রোববার ৭ জুন ২০২৬
২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
রবিবাসরীয়...
প্রকাশ: রোববার, ৭ জুন, ২০২৬, ১:০০ এএম আপডেট: ০৭.০৬.২০২৬ ২:১৮ এএম |



রবিবাসরীয়...







নীল কমলের নীল

রবিবাসরীয়...সফিকুল বোরহান।।

বাসটা যখন ভোরের আলো ফোটার আগমুহূর্তে ধুলোমাখা ছোট্ট বাজারে এসে থামল, তখন আকাশের পূর্বদিগন্তে কেবলমাত্র একটি ম্লান নীলাভ রেখা দেখা যাচ্ছিল। দীর্ঘ সাত মাস পর আমি গ্রামে ফিরছি। শহর থেকে বেরিয়ে আসার পর থেকেই বুকের ভেতরে অদ্ভুত এক টান অনুভব করছিলাম। মানুষের জীবনে এমন কিছু জায়গা থাকে, যেখান থেকে যত দূরেই যাওয়া হোক, হৃদয়ের শিকড় সেখানেই রয়ে যায়। আমার জন্য সেই জায়গাটি হলো গ্রামের বাড়ি।
রিকশা নিতে পারতাম। মোটরসাইকেলও পাওয়া যেত। কিন্তু আমি হাঁটতে শুরু করলাম। এই পথ আমি বহুবার হেঁটেছি। ধানক্ষেতের পাশ দিয়ে চলে যাওয়া সরু রাস্তা, ভোরের শিশিরে ভেজা ঘাস, কুয়াশার আবরণে ঢেকে থাকা দূরের গাছপালা- সবকিছু আমাকে এমনভাবে স্বাগত জানাচ্ছিল, যেন বহুদিন পর কোনো হারিয়ে যাওয়া সন্তান ঘরে ফিরেছে।
হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ মনে পড়ল মুমুর কথা। অনেক বছর হয়ে গেছে। তবু গ্রামের পথে হাঁটলে কেন যেন প্রথমে তার কথাই মনে পড়ে। মুমু ছিল আমার শৈশবের নীল কমল। যে ফুলকে কখনো ছিঁড়ে নেওয়া যায় না, তবু যার সৌন্দর্য সারাজীবন মনে থেকে যায়। আমাদের বাড়ির পাশের বাড়িতে থাকত সে। খুব সাধারণ একটি মেয়ে। শ্যামলা রঙ, টানা চোখ, মাথাভর্তি কালো চুল। কিন্তু তার হাসি ছিল অসাধারণ। সেই হাসির ভেতরে ছিল নদীর কলকল ধ্বনি, ভোরের আলো আর কচি পাতার সতেজতা। ছোটবেলায় আমরা একসঙ্গে স্কুলে যেতাম। বর্ষাকালে হাঁটুসমান কাদা মাড়িয়ে। শীতে কুয়াশা ভেদ করে। গ্রীষ্মে খালি পায়ে পুড়ে যাওয়া মাটির ওপর দিয়ে। তখন বুঝিনি, তার প্রতি আমার টান বন্ধুত্বের চেয়েও গভীর। শুধু এটুকু জানতাম, মুমুকে না দেখলে দিনটা অসম্পূর্ণ মনে হয়।
বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াতেই মা দরজা খুললেন। চোখে বিস্ময় আর আনন্দ।
‘এত সকালে?’
