উন্নয়ন খাতে সর্বাধিক বরাদ্দ, রাজস্ব আয়ের বড় ভরসা কর, অনুদান ও নিজস্ব আয়
নিজস্ব প্রতিবেদক।। কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের (কুসিক) ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের জন্য ১ হাজার ৫৯৬ কোটি ৮৪ লাখ ৫৫ হাজার ৮৪৮ টাকার প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে। এটি কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বাজেট। গত ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের এ সিটিতে বাজেট ছিল ৯৯৭ কোটি ৩১ লাখ ৯১ হাজার ৬৫২ টাকা। সেই হিসাবে নতুন অর্থবছরে বাজেটের আকার বেড়েছে ৫৯৯ কোটি ৫২ লাখ ৬৪ হাজার ১৯৬ টাকা, যা প্রায় ৬০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
প্রস্তাবিত বাজেটে মোট আয়ের বিপরীতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ২২৬ কোটি ৬৬ লাখ ৪০ হাজার ২২৩ টাকা। বাকি অর্থ সমাপনী স্থিতি ও বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। বাজেটে নগরীর অবকাঠামো উন্নয়ন, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, সড়ক নির্মাণ ও সংস্কার, পানি সরবরাহ, পরিচ্ছন্নতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সড়কবাতি, স্বাস্থ্যসেবা, সমাজকল্যাণ এবং চলমান উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
সোমবার সকালে কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের সম্মেলন কক্ষে সিটি লেভেল কোঅর্ডিনেশন কমিটি (পিএলসিসি) এর সভায় সিটি কর্পোরেশনের ২০২৬ ও ২০২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করেন সিটি প্রশাসক ইউসুফ মোল্লা টিপু।
এসময় উপস্থিত ছিলেন সিটি কর্পোরেশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী মোহাম্মদ মামুন, প্রধান নির্বাহী প্রকৌশলী আবু সায়েম ভূঁইয়া, সচেতন নাগরিক কমিটির সাবেক সভাপতি শাহ মুহাম্মদ আলমগীর খান, কুমিল্লা প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি আবুল হাসনাত বাবুল, কুমিল্লার কাগজের সম্পাদক আবুল কাশেম হৃদয়, সাংবাদিক গাজীউল হক সোহাগ ও জাহিদুল রহমান।
উপস্থাপিত প্রস্তাবিত বাজেট বিবরণী বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, রাজস্ব আয়ের ক্ষেত্রে কুসিক নিজস্ব আয় বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে রাজস্ব হিসাব (উপখাত-১) থেকে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৯০ কোটি ৪৮ লাখ ৮০ হাজার টাকা। এর মধ্যে করসমূহ থেকে ৭০ কোটি ৩৪ লাখ টাকা, অনুদান থেকে ৩৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং অন্যান্য রাজস্ব খাত থেকে ১৬১ কোটি ৯৮ লাখ টাকা আয় ধরা হয়েছে। ফলে এ চারটি উৎস থেকে মোট রাজস্ব আয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৬২ কোটি ৩০ লাখ ৮০ হাজার টাকা। এছাড়া পানি শাখায় রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে ৮ কোটি ৭০ লাখ টাকা এবং অন্যান্য আয় ১৮ লাখ টাকা, অর্থাৎ পানি শাখার মোট আয় ৮ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। উন্নয়ন খাতে সরকারি, বৈদেশিক সহায়তাপ্রাপ্ত এবং নিজস্ব অর্থায়নের বিভিন্ন প্রকল্প থেকে বিপুল অর্থের সংস্থান রাখা হয়েছে।
উন্নয়ন বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যায়, সরকারি ও বৈদেশিক সহায়তাপ্রাপ্ত চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের পাশাপাশি কুসিকের নিজস্ব অর্থায়নে একাধিক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। উন্নয়ন খাতে মোট ৮৪৭ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব রাখা হয়েছে, যা পুরো বাজেটের সবচেয়ে বড় অংশ। এই অর্থ নগরীর সড়ক ও ড্রেন নির্মাণ, জলাবদ্ধতা নিরসন, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নগর সৌন্দর্যবর্ধন, জনস্বাস্থ্য উন্নয়ন এবং অন্যান্য অবকাঠামোগত উন্নয়নে ব্যয় করা হবে।
ব্যয়ের খাতগুলোতে দেখা যায়, সাধারণ সংস্থাপন খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩০ কোটি ১৯লাখ ৭৫ হাজার টাকা। নিরাপত্তা খাতে ২ লাখ টাকা, স্বাস্থ্য ও জনস্বাস্থ্য খাতে ১ কোটি ২৮ লাখ টাকা, পরিচ্ছন্নতা খাতে ১৮ কোটি ৯০ লাখ টাকা, বিদ্যুৎ প্রক্ষেপণ ও সড়কবাতি খাতে ১৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা, সমাজকল্যাণ ও বস্তি উন্নয়ন খাতে ৫ কোটি ২৫ লাখ টাকা এবং বিবিধ খাতে ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এছাড়া উন্নয়ন ব্যয়ের পাশাপাশি সমাপনী স্থিতি হিসেবে ৪৮৫ কোটি ৭৫ লাখ ২২ হাজার টাকা সংরক্ষণের প্রস্তাব রয়েছে।
বাজেটে পানির সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পানি শাখার পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং সেবা সম্প্রসারণের জন্য পৃথক আয়-ব্যয়ের পরিকল্পনা রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি, কর ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং অনুদাননির্ভর উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া বাজেটে চলমান ও নতুন উন্নয়ন প্রকল্পের মধ্যে সরকারি ও বৈদেশিক সহায়তাপ্রাপ্ত প্রকল্প, কুসিকের নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়নযোগ্য প্রকল্প এবং বিভিন্ন চলতি উন্নয়ন কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। নগরীর নাগরিক সেবা সহজীকরণ, পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জলাবদ্ধতা নিরসন, সড়ক যোগাযোগের উন্নয়ন, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ এবং আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এ বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে।
