
এ
কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, "ফুটবল" হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা।
'পৃথিবীর বুকে সেরা উৎসব (গ্রেটেস্ট শো অন দ্যা আর্থ) তথা ‘বিশ্বকাপ ফুটবল’
বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে আকর্ষণীয় একক খেলা হিসেবে বিবেচিত। ফুটবল ইতিহাসের
বৃহত্তম টুর্নামেন্ট ফিফা বিশ্বকাপের ২৩তম আসর, ১১ই জুন থেকে ১৯শে জুলাই,
২০২৬ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হবে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে
এই টুর্নামেন্টে ৪৮টি দল নিয়ে ১০৪টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। ২০২৬ সালের ১৯শে
জুলাই নিউইয়র্ক/নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ব্র্যান্ড ফাইনালের মাধ্যমে
টুর্নামেন্টটি সমাপ্ত হবে। ২০০২ সালের পর এটিই হবে প্রথম পুরুষদের বিশ্বকাপ
যা একাধিক দেশ যৌথভাবে আয়োজন করছে। ফিফা বিশ্বকাপের ২৩তম আসর যৌথভাবে
ষোলটি শহরে আয়োজিত হবে-এগারোটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, তিনটি মেক্সিকোতে
এবং দুটি কানাডায়। আয়োজক দেশ হিসেবে কানাডা, মেক্সিকো এবং মার্কিন
যুক্তরাষ্ট্র স্বয়ংক্রিয়ভাবে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে। কেপ ভার্দে,
কুরাকাও, জর্ডান এবং উজবেকিস্তান প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে অংশ নেবে।
আর্জেন্টিনা বর্তমান চ্যাম্পিয়ন, যারা ২০২২ সালে তাদের তৃতীয় বিশ্বকাপ
শিরোপা জিতেছিল।
১৯৯৮ সালের পর এই সংস্করণ থেকে শুরু করে, ফিফা বিশ্বকাপ
৪৮টি দলে প্রসারিত হয়েছে, যা পূর্ববর্তী সাতটি টুর্নামেন্টের তুলনায় ১৬টি
দল বেশি। ষোলটি আয়োজক শহরে: আটলান্টা, বোস্টন, ডালাস, গুয়াদালাহারা,
হিউস্টন, কানসাস সিটি, লস অ্যাঞ্জেলেস, মেক্সিকো সিটি, মিয়ামি, মন্টেরে,
নিউ ইয়র্ক নিউ জার্সি, ফিলাডেলফিয়া, সান ফ্রান্সিসকো বে এরিয়া, সিয়াটল,
টরন্টো এবং ভ্যাঙ্কুভার (কানাডায় দুটি, মেক্সিকোতে তিনটি, মার্কিন
যুক্তরাষ্ট্রে এগারোটি) খেলা অনুষ্ঠিত হবে। টুর্নামেন্টটিতে প্রতিটি আয়োজক
দেশের জন্য একটি করে মোট তিনটি উদ্বোধনী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। মেক্সিকোতে
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি ১১ জুন, ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত হবে। কানাডায় উদ্বোধনী
অনুষ্ঠানটি ১২ জুন, ২০২৬ তারিখে টরন্টোর বিএমও ফিল্ডে অনুষ্ঠিত হবে। একই
দিনে লস অ্যাঞ্জেলেসের সোফাই স্টেডিয়ামে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বোধনী
অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে।
ম্যাচের সময়সূচী ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪-এ ঘোষণা করা
হয়েছিল। ১৩ জুন, ২০২৪-এ, ফিফা একটি আপডেট করা সময়সূচী প্রকাশ করে। গ্রুপ
পর্ব ১১ থেকে ২৭ জুন পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হবে। অংশগ্রহণকারী দেশগুলোকে চারটি
করে দলের বারোটি গ্রুপে ভাগ করা হয়েছিল এবং প্রতিটি গ্রুপের দলগুলো
রাউন্ড-রবিন পদ্ধতিতে একে অপরের সাথে খেলবে। গ্রুপ স্ট্যান্ডিংয়ে, জয়ের
জন্য তিন পয়েন্ট, ড্রয়ের জন্য এক পয়েন্ট এবং হারের জন্য কোনো পয়েন্ট দেওয়া
হবে না। গ্রুপ পর্ব শেষে, প্রতিটি গ্রুপের শীর্ষ দুটি দল এবং সমগ্র গ্রুপ