আমি মায়ের হাত ধরলাম। ‘মন টিকছিল না।’ 
মা মৃদু হেসে বললেন, ‘তোর মন তো কোনোদিনই শহরে টেকে না।’
মায়ের কথা সত্যি। শহর আমাকে জীবিকা দিয়েছে। কিন্তু জীবন দেয়নি। জীবন রয়ে গেছে এই গ্রামে।
নাশতা করার আগেই আমি বেরিয়ে পড়লাম। আমার প্রথম গন্তব্য সেই পুরোনো কবরস্থান। যেখানে শুয়ে আছেন আমার দাদা, দাদি, চাচা, ফুফু- অসংখ্য পরিচিত ও অপরিচিত মানুষ। কবরস্থানে ঢুকতেই বাতাসের গন্ধ বদলে গেল। এখানে সবসময় এক ধরনের নীরবতা থাকে। কিন্তু সেই নীরবতা ভয়ের নয়। বরং গভীর প্রশান্তির। পলাশ, জারুল, হিজল আর কদমগাছের ছায়ায় ঢাকা ছোট্ট কবরস্থানটি যেন সময়ের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। আমি দাদার কবরের পাশে গিয়ে বসলাম। মাটি ছুঁয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। তারপর চোখ বন্ধ করলাম। মনে হলো দাদা এখনও আছেন। এই বাতাসে। এই পাতার শব্দে। এই পাখির ডাকে।
মানুষ কি সত্যিই মরে যায়? নাকি রূপ বদলে প্রকৃতির ভেতরে ছড়িয়ে পড়ে? আমার মনে হয় দ্বিতীয়টাই সত্য। কবরস্থানের পাশের বিশাল হিজলগাছ থেকে হঠাৎ একঝাঁক টিয়া উড়ে গেল। সবুজ ডানাগুলো সকালের আলোয় ঝলমল করছিল। তাদের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনে হলো, জীবন আসলে কত সুন্দর। 
কবরস্থান থেকে বের হয়ে পুকুরপাড়ে গেলাম। এই পুকুর আমার শৈশবের সঙ্গী। একসময় এখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সাঁতার কেটেছি। মুমুও আসত। যদিও মেয়েদের আলাদা ঘাট ছিল। আমরা দূর থেকে একে অপরকে দেখতাম। একদিন বিকেলে সে আমাকে বলেছিল, ‘তুমি বড় হয়ে কী হবে?’
আমি বলেছিলাম, ‘গাছ লাগাব।’ সে হেসে উঠেছিল। ‘এটাও আবার পেশা হলো?’ আমি উত্তর দিইনি। কারণ আমি নিজেও জানতাম না কেন গাছের প্রতি আমার এত ভালোবাসা। আজ এত বছর পর বুঝতে পারি। গাছই পৃথিবীর সবচেয়ে উদার প্রাণ। তারা কিছু চায় না। শুধু দিয়ে যায়। ছায়া দেয়। অক্সিজেন দেয়। ফল দেয়। আশ্রয় দেয়। মৃত্যুর পর কাঠও দিয়ে যায়। এমন উদারতা মানুষের মধ্যে খুব কমই দেখা যায়।
সন্ধ্যার দিকে বাড়ির পেছনের বাগানে গেলাম। এখানে গত দশ বছরে আমি প্রায় দুই হাজার গাছ লাগিয়েছি। আম, জাম, কাঁঠাল, কদম, কৃষ্ণচূড়া, জারুল, হিজল, অর্জুন, ছাতিম, বকুল- কী নেই! গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে আমার বুক ভরে উঠল। প্রতিটি গাছের সঙ্গে আমার একটি স্মৃতি জড়িয়ে আছে। কোনটি মায়ের অসুস্থতার সময় লাগানো। কোনটি বাবার মৃত্যুর পরে। কোনটি মুমুর বিয়ের খবর শোনার দিন।
হ্যাঁ, মুমুর বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। খুব অল্প বয়সেই। আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। একদিন খবর পেলাম সে অন্য জেলায় চলে গেছে। সেদিন সারারাত ঘুমাতে পারিনি। বাড়ি ফিরে ভোরবেলা উঠে দশটি কদমগাছ লাগিয়েছিলাম। কেউ বুঝতে পারেনি কেন। কিন্তু আমি জানতাম। ভালোবাসার কিছু স্মৃতি মানুষ হৃদয়ে রাখে। আর কিছু স্মৃতি মাটিতে রোপণ করে। আমার কদমগাছগুলো ছিল সেই রোপণ করা স্মৃতি।
