
চীনের দালিয়ানে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ১৭তম বার্ষিক সভা (২৩-২৫ জুন) ‘অ্যানুয়াল মিটিং অব দ্য নিউ চ্যাম্পিয়ন্স’ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আজ এই সভার শেষ দিন। গত পরশু এই ফোরামেরই ‘ক্লাইমেট লিডারশিপ ইন আ শিফটিং গ্লোবাল ল্যান্ডস্কেপ’ শীর্ষক অধিবেশনে বক্তব্যদেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় বৈশ্বিক সংহতি, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং যৌথ দায়িত্ববোধের ভিত্তিতে কার্যকর আন্তর্জাতিক সহযোগিতার আহ্বান জানান। সেই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশ সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারভিত্তিক কর্মপরিকল্পনাও তুলে ধরেন।
জলবায়ু সংকট বর্তমান বিশ্বের অন্যতম প্রধান সমস্যা। মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কারণে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে আবহাওয়া ও প্রকৃতিতে ঘটে চলেছে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর পরিবর্তন। ভৌগোলিক অবস্থান, নিচু বদ্বীপ অঞ্চল এবং ঘনবসতির কারণে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পৃথিবীর সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। জলবায়ু সংকট এখানে দূরবর্তী আশঙ্কা নয়, প্রতিদিনের বাস্তব সংকট। প্রায় এক দশক ধরে এই আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ সক্রিয় ভূমিকা রেখে চলেছে। জলবায়ু মোকাবিলায় বাংলাদেশের নিজস্ব উদ্যোগ ও নেতৃত্ব প্রশংসিত হয়েছে। বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশ কেবল সাহায্যপ্রার্থী নয়, বরং জলবায়ু অভিযোজনে নিজের সক্ষমতা ও টিকে থাকার লড়াইয়ের কারণে গ্লোবাল লিডার হিসেবে স্বীকৃত।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতিক্রিয়ায় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও উপকূল প্লাবন (দক্ষিণাঞ্চল), উপকূলীয় এলাকার স্থায়ী ভূখণ্ডের বিলুপ্তি, জলবায়ু উদ্বাস্তু, লবণাক্ততা ও সুপেয় পানির সংকট, কৃষিতে ধস, স্বাস্থ্যঝুঁকি, আকস্মিক বন্যা ও নদীভাঙন, হাওরাঞ্চলে আকস্মিক বন্যা, তীব্র খরা ও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর হ্রাস, মরুকরণ ও শস্যহানি, তীব্র তাপপ্রবাহ ও শহরে স্বাস্থ্যঝুঁকি, রোগব্যাধির বিস্তার ইত্যাদি সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে বাংলাদেশ। দালিয়ানে প্রধানমন্ত্রী কীভাবে এই সংকট মোকাবিলা করা হবে, আগামী পাঁচ বছরের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। এ সময় ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন-পুনর্খনন, পদ্মা ও তিস্তা অববাহিকার পানি ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন, ২৫ কোটি বৃক্ষ রোপণ, সবুজ শিল্পের বিকাশে পাটশিল্প ও পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক ভেহিকেল চালু এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ ২০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যের কথা জানান।
এই সম্মেলনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের মূল লক্ষ্য হচ্ছে, অধিকতর বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, জলবায়ু সহনশীলতা ও টেকসই উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও অংশীদারত্বের সঙ্গে আরও গভীরভাবে সংযুক্ত করা। একই সঙ্গে বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি আস্থাশীল ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর তারেক রহমান এই প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ করলেন। বাংলাদেশ জলবায়ু সমস্যাসংক্রান্ত যে লক্ষ্যের কথা তিনি এই সামার দাভোসে তুলে ধরেছেন, আশা করা যায়, সেই লক্ষ্য আগামী পাঁচ বছরে অর্জিত হবে। দালিয়ান সম্মেলনে প্রযুক্তি উদ্ভাবনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে বৈশ্বিক এই ফোরাম। বৈঠকে এশিয়ার উদ্ভাবনীর কেন্দ্রে থাকবে ‘ইকোসিস্টেম’ বা প্রকৃতিকেন্দ্রিক ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়। এশিয়ার অগ্রগতি ও দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির জন্য প্রযুক্তির নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করা হবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ভুক্তভোগী দেশগুলোর নেতারা।
অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং দ্রুত প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের এই সময়ে বৈঠকটি বাস্তবসম্মত সমাধানের ওপর আলোকপাত করার যে সুযোগ সৃষ্টি করেছে, বাংলাদেশকে তা গ্রহণ করতে হবে। জলবায়ু সংকট একদিনে যেমন সৃষ্টি হয়নি, তেমনি দু-তিন বছরে এসব সংকটের সমাধান হবে না। পূর্র্ববতী সরকারের যেসব উদ্যোগ ইতিবাচক ছিল, সেসবও লক্ষ্য হিসেবে বর্তমান সরকার নিজের পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করতে পারে। ঐক্যবদ্ধ বৈশ্বিক সহযোগিতার পাশাপাশি বাংলাদেশের অভ্যন্তরেও সমগ্র জাতিকে এই সংকট দূর করার বিষয়ে এগিয়ে আসতে হবে। প্রধানমন্ত্রী নিজেও দালিয়ানে বলেছেন, সমৃদ্ধি, স্থিতিশীলতা এবং একটি যৌথ ভবিষ্যতের জন্য সবাই মিলে সবুজ, নিরাপদ, টেকসই এবং আরও ন্যায়সংগত ভবিষ্যৎ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করতে হবে। জাতি হিসেবে টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশের এ ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। তবে একক কোনো দেশ নয়, যারা প্রধানত দায়ী, সেই ধনী দেশগুলোকে উন্নত প্রযুক্তি ও পর্যাপ্ত অর্থায়নের মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধানে এগিয়ে আসতে হবে। অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেই আমাদের পৃথিবী রক্ষা পেতে পারে।
