
আন্তর্জাতিক
সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ক্যাসপারস্কি এবং সিঙ্গাপুর ইনস্টিটিউট অব
টেকনোলজি পরিচালিত গবেষণায় অনলাইনে শিশুদের ডেটা নিরাপত্তায় অভিভাবকদের
ভূমিকা নিয়ে ইতিবাচক একটা ফলাফল লক্ষ্য করা যায়। দেশের বিভিন্ন
সংবাদমাধ্যমে এই খবরটা অতি গুরুত্বের সঙ্গে সংবাদ বিজ্ঞপ্তির বরাতে
প্রকাশিত হয়। কিন্তু গবেষণায় প্রাপ্ত উপাত্তগুলোর দিকে একটু মনোযোগ দিলেই
প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক যে, শিশুর সুরক্ষার উদ্বেগ কি এখানে গবেষণার
কেন্দ্রীয় বিষয়, নাকি এটা পণ্য বিপণনের নতুন কোনো কৌশল?
‘স্মল শেয়ারস,
বিগ রিস্ক: হাউ প্যারেন্টস অ্যাসেস থ্রেটস অ্যান্ড কোপ উইথ শেয়ারিং অফ
চিলড্রেন ডেটা’ শীর্ষক এই গবেষণার ফলাফলে সাব্যস্ত করা হয়, সতর্ক
অভিভাবকরাই সন্তানদের সাইবার ঝুঁকি থেকে নিরাপদ রাখছেন এবং এজন্য তারা কিছু
প্রতিরক্ষামূলক ‘ঢাল’ ব্যবহার করেন। এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন
অঞ্চলের ১৫২ জন অভিভাবকের মতামতের ভিত্তিতে পরিচালিত গবেষণাটির ফলাফল আমাকে
উদ্বেলিত করে তোলে, আশ্বাসও দেয়। গবেষণার উপাত্তগুলোর মাধ্যমে আসলে
অভিভাবকদের ‘সচেতন’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
আবার একই সঙ্গে ডিজিটাল
ঝুঁকির কথাও বারবার উল্লেখ করা হয়েছে। আর সবশেষে একটি নির্দিষ্ট
প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান হিসেবে ক্যাসপারস্কি সেফ কিডসের মতো পেইড টুল
ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তারা জানায়, এসব টুলের মাধ্যমে সন্তানের
অবস্থান, ডিভাইস ব্যবহারের অভ্যাস, স্ক্রিন টাইম ও কনটেন্ট ব্যবহারের ওপর
নজর রাখা যায়। এতে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, এটা কি কেবল সচেতনতা তৈরির
জন্য কোনো উদ্যোগ, নাকি নিরাপত্তার উদ্বেগকে বাণিজ্যিক চাহিদায় রূপান্তরের
কোনো কৌশল?
গবেষণায় অভিভাবকদের আত্মবিশ্বাসের মাত্রাটা দেখে আপাতত
নিশ্চিত হওয়াই যায় এই ভেবে যে, আমাদের শিশুরা অনলাইনে পুরোপুরি সুরক্ষিত।
কিন্তু প্রযুক্তির অন্তর্জাল কি এতটাই নিরেট? এই সুরক্ষা কৌশলের বলয়ে বন্দি
করে একটা শিশুকে হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে নিরাপদ রাখার ব্যবস্থা করা গেল,
কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এই নিরাপত্তা বেষ্টনী কি যথেষ্ট? অভিভাবক হিসেবে আমরা
হয়তো কারিগরি ঝুঁকিটা সামাল দিতে আত্মবিশ্বাসী, কিন্তু অ্যালগরিদমে শিশুটি
বোঝার আগেই যে তার একটি স্থায়ী ডিজিটাল পরিচয় তৈরি করে দিচ্ছি, সেটা কি
আমরা টের পাচ্ছি?
দুই.
গবেষণা থেকে প্রাপ্ত উপাত্তগুলো লক্ষ্য করলে
সহজেই বোধগম্য হয় যে, এর মূলে রয়েছে অনলাইনে সন্তানদের নিরাপদে রাখার
ক্ষেত্রে অভিভাবকদের গৃহীত পদক্ষেপের ওপর তাদের আত্মবিশ্বাস। কিন্তু
আশ্চর্যের বিষয় হলো, পুরো গবেষণায় একটিও এমন উত্তর নেই, যেটা থেকে অনুমান
করা যায় যে, অভিভাবকেরা বাস্তবে ‘এই পদ্ধতিগুলো মেনে চলেন কি না’!