রাত গভীর হলো। দূরে কোথাও শিয়াল ডাকছে। বাতাসে কদমফুলের গন্ধ। আমি উঠানে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলাম। হঠাৎ মনে হলো কেউ আমার নাম ধরে ডাকছে। ‘রাহাত...’। আমি চমকে উঠলাম। চারপাশে কেউ নেই। কিন্তু সেই কণ্ঠস্বর আমার পরিচিত। খুব পরিচিত। মুমুর মতো। আমি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালাম। বাগানের ভেতর হাঁটতে লাগলাম। চাঁদের আলোয় গাছগুলোর ছায়া লম্বা হয়ে আছে। আর ঠিক তখনই- পুরোনো কদমগাছটার নিচে একটি নারীর অবয়ব দেখতে পেলাম। আমার বুকের ভেতর ধক করে উঠল। আমি থেমে গেলাম। নারীটি স্থির দাঁড়িয়ে আছে। চাঁদের আলো তার মুখে পড়ছে। আমি আরও কয়েক কদম এগোলাম। তারপর হঠাৎ সময় যেন থেমে গেল। কারণ সেই মুখ আমি হাজার বছরেও ভুলতে পারব না।
মুমু। মুমুই দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু সে এখানে কীভাবে? এত রাতে? এত বছর পর? আর তার চোখে কেন এমন অদ্ভুত বিষণ্নতা? আমি কিছু বলতে যাচ্ছিলাম- ঠিক তখনই বাতাসে হিজলপাতার মর্মর ধ্বনি উঠল। আর মুমু ধীরে ধীরে বলল, ‘তুমি এখনও গাছ লাগাও?’ আমার মনে হলো, এই প্রশ্নের উত্তরেই হয়তো লুকিয়ে আছে আমার জীবনের সমস্ত গল্প...
‘তুমি এখনও গাছ লাগাও?’ মুমুর কণ্ঠস্বর বাতাসে ভেসে এলো। আমি কিছুক্ষণ উত্তর দিতে পারলাম না। মনে হচ্ছিল সময় থমকে গেছে। কদমগাছের ছায়া, চাঁদের আলো, ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক- সবকিছু যেন এক অদ্ভুত স্বপ্নের ভেতর আটকে আছে। আমি ধীরে ধীরে বললাম, ‘হ্যাঁ। এখনও লাগাই। যতটা পারি।’ মুমু মৃদু হাসল। সেই হাসি আমি চিনি। কিন্তু আগের মতো উচ্ছ্বল নয়। হাসির ভেতরে আজ একরাশ ক্লান্তি, কিছু অপ্রকাশিত বেদনা। ‘আমি জানতাম,’ সে বলল। ‘কীভাবে জানলে?’ ‘তুমি বদলাবে না। ছোটবেলায় সবাই ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বড় অফিসার হতে চাইত। তুমি শুধু বলতে- আমি গাছ লাগাব।’ আমি হেসে ফেললাম। ‘তখন তো তুমিও আমাকে নিয়ে হাসতে।’ ‘হাসতাম। কারণ বুঝতাম না।’
বাতাসে কদমফুলের গন্ধ আরও ঘন হয়ে উঠল। আমি তাকিয়ে আছি তার দিকে। এত বছর পরেও মানুষ কি কাউকে ঠিক একই রকম দেখতে পারে? হয়তো পারে না। তবু মুমুর চোখ দুটি একই রয়ে গেছে। সেই গভীর, শান্ত, জলের মতো স্বচ্ছ চোখ। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুমি কবে এলে?’ মুমু কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর দূরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আজ বিকেলে।’ ‘কোথায় উঠেছ?’ ‘পুরোনো বাড়িতে।’ আমি অবাক হলাম। ‘ওই বাড়ি তো অনেকদিন খালি পড়ে আছে!’ ‘হ্যাঁ। তবু এসেছি।’ তার গলায় এমন এক সুর ছিল, যা আমাকে আর প্রশ্ন করতে দিল না।
