
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ বন্ধে বড় রকমের অগ্রগতি হয়েছে। এর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ীভাবে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হলো। স্থায়ীভাবে যদি না-ও হয়, আপাতত যে বড় রকমের সংঘাতের সম্ভাবনা নেই, সেটা নিশ্চিত করে বলা যায়। এর কারণ দেশ দুটি প্রাথমিকভাবে এমন একটি চুক্তিতে সই করেছে, যার প্রভাবে আপাতত যুদ্ধের দামামা বাজবে না মধ্যপ্রাচ্যে।
চুক্তির বিষয়টি যদিও পূর্ণাঙ্গ রূপে কোনো পক্ষই প্রকাশ করেনি, তবে যেটুকু গণমাধ্যমে এসেছে, তাতে প্রাথমিক এই চুক্তির লক্ষ্য হচ্ছে আপাতত যুদ্ধ বন্ধ করা এবং স্থায়ী কূটনৈতিক সমাধানের পথে এগিয়ে যাওয়া। বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে আলোচনার পর ১৭ জুন যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে দেশ দুটি এই চুক্তিতে সই করে। চুক্তির শর্ত অনুসারে যুদ্ধ শুধু যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে বন্ধ থাকবে না, লেবাননসহ সব ফ্রন্টে স্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধে সম্মত হয়েছে তারা। চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য এবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ৬০ দিন ধরে আলোচনা করবে। তবে সেই স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছানোর আগেই এমন কিছু সিদ্ধান্তের কথা জানা যাচ্ছে, যা আগে কখনো ঘটেনি।
যুদ্ধ, তা যে ধরনেরই হোক, তাতে ক্ষয়ক্ষতি হবেই। এই যুদ্ধেও তা-ই হয়েছে। উভয় পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৪০ দিনের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়ে গেছে। ইরান সরকারের হিসাবেই দেখা যাচ্ছে, তাদের ক্ষতি হয়েছে প্রায় ২৭০ বিলিয়ন ডলার। আল-জাজিরা গত মার্চে জানিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানে ৩ হাজার ৫১৯ জন নিহত হন। আহত হন ২৬ হাজার ৫০০ জনের বেশি মানুষ। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। লেবাননে ইসরায়েলের হামলায় হাজার হাজার মানুষ নিহত ও লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
একইভাবে ক্ষতির মুখে পড়ে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলো ও ইসরায়েল। ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলায় অন্তত এক ডজন মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং মিত্র দেশগুলোর অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি ছিল সবচেয়ে বড় ঘটনা। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ বিশ্ববাজারকে কাঁপিয়ে দিলে তেলের দাম বেড়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানকে সেভাবে কাবু করতে পারেনি, যেমনটা তারা চেয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের পত্রপত্রিকাতেই স্বীকার করা হচ্ছে, ইরানে যুদ্ধ বাধিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চরম ভুল করেছেন। এই যুদ্ধের ফলে যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক দিক থেকে আগের তুলনায় দুর্বল হয়ে পড়েছে। এর অভিঘাত আগামী বহু বছর যুক্তরাষ্ট্রকে ভোগাবে। যুদ্ধ শুরুর পর ট্রাম্প বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত বিজয়’ অর্জন করবে এবং ইরানকে ‘শর্তহীন আত্মসমর্পণ’ করতে হবে। তিনি ইরানে সরকার পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। কিন্তু এর কোনোটিই ঘটেনি। ইরানে কট্টরপন্থি সরকার বহাল আছে। পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে আগামী দুই মাস আলোচনা হবে।
সব মিলিয়ে চার মাসের এই যুদ্ধে ইরানের বিশাল ক্ষয়ক্ষতি হলেও দেশটি কৌশলগত বিজয় অর্জন করেছে। ইরানের জব্দ হওয়া সম্পদ ছেড়ে দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এই সম্পদ অবমুক্ত হলে ইরান সেই সম্পদ দিয়ে পুনর্গঠন ও উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হবে। একইভাবে ইরানের তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল বিক্রির ওপর থেকে সাময়িকভাবে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়েছে। এতে ইরানের বিপর্যস্ত অর্থনীতি আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।
পরিস্থিতি এমন যে অবিশ্বাস থাকলেও উভয় পক্ষই খুশি। তবে সবচেয়ে বড় স্বস্তির বিষয় হয়ে উঠবে আমাদের মতো পৃথিবীর অবশিষ্ট দেশগুলোর জন্য। এই চুক্তির ফলে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল আবারও স্বাভাবিক হবে। তেলের দাম যেভাবে বেড়ে গিয়েছিল, তাতে আকস্মিকভাবে আমাদের জ্বালানি পরিস্থিতি অস্থির হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রসহ পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে যায়। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বাংলাদেশের কয়েক লাখ মানুষ কাজ করেন। তারা জীবন ও কাজের অনিশ্চয়তায় ছিলেন। এখন যুদ্ধের আশঙ্কা না থাকায় তারা আবার স্বাভাবিকভাবে কাজ করে যেতে পারবেন। শ্রমবাজার সম্প্রসারিত হওয়ারও সম্ভাবনা বাড়বে। আমাদের অর্থনীতির যে ধমনি রেমিট্যান্স, তার প্রবাহও স্বাভাবিক থাকবে বলে আশা করা যায়।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের ‘সাময়িক’ চুক্তি ‘স্থায়ী’ চুক্তিতে পরিণত হোক। এ জন্য যা যা করণীয় তা এই দেশ দুটি করবে বলে আমরা প্রত্যাশা করছি। বিশ্বের মানুষ প্রকৃতপক্ষে শান্তি চায়। শান্তিতেই সমৃদ্ধি।
