রোববার ৭ জুন ২০২৬
২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
গরমে স্বাস্থ্যসমস্যা ও করণীয়
অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ
প্রকাশ: শুক্রবার, ৫ জুন, ২০২৬, ১২:৪০ এএম আপডেট: ০৫.০৬.২০২৬ ১:২৪ এএম |

 গরমে স্বাস্থ্যসমস্যা ও করণীয়

চলছে গ্রীষ্মকাল। বৈশাখের প্রচণ্ড গরমে চারদিক অস্থির। সেই সঙ্গে রয়েছে বাতাসে অস্বাভাবিক আর্দ্রতা। বৃষ্টি না থাকার কারণে প্রচণ্ড গরমে সবার অবস্থা নাজেহাল। সারা দেশে এখন গরমের দাবদাহে জীবন ওষ্ঠাগত এবং জনজীবন বিপর্যস্ত। শিশু-কিশোর, যুবক-যুবতী, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা-সবাই প্রতিনিয়ত কোনো না কোনো স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছেন। ঘামাচি কিংবা পানি-স্বল্পতার মতো সমস্যা প্রায় প্রত্যেকেরই হচ্ছে, আবার কেউ কেউ হিট স্ট্রোকের মতো মারাত্মক সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছেন। এর সঙ্গে হতে পারে অবসাদ, অ্যালার্জি, সূর্যরশ্মিতে ত্বক পুড়ে যাওয়া, হজমের সমস্যা, বমি বা ডায়রিয়াজনিত রোগ ইত্যাদি।
পানি-স্বল্পতা বা ডিহাইড্রেশন :
গরমের কারণে সবচেয়ে বেশি যে সমস্যা হয়, তা হলো পানি-স্বল্পতা। প্রচুর ঘামের কারণে পানির সঙ্গে শরীর থেকে লবণও বেরিয়ে যায়। এর ফলে শরীরের রক্তচাপ কমে যায়, দুর্বল লাগে, মাথা ঝিমঝিম করে। পানি-স্বল্পতা গরমের খুব সাধারণ সমস্যা হলেও অবহেলা করলে তা মারাত্মক হতে পারে। বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তি, যারা বাইরে অতিরিক্ত গরমের মধ্যে কাজ করেন এবং প্রয়োজনমতো পানি পান করার সুযোগ পান না, তারাই মারাত্মক ধরনের পানি-স্বল্পতায় আক্রান্ত হন। এক্ষেত্রে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া এবং কিডনি বিকল হওয়ার মতো জটিলতর সমস্যা হওয়াও বিচিত্র নয়।
শরীরের ওপর তাপদাহের প্রভাব :
মাত্রাতিরিক্ত গরমের কারণে যখন শরীরের তাপমাত্রা-নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার কার্যক্ষমতা কমে যায়, তখন দুর্বলতা বা ক্লান্তি, মাথাব্যথা, মাথাঘোরা, অবসাদ, কাজকর্মে অনীহা এবং ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে হলে হিট স্ট্রোকের আশঙ্কা থাকে।
চর্মরোগ, ঘামাচি ও অ্যালার্জি :
গরমের কারণে ত্বকে ঘামাচি এবং অ্যালার্জি হতে পারে। অতিরিক্ত ঘাম তৈরি হয়ে ঘর্মগ্রন্থি ও নালি ফেটে যায়, ফলে ত্বকের নিচে ঘাম জমতে থাকে-এটাই ঘামাচি। অনেক সময় ঘাম ও ময়লা জমে ঘর্মনালির মুখ বন্ধ হয়ে যায় এবং সেখানে সংক্রমণ হতে পারে। এতে ঘামাচি ও অ্যালার্জি বেড়ে যায় এবং ঘামে প্রচুর দুর্গন্ধ হতে পারে। ব্যাকটেরিয়া ছাড়াও ঘাম ও ময়লার কারণে ছত্রাকজনিত রোগও এ সময় বেশি হয়। গরমে যারা সরাসরি সূর্যের আলোর নিচে বেশিক্ষণ থাকেন, তাদের ত্বক পুড়ে যেতে পারে। এতে ত্বক লাল হয়ে যায়, জ্বালাপোড়া করে, চুলকায় এবং ফোসকা পড়ে। একে সানবার্ন বলে। মূলত সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মিই এর জন্য দায়ী। যারা একটু ফর্সা বা যাদের ত্বক নাজুক, তাদের এ সমস্যা বেশি হয়।
হিট স্ট্রোক এবং অজ্ঞান হওয়া :
হিট স্ট্রোক গরমের সবচেয়ে মারাত্মক সমস্যা। হিট স্ট্রোকের শুরুতে হিট ক্র্যাম্প দেখা দেয়, যাতে শরীর ব্যথা করে, দুর্বল লাগে এবং প্রচণ্ড পিপাসা পায়। পরে হিট এক্সহসশন দেখা দেয়। এতে শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুত হয়, মাথাব্যথা করে এবং রোগী অসংলগ্ন আচরণ করতে থাকে। এ অবস্থায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রণক্ষমতা নষ্ট হয়ে হিট স্ট্রোক হতে পারে। এর লক্ষণগুলো হলো-তাপমাত্রা দ্রুত ১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট ছাড়িয়ে যায়, ঘাম বন্ধ হয়ে যায়, ত্বক শুষ্ক ও লাল হয়ে যায়, নিশ্বাস দ্রুত হয়, নাড়ির স্পন্দন ক্ষীণ ও দ্রুত হয়, রক্তচাপ কমে যায়, খিঁচুনি হয়, মাথা ঝিমঝিম করে এবং রোগী অসংলগ্ন ব্যবহার করতে থাকে। রোগীর প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যায়, অজ্ঞান হয়ে যায়, এমনকি শকেও চলে যেতে পারে।
