
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফরের অংশ হিসেবে মালয়েশিয়া ও চীন সফর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এ সফরের গুরুত্ব ও তাৎপর্য বহুমাত্রিক। এর মাধ্যমে বিএনপি সরকার একরৌখিক পররাষ্ট্রনীতি থেকে বের হয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির পথে চলতে শুরু করেছে। ভূ-রাজনীতি ও অর্থনীতির নতুন সমীকরণে সরকারের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ সামনে এসেছে। প্রধানমন্ত্রীর এ সফর বাংলাদেশ চীনের সরাসরি বিনিয়োগ আকর্ষণের ওপর জোর দিচ্ছে। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে চীনে তাদের প্রথম বৈদেশিক অফিস খোলার ঘোষণা দিয়েছে। বাংলাদেশের ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী, রপ্তানিকারক, প্রবাসী বাংলাদেশি, অর্থনীতির বিশ্লেষকসহ অনেকে এ সফরকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন। বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় সবাই চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিকভাবে কাজ করতে চায়। বাংলাদেশ যদি একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারে, তাহলে বড় ধরনের চীনা বিনিয়োগ এ দেশে আনা সম্ভব হবে।
চীন সফরকে সামনে রেখে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে চীন ৯৮ শতাংশেরও বেশি বাংলাদেশি পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধা দিচ্ছে। এ সুবিধার আওতায় এসব পণ্য চীনে রপ্তানির পরিমাণ বহু গুণ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগকারীদের কারখানা স্থাপনে উৎসাহিত করতে হবে। চীনা বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে উৎপাদিত পণ্য চীনে রপ্তানি করে ঘাটতি কমানো সম্ভব।
শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্যে চীন বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি রাষ্ট্র। বাংলাদেশের সঙ্গেও দেশটির বহুমুখী বাণিজ্য সম্পর্ক রয়েছে। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক ইতিবাচক হলেও বাংলাদেশের বাণিজ্যঘাটতি থেমে নেই। এ ঘাটতি প্রতিনিয়তই বাড়ছে। তাই সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঘাটতি কমাতে চীন থেকে আমদানি কমিয়ে রপ্তানি বাড়াতে হবে। তথ্য মতে, বর্তমানে বাংলাদেশ-চীন দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশ থেকে চীনের রপ্তানি প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের, বিপরীতে চীন থেকে আমদানি ১৮ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। এই বিশাল বাণিজ্যঘাটতি কমাতে চীনের বাজারে যথাযথ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তাদের শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধাকে কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, চীন-বাংলাদেশ বাণিজ্যঘাটতি কমাতে হলে চীনে রপ্তানি বাড়াতে হবে। এজন্য বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী পণ্যে বৈচিত্র্য আনতে হবে। চীনের বাজারে পণ্যের চাহিদা বাড়াতে হলে পণ্যের গুণগত মান, পণ্য বৈচিত্র্যকরণে মনোযোগ বাড়াতে হবে। বিশ্ববাণিজ্যে শীর্ষ এই দেশটির সঙ্গে বাণিজ্যঘাটতি কমানো যথেষ্ট কঠিন।
বাংলাদেশ-চীন বাণিজ্যঘাটতি বেড়েই চলেছে। এ ঘাটতি দূরীকরণে স্থানীয় পণ্যের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
আন্তর্জাতিক মানের পণ্য রপ্তানি করতে হবে অর্থাৎ পণ্যের মাননিয়ন্ত্রণ, পণ্যের বৈচিত্র্যকরণ এবং বিপণন নেটওয়ার্ক বাড়াতে হবে। যাতে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে আনা যায়। এ ছাড়া শিল্প খাতে যেসব কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে সেগুলো কাটিয়ে উঠতে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। রপ্তানিমুখী শিল্পকে গতিশীল করতে গবেষণা বাড়াতে হবে। আমরা আশা করছি, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর বাংলাদেশ-চীন বাণিজ্যঘাটতি এবং অর্থনৈতিকসংকট দূরীকরণে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করবে।
