সোমবার ২৯ জুন ২০২৬
১৫ আষাঢ় ১৪৩৩
ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্প দুর্যোগ প্রস্তুতিতে বাংলাদেশের করণীয়
ড. মো. আব্দুল মোমেন
প্রকাশ: সোমবার, ২৯ জুন, ২০২৬, ১২:৫৬ এএম আপডেট: ২৯.০৬.২০২৬ ১:০৫ এএম |

 ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্প দুর্যোগ প্রস্তুতিতে বাংলাদেশের করণীয়
সম্প্রতি দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় মাত্র ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে আঘাত হানা ৭.২ ও ৭.৫ মাত্রার প্রলয়ংকরী জোড়া ভূমিকম্প বিশ্ববাসীকে প্রকৃতির রুদ্ররূপের সামনে দাঁড় করিয়েছে। দেশটির রাজধানী কারাকাসসহ উত্তর-কেন্দ্রীয় অঞ্চলে শতাব্দীর ভয়াবহতম এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে মুহূর্তের মধ্যে ধসে পড়েছে অসংখ্য বহুতল ভবন, অচল হয়ে পড়েছে যোগাযোগ ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো এবং প্রাণ হারিয়েছেন শতাধিক মানুষ। ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ এখনো নিরূপণ করা সম্ভব না হলেও, এ ঘটনাটি বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এবং তীব্র ভূমিকম্প ঝুঁকিতে থাকা দেশের জন্য এক চরম ও জরুরি সতর্কবার্তা। ভূমিকম্পের মতো মহাবিপর্যয়কে রুখে দেওয়ার সাধ্য মানুষের নেই। কিন্তু সঠিক পূর্বপ্রস্তুতি ও সতর্কতার মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি এবং প্রাণহানি যে বহুলাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব, সেটিই বিজ্ঞানের চরম সত্য। মহান আল্লাহ না করুন, ভেনেজুয়েলার মতো এমন জোড়া বা একক কোনো শক্তিশালী ভূকম্পন যদি আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি, বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় আঘাত হানে, তবে আমাদের পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে এবং তা সামাল দিতে আমাদের কী প্রস্তুতি প্রয়োজন–সেটি আজ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে এবং বৈজ্ঞানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দৃষ্টিকোণ থেকে ভাবার সময় এসেছে।
ভূতাত্ত্বিক অবস্থানগত কারণে বাংলাদেশ দীর্ঘকাল ধরেই ভূমিকম্পের এক বিশাল এবং সক্রিয় ডেডজোনের ওপর অবস্থান করছে। আমাদের উত্তর ও পূর্বে ভারতীয়, ইউরেশীয় ও বার্মিজ প্লেটের সংযোগস্থল বা বাউন্ডারি রয়েছে, যা রিখটার স্কেলে ৮ মাত্রারও বেশি শক্তিশালী মেগা আর্থকোয়েক তৈরি করতে সক্ষম। বিশেষ করে মধুপুর ফল্ট, ডাউকি ফল্ট এবং সিলেট-চট্টগ্রামের সাবডাকশন জোনগুলো দীর্ঘ সময় ধরে ভূগর্ভে বিপুল পরিমাণ শক্তি সঞ্চয় করে চলেছে। বিজ্ঞানী ও দুর্যোগ বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করছেন যে, বাংলাদেশে যেকোনো সময় বড় ধরনের ভূমিকম্প আঘাত হানতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি মানসিক ও পরিকাঠামোগতভাবে আসলেই প্রস্তুত? ভেনেজুয়েলার সাম্প্রতিক ট্র্যাজেডি থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের রাষ্ট্রীয়, প্রাতিষ্ঠানিক, ব্যবসায়িক এবং সামাজিক পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট পূর্বপ্রস্তুতি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং টিকে থাকার লড়াই।
সরকারি পর্যায়ে সবচেয়ে প্রাথমিক ও জরুরি পদক্ষেপ হলো ‘ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড’ (বিএনবিসি)-এর কঠোর, আপসহীন এবং দুর্নীতিমুক্ত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। ভেনেজুয়েলায় ২২ তলার বহুতল ভবন ধসে পড়ার প্রধান কারণ হিসেবে প্রাথমিক তদন্তে ভবনের কাঠামোগত দুর্বলতা এবং নির্মাণসামগ্রীর নিম্নমানের বিষয়টি উঠে এসেছে। আমাদের দেশে, বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম বা সিলেটের মতো মেগা সিটিগুলোয় অপরিকল্পিত আবাসন এবং ভবন নির্মাণ বিধিমালা বা রাজউকের নিয়ম লঙ্ঘনের এক ভয়াবহ মহোৎসব চলছে। রাজউক, সিডিএ বা স্থানীয় পৌর কর্তৃপক্ষগুলোকে শুধু কাগজে-কলমে নকশা অনুমোদন করলেই চলবে না; ভবন নির্মাণকালে শতভাগ ভূমিকম্প সহনীয় প্রযুক্তির সঠিক প্রয়োগ হচ্ছে কি না, তা মাঠপর্যায়ে কঠোরভাবে তদারকি করতে হবে। একই সঙ্গে শহরের পুরোনো এবং অতি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোকে বৈজ্ঞানিক উপায়ে চিহ্নিত করে জরুরি ভিত্তিতে ‘রেট্রোফিটিং’ বা শক্তিশালীকরণ করতে হবে, অন্যথায় সেগুলোকে ভেঙে ফেলার জন্য কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে।
