বস্ত হয়ে যুক্তরাষ্ট্র বন্ড প্রথা শিথিল করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে যে সকল বাংলাদেশি কমিউনিটি রয়েছে, তারা যে তথাকার সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য ভূমিকা পালন করছে, তাও ট্রাম্প প্রশাসনকে অনুধাবন করতে হবে। বন্ড আরোপ করলে তথায় দেশের নাগরিকদের গমন হ্রাস পেলে যুক্তরাষ্ট্রের উপর কী ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, তাও বুঝবার বিষয় রয়েছে। তবে অন্যতম প্রধান কারণ হিসাবে যেহেতু অতিরিক্ত সময়ে অবস্থানের বিষয় রয়েছে, সেখানে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি।
