
বর্ষা মৌসুম শুরু হয়েছে, সেই সঙ্গে বেড়েছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা। চলতি বছর দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮টিতে ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে। বিষয়টি খুবই শঙ্কার। আগাম প্রস্তুতি না নিলে সারা দেশে এর প্রকোপ বেড়ে যেতে পারে। প্রকৃতিতে রোদ-বৃষ্টি আর উষ্ণায়নের কারণেই দীর্ঘ হচ্ছে ডেঙ্গুর প্রজননের সময়। এ সময়টাতে বৃষ্টি বেশি হওয়ায় এডিসের লার্ভা জন্মায় এবং এডিস মশায় আক্রান্ত ডেঙ্গু রোগের ঝুঁকিও বাড়ে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ডেঙ্গু প্রতিরোধের ওপর কাজ শুরু করেছে। প্রতিষ্ঠান বা বাড়ি পরিদর্শন করে এডিস মশার লার্ভা শনাক্ত করার জন্য সরকার ভ্রাম্যমাণ আদালত গঠন করেছে। উপজেলা হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু কর্নার স্থাপন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মাঠে একটি ‘ফিল্ড হাসপাতাল’ তৈরি রাখা হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, প্রয়োজনে কার্যক্রম আরও বাড়ানো হবে। ডেঙ্গু পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও সময়মতো প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সিডিসি, আইইডিসিআর, এমআইএস ও হাসপাতাল শাখার পরিচালকদের নিয়ে একটি সেল গঠন করা হয়েছে।
সাধারণত এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত এই মাসগুলোতে ডেঙ্গু রোগী বেশি হয়। অক্টোবরের দিকে এসে এটি কমতে থাকে। তবে এখন ডেঙ্গু শুধু মৌসুমের রোগ নয়, এটি সারা বছরের একটি রোগ। জনস্বাস্থ্যবিদদের ধারণা, বর্ষা শেষ হওয়ার এক-দেড় মাস পর্যন্ত ডেঙ্গু বাড়তে পারে। সাধারণত জুলাই-আগস্ট মাসে ডেঙ্গু ‘পিকে’ থাকে বা সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ দেখা দেয়। তবে সরকার জোরালো কোনো কর্মসূচি না নিলে ডেঙ্গুর প্রকোপ অক্টোবরের পরও প্রলম্বিত হতে পারে। এডিস মশার ডিম পাড়ার জায়গাগুলো ধ্বংস করতে হবে। ডেঙ্গু এখন শুধু শহরে সীমাবদ্ধ নয়, গ্রাম পর্যায়েও ছড়িয়ে পড়েছে। সম্প্রতি বরিশাল বিভাগের জেলাগুলোতে ডেঙ্গু রোগী বেশি দেখা যাচ্ছে। একসময় ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হতো শুধু রাজধানী ঢাকাতেই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ সংক্রমণের দেশব্যাপী বিস্তার ঘটেছে।
জুনের প্রথম সপ্তাহের তথ্যে বলা হচ্ছে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৬৩টিতেই এডিস মশার ঘনত্ব নির্ধারিত সূচকের চেয়ে বেশি ছিল। এর মধ্যে ২৭টি ওয়ার্ড ডেঙ্গুর জন্য ‘চরম ঝুঁকিপূর্ণ’।
মশা বৃদ্ধির উপযুক্ত পরিবেশ মশার ভাইরাস বিস্তারের অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। তাই মশার বংশবিস্তার রোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার। ডেঙ্গুর চিকিৎসা দেরিতে হলেও প্লাটিলেট কমে যায় এবং মৃত্যুঝুঁকি বাড়ে। তাই ডেঙ্গুর সংক্রমণ ও মৃত্যুঝুঁকি কমানোর একমাত্র উপায় মশার বংশবিস্তার রোধ করা। এ ক্ষেত্রে কীটতত্ত্ববিদদের পরামর্শ কাজে লাগাতে হবে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতা বাড়াতে নাগরিকদেরও সম্পৃক্ত করতে হবে। জেলা বা গ্রাম পর্যায় থেকে যারা রাজধানী ঢাকায় ডেঙ্গু চিকিৎসা নিতে আসেন, অনেক সময় চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে পরিবারগুলোকে হিমশিম খেতে হয়। বেশি সংক্রমণ এলাকায় জেলা এবং উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত রাখতে হবে; যাতে রাজধানীর হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ না পড়ে। এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ ও চিকিৎসায় সিটি করপোরেশন ও স্থানীয় সরকারগুলোর জনসম্পৃক্ততা বাড়িয়ে একটি বিজ্ঞানভিত্তিক ও কার্যকর সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আশা করি, সরকার এ ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।