পরদিন ভোরে ঘুম ভাঙল পাখির ডাকে। জানালা খুলতেই দেখি আকাশ লাল হয়ে উঠছে। বাগানের দিকে তাকিয়ে আমার মন ভরে গেল। কত গাছ বড় হয়ে গেছে! যে চারাগুলো একসময় কাঠির মত ছিল, এখন তারা বিশাল। অনেক গাছে ফল এসেছে। অনেক গাছে পাখির বাসা। একটা শালিকদম্পতি ডালে বসে কীযে বুকুর বুকুর করছে। অরূপ রূপের রঙিলা কাঠঠোকরা গাছের গায়ে ঠকঠক শব্দ তুলছে তো তুলছেই। আমি চা হাতে বাগানের ভেতর হাঁটতে শুরু করলাম। প্রতিটি গাছের সঙ্গে আমার একেকটি স্মৃতি। এই অর্জুনগাছটি বাবার মৃত্যুর পরে লাগানো। ওই কদমগাছটি মুমুর বিয়ের খবর শোনার দিন। ওই ছাতিমগাছটি মায়ের অসুস্থতার সময়। গাছগুলো আমার জীবনের ডায়েরি। 
হঠাৎ দেখি দূরে মুমু দাঁড়িয়ে আছে। সে বাগানের দিকে তাকিয়ে। আমি এগিয়ে গেলাম। ‘এত সকালে?’ সে হেসে বলল, ‘ঘুম ভেঙে গেছে।’ তারপর চারদিকে তাকিয়ে বলল, ‘এগুলো সব তুমি লাগিয়েছ?’ ‘বেশিরভাগ।’ মুমু বিস্মিত চোখে গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। ‘তুমি সত্যিই পাগল।’ ‘কেন?’ ‘একজন মানুষ এত গাছ লাগায়?’ আমি হেসে বললাম, ‘একজন মানুষ এত গাছ কাটে- সেটা নিয়ে তো কেউ প্রশ্ন করে না।’ মুমু চুপ করে গেল। কিছুক্ষণ পরে বলল, ‘সত্যি কথা।’ 
আমরা হাঁটতে হাঁটতে নদীর দিকে গেলাম। যে নদী একসময় আমাদের শৈশবের খেলার সঙ্গী ছিল। নদীর পাড়ে এসে মুমু থেমে গেল। তার মুখের রঙ বদলে গেল। ‘এ কী?’ আমি কোনো উত্তর দিলাম না। কারণ উত্তর আমারও জানা নেই। একসময় যেখানে ঢেউয়ের শব্দ শোনা যেত, সেখানে এখন ধুলা উড়ছে। যেখানে নৌকা চলত, সেখানে ট্রাক দাঁড়িয়ে। যেখানে মাছরাঙা বসত, সেখানে মাটি খুঁড়ে রাখা হয়েছে। মুমু ধীরে ধীরে বসে পড়ল। ‘আমরা কি সত্যিই এত নিষ্ঠুর হয়ে গেছি?’ আমি নদীর দিকে তাকিয়ে রইলাম। ‘হয়তো।’ ‘কিন্তু কেন?’ আমি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। ‘লোভ।’ বাতাসে শুকনো বালুর গন্ধ। নদী যেন কথা বলতে চাইছে। কিন্তু তার কণ্ঠস্বর কেউ শুনছে না। 
সেদিন বিকেলে আমরা পাশের পাহাড়ের দিকে গেলাম। আমাদের গ্রাম থেকে খুব দূরে নয়। শৈশবে এই পাহাড় আমাদের কাছে ছিল বিস্ময়ের রাজ্য। একটা ছোট্ট ঝর্ণা ছিল। বুনো ফুল ছিল। রঙিন প্রজাপতি ছিল। আজ সেখানে বিশাল যন্ত্র। কাটা মাটি। ধ্বংসস্তূপ। পাহাড়ের বুক ক্ষতবিক্ষত। মুমু দীর্ঘক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর বলল, ‘মনে আছে, একবার আমরা এখানে এসেছিলাম? ‘মনে আছে।’ ‘তুমি একটা বুনো ফুল তুলে দিয়েছিলে।’ আমি হেসে বললাম, ‘আর তুমি বলেছিলে, ফুল ছিঁড়ো না।’ মুমুও হাসল। ‘আমি এখনও তাই বলি।’ আমরা দুজনেই চুপ হয়ে গেলাম। কারণ সামনে যে দৃশ্য, সেখানে আর কোনো ফুল নেই। শুধু কাটা মাটির ক্ষত।
