নৃত্যগুরু জি. এ. মান্নান:

কুমিল্লা
শহরের দক্ষিণে টমছমব্রিজ পেরিয়ে শাকতলা গ্রাম। সে গ্রামেই ১৯৩০ সালের ৮
জুন মো. আলিমুদ্দিনের ঘরে জন্মগ্রহণ করেন জি. এ. মান্নান (১৯৩০-১৯৯০)।
চাকুরির নথি অনুযায়ী তাঁর নাম গাজী আলিমুদ্দিন মান্নান। চার ভাই, তিন বোনের
মাঝে ভাইয়েদের মধ্যে তিনি তৃতীয়। মাত্র আট বছর বয়সে তিনি কুমিল্লার ‘বাণী
বিতান’ সংগীত বিদ্যালয়ে তবলা বাদক হিসেবে প্রশিক্ষণ শুরু করেন।
এ সময়
কুমিল্লার আরেক কৃতি নৃত্যশিল্পী শান্তি বর্ধনের বম্বের (বর্তমান মুম্বাই)
লিটল ব্যালে ট্রুপের একটি অনুষ্ঠান হয় কুমিল্লা টাউন হলে। সে নৃত্যানুষ্ঠান
দেখে কিশোর জি. এ. মান্নান ঘর পালিয়ে নৃত্য শিক্ষার জন্য চলে যান বম্বে।
সেখানে গিয়ে তিনি যোগ দেন শান্তি বর্ধনের লিটল ব্যালে ট্রুপে।
এ
প্রসঙ্গে তৎকালিন সমতল ত্রিপুরা জেলার (বর্তমান কুমিল্লা) ভারত বিখ্যাত
নৃত্যশিল্পীদের কয়েকজনকে নিয়ে আলোচনা করি। আজকের কুমিল্লা অতীতের ত্রিপুরা।
ত্রিপুরা অঞ্চলে নৃত্যের প্রচলন ছিল আদিকাল থেকে। কুমিল্লার লালমাই
ময়নামতি পাহাড়ের প্রত্নকৃতির মাঝে আমরা তা দেখতে পাই। খ্রিষ্টীয় অষ্টম
শতাব্দীতে নির্মিত শালবন বিহারের অঙ্গবিন্যাস ও মুদ্রায় স্থানীয় অর্থাৎ
লোকায়ত নৃত্যরতদের ছবি দেখা যায়। পরবর্তীতে মুসলমান আমলেও এখানকার লোকনৃত্য
চর্চার ধারা ছিল। মধ্যযুগেও কুমিল্লা জেলায় নৃত্যশিল্পের অনুশীলন করা হতো।
তৎকালে সমতল কুমিল্লার নানা অঞ্চলে ঢাকি নৃত্য, ঢোলি নৃত্য, জারি নৃত্য,
বাউল নৃত্য, ধামালি নৃত্য, গাজন নৃত্য, ঘাটু নৃত্য, বৌ নাচ, লাঠি নাচ,
ঝুমুর নাচ, খেমটা নাচ, বিয়ের জল ভরনের নাচ, কীর্তন নাচ, মাইজভান্ডরি নাচ
প্রভৃতির প্রচলন ছিল। বিগত দিনে সমতল ত্রিপুরায় কুমিল্লা অঞ্চলের যারা
নৃত্যের সঙ্গে জড়িত ছিলেন তাঁদের মধ্যে কয়েকজনের বর্ণনা এখানে দেয়া হলো।
একটি
তথ্যে জানা যায়, প্রায় তিনশত বছর আগে শ্রীমতি চন্দ্রপ্রভা দেবী নৃত্য
প্রদর্শন করে ত্রিপুরা রাজ্যে খ্যাতি লাভ করেন। তার বাড়ি ছিল সমতল ত্রিপুরা
অঞ্চলে।
ধ্রুপদি ও আধুনিক রীতির নৃত্যের অনুশীলন ও প্রদর্শন করে যারা
দেশে বিদেশে অকুণ্ঠ প্রশংসা কুড়িয়েছেন তাঁদের কয়েকজনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য
মণি বর্ধন। ১৯০৫ সালে বৃহত্তর কুমিল্লা জেলার (বর্তমান ব্রাহ্মণবাড়িয়া)
কৈদর গ্রামে জন্মগ্রহণকারী মণি বর্ধন ঈশ^র পাঠশালা থেকে প্রবেশিকা ও ১৯২৮
সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে গ্রাজুয়েট হন। এরপর চাকুরিসূত্রে আসামে
থাকাকালিন মণিপুরী নাচে আকৃষ্ট হয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে চাকুরি ছেড়ে নৃত্যে
মনোনিবেশ করেন। তিনি ইন্দোনেশিয়ার জাভা ও বালি দ্বীপের নৃত্যের কায়দা কানুন
শিখেন। তিনি ভারত নাট্যম, মণিপুরী, কত্থক, কথাকলি, জাভানিজ, বালি, জাপানি
প্রভৃতি নৃত্যরীতিতে পারদর্শিতা অর্জন করেন। ১৯৬১ সাল থেকে মৃত্যুর আগ
পর্যন্ত তিনি ভারত সরকারের কলা বিভাগের সহকারী অধিকর্তা ছিলেন। প্রথম জীবনে
তিনি বংশীবাদক ছিলেন।

শান্তিদেব ঘোষ: বৃহত্তর কুমিল্লা জেলার চাঁদপুর
মহকুমার বাজাপ্তি গ্রামে শান্তিদেব ঘোষের জন্ম। তিনি একাধারে সংগীত ও নৃত্য
পটিয়সী ছিলেন। তিনি সংগীত ও নাটক নিয়ে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে, সিংহল,
বালি, যবদ্বীপ, প্রভৃতি ভ্রমণ করেন। রবীন্দ্রনাথ প্রবর্তিত নৃত্যকলার
বিকাশে শান্তিদেব ঘোষ ছিলেন কবির দক্ষিণহস্ত। কবি তাঁকে সুরসেন নটরাজ বলে
ডাকতেন। (মাসিক বসুমতী, ফাল্গুন ১৩৬৩ বঙ্গাব্দ)
কুমিল্লার গোমতি পাড়ের
পাঁচথুবি গ্রামের একই বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন চারজন নৃত্যশিল্পী- মণিশঙ্কর
চক্রবর্তী, তাঁর কনিষ্ঠ ভ্রাতা মুকুন্দলাল চক্রবর্তী, আরেক ভ্রাতা
গোবিন্দলাল চক্রবর্তী এবং মণিমঙ্কর কন্যা মায়া চক্রবর্তী (মুখার্জী)। এরা
সবাই রবীন্দ্র ভারতী বিশ^বিদ্যালয় হতে নাচে ডিপ্লোমা গ্রহণ করেন। ১৯১৪ সালে
জন্মগ্রহণকারী মািণশঙ্কর চক্রবর্তী কুমিল্লা ঈশ^র পাঠশালায় পড়াকালিন
কুমিল্লা টাউন হলে মহারাজ বসুর নৃত্য সম্প্রদায়ের নৃত্য দেখে নৃত্যের প্রতি
অনুরাগ জন্ম হয়। কলকাতায় তিনি নৃত্য শিক্ষক হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করেন।
২০২৩
সালে আমার মায়ের মৃত্যুর পর তাঁকে টমছমব্রিজ কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।
তাঁর কবরের দুটি কবরের দক্ষিণে উপমাহাদেশের প্রখ্যাত যন্ত্রসংগীত শিল্পী
ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁ এর সমাধি। ২০০৭ সালে তাঁর ছেলে বাংলাদেশ শিল্পকলা
একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক মোবারক হোসেন খাঁন ও আমি পৌরসভাকে বলে তাঁর
সমাধিটি সংস্কার করার চেষ্টা করি কিন্তু হয়নি। ৮০ দশক থেকে ওস্তাদ আয়েত আলী
খাঁ এর উপর আমার কিছু লেখা পত্রিকায় ছাপা হয়। তারপর আহসানুল কবীর এ নিয়ে