জুড়ে সেরা আটটি তৃতীয়-স্থানাধিকারী দল নকআউট পর্বে উন্নীত হবে। নকআউট
পর্বটি সিঙ্গেল-এলিমিনেশন ফরম্যাটে খেলা হবে, যা ২৮শে জুন শুরু হয়ে ১৯শে
জুলাই ফাইনালের মাধ্যমে শেষ হবে। এর আগের দিন, ফ্রেঞ্জ পদক বিজয়ী
নির্ধারণের জন্য সেমি-ফাইনালের পরাজিত দুটি দলের মধ্যে তৃতীয় স্থান
নির্ধারণী একটি ম্যাচও খেলা হবে। নকআউট পর্বে, নির্ধারিত খেলার সময় শেষে
স্কোর সমান থাকলে ৩০ মিনিটের অতিরিক্ত সময় খেলা হবে। অতিরিক্ত সময়ের শেষেও
স্কোর সমান থাকলে, বিজয়ী নির্ধারণের জন্য পেনাল্টি শুটআউটের ব্যবস্থা করা
হবে।
ফিফা টুর্নামেন্টের আনুষ্ঠানিক মাসকটগুলি হল মেপল, জায়ু এবং ক্লাচ। মেপল হল একটি মুজ, জায়ু হল একটি
জাগুয়ার
এবং ক্লাচ হল একটি বন্ড ঈগল। মাসকটগুলি কানাডা, মেক্সিকো এবং মার্কিন
যুক্তরাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে প্রতিফলিত করে। এ টুর্নামেন্টের ম্যাচ
বলটির নাম হবে অ্যাডিডাস ট্রিওল্ডা। এর নকশায় রয়েছে লাল, সবুজ ও নীল রঙ এই
তিনটি রঙ যথাক্রমে কানাডা, মেক্সিকো ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব
করে এবং আয়োজক দেশগুলোর পতাকায়ও এই রঙগুলো রয়েছে এবং রয়েছে প্রতিটি রঙকে
সংযুক্তকারী একটি সাদা ঢেউ। ফিফা আয়োজক দেশগুলোর শহরগুলোতে ফ্যান
ফেস্টিভ্যালের আয়োজন করবে, যেখানে বিশাল পর্দায় ম্যাচ এবং সরাসরি বিনোদনের
বাবস্থা থাকবে।
২০২৬ বিশ্বকাপে ৪৮টি দলের মোট ১,২৪৮ জন খেলোয়াড় অংশগ্রহণ
করবে। এশিয়া থেকে ৮টি (ইরান, জাপান, জর্ডান, সাউথ কোরিয়া, কাতার, সৌদি আরব
ও উজবেকিস্তান), আফ্রিকা থেকে ৯টি, উত্তর আমেরিকা থেকে ৬ টি দল (কানাডা,
মেক্সিকো এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আয়োজক দেশ হিসাবে), ইউরোপ থেকে ১৬ টি,
দক্ষিণ আমেরিকা থেকে ৬টি, ওশেনিয়া থেকে ১ টি এবং আন্তঃমহাদেশীয় খেলার
মাধ্যমে বাছাই করা অতিরিক্ত ২টি দল অংশ নিচ্ছে। ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপে
সবচেয়ে কম জনসংখ্যার দেশ হলো কুরাসাও। ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের এই
দ্বীপরাষ্ট্রটির জনসংখ্যা মাত্র ১ লাখ ৫৬ হাজার, যা বিশ্বকাপের ইতিহাসে
যোগ্যতা অর্জনকারী দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে মোট
১,২৪৮ জন খেলোয়াড় অংশগ্রহণ করবেন। আশা করা হচ্ছে ৫০ থেকে ৭০ লক্ষ দর্শক
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কানাডা জুড়ে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের
১০৪টি ম্যাচ সশরীরে উপভোগ করবেন। এছাড়াও টেলিভিশন, সোস্যাল মিডিয়া ও
অন্যান্য মাধ্যমে বিশে^র প্রায় ১০ কোটি মানুষ এখেলা উপভোগ করবেন বলে আশা
করা যায়। এরই মধ্যে বাংলাদেশেও ফুটবল প্রেমীদের মধ্যে বিশ^কাপ ফুটবল উপভোগ
করা নিয়ে আনন্দের ঢেউ ছড়িয়ে পড়েছে।
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের টিকিটের দাম
প্রাথমিকভাবে গ্রুপ পর্বের ম্যাচের জন্য ৬০ ডলার থেকে ফাইনালের জন্য ৬,৭৩০
ডলার পর্যন্ত ছিল। ফিফা অংশগ্রহণকারী সকল দেশের জন্য এই আসরের
টুর্নামেন্টের মোট পুরস্কারের পরিমাণ হবে ৮৭১ মিলিয়ন ডলার, যা পূর্ববর্তী
টুর্নামেন্টের পুরস্কারের চেয়ে ৪৩১ মিলিয়ন ডলার বেশি। টুর্নামেন্টের শেষে
টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতাকে গোল্ডেন বুট পুরস্কার, টুর্নামেন্টের
