ইসমাইল নয়ন।।
রাস্তা
সংস্কার হয়েছে, দূর হয়েছে খানাখন্দ। কিন্তু কমেনি যাত্রীদের পকেটের টান আর
ভোগান্তি। কুমিল্লা-বুড়িচং-ব্রাহ্মণপাড়া সড়কে সিএনজিচালিত অটোরিকশার ভাড়া
নৈরাজ্য এখন চরম আকার ধারণ করেছে। প্রশাসনের বেঁধে দেওয়া নিয়মের তোয়াক্কা
না করে একশ্রেণীর অসাধু চালক সাধারণ যাত্রীদের কাছ থেকে ইচ্ছেমতো অতিরিক্ত
ভাড়া আদায় করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে,
ব্রাহ্মণপাড়া থেকে কুমিল্লার শাসনগাছা পর্যন্ত সড়কটির দূরত্ব প্রায় ২১
কিলোমিটার। একসময় বন্যার কারণে সড়কটি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ায় এবং
ভাঙাচোরা রাস্তার অজুহাতে সিএনজিচালকরা ভাড়া ৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০-৮০
টাকা করেছিলেন। বর্তমানে সড়কটি ঢালাই ও পিচ ঢালাইয়ের মাধ্যমে সম্পূর্ণ
আধুনিক ও উন্নত করা হয়েছে। রাস্তা ভালো হলেও ভাড়া তো কমেইনি, উল্টো তা এখন
৮০ থেকে ১০০ টাকায় ঠেকেছে। আর সন্ধ্যা নামলেই এই চিত্র আরও ভয়াবহ রূপ নেয়;
তখন ভাড়া হাঁকানো হয় ১৫০ টাকা পর্যন্ত।
ভুক্তভোগী যাত্রীদের অভিযোগ, এই
সড়কে বিকল্প হিসেবে কোনো বাস সার্ভিস না থাকায় সিএনজি অটোরিকশাই একমাত্র
ভরসা। আর এই সুযোগটিকে কাজে লাগিয়ে চালকেরা একচেটিয়া ‘ভাড়া নৈরাজ্য’
চালাচ্ছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাঝেমধ্যে অভিযান চালানো হলেও তা
দীর্ঘস্থায়ী কোনো সমাধান আনছে না। উল্টো অভিযানের খবর পেলে চালকরা ওই
এলাকায় অটোরিকশা চালানো বন্ধ করে দেন, ফলে চরম ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ
যাত্রীরা।
গত ৩-৪ দিন আগে ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা প্রশাসন, সদর ইউপি
চেয়ারম্যান ও থানা-পুলিশ যৌথভাবে বৈঠক করে এই সড়কের ভাড়া ৬০ টাকা নির্ধারণ
করে দেয়। সিদ্ধান্তের পরদিন চালকেরা ৬০ টাকা করেই ভাড়া নেন। কিন্তু এর পরের
দিন থেকেই আবারও শুরু হয় আগের মতো ৮০ থেকে ১০০ টাকা আদায়।
এই সড়কে
প্রতিদিন চলাচলকারী জসীমউদ্দীন খান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "কাজের প্রয়োজনে
আমাকে প্রতিদিন ব্রাহ্মণপাড়া থেকে কুমিল্লা যেতে হয়। ২১ কিলোমিটার রাস্তার
জন্য আমাদের কাছ থেকে প্রতিদিন ৮০ থেকে ১০০ টাকা রাখা হচ্ছে। আর সন্ধ্যা
বা রাত হলে তো কথাই নেই, ১৫০ টাকার নিচে কেউ যেতেই চায় না।"
একই
ভোগান্তির কথা জানান ব্রাহ্মণপাড়ায় কর্মরত এক চাকরিজীবী নারী। তিনি বলেন,
"আমি প্রতিদিন কুমিল্লা থেকে এসে ব্রাহ্মণপাড়ায় অফিস করি। সকালবেলা আসার
সময় ৮০ টাকা লাগলেও, রাতে ফেরার সময় ১০০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত গুনতে হয়।
এই সড়ক নিয়ে আমরা সাধারণ যাত্রীরা চরম বিপাকে আছি।"
ভাড়া বৃদ্ধির বিষয়ে
জানতে চাইলে সিএনজি চালক আলী মিয়া বলেন, "রাস্তা ঠিক হয়েছে এটা সত্যি,
কিন্তু বাজারে গাড়ির সব ধরনের যন্ত্রাংশের দাম অনেক বেড়েছে। এছাড়া আমাদের
প্রতিদিনের সিএনজি জমা (মালিকের ভাড়া) ৫০০ টাকা থেকে বেড়ে ৭০০ টাকা হয়েছে।
সব মিলিয়ে ৬০ টাকা ভাড়ায় আমাদের পোষায় না, তাই বাধ্য হয়ে একটু বেশি নিতে
হচ্ছে।"
এ বিষয়ে ব্রাহ্মণপাড়া সদর ইউপি চেয়ারম্যান জহুিরুল হক ঠিকাদার
বলেন, "যাত্রী ভোগান্তি কমাতে আমরা নিয়মিত আনসার ও গ্রাম পুলিশ নিয়ে সিএনজি
স্টেশনগুলো মনিটরিং করছি। কিন্তু আমাদের চোখ ফাঁকি দিয়েই চালকেরা আবার
অতিরিক্ত ভাড়া আদায় শুরু করে দেয়।"
ব্রাহ্মণপাড়া থানার অফিসার ইনচার্জ
(ওসি) মোঃ ফারুক হোসেন জানান, "ভাড়া নৈরাজ্য বন্ধে পুলিশ তৎপর রয়েছে। আজও
(রবিবার) সিএনজি স্টেশন ও এর আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে
অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগে দুটি সিএনজি জব্দ করা হয়েছে। অন্যদেরও
কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে। অতিরিক্ত ভাড়া নিলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
সার্বিক
বিষয়ে ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মাহমুদা জাহান বলেন,
"জনসাধারণের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে এবং ভাড়া নৈরাজ্য বন্ধে প্রশাসন কঠোর
অবস্থানে রয়েছে। এর আগে আমরা সবার সাথে বসে ভাড়া নির্ধারণ করে দিয়েছিলাম।
যারা এই সিদ্ধান্ত অমান্য করে সাধারণ যাত্রীদের জিম্মি করছে, তাদের
বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হবে। কোনো
অবস্থাতেই এই নৈরাজ্য মেনে নেওয়া হবে না।"