লেখেন এবং ইতোমধ্যে আমার বন্ধু এক্সিম ব্যাংকের স্বপনকে দিয়ে সমাধির কাঠামো
কিছুটা ঠিক করে তাঁর জন্মমৃত্যুর এফিটাপ লাগাই। তার আরও পরে আমার নাটকের
ছাত্র হালিম সৈকত ও সাংবাদিক জাহাঙ্গীর আলম ইমরুল জেলা প্রশাসক থেকে ৫০,০০০
টাকা অনুদান নিয়ে সমাধির কাঠামোটি ইট বালি সিমেন্ট দিয়ে গড়ে তোলে কিন্তু
অযত্ন অবহেলায় তা আবার পূর্বের রূপ ধারণ করে। ২০২৫ সালে কুমিল্লা সিটি
কর্পোরেশনে বরুড়ার ছেলে যুগ্ম সচিব মো. শাহ আলম যোগ দিলে তাঁকে আমি ওস্তাদ
আয়েত আলী খাঁর কবরটি সংস্কার করার পাশাপাশি এদেশের আরেকজন কৃতিশিল্পী
শাকতলা নিবাসী ১৯৮২ সালে একুশে পদক ১৯৮৪ সালে কুমিল্লা কুমিল্লা ফাউন্ডেশন
পদকপ্রাপ্ত, আমার নৃত্যের পার্টনার নাগমা গাজীর বাবা গাজী আলিমৃদ্দিন
মান্নান যিনি এ অঙ্গনে জি. এ. মান্নান নামে পরিচিত তাঁর কবরটিও সংস্কার
করার অনুরোধ করে দরখাস্ত করি। ১৯৯০ সালের ৩০ মার্চ জি. এ. মান্নানকে
টমছমব্রিজ তার পরিবারের অন্যান্যদের সাথে কবর দিলেও তার আত্মীয় স্বজনের
সাথে যোগাযোগ করে তা নির্ধারণ করা যায়নি। তাই ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁর
সমাধিটিকে ঠিক রেখে তার পাশেই আলাদা করে জি. এ. মান্নানের স্মৃতি সংরক্ষণ
করা হয়।
এ লেখার একটাই কারণ এ সমাধি ক্ষেত্রেটি করতে গিয়ে একজনের বৈরী
মনোভাবে আমাকে অনেক মানসিক যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছে। এবং সেদিন থেকেই আমি
ঠিক করেছি জি. এ. মান্নানকে নিয়ে আমি লিখব। ঢাকা, কুমিল্লা বহু জায়গায় ঢুঁ
মেরে তাঁর নৃত্যজীবনের কোনো লেখালেখি পাইনি। শুধু কুমিল্লা জেলার ইতিহাস
(প্রকাশকাল ১৯৮৩) গ্রন্থে পাই তিনি কুমিল্লার সন্তান। এরপর ঢাকায় গিয়ে তাঁর
ছাত্রছাত্রীদের দু’একজনকে খুঁজে বের করলাম কিন্তু অনেকেই প্রয়াত তবে
একজনকে পেলাম তাঁর বর্তমান বয়স ৮৮, সংগীত ও নৃত্যশিল্পী আমানুল হক। প্রায়
দুই ঘণ্টা তাঁর সঙ্গে কথা হলো। এছাড়া জি.এ. মান্নানের ছাত্রী দীপা খন্দকার,
কন্যা রেশমা, তাঁর ছাত্র মাহফুজ, সুধীর সেনের মেয়ে সুনন্দা সেন, কুমিল্লার
তপন দাশগুপ্তা, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সাবেক সংগীত পরিচালক কাজী
হাবলু এদর সাথে কথা বললাম।
তবে জি. এ. মান্নানের বিষয়ে যিনি আমাকে পথের
দিশা দিয়েছেন তিনি তাঁর ছাত্রী দীপা খন্দকার, যিনি ১৯৭২ সাল থেকে জি. এ.
মান্নােেনর কাছে নাচ শিখেছেন এবং তাঁর স্মরণে প্রতিষ্ঠা করেছে জি. এ.