সেরা গোলরক্ষককে গোল্ডেন গ্লোভ পুরস্কার, টুর্নামেন্টের সার্বিকভাবে সেরা
খেলোয়াড়কে গোল্ডেন বল পুরস্কার, ২১ বছরের কম বয়সী টুর্নামেন্টের
সার্বিকভাবে সেরা খেলোয়াড়কে ফিফা ইয়ং প্লেয়ার অ্যাওয়ার্ড পুরস্কার এবং
নকআউট পর্বে পৌঁছানো সেরা শৃঙ্খলাবদ্ধ দলকে ফিফা ফেয়ার প্লে ট্রফি পুরস্কার
দেওয়া হবে।
অর্থনীতির সঙ্গে ফুটবলের একটা গভীর সম্পর্ক আছে। বিশ্বকাপ
ফুটবল বিভিন্ন উপায়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানো, নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ
তৈরী এবং নতুনতর দক্ষতার সাথে সংযোগ ঘটানোর মাধ্যমে আয়োজক দেশের
অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে সহায়তা করে। বিশ্বকাপ ফুটবল থেকে আয়োজক
দেশগুলোর আয়ের তথ্য নিয়ে জানা যায়, ২৮ বছর আগের ১৯৯৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের
লস অ্যাঞ্জেলেসে অনুষ্ঠিত ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজন করতে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয়
হয়েছিল ৫ বিলিয়ন ডলার এবং এক মাসের ফুটবল উৎসবে সরাসরি আর্থিক লাভ হয়েছিল
৬২৩ মিলিয়ন ডলার। ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে কাতারের আয় হয়েছে ১৭০০ কোটি
ডলার। এ বিশ্বকাপে কাতারের পর্যটন, হসপিটালিটি, খুচরা, পরিবহনসহ অনেক খাত
লাভবান হয়েছে। তবে এই বিশাল আয়োজন করতে কাতার ১১ বছরে অবকাঠামো উন্নয়নে
ব্যয় করেছে ২২৯ বিলিয়ন ডলার। ফুটবলের বিনোদন ও অর্থনীতির বাইরেও একটি
শক্তিশালী সামাজিক প্রভাবও রয়েছে। এটি প্রায়শ:ই সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের
হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। বড় বড় ক্লাব ও খেলোয়াড়রা সমাজের পিছিয়ে পড়া
মানুষের জন্য সামাজিক দায়বদ্ধতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে। বিশ্বব্যাপী
ফুটবল ভক্তরা প্রায়ই এই ধরনের উদ্যোগের সাথে সম্পৃক্ত হয় যা ইতিবাচক
সামাজিক পরিবর্তন আনতে সহায়তা করে। ফুটবল খেলা বিশ্বের দেশে দেশে
ভ্রাতৃত্ব, একতা ও সংহতির প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়।
দেশে দেশে মানুষের মধ্যে
‘বৈশ্বিক বন্ধণ’ তৈরীতে ‘ফুটবল’ হচ্ছে অন্যতম সবচেয়ে কার্যকর একটি মাধ্যম।
ফুটবলকে বিবেচনা করা হয় বিশ্বায়নের সবচেয়ে শক্তিশালী বাহন হিসেবে। প্রায়
২০০০ বছর ধরে মানুষ ফুটবল খেলে আসছে। 'ফুটবল' দেশে দেশে মানুষের যোগসূত্রের
ক্ষেত্রে একটি সর্বজন গৃহীত ভাষা হিসেবে কাজ করছে। ফুটবল কেবলমাত্র একটি
খেলা নয় এটি একটি আবেগ, একটি সংস্কৃতি এবং একটি জীবনযাত্রা। ফুটবলকে
কেন্দ্র করে বিভিন্ন সংস্কৃতি, পটভূমি, বিশ্বাস ও দর্শনের মানুষ একসূত্রে
জড়ো হয়। তাই ফুটবলের ইতিহাস থেকে শুরু করে আজকের এর যে অবস্থান তা
বিশ্বব্যাপি ফুটবলকে এক অনন্য খেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। পৃথিবীর প্রায়
সব প্রান্তে ফুটবল খেলা হয় এবং এটি কোটি কোটি মানুষের আনন্দ এবং বিনোদনের
উৎস। ফুটবল খেলার মাধ্যমে বিশ্ব ভ্রাতৃত্ব গড়ে উঠুক, মানুষ-মানুষে আন্তরিক
সম্পর্ক গড়ে উঠুক, যুদ্ধ ও মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ফুটবল জয়ী
হউক-এ কামনা আমাদের সবার।
লেখকঃ মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে অতিরিক্ত সচিব হিসেবে কর্মরত।
