
বিগত সরকারের সময়ে গুমের ঘটনা তদন্তে গঠিত কমিশন গত রবিবার প্রধান উপদেষ্টার কাছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। পরদিন এ ব্যাপারে সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেছেন কমিশন প্রধান মইনুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি বলেন, দেশের প্রত্যেকটা গোয়েন্দা সংস্থার সংস্কার করতে হবে। আমাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ‘নাক গলায়’, কারণ তারা ক্ষমতার অংশ হতে চায়। আগের সরকারগুলোর সবাই তাদের অপব্যবহার করেছে। এ প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। গুম কমিশনের এই প্রতিবেদনে আমরা দেখেছি যারা নাগরিকদের জান-মালের নিরাপত্তা দিতে শপথ নিয়েছিলেন, তাদের একটি অংশের হাতেই সাধারণ মানুষ অনিরাপদ ছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একশ্রেণির সদস্যদের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করা হয়েছিল।
কমিশন প্রধান জানান, পুলিশের কাজ হচ্ছে দেশের ভেতরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা। আর সেনাবাহিনীর কাজ হচ্ছে ক্যান্টনমেন্ট থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা এবং নতুন নতুন যুদ্ধ কৌশল রপ্ত করা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা সেনা কর্মকর্তাদের কাজ নয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বেসামরিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলো থেকে তাদের প্রত্যাহার করতে হবে। পুলিশের মধ্য থেকে দক্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি এলিট ফোর্স গঠন করা যেতে পারে।
কমিশন প্রধান আরো জানান, বাংলাদেশের বলপূর্বক গুম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অবসান ঘটাতে ব্যাপক প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনগত সংস্কারের সুপারিশ করেছে কমিশন। এর মধ্যে রয়েছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বিলুপ্তকরণ, অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বথেকে সশস্ত্র বাহিনী প্রত্যাহার, সন্ত্রাসবিরোধী আইন ২০০৯ বাতিল বা মৌলিক সংশোধন, সমাজভিত্তিক প্রতিরোধমূলক সন্ত্রাসবিরোধী নীতি প্রণয়ন, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ান আইন, ২০০৩ এর ১৩ ধারা বাতিল, সব বাহিনীকে কঠোর আইনি জবাবদিহির আওতায় আনা, বাধ্যতামূলক মানবাধিকার প্রশিক্ষণ, ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক ন্যায়বিচার, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন নিশ্চিতকরণ এবং সত্য, স্মৃতি ও জবাবদিহির প্রতীক হিসেবে ‘আয়নাঘর’গুলোকে জাদুঘরে রূপান্তর।
কমিশনের তথ্যমতে, প্রায় ২৫ শতাংশ গুমের অভিযোগে র্যাব জড়িত। এরপর পুলিশ ২৩ শতাংশ। এছাড়া ডিবি, সিটিটিসি, ডিজিএফআই ও এনএসআই ব্যাপক হারে গুম করেছে। বহুক্ষেত্রে সাদা পোশাকধারী বা ‘প্রশাসনের লোক’ পরিচয়ে অপহরণ করা হয়েছে। অভিযোগগুলোর ধরন থেকে এটা স্পষ্ট যে, গুম একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও পদ্ধতিগত চর্চা হিসেবে র্যাব, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মাধ্যমে একক ও যৌথ অভিযানে সংঘটিত হয়েছে। এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন অসদাচরণের পরিবর্তে রাষ্ট্রীয় সমন্বিত কার্যক্রমের ইঙ্গিত দেয়।
বাংলাদেশের সংবিধান এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার আছে। অথচ গুমের মাধ্যমে সে অধিকার লঙ্ঘন করা হয়েছে। রাষ্ট্র হলো নাগরিকের আশ্রয়স্থল। একটি সভ্য দেশে একজন মানুষ গুম হয়ে যাবেন অথচ রাষ্ট্র সে দায় নেবে না, এটা কোনোভাবেই হতে পারে না। সময় এসেছে দেশটাকে পরিবর্তনের। ভবিষ্যতে ক্ষমতা ধরে রাখার বাসনায় কোনো শাসকগোষ্ঠী বা বাহিনী এ ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধ না করতে পারে সেজন্য আইনি ও কাঠামোগত সংস্কার করতে হবে।
এজন্য দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা। শুধু প্রতিবেদনে উল্লেখ করেই রাষ্ট্রের দায়িত্বশেষ হয়ে যায় না, এই ধরনের অপরাধে যারা পৃষ্ঠপোষকতায় রয়েছে এবং যারা বাস্তবায়ন করেছে তাদের সবাইকে আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। আশা করছি, সরকার নাগরিকদের নিরাপত্তা রক্ষায় ভবিষ্যৎ শাসকগোষ্ঠীর জন্য সঠিক পথনির্দেশনা তৈরিতে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
