
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পাশাপাশি নতুন ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কৌশলগত সম্পর্কের এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এ সফরে যেসব চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে, তা বাস্তবায়ন হলে ঢাকা-বেইজিং সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের যৌথ ঘোষণায় দুই দেশের মধ্যে পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা খাতে ‘টু প্লাস টু’ কৌশলগত সংলাপ চালুর বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। এর মাধ্যমে নতুন ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতা আরও বাড়বে। তবে এই সফরের সবচেয়ে বড় আলোচ্য বিষয় বেইজিংয়ের ডিরেক্ট কানেকটিভিটি বা সরাসরি সংযোগের প্রস্তাব। বাংলাদেশ থেকে মায়ানমার হয়ে চীন পর্যন্ত একটি অর্থনৈতিক করিডর গড়ে তুলতে চায় বেইজিং। এই করিডরের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতির ব্যাপ্তি বাড়ানো এবং বহুমুখী পরিবহনব্যবস্থাকে আরও উন্নত ও কার্যকর করা। এটি সফলভাবে বাস্তবায়ন হলে দেশগুলোর মধ্যে আমদানি-রপ্তানি ব্যয় ও সময় কমবে।
চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক অত্যন্ত সুদৃঢ়। বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতাও রয়েছে। এই সফরের ফলে সেই সহযোগিতাগুলো নতুন মাত্রা পাবে। নতুন নতুন ক্ষেত্রে আরও সহযোগিতার সম্ভাবনা বাড়বে। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি এবং সামরিক খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধিতে চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ উদ্যোগের আওতায় দুই দেশের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার আলোচনার পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে মায়ানমারকে আলোচনায় আনতে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে চীন। মায়ানমারের ওপর দিয়ে এই সংযোগ তৈরি হলে বাংলাদেশ সরাসরি যুক্ত হবে চীনের মূল অর্থনীতি এবং আসিয়ান জোটের শক্তিশালী বাজারগুলোর সঙ্গে।
চীন-মায়ানমার-বাংলাদেশ ইকোনমিক করিডর প্রস্তাবের বিষয়ে কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি এক বৃহৎ কানেকটিভিটি। অর্থনৈতিক কানেকটিভিটিকে কাজে লাগানোর উপায় নিয়ে আগে থেকে ভাবতে হবে। এর সঙ্গে মায়ানমারের রাখাইনের অর্থনৈতিক উন্নয়নও জড়িত। এটি হলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সহজ হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, সফরে যেসব চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে, সেগুলো যদি বাস্তবায়ন করতে পারে সরকার, তাহলে সফরকে ইতিবাচক বলা যাবে। আর যদি অন্য পরাশক্তির চাপে বাস্তবায়ন না করতে পারে, তাহলে সফরকে ইতিবাচক বলার সুযোগ নেই। এখানে চীন দেখার চেষ্টা করছে, বাংলাদেশ সরকার এসব চুক্তি বাস্তবায়ন করতে কতটা সক্ষম। বাংলাদেশ সরকার যদি সেই সক্ষমতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়, তাহলে ঢাকা-বেইজিং সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে।
প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক এই সফর কতটা সফল বা ব্যর্থ, তা নিয়ে জনমনে ব্যাপক কৌতূহল রয়েছে; তেমনি বিশেষজ্ঞ পর্যায়েও চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। এই সফরে ঢাকা-বেইজিং কতটা কাছাকাছি এল বা যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের জন্য কতটা চিন্তার কারণ হলো, তা নিয়েও চলছে নানা জল্পনাকল্পনা। বাংলাদেশকে এ নিয়ে নেতৃত্বের দক্ষতা ও সক্ষমতার পরীক্ষায়ও উত্তীর্ণ হতে হবে। দেশের উন্নয়নের স্বার্থে ত্রিদেশীয় অর্থনৈতিক করিডরের প্রস্তাব নিয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনা চলতে পারে। এ ক্ষেত্রে নিরাপত্তা বিশ্লেষক, কূটনীতিবিদ ও অর্থনীতিবিদদের পরামর্শ কাজে লাগানো যেতে পারে। সার্কভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গেও অর্থনৈতিক করিডর নিয়ে আলোচনা করতে পারে সরকার। ইতোপূর্বে ভারতের করিডর ব্যবহার করে নেপালে পণ্য পরিবহনের ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। সে বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে তাদের সমন্বিত কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও দৃঢ় হোক, সেটিই প্রত্যাশা।