তিন.
এই
গবেষণার ফলাফলটি মিডিয়ায় ‘সংবাদ’ হয়েছে প্রেস বিজ্ঞপ্তির বরাত দিয়ে
(গবেষণাটি কোনো একাডেমিক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে কি না-আমি নিশ্চিত নই;
ব্যক্তিগতভাবে গুগলে সার্চ করে খুঁজে পাইনি)। আমরা যারা সাংবাদিকতা নিয়ে
পড়াশোনা করেছি কিংবা মিডিয়া হাউজে কাজ করছি, আমরা জানি, সাধারণত প্রেস
বিজ্ঞপ্তি তৈরি করা হয় নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানের নতুন কোনো পণ্য,
ইভেন্ট, নীতি কিংবা প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিডিয়ায় প্রকাশের
মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে অবহিত করার জন্য। ক্যাসপারস্কির এই গবেষণা কি তবে
জনসচেতনতা তৈরির আড়ালে বাজার বিস্তারই মুখ্য বিষয়?
গবেষণায় দেখা যায়,
অভিভাবকরা শিশুটির স্কুলের নাম, বাসার ঠিকানা, জন্মতারিখ প্রভৃতি
ব্যক্তি-শনাক্তযোগ্য তথ্যগুলো (বা পারসোনালি আইডেন্টিফায়েবল ইনফরমেশন)
প্রদান করেন না। অর্থাৎ, এটার মাধ্যমে তারা সন্তানকে হ্যাকিং, জায়গা
শনাক্তকরণ কিংবা তাৎক্ষণিকভাবে সংগঠিত কোনো সাইবার অপরাধের ঝুঁকি থেকে
মুক্ত রাখলেন। আবার দেখা যায়, অভিভাবকেরা বাচ্চার ছবি বা তথ্য দেখার সুযোগ
কেবল পরিবার ও ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেন। যেহেতু বাইরের কোনো
অপরিচিত মানুষ এই ছবিগুলো দেখতে পাচ্ছে না, তাই তাদের সন্তান নিরাপদ-এটাই
তারা ভাবছেন। কিন্তু এটা কি একটা সন্তানের গোপনীয়তা রক্ষা করতে পারছে?
ব্যক্তি-শনাক্তযোগ্য
তথ্যগুলো প্রকাশ না করলেও তারা কিন্তু একটা শিশুর বিভিন্ন গল্প, ছবি কিংবা
তাদের অনুভূতিগুলোর কথা ঠিকই শেয়ার করছেন। অর্থাৎ, পুনরায় শেয়ার করার অপশন
বন্ধ রাখলেও, মেটাডেটা মুছে ফেললেও কিংবা শুধু পরিবারের মধ্যে তথ্যগুলো
শেয়ার করলেও অ্যালগরিদম কিন্তু ওই বাচ্চাটার শৈশবের গল্প, ছবিগুলো বিশ্লেষণ
করে তার একটা বাণিজ্যিক প্রোফাইল তৈরি করে ফেলছে।
ব্রিটিশ রাজনৈতিক
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কেমব্রিজ অ্যানালিটিকার ঘটনা সম্পর্কে আমরা অনেকেই
ওয়াকিবহাল (ক্যারোল ক্যাডওয়ালাডার ও এমা গ্রাহাম-হ্যারিসন, ‘দ্য কেমব্রিজ
অ্যানালিটিকা ফাইলস’, দ্য গার্ডিয়ান, ২০১৮)। ২০১৮ সালে তাদের বিরুদ্ধে