মান্নান নৃত্যকলা একাডেমি। দীপা খন্দকার তার অধ্যক্ষ।
এবার ২০২৫ সালের
নৃত্য দিবসে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি ঢাকায় গিয়ে তাঁর সাক্ষাৎকার নিলাম।
তার কথায় বেরিয়ে আসলো অনেকের নাম। গোলাম মোস্তফা, হাসান ইমাম, মাইদুল ইসলাম
গেদু, লায়লা হাসান যারা ৫৩, ৫৪ সালে তার সমসাময়িক বা ছাত্রছাত্রী, মনজুর
চৌধুরী, গোলাম মোস্তফা খান, আবুল কাশেম, মাইনুল ইসলাম, জিনাত বরকতউল্লাহ
এবং ৮৮ বৎসর বয়স্ক সংগীত ও নৃত্যশিল্পী আমানুল হক। উপরে উল্লেখিত অনেকেই
প্রয়াত হয়েছেন।
অনেক খুঁজেও জি. এ. মান্নানের নাচের কোনো ছবি পাচ্ছিলাম
না। কুমিল্লা এসে নৃত্য প্রশিক্ষক ছোট ভাই মামুনের কাছে মাহফুজুর রহমানের
লিখা ‘বাঙালির সংস্কৃতি ও বাঙালির নৃত্যকলা’ নামে একটি বইয়ের পাতায় ১৯৬২
সালে জি. এ. মান্নানের সাড়া জাগানো নৃত্যনাট্য নকশী কাঁথার মাঠে জি. এ.
মান্নানের সাথে রাফিজা খানম ঝুনুর (প্রয়াত) নৃত্যরত একটি ছবি পেলাম।
যোগাযোগ করলাম ঝুনু আপার মেয়ের সাথে কিন্তু তার কাছে কিছুই পেলাম না। দীপা
খন্দকারের কাছ থেকে জি. এ. মান্নানের বড় মেয়ে রেশমার ফোন নাম্বার পেলাম
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে তার বাবা সম্পর্কে কিছুই তিনি জানাতে
পারেননি কারণ তখন তিনি ছোট ছিলেন। তবে ৭০ এর দশক থেকে কিছু কিছু স্মৃতি তার
কাছ থেকে পেলাম।
আসলে জি. এ. মান্নান একজন নিখাদ শিল্পী ছিলেন। তিনি
তাঁর জীবনে শুধু দিয়েছেন কিছু চানওনি, কিছু পানওনি। রেশমার কাছ থেকে
বঙ্গবন্ধুর সাথে একটি ছবি এবং ৭২ সালে নৃত্যের দল নিয়ে ভারতের দিল্লীতে
অনুষ্ঠান শেষে তৎকালিন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাথে একটি
গ্রুপ ছবি ও জি. এ. মান্নানের সংগ্রামী জীবনের কিছু কথা পেয়েছি এবং তখনই
জানলাম অনাদর অবহেলায় তার ছোটবোন নাগমার মৃত্যুর কথা। কিন্তু আমি জানি
নাগমা ছিল বাবার যেগ্য উত্তরসূরি। নাগমা বহু চলচ্চিত্রের নৃত্যপরিচালক
ছিল।
রেশমাও ছিল বিটিভির অনুষ্ঠান সংগঠক। উইকেপিডিয়া খুঁজেও জি. এ.
মান্নান সম্পকে তেমন কিছু জানা যায়নি। তবে সেখানে একটি ডাক টিকেট পেলাম, যা
জি. এ মান্নানের মৃত্যুর পর বাংলাদেশ ডাক বিভাগ স্মারক ডাক টিকেট হিসাবে
প্রকাশ করেছে। যার মূল্যমান ৬ টাকা। আমার শরীর শিহরিত হলো, কুমিল্লার একজন
