
সভ্যতার ইতিহাসে
গণতন্ত্র শব্দটা খুব বেশিদিনের কথা নয়, আর চর্চা হিসেবে নির্বাচন তো অতি
সাম্প্রতিক ব্যাপার। পরিবর্তনশীল সমাজে রাষ্ট্র, গণতন্ত্র, নির্বাচনসহ
আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের সঙ্গে সঙ্গে রাজনীতিসংক্রান্ত ধারণাও পাল্টে যেতে
থাকে। রাজার ইচ্ছাই শিরোধার্য- এ নীতি আর চলবে না। জনগণ হবে রাজনীতি,
সমাজের পরিচালনাকারী শক্তি। জনগণের অভিপ্রায় এবং পক্ষের শক্তি হিসেবে
রাজনৈতিক দল গড়ে উঠলেও রাজনৈতিক দল এক অর্থে সমাজের অভিভাবক।
রাজনীতি
শুধু নীতি ও পদ্ধতিই নয়, রাজনীতি একটা সংস্কৃতিও বটে। আর নির্বাচন হচ্ছে
সেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অঙ্গ। গণতন্ত্র এবং গণতান্ত্রিক চর্চার বিষয়টি
খুব বেশি আলোচনা না হলেও নির্বাচন নিয়ে উৎসাহ আমাদের দেশে বেশ প্রবল। তাই
নির্বাচন এলেই সরগরম হয়ে ওঠে রাজনৈতিক পরিবেশ।
বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এবার প্রার্থী হতে ৩০০ সংসদীয় আসনে ৫১টি রাজনৈতিক
দলের দলীয় ও স্বতন্ত্র মিলিয়ে প্রায় ২ হাজার ৫৮২টি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছিল।
প্রতিটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ইচ্ছা করেছিলেন গড়ে আটজন। একটা বিষয়
চোখে পড়ার মতো- এত প্রার্থীর ভিড়ে নারী প্রার্থী মাত্র ৬৫ জন। ৫১টি
রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৩০টি দলের কোনো নারী প্রার্থী নেই। যাদের প্রার্থী আছে
তাদের অনেক দল কমপক্ষে ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী দিতে পারেনি। কেন পারেনি তা
নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষণ চলছে। এর কতটা সামাজিক-সাংস্কৃতিক আর কতটা
অর্থনৈতিক এবং কতটা নারীর নিরাপত্তাজনিত- সেসব আলোচনা থেকে নিশ্চয়ই
কারণগুলো বেরিয়ে আসবে। নির্বাচনে টাকা, পেশিশক্তি এবং ধর্মের প্রভাব কতটা
এবং এগুলো বজায় থাকলে নির্বাচন হলেও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বিকশিত হবে কি
না- সে প্রশ্ন থেকে যাবে।
নির্বাচন মানেই টাকাওয়ালাদের ব্যাপার, এ
বিষয়টা প্রায় প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছে আমাদের দেশের নির্বাচনগুলো। একটা কথা
তো প্রচলিত আছে- যেখানেই বিপুল সম্পদ সেখানেই লুকিয়ে আছে নানা অনিয়ম আর
দুর্নীতি। মাসে ২০-৩০ হাজার জমাতে পারেন এমন চাকরিজীবী কতজন আছে দেশে? মাসে
সংসারের সব খরচ করে ৩০ হাজার টাকা সঞ্চয় করতে পারলে বছরে জমা হবে ৩ লাখ ৬০
হাজার টাকা মাত্র। তাহলে কোটিপতি হতে সময় লাগবে কমপক্ষে ২৫ বছর। ব্যবসা
করলে অবশ্য কথা নেই। কোটিপতি, শত কোটিপতি হতে পারা যায় চোখের পলকেই। কোথা
থেকে আসে এত টাকা, এ যেন এক বিস্ময়! তবে যে কোনো বিস্ময় কিছুদিন পর
স্বাভাবিক মনে হয়। তাই মানুষ ধরে নেয় ব্যবসায়ী মানেই টাকাওয়ালা, তা সে টাকা
যেভাবেই আসুক না কেন? এই যে টাকাকেন্দ্রিক ভাবনা, তা দুর্নীতিকে সহ্য করার
মানসিকতা তৈরি করে দেয়।
নির্বাচন এলে মানুষ খেয়াল করে, যে প্রার্থীরা
নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন তারা কতটা সত্য কোথা বলছেন। নির্বাচন
কমিশনে একটা হলফনামা জমা দিয়ে প্রার্থীরা তাদের সম্পর্কে তথ্য প্রদান করেন।
এ মুহূর্তে দেশের মানুষের অন্যতম আলোচনার বিষয় প্রার্থীদের হলফনামা।
হলফনামায় তারা যা উল্লেখ করেছেন তা থেকে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ
নীতিনির্ধারকরা বার্ষিক আয়ের দিক থেকে কতটা গরিব কিন্তু সম্পদে ধনী, আর
তাদের স্ত্রীরা কতটা অর্থ, সম্পদ, জমি, বাড়ি ও সোনার মালিক। প্রার্থীদের
দেওয়া সম্পদের হিসাব থেকে জনগণ এটাও মনে করছেন যে, আমরা হয়তো টাইম মেশিনে
করে কয়েক দিনের জন্য শায়েস্তা খানের আমলে ফিরে গেছি। তা না হলে ২৫-২৬ লাখ
টাকায় ডুপ্লেক্স বাড়ি কীভাবে পেয়েছেন তারা? কিংবা ৮-১০ হাজার টাকায় এক ভরি