বেশি আর্দ্রতাজনিত সমস্যা :
তাপদাহের সময় আর্দ্রতা বেশি থাকলেও স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ঘাম বের হলে শরীর ঠান্ডা হয়। তবে আর্দ্রতা বেশি থাকলে ঘাম সহজে বাষ্পীভূত হতে পারে না। ফলে দেহের তাপমাত্রা বেড়ে নানা ধরনের অস্বস্তিকর সমস্যার সৃষ্টি হয়।
ফুড পয়জনিং এবং পেটের পীড়া :
অনেকেই গরমে তৃষ্ণা মেটাতে বাইরে বা রাস্তাঘাটের বিক্রেতাদের কাছ থেকে অবিশুদ্ধ পানি বা শরবত পান করেন। ফলে ডায়রিয়া ও বমিতে আক্রান্ত হতে পারেন। একই কারণে এ সময় পানিবাহিত রোগ, যেমন-টাইফয়েড, প্যারাটাইফয়েড, আমাশয়, জন্ডিস বা হেপাটাইটিস বেশি হয়। গরমে অনেকে প্রচুর পানি পান করেন, কিন্তু তাতে পর্যাপ্ত লবণ থাকে না। ফলে শরীরে লবণের অভাব দেখা দেয়। এ অবস্থায় ওরস্যালাইন ও টাটকা ফলের শরবত খাওয়া যেতে পারে। অতিরিক্ত গরমে অনেক সময় খাবার নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এই খাবার খেলে বদহজমসহ অন্যান্য পেটের পীড়া দেখা দিতে পারে।
মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি :
শারীরিক সমস্যার পাশাপাশি তীব্র গরমে অনেকের মানসিক সমস্যা দেখা দেয়। প্রচণ্ড গরমে মাথা ঘোরা, চোখে ঝাপসা দেখা এবং মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
অন্যান্য সমস্যা :
মাথাব্যথা, জ্বরের প্রকোপ বৃদ্ধি, কিডনি বিকল হওয়া, শ্বাসযন্ত্রের রোগ যেমন সর্দি-কাশি, নিউমোনিয়া ও হাঁপানি, হৃদরোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি এবং মাংসপেশিতে ক্র্যাম্প বা খিঁচুনি দেখা দিতে পারে।
কারা বেশি ঝুঁকিতে :
তাপদাহের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিতে আছেন বয়স্করা, শিশু, গর্ভবতী নারী এবং শারীরিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তিরা; যেমন—উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, কিডনি, লিভার, হৃদরোগ বা ক্যানসারে আক্রান্ত রোগী, যাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা। যারা দিনের বেলায় প্রচণ্ড রোদে কায়িক পরিশ্রম করেন, তাদের হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি বেশি। যেমন-কৃষক, শ্রমিক ও রিকশাচালক। খেলোয়াড়দের ঝুঁকির মাত্রা আরও বেশি, কারণ শরীরচর্চার কারণেও তাপমাত্রা বেড়ে যায়। গৃহহীন মানুষেরা গরমের কারণে অনেক ঝুঁকিতে থাকেন, কারণ তাদের জন্য গরম এড়িয়ে চলার সুযোগ কম।
সুস্থ থাকার জন্য করণীয় :
(১) প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে যাবেন না। যথাসম্ভব ঘরের ভেতরে বা ছায়াযুক্ত স্থানে থাকার চেষ্টা করুন।
(২) বাইরে বের হলে সরাসরি রোদ যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলুন। মাথায় কাপড়, টুপি বা ছাতা ব্যবহার করুন। পরনের কাপড় হবে হালকা, ঢিলেঢালা ও সুতির। শরীর যতটা সম্ভব ঢেকে রাখুন। লিপ জেল ব্যবহার করা যেতে পারে। বাইরে বের হওয়ার আগে শরীরের উন্মুক্ত স্থানে সানস্ক্রিন লাগান। এতে সানবার্ন থেকেও রক্ষা পাওয়া যাবে।
(৩) যারা মাঠে-ময়দানে কাজ করেন, তারা ছাতা ব্যবহার করুন। মাঝেমধ্যে শীতল স্থান বা গাছের নিচে বসে বিশ্রাম নেওয়ার চেষ্টা করুন।
(৪) কিছু কিছু শিল্পকারখানায় প্রচুর গরমের মধ্যে কাজ করতে হয়। তারাও মাঝেমধ্যে গরম থেকে কিছু সময়ের জন্য বাইরে এসে বিশ্রাম নেওয়ার চেষ্টা করুন।