পরবর্তী কয়েকদিন আমরা প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও ঘুরতে বের হতাম। কখনও নদীর ধারে। কখনও পুকুরপাড়ে। কখনও কবরস্থানে। কবরস্থানে গেলে মুমু খুব চুপচাপ হয়ে যেত। একদিন সে দাদার কবরের পাশে বসে বলল, ‘জানো, আমি ছোটবেলায় মৃত্যু খুব ভয় পেতাম।’ ‘এখন?’ ‘এখন মনে হয় মৃত্যু ভয়ংকর না। ভয়ংকর হলো ধীরে ধীরে সবকিছু হারিয়ে যাওয়া।’ আমি তার দিকে তাকালাম। সে দূরে কোথাও তাকিয়ে আছে। ‘নদী হারিয়ে যাচ্ছে।’ ‘পাহাড় হারিয়ে যাচ্ছে।’ ‘গাছ হারিয়ে যাচ্ছে।’ ‘মানুষের ভেতরের ভালোবাসাও হারিয়ে যাচ্ছে।’ তার কথাগুলো শুনে বুকের ভেতর কেমন একটা ব্যথা অনুভব করলাম। কারণ আমি জানি, সে শুধু প্রকৃতির কথা বলছে না, নিজের ক্ষয়িষ্ণুর কথাও বলছে। আমার রোপিত হাজারো গাছের কথা বলছে। স্মৃতিমেদুর নীল কমলের কথা বলছে।
মুমু আমার কাছে সেই নীল কমল! আর তার স্মৃতিতে জন্ম নেওয়া সবুজ পৃথিবী- সেই নীল কমলেরই নীল।
সফিকুল বোরহান
কথাসাহিত্যিক
অন্বেষা, রানির দিঘির পূর্ব পাড়, কুমিল্লা
০১৭১৪-৩৭২২০০
tanhaborhan@gmail.com







চেনা মুখের ‘অচেনা’ আদল


হিমাদ্রিশেখর সরকার ।।

     মানুষের জীবনে কখনও কখনও এমন একটি মুহুর্ত চলে আসে যখন তার অনেকদিনের চেনা মানুষের মুখটি অচেনা হয়ে যায়। এমনকি নিজের কাছে নিজেকেই অচেনা মনে হয়। এমন অবস্থায় মানুষ কখন পৌঁছে? পারিপার্শ্বিক কারণে মনের অজান্তেই একটা সময় মানুষ স্বেচ্ছাচারী হয়ে পড়ে । অহংবোধ, আত্মকেন্দ্রিকতা ও স্বার্থপরতার কাছে মানুষ একসময় নতজানু হতে বাধ্য হয়। সে বুঝতে পারে না আসলে সে কী করছে বা এর জন্য কী পরিণতি তার জন্য অপেক্ষা করছে। ততদিনে তার অনেক ক্ষতি হয়ে যায়। সে ক্ষতি আর পূরণ করার কোন পথ থাকে না। তখন আফসোস আর হায় হায় করা ছাড়া কোন গত্যন্তর থাকে না। 
       কিন্তু এই অবস্থার জন্য কি শুধু ব্যক্তিকে এককভাবে দায়ী করা যায় না। বর্তমান পুঁজিবাদী সমাজ-ব্যবস্থায় যন্ত্রসভ্যতার সহায়তায় মানুষ হয়ে যাচ্ছে উচ্চাবিলাসী, আত্মকেন্দ্রিক ও স্বার্থপর। একসময় তারা আপনজনের সম্পর্ককেও অস্বীকার করে বসছে। অস্বীকার করছে দীর্ঘদিনের প্রেম-প্রীতি-ভালোবাসাকে। 
      কল্লোল মজুদারের চতুর্থ উপন্যাস ‘অচেনা’ পড়ে আমাদের উপর্যুক্ত কথাগুলোই মনে এলো। উপন্যাসে দুই জোড়া প্রেমিক-প্রেমিকার সন্ধান মেলে যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র-ছাত্রী। শৈশব আর নিশি, নির্ঝর আর পিউ। তারা পরস্পরের প্রেমে পড়ে। একটা সময় স্বার্থের টানে তাদের প্রেমে ভাঙন ধরে। মেয়ে দুটি বেশিমাত্রায় স্বার্থপরতার পরিচয় দেয়। ফলে প্রত্যেকেই যার যার পথ ধরে। শেষ সময়ে তারা তাদের ভুল বুঝতে পারে। কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে যায়। অনেক ঘটনা ঘটে যায়।
     বর্তমান বাস্তবতায় এই কাহিনি অবাস্তব কিছু নয়। এমন একটি আত্মকেন্দ্রিক সমাজেই এখন আমাদের বসবাস। যেখানে চেনা মানুষরা বার বার অচেনা হয়ে যাচ্ছে। সম্পর্কের চেয়ে টাকাটাকেই বড় করে দেখা হচ্ছে। কিন্তু একটা সময় তারা বুঝতে পারে টাকার চেয়ে সম্পর্কটাই বড়। এসব প্রশ্নের উত্তর কল্লোল মজুদারের চতুর্থ উপন্যাস (বাংলায় লেখা তৃতীয়) ‘অচেনা’-তে পাওয়া যাবে।
রবিবাসরীয়...