সংস্কৃতি নাট্য সংগঠক হিসাবে আমার বুকটা ফুলে উঠলো। কুমিল্লার আর কারো নামে
বাংলাদেশ ডাক বিভাগ স্মারক ডাক টিকেট প্রকাশ কজরেছে কিনা আমার জানা নেই।
শিল্পী
আমানুল হক (৮৮) এর সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে তৎকালিন পাকিস্তানের রাজধানী
রাওয়ালপিন্ডিতে ১৯৬২ সালে জসীম উদ্দীনের নকশি কাঁথার মাঠ নৃত্যনাট্যের একটি
গ্রুপ ছবি যাতে আমার কুমিল্লার সুবল দাশ ও তপন দাশগুপ্তাও ছিলেন। আমার
নাচের শিক্ষক তপনদির সাথে কথা বলতে গিয়ে বেরিয়ে আসলো অনেক অজানা তথ্য কারণ
সুবল দাশ ও তপন দাশগুপ্তা ৫০ এর দশকে পুরনো ঢাকার বলবুল ললিতকলা একাডেমির
পাশে জি. এ. মান্নানেন সাথে বহু নাচে অংশগ্রহণ করেছেন এবং তৎকালে উদর্ুু
ছবি ‘ইয়ে ভি এক কাহানি হ্যায়’ ছবিতে জি. এ. মান্নানের পরিচালনায় নৃত্য
করেছেন। এই প্রেক্ষিতে আমার একটি নস্টালজিক ঘটনা বলার লোভ সংবরণ করতে পারছি
না। একবার ঢাকা নিউ মার্কেট ঘুরতে গিয়ে আক্স স্টুডিওর সামনে একটি বোর্ডে
নৃত্যরত এক নারীর ছবির নিচে তপন দাশগুপ্তার নাম দেখে ছবি তুলে এনে তপনদিকে
দেখাতে তিনি এ ছবির কথা বলেছিলেন। এই ছবির চিত্রগ্রাহক ছিলেন ‘ইয়ে ভি এক
কাহানি হ্যায়’ এর চিত্রগ্রাহক। সে আমলে এই মডেল ছবির জন্য তপনদি ৫০০ টাকা
পেয়েছিলেন। জি. এ মান্নান এরপর বহু ছবিতে নৃত্য পরিচালক ছিলেন। ছবিগুলো
হচ্ছে- আসিয়া, এ দেশ তোমার আমার, রাজধানীর বুকে, যে নদী মরুপথে, হারানো
দিন, নয়নতারা, কুমিল্লার সন্তান অশোকতলার এস. এম. শফির দি রেইন, যার নায়িকা
ছিলেন শফির স্ত্রী অলিভিয়া, নায়ক ওয়াসিম, লাল সবুজের পালা, জোকার, তওবা,
মৌ চোর, চাঁপা ডাঙার বউ, সহযাত্রী, রাই বিনোদিনী প্রভৃতি।
জি. এ.
মান্নান নাচের নেশায় চল্লিশ দশকে ঘর থেকে পালিয়ে বম্বেতে শান্তি বর্ধনের
দলে যোগ দিয়েছিলেন। শান্তি বর্ধন নিজের জেলার একজন ছেলেকে পেয়ে খুশি
হয়েছিলেন। তিনি তাঁকে মণিপুরী নাচ শেখার জন্য ত্রিপুরা রাজ্যের মণিপুরে
পাঠান। তখন ত্রিপরা রাজ্য ছিল সংগীত, নৃত্য, সংস্কৃতিতে এক সমৃদ্ধ রাজ্য।
শচীন দেববর্মন তখন বম্বের খ্যাতিমান সংগীত পরিচালক। রাজার ছেলে রাজা না হয়ে
হয়েছেন সংগীতজ্ঞ।
জি. এ. মান্নান মণিপুর এসে শান্তি বর্ধনের গুরু
আমুবা সিংয়ের কাছে মণিপুরী নৃত্য শিখে ফিরে যান বম্বে। শান্তি বর্ধন জি. এ.