অভিযোগ উঠেছিল যে, তারা ফেইসবুকের কোটি কোটি ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য
তাদের অনুমতি ছাড়া সংগ্রহ করে ‘সাইকোগ্রাফিক প্রোফাইলিং’ করে। এ ধরনের
প্রোফাইলিং করার মাধ্যমে কোনো ব্যক্তির আগ্রহ, পছন্দ, মূল্যবোধ, জীবনধারা,
মানসিক প্রবণতা প্রভৃতি অনলাইন আচরণ বিশ্লেষণ করে তাদের একটি আচরণগত
প্রোফাইল তৈরি করা হয়। অর্থাৎ, স্বতন্ত্র মানুষটা কী ভাবে, কী পছন্দ করে,
কীভাবে প্রভাবিত হয়–সেটা ডেটার মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করা। সেই সময় অভিযোগ
হয়েছিল যে, কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা এ ধরনের প্রোফাইলিং তৈরি করেই সাধারণ
মানুষকে লক্ষ্যভিত্তিক রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন দেখিয়েছিল।
ঠিক একইভাবে
শিশুটির শৈশবের বিভিন্ন মুহূর্ত অনলাইনে শেয়ার করার মাধ্যমে সে বড় হওয়ার
আগেই, কিংবা তার বুঝমান হওয়ার আগেই অনলাইনে তার একটা পরিচয় তৈরি হচ্ছে।
শুধু যে তার পরিচয়ই তৈরি হচ্ছে এটাই নয়, বরং সে বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে একটি
পণ্য এবং সুনির্দিষ্ট ভোক্তা হিসেবেও গড়ে উঠছে। অর্থাৎ, তার শৈশবকে
বিশ্লেষণ করে অন্যান্য বিভিন্ন কোম্পানি লাভবান হচ্ছে।
আবার, গবেষণার
উপাত্ত অনুযায়ী, অভিভাবক তার সন্তানের যেকোনো কিছু পোস্ট করার আগে সন্তানের
অনুমতি নেওয়ার সক্ষমতার কথা বলেছেন। এখন প্রশ্ন হলো, তারা আসলে কার অনুমতি
নিচ্ছেন? ৫ বছর, ৮ বছর কিংবা ১০ বছরের একটা বাচ্চার কাছ থেকে? তারা কি
অনলাইনের এই পরিবেশটা সম্পর্কে জ্ঞান রাখে? তার এই সম্মতি আসলে কতখানি
কার্যকর? প্রকৃতপক্ষে, এই অনুমতি নেওয়ার বিষয়টাও আসলে অভিভাবকদের নিজস্ব
অপরাধবোধ বা দায় এড়ানোর একটি কৌশল ছাড়া আর কিছুই না! আর এই সুযোগটাও করে
দেয় তথাকথিত এই গবেষণায় রাখা প্রশ্নগুলো।
গবেষণাটা বিভিন্ন মিডিয়ায়
‘সংবাদ’ হিসেবে প্রকাশিত হয় প্রেস বিজ্ঞপ্তির সূত্র ব্যবহার করে এবং
প্রতিটা মিডিয়াই প্রায় অপরিবর্তিত ভাষায় হুবহু বিজ্ঞপ্তিটিই তুলে ধরে।
অর্থাৎ, বলা বাহুল্য, মিডিয়াগুলো একটি বহুজাতিক কোম্পানিকে বিনামূল্যে
প্রচারণার সুযোগ করে দেয়, হয়তো ভবিষ্যতে কোনো মূল্য পাওয়ার আশায়।
চার.
