
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যেসব প্রার্থী অংশ নিতে চান তাদের মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শুরু হয়েছে। সব যাচাই-বাছাই শেষ হলে চূড়ান্ত প্রার্থীর নাম ঘোষণা হবে ২০ জানুয়ারি। মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের মধ্যেই প্রার্থীদের হলফনামা নিয়ে দেশে আলোচনা সমালোচনার কমতি নেই। প্রভাবশালী প্রার্থীদের হলফনামা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তাদের স্ত্রীদের নামে রয়েছে বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট ও অঢেল নগদ টাকা ও সম্পদ। প্রার্থীদের তুলনায় তাদের স্ত্রীরা বেশি সম্পদশালী। স্ত্রীরা কীভাবে কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক হলেন তার কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা মেলেনি অনেক প্রার্থীর হলফনামায়। বেশ কিছু প্রার্থীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ব্যক্তিগত ও আর্থিকভাবে প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত হলেও হলফনামায় তাদের বার্ষিক আয় কিংবা সম্পদের পরিমাণ কম দেখানো হয়েছে।
সম্পদের এই বিশাল ফারাক নিয়ে সাধারণ ভোটারদের মনে তৈরি হয়েছে নানা কৌতূহল। এ ছাড়া প্রার্থীদের হলফনামায় দেওয়া তথ্যে বাস্তবতার ঘাটতি আছে কি না, সে প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে সর্বত্র।
হলফনামায় অসত্য তথ্য দেওয়ার প্রবণতা দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। বিগত নির্বাচনগুলোয় দেখা গেছে তথ্য গোপন বা বিকৃত করে প্রার্থীদের অংশ নেওয়ার নজির রয়েছে বহু নির্বাচনে। কিন্তু এতদিন এ ধরনের মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে কার্যকর শাস্তির স্পষ্ট বিধান না থাকায় অনেক প্রার্থী পার পেয়ে গেছেন। এবার সেই জায়গাতে নির্বাচন কমিশন (ইসি) বড় পরিবর্তন এনেছে। অসত্য তথ্য প্রমাণ হলে প্রার্থীকে শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। সংশোধিত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) ১৯৭২ (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫ অনুযায়ী, এবার নির্বাচনি হলফনামায় মিথ্যা তথ্য দিলে এবং তা পরবর্তী সময়ে প্রমাণ হলে শুধু মনোনয়নপত্র বাতিল নয়, ভোটে নির্বাচিত এমপির পদও বাতিল হতে পারে। এমন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান যুক্ত করা হয়েছে। তবে নির্বাচিত প্রার্থী যদি পাঁচ বছর মেয়াদ অতিক্রম করতে পারেন ও অভিযোগ এই সময়কালে প্রমাণিত না হয়, তাহলে ইসির কিছু করার থাকবে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হলফনামায় মিথ্যা তথ্য দিয়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা সংসদে নৈতিক সংকট তৈরি করেন, যা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ক্ষতিকর। এ প্রসঙ্গে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য ও সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, সংস্কার কমিশনের পক্ষ থেকেও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে তথ্য যাচাইয়ের। যারা ভুল তথ্য দেবে এবং তথ্য গোপন করবে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আইনেও এ ধরনের শাস্তির বিধান রয়েছে।
নির্বাচন বিশ্লেষক ড. আব্দুল আলীম বলেন, হলফনামায় প্রার্থীদের মিথ্যাচার রোধে আরপিওতে এ ধরনের সংশোধনী অত্যন্ত ইতিবাচক পদক্ষেপ । তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে প্রয়োগের ওপর। কারণ, রাজনৈতিক চাপ উপেক্ষা করে কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করতে না পারলে হলফনামায় তথ্য গোপনের সংস্কৃতি বদলাবে না।
আমরা মনে করি, এ ধরনের প্রবণতা দায়মুক্তির সংস্কৃতি থেকে এসেছে। আগে যারা সংসদ সদস্য হয়েছেন তাদের ক্ষেত্রে যদি এই আইন প্রয়োগ করা হতো তাহলে এই প্রবণতা অনেক আগেই কমত। প্রার্থীর তথ্য গোপন রোধে ইসির পরিকল্পনাকে সাধুবাদ জানাই। সংশোধিত গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ-২০২৫ অনুযায়ী নির্বাচনি হলফনামায় বিভ্রান্তিকর তথ্যের জন্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান অনুসারে দেশের প্রতিটি নির্বাচনি প্রার্থীর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির পথ পরিষ্কার হবে। নির্বাচন কমিশনের এ ধরনের পরিকল্পনা যদি বাস্তবে কার্যকর হয়, তাহলে বাংলাদেশে নির্বাচনি ইতিহাসে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে থাকবে।