মান্নানের পরিবারের আদরের ডাক নাম মনু পরিবর্তন করে নাম রাখেন মনীশ কুমার।
তখনকার সময়েও হিন্দু মুসলিম মৌলবাদের প্রভাব ছিল। যে কারণে নজরুলের গজল ও
ইসলামী গান গাওয়ার জন্য অনেক হিন্দু মুসলিম নাম ধারণ করতেন। আবার
কীর্তন-শ্যামা সংগীত গাওয়ার জন্য অনেক মুসলিম হিন্দু নাম ধারণ করে গান
গাইতেন। সে আরেক ইতিহাস।
সে সময় জি. এ. মান্নানের সাথে পরিচয় হয়
কুমিল্লার সন্তান শচীন দেববর্মন ও রাহুল দেববর্মনের সাথে। জি. এ. মান্নানের
ভাইয়ের মেয়ে আমার সংগঠনের ইমতিয়াজ রিশাদের মা ফাতেমা পারভীনের কাছ থেকে
জানা যায়, জি. এ. মান্নান শচীন দেববর্মন ও রাহুল দেববর্মনের অনেক ছবিতে কাজ
করেছেন। তখন বম্বেতে ছিল কুমিল্লার নৃত্য শিল্পীদের জয়জয়কার। শান্তি
বর্ধনের লিটল ব্যালে ট্রুপের সাথে মনীশ কুমারের (জি. এ. মান্নান) নামও
ছড়িয়ে পড়ে। লিটল ব্যালে ট্রুপ ভারতবর্ষ ছাড়াও চিন, ইন্দোনেমিয়া, শ্রীলঙ্কা
প্রভৃতি দেশে সাংস্কৃতিক বিনিময় করে। ১৯৫৪ সালে মাত্র ৩৮ বছর বয়সে শান্তি
বর্ধন মারা যায়। শান্তি বর্ধনের স্ত্রী কুমিল্লারই মেয়ে প্রভাবশালী
নৃত্যশিল্পী গুণা বর্ধন তার হাল ধরেন। তখন জি. এ. মান্নানের বয়স ২৪ থেকে
২৫।
১৯৫৫ সালে জি. এ মান্নান চিন গিয়ে চিনা অ্যাক্রোবেটিক, নাচ,
লাইটিং, স্টেজ ডিজাইনের উপর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এদিকে ১৯৫৪ সালে
কিংবদন্তি নৃত্যশিল্পী বুলবুল চৌধুরীর মৃত্যুর পর পূর্ব পাকিস্তানে নৃত্যে
শিল্পে শূন্যতা সৃষ্টি হয়। নৃত্যশিল্পী আমানুল হক তাঁর সাক্ষাৎকারে বলেন,
বুলবুল চৌধুরীর মৃত্যুর পর তৎকালিন মন্ত্রী চট্টগ্রামের হাবিবুল্লাহ বাহার
চৌধুরী বুলবুল চৌধুরীর স্মরণে বুলবুল ললিতকলা একাডেমি গঠন করেন এবং জি. এ.
মান্নানেকে সেখানে যোগ দেয়ার অনুরোধ করেন। জি. এ. মান্নান বুলবুল ললিতকলা
একাডেমিতে যোগ দেয়ার পর প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের ধারায় নৃত্য পরিবিশন করে
বিপুল সাড়া ফেলে দেন। বুলবুল ললিতকলা একাডেমিতে থাকাকালিন তিনি ১৯৫৮ সালে
বরিশালের মেয়ে সৈয়দা শাসসুন্নেসা বিলুর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বুলবুল
ললিতকলা একাডেমিতে থাকাকালিন তিনি কুমিল্লায় এসে কুমিল্লার ছেলেমেয়েদের
নাচের তামিল দিতেন। তাঁর মাঝে ছিলেন তপন দাশগুপ্তা, সুনন্দা সেন, ইলেভেন
সিস্টারদের তিন বোন কাজী শাহানা, কাজী হেলেনা, কাজী মেহেরজান প্রমুখ। তখন
একজিবিশন মাঠে, টাউন হলে কুমিল্লা ও বুলবুল ললিতা একাডেমির ছাত্রছাত্রীতের
নিয়ে নৃত্যনাট্য পরিবেশন করতেন। তার মাঝে উল্লেখযোগ্য দুটি ঘটনা-
বন্যার্তদের সাহায্যার্থে ভার্নাল থিয়েটারের হয়ে নৃত্যনাট্য পরিবেশন ও
বিশিষ্ট নজরুল গবেষক মোহাম্মদ আবদুল কুদ্দুস প্রতিষ্ঠিত মডার্ন স্কুলের
জন্য (পূর্বের নাম চিলড্রেনস হোমস) নৃত্য পরিবেশন করে অর্থ জোগাড় করেছেন।
