
সময়ের
স্রোতে ভেসে ২০২৫ সাল বিদায় নিচ্ছে। মহাকালের গর্ভে একটি বছর বিলীন হয়ে
নতুন আশা, নতুন স্বপ্ন নিয়ে বর্ষ পরিক্রমায় যুক্ত হতে যাচ্ছে নতুন বছর
২০২৬। বিদায়ী বছরের ভালো-মন্দ, হাসি-কান্না, ব্যস্ততা-দুশ্চিন্তা সবকিছু
পেছনে রেখে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি আগামীর পথে। পৃথিবীর বয়স বাড়ছে, সেই সাথে
আমাদেরও। দেশ, সমাজ ও মানুষের জীবন সরলরৈখিক ভাবে এগিয়ে যায় না। প্রতিটি
দিন আমাদের জন্য ভালো-মন্দ মিলিয়ে ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতা বয়ে আনে। গেল বছরের
হিসাবের খাতায় হয়তো বা জমা হয়ে আছে অনেক অতৃপ্তি, অনেক কষ্ট ও স্বজন
হারানোর কান্না। সেখানে আছে মানুষের সম্পর্ক, সংগ্রাম আর ছোট ছোট সুখের
গল্প। কিন্তু তবুও নতুন বছর এলে আমরা জীবনকে এগিয়ে নিতে বিগত সময়ের অপূরণীয়
অনেক স্বপ্ন দেখি। প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির হিসেব নিকেশ করে আগামী'র
সম্ভাবনার ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করে আশাবাদী মানসিকতা নিয়ে নতুন বছরকে বরণ
করে নেয়ার প্রস্তুতি নেই।
অমিত সম্ভাবনার আমাদের এ প্রিয় বাংলাদেশে ২০২৫
সালটি ছিল অনেক ঘটনাবহুল। সব ঘটনা যে শুভকর বা অশুভকর ছিল তা একবাক্যে বলা
যাবে না। তথাপি এর মধ্য থেকেই ভবিষ্যতের জন্য ভালোগুলোকে বেছে নিয়ে
কর্মপরিকল্পনা করে এগিয়ে যেতে হবে। পুরনো বছর যেমনই কাটুক, নতুন বছর যেন
ভাল কাটে সেই লক্ষ্যে কাজ করে যেতে হবে।
আসছে ২০২৬ সাল আমাদের রাষ্ট্রীয়
জীবনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাক্ষি হবে। রাষ্ট্রীয় সেসব ঘটনার প্রভাব
পড়বে আমাদের সমাজ এবং ব্যক্তি জীবনেও। এ বছরে শুরুতেই অনেক আকাক্সিক্ষত
একটি সুষ্ঠু, গ্রহনযোগ্য সংসদীয় নির্বাচনের মাধ্যমে নিজেদের পছন্দসই সাংসদ
তথা জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের জন্য জাতি উন্মুখ হয়ে আছে। সবার আশা নির্বাচিত
সরকার দেশকে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নমুখী যাত্রায় শামিল করে কাঙ্খিত
লক্ষ্যে এগিয়ে নিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবেন। এ উন্নয়ন যাত্রায় সঠিকভাবে
প্রাধিকার নির্ধারণ করত: গণমানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে দেশকে টেকসই
উন্নয়নের পথে এগিয়ে নেয়া সম্ভব হবে। এর ধারাবাহিকতায় দেশে টেকসই ও গুণগত
প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা যাবে, জনগণের কর্মসংস্থান বাড়বে এবং ফলশ্রুতিতে
দারিদ্র্য বিমোচন কার্যক্রম গতি পাবে।
আগামী বছরটি বাংলাদেশের জন্য আরও
একটি কারনে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২৬ সালের
শেষার্ধে নভেম্বর মাসে অফিসিয়ালি জাতিসংঘ কর্তৃক নির্ধারিত মানদণ্ড
বিবেচনায় বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশের ক্যাটাগরি থেকে উত্তরণ ঘটবে।
উন্নয়নশীল দেশমুখি যাত্রার এ গৌরবময় অর্জনকে টেকসই করার লক্ষ্যে আমাদের
প্রচেষ্টা আরো জোরদার করতে হবে। উত্তরন পরবর্তীতে উদ্ভূত চ্যালেঞ্জগুলো
মোকাবেলার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক, নীতিগত, কাঠামোগত ও মনস্তাত্ত্বিক প্রস্তুতি
গতিশীল করতে হবে।
একবছরে সবকিছু বা অনেককিছু করে ফেলা যাবে এমনটা কেউ
মনে করেন না, তবে শুরুটা যদি ভালো হয় তাহলে আশাবাদী হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
আশাবাদী মানুষ যে অনেক অসাধ্য সাধন করতে সক্ষম হয় তার উদাহরণ আমরা নিকট
অতীতে অনেক দেখেছি। প্রকৃতি উদারভাবে আমাদের এ দেশকে দান করেছে উর্বর মাটি
যেখানে বীজ বুনলেই ভরে উঠে ফসলের মাঠ। এ দেশের নদনদী, খালবিল, হাওরবাঁওড়
আমাদের অফুরন্ত সম্পদের ভান্ডার। মানবসম্পদে সমৃদ্ধ বাংলাদেশের মানুষ খুবই
পরিশ্রমী। ঐক্যবদ্ধভাবে প্রয়াস চালালে সময়ের সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে
জাতিকে সমৃদ্ধ বিশ্বের কাতারে নিয়ে যাওয়া কঠিন কিছু নয়। একটি ন্যায্য,
সাম্য, সংগতিপূর্ণ, গণতান্ত্রিক, বৈষম্যহীন, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক
উন্নয়ন ধারা পরিচালনার সংস্কৃতি গড়ে তোলা খুবই জরুরি। শিক্ষার সংস্কৃতি আর
সংস্কৃতির শিক্ষার অন্তর্নিহিত ধারনাকে আত্মস্হ করে সকল উন্নয়নের
কেন্দ্রবিন্দুতে মানুষকে বিবেচনার রেখে 'মানুষের জন্য ' উন্নয়ন নিশ্চিত
করতে হবে।
সম্প্রীতি ও সমঝোতার সংস্কৃতি রচনা করে এগিয়ে নিতে হবে। সবাই
মিলে কাজ শুরু করে নতুন বছরে শান্তিপ্রিয় মানুষের জীবনের নিরাপত্তা
নিশ্চিত হোক, দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার বন্ধ হোক, বন্ধ হোক প্রাণঘাতী
যুদ্ধ, জয় হোক বিশ্বমানবতার -এ কামনা সবার। নতুন বছর ক্যালেন্ডার বদলানো
পাশাপাশি নতুন সুযোগ ও সম্ভাবনাকে আলিঙ্গন করার, সব ভুল কাটিয়ে উঠার, সব
জঞ্জাল সরিয়ে দেয়ার মাধ্যমে টেকসই ভবিষ্যত বির্নিমানের সুযোগ তৈরি করবে এ
প্রত্যাশাই সবার। প্রিয় মাতৃভূমিতে ফিরে আসুক শান্তি, সমৃদ্ধি, স্বস্তি ও
গতিময়তা। ভালো থাকুক প্রিয় বাংলাদেশ।
লেখকঃ পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগে অতিরিক্ত সচিব হিসেবে কর্মরত।