ভূমিকম্পের মূল কম্পনের চেয়েও পরবর্তী অনুষঙ্গ বিষয়, যেমন-গ্যাস লাইনের লিকেজ থেকে অগ্নিকাণ্ড এবং বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট অনেক সময় বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটায়। ভেনেজুয়েলার ঘটনায় দেখা গেছে, মূল কম্পনের সঙ্গে সঙ্গেই স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির মাধ্যমে শহরের গ্যাস ও বিদ্যুৎ লাইন বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল, যা একটি বড় ধরনের বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ড থেকে শহরটিকে রক্ষা করেছে। আমাদের দেশেও বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগের ক্ষেত্রে অবিলম্বে স্বয়ংক্রিয় শাট-অফ সংবলিত স্মার্ট গ্রিড প্রযুক্তি প্রবর্তন করা প্রয়োজন।
পাশাপাশি, ভূমিকম্প-পরবর্তী অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানের সক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি করা দরকার। আমাদের ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স এবং সশস্ত্র বাহিনীকে আরও আধুনিক জিপিএস ট্র্যাকার, লাইভ ডিকটেটর ড্রোন, থার্মাল ইমেজিং ক্যামেরা এবং ভারী রাবল-রিমুভার বা ধ্বংসস্তূপ সরানোর অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির মাধ্যমে সুসজ্জিত করতে হবে। ঢাকার মতো পুরোনো ও ঘনবসতিপূর্ণ শহরের সরু গলিগুলোয় যেন উদ্ধারকারী যান ও ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি সহজে পৌঁছাতে পারে, সে জন্য এখনই দীর্ঘমেয়াদি নগর পুনর্বাসন পরিকল্পনা এবং রাস্তা প্রশস্তকরণ প্রকল্প হাতে নেওয়া দরকার।
একটি বিপণন ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ের শিক্ষক হিসেবে আমি মনে করি, দুর্যোগ-পরবর্তী পরিস্থিতি ও ক্ষয়ক্ষতি সামাল দিতে ‘স্ট্র্যাটেজিক লজিস্টিকস ও সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ভূমিকম্পের পর প্রথম কয়েক ঘণ্টার মধ্যে লাখ লাখ আহত ও গৃহহীন মানুষের জন্য তাৎক্ষণিক খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, জরুরি জীবন রক্ষাকারী ওষুধ এবং অস্থায়ী আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতে হয়। ভেনেজুয়েলার প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটির রানওয়েতে ফাটল ধরায় এবং এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আন্তর্জাতিক উদ্ধার তৎপরতা ও ত্রাণ পৌঁছাতে ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে। এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশ সরকারকে দেশের প্রধান বিমানবন্দর ও মহাসড়কগুলোর বিকল্প ব্যাকআপ ব্যবস্থা প্রস্তুত রাখতে হবে। দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ‘ডিজাস্টার রিলিফ হাব’ বা জরুরি রসদ ভাণ্ডার গড়ে তুলতে হবে, যেখানে আপৎকালীন সময়ের জন্য শুকনো খাবার, পানি বিশুদ্ধকরণ কিট এবং জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জাম সব সময় মজুত থাকবে। এটি দুর্যোগের প্রথম গোল্ডেন আওয়ার বা ৭২ ঘণ্টায় হাজারো জীবন বাঁচাতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখবে।