(সূত্র তপন দাশগুপ্তা)
৬০ এর দশকে প্রতিষ্ঠিত হয় শিল্পীদের নিয়ে
ন্যাশনাল একাডেমি অব পারফর্মিং আর্টস। সে সময় জি. এ. মান্নানের অনবদ্য
সৃষ্টি যা আজ পর্যন্ত নৃত্যজগতে কিংবদন্তি হয়ে আছে- কবি জসীমউদ্দীনের ‘নকশি
কাঁথার মাঠ, যা প্রথম প্রদর্শিত হয়েছিল ঢাকার ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউটে।
নকশি কাঁথার মাঠ সম্পর্কে তৎকালিন ইংরেজি ও বাংলা পত্রিকাগুলোর ভাষ্য
হচ্ছে, এ ধরনের নৃত্য কেউ কখনো দেখেনি। নকশি কাঁথার মাঠে পাশ্চাত্যের
ব্যালে নৃত্যকে কাজে লাগিয়ে বাঙালি সংস্কৃতিকে তুলে ধরা হয়েছে। গ্রামীণ
সংগীত, সুর, ছন্দ, সুখ-দুঃখ এবং সেটলাইট ছিল অনবদ্য। এই নৃত্যের গ্রন্থনা ও
পরিকল্পনায় ছিলেন এ কে এম মোস্তফা, সংগীত পরিচালনা করেন ওস্তাদ খাদেম
হোসেন খান। গানে কণ্ঠ দেন বেদারউদ্দিন আহমেদ, নীনা হামিদ ও সহশিল্পীবৃন্দ।
নির্দেশনায় জি এ মান্নান। তিনি নকশি কাঁথার মাঠের মূল চরিত্র রুপাই এবং
রাফিজা খানম ঝুনু সাজু চরিত্রে অভিনয় করেন। সেদিন ইঞ্জিনিয়ারিং
ইনস্টিটিউটের প্রতিটি দর্শক বিষ্ময়ে নৃত্যনাট্যটি দেখেছিল। নকশী কাঁথার
মাঠের লেখক কবি জসীমউদ্দীন দর্শক সারিতে ছিলেন। (উইকেপিডিয়া)
নকশি
কাঁথার মাঠ সে বছরেই ইরাক, ইরানে মঞ্চস্থ হয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে খ্যাতি
লাভ করে। নকশি কাঁথার মাঠ ছাড়াও জি এ মান্নান সুজন বাদিয়ার ঘাট, ক্ষুধিত
পাষাণ, মহুয়া, কাশ্মিরী, অধিক খাবার ফলাও, হাজার তারের বীণা, আলী বাবা
চল্লিশ চোর, নবান্ন প্রভৃতি নৃত্যনাট্য নির্দেশনা দেন। জি. এ. মান্নানের
রাওয়ালপিন্ডি সফরে কুমিল্লার সুবল দাশ ও তপন দাশগুপ্তা, চিন সফরে কাজী
হাবলু ও জাপান সফরে অভিজিৎ সিনহা মিঠু অংশ নিয়েছিলেন। তাঁর খ্যাতি চারদিকে
ছড়িয়ে পড়লে মতের অমিল হওয়াতে বুলবুল ললিতকলা একাডেমি ছেড়ে এসে শান্তিনগরে
লায়লা আরজুমান্দ বানুর বাবার বাসার নিচে নিক্কন ললিতকলা একাডেমি প্রতিষ্ঠা
করেন। পাকিস্তানের রাজধানী রাওয়ালপিন্ডিতে শো করার পর পাকিস্তান
ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনস (পিআইএ) তাঁকে তাদের পারফর্মিং আর্টস একাডেমিতে
নৃত্য পরিচালক পদে নিয়োগ দেন। বিমানে চাকুরির সুবাদে ফ্রি টিকেটে ঢাকায়
এসেও কাজ করতেন। ১৯৭০ সালে লাহোরের একটি অনুষ্ঠান শেষে পরিবার নিয়ে পূর্ব
পাকিস্তানে চলে আসেন এবং আর ফিরে যাননি। সে সময় জি. এ. মান্নান বাংলাদেশ
স্বাধীন হওয়ার আগ পর্যন্ত উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলে শনি ও রবিবার নৃত্যের
ক্লাস চালাতেন।
এছাড়াও তিনি দল নিয়ে মধ্যপ্রাচ্য, জার্মানী, ভারত,
রাশিয়া, নেপাল, ইটালী, ইন্দোনেশিয়া, চীন, জাপান প্রভৃতি দেশে নৃত্যনাট্য
প্রদর্শন করেন। তাঁর নাচের মধ্যে একক একটি নাচ ‘জেলে নৃত্য’ বিখ্যাত ছিলো।
জি.