(৫) প্রচুর পানি ও অন্যান্য তরল পান করুন। যেহেতু ঘামের সঙ্গে পানি ও লবণ বের হয়ে যায়, তাই লবণযুক্ত পানীয় গ্রহণ করতে পারেন। স্বাভাবিক পানিতে সামান্য খাবার লবণ মিশিয়ে অথবা খাবার স্যালাইন পান করা যেতে পারে। অবশ্যই বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার করতে হবে।
(৬) চা ও কফি যথাসম্ভব কম পান করা উচিত।
(৭) প্রয়োজনমতো গোসল করতে হবে এবং শরীর ঘাম ও ময়লামুক্ত রাখতে হবে।
(৮) শ্রমসাধ্য কাজ যথাসম্ভব কম করতে হবে। এক্ষেত্রে কিছুক্ষণ পরপর বিশ্রাম নিতে হবে এবং প্রচুর পানি ও স্যালাইন পান করতে হবে। গরমের সময় ইনডোর বা শীতল স্থানে খেলাধুলা ও শরীরচর্চা করা ভালো।
(৯) গুরুপাক খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। সহজপাচ্য খাবার, যেমন-ভাত, ডাল, সবজি ও মাছ খাওয়াই ভালো।
(১০) খাবার যেন টাটকা হয়, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। নানা রকম ফল, যেমন-আম, তরমুজ এবং লেবুর শরবত শরীরের প্রয়োজনীয় পানি ও লবণের ঘাটতি পূরণে সাহায্য করবে।
(১১) শিশুদের ক্ষেত্রে আরও বেশি সতর্ক হতে হবে। বাচ্চারা যাতে এ সময় স্কুলে গিয়ে বাইরে খেলাধুলা বা দৌড়াদৌড়ি না করে, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। বিদ্যালয়ে যাওয়ার সময় তাদের সঙ্গে পর্যাপ্ত পানি দিন। ফুলপ্যান্টের পরিবর্তে হাফপ্যান্ট পরানো যেতে পারে।
(১২) বয়স্কদের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে যাদের অন্যান্য রোগ আছে, তারা যতদূর সম্ভব রোদে চলাফেরা এড়িয়ে চলুন।
(১৩) সিনথেটিক কাপড় পরিহার করতে হবে।
(১৪) গরমে শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ থাকতে দৈনিক ৭-৮ ঘণ্টা ঘুম দরকার। অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও উদ্বেগ পরিহার করা উচিত।
কেউ অসুস্থ হলে করণীয় :
(১) রোগীকে দ্রুত শীতল বা ছায়াযুক্ত স্থানে নিয়ে যেতে হবে।
(২) ফ্যান বা এসি চালু করতে হবে। সম্ভব না হলে পাখা দিয়ে বাতাস করতে হবে।
(৩) রোগীর আঁটসাঁট বা গরম কাপড় খুলে ফেলতে হবে এবং ভেজা কাপড় দিয়ে শরীর মুছে দিতে হবে।
(৪) চোখে, মুখে ও ঘাড়ে পানি দিতে হবে। সম্ভব হলে গোসল করাতে হবে।
(৫) মুখে খেতে পারলে রোগীকে প্রচুর পানি, শরবত, ডাবের পানি ও খাবার স্যালাইন পান করাতে হবে।
(৬) যদি কেউ হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়, তবে তাকে অবশ্যই দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।
এই প্রচণ্ড গরমে সবাইকে স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন হয়ে সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। তাহলেই গরমকালের নানা স্বাস্থ্যসমস্যা থেকে অনেকাংশে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব।
লেখক : বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, ইমিরিটাস অধ্যাপক।












http://www.comillarkagoj.com/ad/1752266977.jpg
সর্বশেষ সংবাদ
এখনই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিন
ফিফা বিশ্বকাপ- ২০২৬: বিশ্ব কাঁপছে বিশ্বকাপ জ্বরে!
কুমিল্লায় ১২ ঘণ্টার ব্যবধানে সড়কে ৫ জনের প্রাণহানি
টেন্ডার শেষে কাজ না হলে দায় ঠিকাদারের
নির্বাচিত সরকার মব কমাতে পারেনি, তা আরো বেড়েছে
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রাম বিভাগের শ্রেষ্ঠ ইউএনও ব্রাহ্মণপাড়ার মাহমুদা জাহান
ফিফা বিশ্বকাপ- ২০২৬: বিশ্ব কাঁপছে বিশ্বকাপ জ্বরে!
ইউপি নির্বাচনের তফসিল হতে পারে আগস্টে
ভারতে ভগ্নিপতিকে চিকিৎসা করাতে গিয়ে যুবকের মৃত্যু, আশঙ্কাজনক ৪
দি কাজী ফাউন্ডেশন এর আয়োজনে কুমিল্লায় ফ্রি হেলথ ক্যাম্প
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: newscomillarkagoj@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২