     কল্লোল মজুমদার কোন ভূঁইফোড় লেখক নন। এর আগে তার তিনটি উপন্যাস ও একটি কবিতার বই প্রকাশিত হয়ে গেছে। তার প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস ঈবৎঃধরহ উৎবধসং-ঞযব ইধপশমৎড়ঁহফ ড়ভ ঝঁহৎরংরহম । পরবর্তীকালে তিনি এর বাংলা ভাবানুবাদ করেন ‘সূর্যোদয়ের অন্তরালে’ শিরোনামে। যার মূল প্রতিপাদ্য প্রেম, মুক্তিযুদ্ধ আর অসাম্প্রদায়িকতা। এটিকে তার দ্বিতীয় উপন্যাস বলা যায়। তৃতীয় উপন্যাস ‘দহন’ এও একজন কবি ও মেধাবী ছাত্রের প্রেম-কাহিনি বর্ণিত হয়েছে অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সাথে। ঐ বইয়ে ‘ইমোশনাল লাভ’ নয় ‘ইকোনোমিক লাভ’-এর কথাও তুলে ধরা হয়েছে। এখন আমরা কল্লোল মজুদারের চতুর্থ উপন্যাস ‘অচেনা’ নিয়ে কথা বলছি। 
      তার প্রথম বাংলা উপন্যাস ‘সূর্যোদয়ের অন্তরালে’ থেকেই কল্লোল মজুমদার একটি নিজস্ব ভাষাশৈলী নির্মাণ করেছেন বলে আমাদের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে। এই ভাষা অন্য কারো ভাষার সাথে মেলে না। সহজ, সরল, অনাড়ম্বর একটি ভাষা তিনি তৈরি করে ফেলেছেন। এই ভাষাকে কাজে লাগিয়ে কল্লোল মজুমদার বড় মাপের একজন লেখক হিসেবে একদিন আত্মপ্রকাশ করবেন এ প্রত্যাশা করা যেতেই পারে। এর জন্য কাহিনির বর্তমান বাধা-ধরা ছক থেকে ঔপন্যাসিককে বেরিয়ে আসতে হবে। বড় ক্যানভাসে তার কাহিনিকে নিয়ে যেতে হবে। এর জন্য দরকার পড়বে পূর্ব প্রস্তুতির এবং এ কাজে তাকে অনেক পরিশ্রম স্বীকার করতে হবে। 
    কল্লোল মজুমদার-এর প্রতিটি উপন্যাসে এর পটভূমি ঢাকা শহর হলেও তিনি তার নিজ শহর কুমিল্লাতেও কাহিনিকে টেনে এনেছেন। কুিমল্লা একটি প্রাচীন ঐতিহাসিক জনপদ ও শহর। এর ইতিহাস-ঐতিহ্য কিংবা ঐতিহাসিক চরিত্র নিয়ে অনেক সুন্দর উপন্যাস লিখা যায়। গ্রামীণ পটভূমিকায় হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান বা এক সময়ের ব্রাহ্মদের নিয়ে তিনি উপন্যাস লিখতে পারেন। আশা করি পরবর্তীকালে ঔপন্যাসিক এই দিকটার প্রতি অবশ্যই দৃষ্টি দেবেন এবং এমন একটি উপন্যাস লিখার প্রস্তুতি এখন থেকেই শুরু করবেন। 
     আমরা জানি, লেখক কল্লোল মজুমদার একজন সমাজবিজ্ঞানের ছাত্র। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উক্ত বিষয়ে স্নাতোকোত্তর ডিগ্রিধারী (১৯৯৪)। এ বিষয়ে তিনি কলেজে অধ্যাপনাও করছেন। তার সমাজ-বিশ্লেষণ অন্যদের থেকে আলাদা হবে এটা স্বাভাবিকভাবে ধরে নেয়া যায়। লেখায় তিনি অনায়াসে সমাজের অনাচার, অবিচার, বিচারহীনতা ইত্যাদি উপজীব্য করে তুলতে পারেন।