এ. মান্নানের বড় মেয়ে রেশমা বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১০ই
জানুয়ারি ১৯৭২ সালে দেশে এলে তিনি তাঁর সাথে দেখা করেন। পিআইএতে কর্মরত
থাকাকালিন বঙ্গবন্ধুর সাথে তাঁর ঘনিষ্টতা হয়। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান সফরে
গেলে তাঁকে তিনি প্রটোকল দিতেন। রেশমা তখন ছোট। নাগমা আরও ছোট। রেশমা গর্ব
করে বলেন, বাবা অনেক সময় ধানমন্ডি ৩২এ বঙ্গবন্ধুর সাথে নাস্তার টেবিলে
মিলিত হতেন। সে সময় বঙ্গবন্ধু জি. এ. মান্নানকে থাকার ও নিক্কন ললিতকলা
একাডেমি শুরু করার জন্য বেইলি রোডে একটি বাড়ি দেন। একসময় তাঁদেরকে সেই বাড়ি
থেকে উচ্ছেদ করা হয়। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে জি. এ. মান্নানের একান্ত আলাপের
একটি ছবি রেশমার কাছ থেকে পাই। বঙ্গবন্ধু তাঁকে বাংলাদেশ ন্যাশনাল একাডেমি
অব পারফর্মিং আর্টস এ নৃত্য প্রশিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেন। দীপা খন্দকার
(বর্তমান অধ্যক্ষ, জি এ মান্নান ললিতকলা একাডেমি), তাঁর সাথে কথা বলে জানা
যায় ৭২ অথবা ৭৩ এ একটি সাংস্কৃতিক দল ভারতের সব উল্লেখযোগ্য শহরে অনুষ্ঠান
পরিবেশন করে দিল্লীতে অনুষ্ঠান শেষে তৎকালিন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা
গান্ধীর সাথে সাক্ষাৎ করেন। সে দলে দীপা খন্দকারও ছিলেন। সে অনুষ্ঠানে
সংগীত পরিচালক ছিলেন সমর দাস, গ্রন্থনা ড. মনিরুজ্জামান, বিষয় বাংলাদেশের
মুক্তিযুদ্ধ। নির্দেশনায় নৃত্যনাট্য সম্রাট জি. এ. মান্নান। তার সাথে ছিলেন
গওহর জামিল ও আলতামাস আহমেদ। বাংলাদেশ নৃত্য সংস্থা জি. এ. মান্নানেকে
নৃত্যগুরু উপাধি দেয়।
১৯৭৯ সালে ন্যাশনাল একাডেমি অব পারফর্মিং আর্টস
বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সাথে একীভূত হয়ে গেলে জি. এ. মান্নান নৃত্য
বিভাগের পরিচালক নিযুক্ত হন। ১৯৮২ সালে তিনি একুশে পদক লাভ করেন। ১৯৮৪ সালে
কুমিল্লা ফাউন্ডেশন কুমিল্লার এই কৃতি সন্তানকে স্বর্ণপদক প্রদান করে।
এছাড়াও তিনি দেশে বিদেশে প্রচুর সম্মাননায় ভূষিত হন।
৮০’র দশকের শেষ
দিকে ঢাকায় নিযুক্ত ফাদার রিগ্যানের আমন্ত্রণে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি
থেকে জি. এ. মান্নান নকশী কাঁথার মাঠ নিয়ে ইতালির বিভিন্ন শহরে তা প্রদর্শন
করেন এবং সেখানে জি. এ. মান্নান হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তার কিছুদিন পর
১লা মার্চ, ১৯৯০ তিনি ইন্তেকাল কারেন। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে প্রথম
জানাজা শেষে তাঁকে কুমিল্লার শাকতলায় তার নিজের বাড়িতে দ্বিতীয় জানাজা শেষে
টমছমব্রিজ কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।
পরিশেষে, জি. এ. মান্নান সম্পর্কে
তিন চার মাসে আমি যা সংগ্রহ করেছি তা পত্রিকার পাতায় তুলে ধরা সম্ভব নয়।
জি. এ. মান্নান সম্পর্কে যাদের কাছ যা কিছু কিছু সংগ্রহ করেছি এ লেখার মাঝে
কৃতজ্ঞতার সাথে উল্লেখ করার চেষ্টা করেছি। আমার এ লেখা আগামী কোনো গবেষকের
কাজে লাগলে আমি ধন্য হবো।
লেখক: নাট্যব্যক্তিত্ব
০১৭১১-১৪১০২৭