অনলাইনে
শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে অভিভাবকেরা যেমন সন্তানের গোপনীয়তা ও ঝুঁকি নিয়ে
চিন্তিত, একইভাবে শিক্ষক ও নীতিনির্ধারকেরাও বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে
দেখছেন। আবার সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন এই অভিভাবকেরা
স্বাভাবিকভাবেই মানসিকভাবে দুর্বলও হয়ে থাকেন। বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানটি এই
দুর্বলতাকেই পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করে শঙ্কিত অভিভাবকদের মধ্যে একধরনের ভয়
তৈরি করেছে। এবার এই ভয় থেকে মুক্তি পেতেই তারা সমাধান হিসেবে তাদের পণ্যের
কথা উল্লেখ করেছে! ক্যাসপারস্কির মতো বহুজাতিক কোম্পানিগুলো এই সংকটকে দূর
করার কোনো কাঠামোগত সমাধান অনুসন্ধানের কথা বলে না; বরং এটাকেই তারা
নিজেদের পণ্য বিক্রির একটি কৌশলগত বাণিজ্যিক সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করছে।
ক্যাসপারস্কির
এই গবেষণার পুরো সারবত্তা বিশ্লেষণ করলে 'আত্মবিশ্বাস-ভয়-সমাধান' চক্রকে
কেন্দ্র করে পণ্যের একধরনের বিপণন ব্যবস্থা দেখা যায়। গবেষণায় তারা
পরিসংখ্যান দিয়ে প্রমাণ করেছে যে, বর্তমান যুগের অভিভাবকরা অত্যন্ত ‘সচেতন’
এবং প্রযুক্তিগতভাবে ‘দক্ষ’। অর্থাৎ, তারা প্রাইভেসি সেটিংস ব্যবহার করেন,
মেটাডেটা মুছে ফেলেন, রি-শেয়ারিং বন্ধ রাখেন, তথ্য শেয়ার সীমিত পর্যায়ে
রাখেন প্রভৃতি। অর্থাৎ, গবেষণায় প্রথমেই অভিভাবকদের সচেতনতার কাঠামোতে
বন্দি করা হয়, যেটা তাদেরকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। অন্যদিকে হ্যাকিং,
ট্র্যাকিং ও ডিজিটাল ঝুঁকির বিষয়গুলোকে ক্রমাগত সামনে এনে একধরনের ভয়ের
সংস্কৃতিও গড়ে তোলা হয়।
এবার তাদের বিশেষজ্ঞদের দেওয়া নির্দেশিকার
মাধ্যমে প্রচ্ছন্ন ভাষায় তারা বলতে চাচ্ছে, গবেষণার মাধ্যমে যেহেতু
প্রমাণিত যে অনলাইন পরিসরে আপনি আপনার সন্তানের সুরক্ষায় সচেতনতার ক্ষেত্রে
আত্মবিশ্বাসী একজন অভিভাবক, সুতরাং আমাদের ‘ক্যাসপারস্কি সেফ কিডস’
সফটওয়্যার/অ্যাপটি আপনার জন্যই তৈরি করা! মিডিয়ায় কোনো ধরনের বিজ্ঞাপন না
দিয়ে বরং বিজ্ঞাপনী বার্তাটা গবেষণার মাধ্যমে পরোক্ষভাবে দেওয়া হলো আরকি!
মজার
বিষয় হলো, ‘ক্যাসপারস্কি সেফ কিডস’ সফটওয়্যার/অ্যাপটি কিন্তু সবার জন্যও
উন্মুক্ত নয়! কারণ, এটা ব্যবহার করার জন্য অভিভাবককে প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ
হতে হবে, আবার আর্থিক দিক থেকে সামর্থ্যবানও হতে হবে। যে অভিভাবক
ক্যাসপারস্কি সেফ কিডসের প্রিমিয়াম সাবস্ক্রিপশন ক্রয়ের সামর্থ্য রাখেন না,
বা নিয়মিত ফি দেওয়ার সামর্থ্য নেই যাদের, কিংবা যদি কোনো অভিভাবক
প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ না হন, সে ক্ষেত্রে তার সন্তান কি অনলাইনে অনিরাপদ
থাকবে? নিরাপত্তা কিংবা সুরক্ষার বিষয়গুলো যদি বাজারনির্ভর হয়ে ওঠে, তাহলে
ক্রমে সমাজের একটা শ্রেণিই যে এই সুবিধা ভোগ করবে-এটা বলতেও দ্বিধা নেই।
আমাদের
বুঝতে হবে, শিশুদের অনলাইনে নিরাপত্তা দেওয়ার প্রথম এবং প্রধানতম কাজই হলো
তাকে সেই পরিমণ্ডল সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে পুঙ্খানুপুঙ্খ জানানো। এই
পাঠদানকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে শ্রেণীকক্ষেও। আর অভিভাবক হিসেবে আমাদের
সতর্ক থাকতে হবে, নিরাপত্তার নামে কোনোভাবেই যেন আমরা আমাদের সন্তানের
শৈশবকে কর্পোরেট ডেটাবেজের পণ্য বানিয়ে না ফেলি, কিংবা কোনোভাবেই যেন
সমাজে নতুন কোনো বৈষম্যও সৃষ্টি না হয়ে যায়।
লেখক:সাংবাদিক