     লেখক কল্লোল মজুমদার শুধুু উপন্যাসই লিখেন না তিনি গানও লিখে থাকেন। তিনি ‘বাংলাদেশ বেতার’-এর একজন তালিকাভূক্ত গীতিকারও বটে। এই হিসেবে তাকে আমরা একজন কবিও বলতে পারি। এ ছাড়াও নিজের জেলাশহর কুমিল্লায় তিনি বিভিন্ন সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথেও যুক্ত আছেন। 
      কল্লোল মজুমদার-এর প্রকাশিত বইয়ের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো তার বইয়ে বানান ভুল একেবারেই থাকে না। বাধাঁই ও ছাপার মানও ভালো থাকে। এক্ষেত্রে তার প্রকাশক ধ্রুবতারা  প্রকাশনী’র প্রশংসা করতেই হয়। তবে প্রচ্ছদ আরেকটু মানসম্পন্ন হওয়া উচিত। 
      আমরা তার ‘অচেনা’ উপন্যাসটির বহুল প্রচারের পাশাপাশি পরবর্তী একটি সাড়াজাগানো উপন্যাসের প্রতীক্ষায় রইলাম।  
অচেনা
কল্লোল মজুমদার
প্রকাশক-ধ্রুবতারা  প্রকাশনী
১২৫, নিউ কাকরাইল রোড (শান্তিনগর প্লাজা), ৬ষ্ঠ তলা, ঢাকা-১০০০
িি.িৎড়শড়সধৎর.পড়স   ঢ়যড়হব- ১৬২৯৭
মূল্য- ২১০ টাকা, পৃষ্ঠা সংখ্যা- ৯৬।
প্রকাশকাল -একুশে বইমেলা ২০২২ খ্রিস্টাব্দ। 
..... হিমাদ্রিশেখর সরকার ঃ প্রাবন্ধিক, গবেষক ও ছোটগল্পকার। মোবাইল ০১৭২০২১২৮৫৬ email shekhorhimadri@gmail.com













http://www.comillarkagoj.com/ad/1752266977.jpg
সর্বশেষ সংবাদ
এখনই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিন
ফিফা বিশ্বকাপ- ২০২৬: বিশ্ব কাঁপছে বিশ্বকাপ জ্বরে!
কুমিল্লায় ১২ ঘণ্টার ব্যবধানে সড়কে ৫ জনের প্রাণহানি
টেন্ডার শেষে কাজ না হলে দায় ঠিকাদারের
নির্বাচিত সরকার মব কমাতে পারেনি, তা আরো বেড়েছে
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রাম বিভাগের শ্রেষ্ঠ ইউএনও ব্রাহ্মণপাড়ার মাহমুদা জাহান
ফিফা বিশ্বকাপ- ২০২৬: বিশ্ব কাঁপছে বিশ্বকাপ জ্বরে!
ইউপি নির্বাচনের তফসিল হতে পারে আগস্টে
ভারতে ভগ্নিপতিকে চিকিৎসা করাতে গিয়ে যুবকের মৃত্যু, আশঙ্কাজনক ৪
দি কাজী ফাউন্ডেশন এর আয়োজনে কুমিল্লায় ফ্রি হেলথ ক্যাম্প
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: newscomillarkagoj@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২