ভূমিকম্পের মতো মেগা দুর্যোগের প্রস্তুতি কেবল সরকারের একার পক্ষে নেওয়া সম্ভব নয়। এখানে অন্যান্য স্টেকহোল্ডার, বিশেষ করে করপোরেট সেক্টর, বেসরকারি সংস্থা (এনজিও), গণমাধ্যম এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাপক ও সমন্বিত ভূমিকা রয়েছে। দেশের বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর তাদের করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার তহবিলের একটি নির্দিষ্ট অংশ জাতীয় দুর্যোগ প্রস্তুতি, গবেষণা এবং কমিউনিটি-ভিত্তিক উদ্ধারকর্মী তৈরিতে বরাদ্দ করা উচিত। আমাদের এনজিওগুলো তৃণমূল পর্যায়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় দক্ষ, তাদের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চল ও ওয়ার্ড পর্যায়ে ভলান্টিয়ার বা স্বেচ্ছাসেবী দল গঠন করে উন্নত প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে।
গণমাধ্যমগুলোর দায়িত্বকেবল দুর্যোগ ঘটে যাওয়ার পর ক্ষয়ক্ষতির লাইভ কভারেজ বা সংবাদ পরিবেশন করা নয়, বরং দুর্যোগের আগে নিয়মিত জনসচেতনতামূলক ও শিক্ষণীয় ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা। দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, বিশেষ করে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত তিন মাস পরপর বাধ্যতামূলক ‘আর্থকোয়েক ড্রিল’ বা ভূমিকম্প মহড়া আয়োজন করা উচিত। ফলে নতুন প্রজন্ম ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা জানতে পারবে যে, ভূমিকম্পের প্রথম কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আতঙ্কিত না হয়ে কীভাবে নিজেদের রক্ষা করতে হয় (যেমন-ড্রপ, কভার অ্যান্ড হোল্ড অন পদ্ধতি)।
ভূমিকম্প এমন এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ যার কোনো পূর্বাভাস আজ পর্যন্ত বিজ্ঞান দিতে পারেনি। ভেনেজুয়েলার জোড়া ধাক্কা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রকৃতির আদালতে মানুষের অবহেলা, দুর্নীতি বা অসচেতনতার কোনো ক্ষমা নেই। সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার, রাজউক এবং নগর পরিকল্পনাবিদদের সমন্বয়ে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন স্বায়ত্তশাসিত ‘জাতীয় ভূমিকম্প প্রস্তুতি ও বাস্তবায়ন সেল’ গঠন করে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজ শুরু করা এখন সময়ের দাবি।
আল্লাহতায়ালা আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করুন। তবে পবিত্র কোরআনেও বলা হয়েছে, মানুষ নিজের ভাগ্য নিজে পরিবর্তন না করলে আল্লাহ তার ভাগ্য পরিবর্তন করেন না। তাই স্রষ্টার ওপর ভরসা রাখার পাশাপাশি আমাদের নিজেদের সর্বোচ্চ বৈজ্ঞানিক ও বাস্তবিক প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে হবে। ভেনেজুয়েলার এই প্রলয়ংকরী ট্র্যাজেডি থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা যদি আজ অবহেলা ও উদাসীনতা ঝেড়ে জেগে না উঠি, তবে আগামীর যেকোনো একটি বড় ভূকম্পন আমাদের চিরতরে শতাব্দীর সবচেয়ে বড় মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিতে পারে।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান
মার্কেটিং বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ













http://www.comillarkagoj.com/ad/1752266977.jpg
সর্বশেষ সংবাদ
হকারদের পার্কিং ভাড়া দিলে ভবন মালিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা
কাটাবিলে গুলিবিদ্ধ স্কুলছাত্র ইথানকে দেখতে ঢাকা মেডিকেলে এমপি মনিরুল হক চৌধুরী
ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্প দুর্যোগ প্রস্তুতিতে বাংলাদেশের করণীয়
আগাম প্রস্তুতি ও সমন্বিত পদক্ষেপ কাম্য
কুমিল্লায় জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন উদ্বোধন
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
কুমিল্লায় নকলওষুধের বড় চালান জব্দ, উৎপাদন চক্রের সদস্য আটক
লালমাইয়ে যুবককে ডেকে নিয়েগলা কেটে হত্যার অভিযোগ
ইথানের শরীর থেকে গুলি বের করা যা নি এখনো
গোলাবাড়ির কারবারিদের ধরলে মাদক সরবরাহ অর্ধেক কমবে
মাদকবিরোধী জোটের উদ্যোগে মানববন্ধন
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: newscomillarkagoj@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২