স্বর্ণ! এত সস্তা বাড়ি, গাড়ি, স্বর্ণালঙ্কার দেখানোর পরও কোটিপতি প্রার্থীর
সংখ্যা বেড়েই চলেছে। নির্বাচন যেন হয়ে দাঁড়িয়েছে কোটিপতিদের সংসদে যাওয়ার
প্রতিযোগিতা।
কেন এটা হয়? এর অন্যতম কারণ, টাকা কামাই করার সহজ এবং
যুক্তিগ্রাহ্য পন্থা হলো ব্যবসা করা। রাজনীতি এবং ব্যবসার মেলবন্ধন সম্পদের
মালিক হওয়াকে সহজ করে দেয়। ফলে ব্যবসায়ীরা যেতে চান সংসদে। তাই দেখা
যাচ্ছে, সর্বশেষ দ্বাদশ জাতীয় সংসদে মোট সদস্যদের ৬৭ শতাংশই ছিলেন
ব্যবসায়ী, একাদশ জাতীয় সংসদে ৬২ শতাংশ এবং প্রথম জাতীয় সংসদে ছিল ১৮ থেকে
২৪ শতাংশ।
সংসদ সদস্য পদে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে দলগুলো প্রায়ই
আর্থিক সক্ষমতা যাচাই করে, যারা নিজ খরচে সভা-সমাবেশ বা প্রভাবশালী
ব্যক্তিদের অনানুষ্ঠানিক অর্থ প্রদান করতে পারেন, তাদেরই অগ্রাধিকার দেওয়া
হয়। যদি এক আসনে একাধিক আগ্রহী প্রার্থী দলীয় মনোনয়ন চান তাহলে প্রতিযোগিতা
তীব্র হয়, সমর্থক জোগানোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা বেড়ে ওঠে এবং টাকার খেলা জমে
ওঠে। মনোনয়ন পাওয়ার পর প্রচারযুদ্ধ আরও ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে, যেখানে পোস্টার ও
প্রচারসামগ্রী, কর্মীদের হাতখরচ, পরিবহন, গণসংযোগ এবং সামাজিক
যোগাযোগমাধ্যমে ডিজিটাল প্রচারণার জন্য বড় অঙ্কের অর্থ লাগে।
প্রতিযোগিতামূলক
আসনে ভোটারদের আকৃষ্ট করতে ব্যয় আরও বেড়ে যায়। নির্বাচনের দিনেও পোলিং
এজেন্টের খরচ, কেন্দ্র খরচ, প্রার্থীর নিরাপত্তা, নজরদারি ও ভোটকেন্দ্রে
প্রভাব বিস্তার খাতে ব্যয় বাড়ে। টাকা খরচ হতে থাকে পানির স্রোতের মতো। এক
বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনাময় প্রার্থী বলেছেন, নির্বাচনের দিনের জন্যই তো
কমপক্ষে এক কোটি টাকার অদৃশ্য হাতবদল হয়ে থাকে।
এখানেই শেষ নয়,
নির্বাচনের পরে স্থানীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা, দলের পক্ষ থেকে নানা
ধরনের অনুদান, এলাকায় এলাকায় দলীয় অফিস পরিচালনা, স্থানীয় নানা সামাজিক
অনুষ্ঠান ও প্রতিষ্ঠানে অনুদান এবং জনসংযোগ বজায় রাখতে সংসদ সদস্যরা বিপুল
ব্যয় করে থাকেন যা এক ধরনের বিনিয়োগও বটে। এ টাকার উৎস কী? সম্পদ বাড়ানো
এবং সম্পদ দখলের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হন তারা। ফলে সংসদ সদস্যরা আইনপ্রণেতা
বা নীতিনির্ধারক হওয়ার পরিবর্তে মূলত চাকরি, বদলি, খাল, নদী, বন, খাসজমি
দখল, ঠিকাদারি করা বা নিয়ন্ত্রণ করার দিকেই মনোযোগী হয়ে পড়েন। নির্বাচন তাই
যেন এক লাভজনক বিনিয়োগ। টাকা খাটিয়ে নির্বাচন করে, টাকা বাড়ানোর কাজে
নিয়োজিত থাকেন সংসদ সদস্যরা।
নির্বাচনে টাকা খরচের এ প্রবণতা
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার দুর্বলতাকে উন্মোচন করে। টাকা কে দেয় এবং কেন দেয় এ
প্রশ্ন তুললে দেখা যায়, দলের সামান্য অনুদান ও ব্যক্তিগত সঞ্চয়ের বাইরে
ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী যারা টাকা দেওয়াকে বিনিয়োগ
হিসেবে দেখে তারাই সম্ভাবনাময় বিজয়ী প্রার্থীদের প্রধান টাকার জোগানদারে
পরিণত হয়।
আবার বিপুল টাকার অধিকারী, বিরাট বিরাট করপোরেট
প্রতিষ্ঠানগুলো একচেটিয়া ব্যবসায়িক সুবিধা পাওয়ার আশায় বিভিন্ন প্রার্থীদের
অর্থায়ন করে থাকে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে স্থানীয় এনজিওগুলো ভবিষ্যতে সুবিধা
পাওয়ার আশায় প্রার্থীদের বিভিন্ন লজিস্টিক সহায়তা করে। ফলে সংসদ সদস্য
জিম্মি হয়ে পড়ে টাকার মালিকদের কাছে যারা প্রদত্ত টাকার বহু গুণ বেশি আদায়
করেন জনগণের কাছ থেকে।
তাহলে নির্বাচনকে টাকার খেলা এবং টাকাওয়ালাদের
বিনিয়োগ হিসেবে না দেখতে চাইলে করণীয় কী? নির্বাচন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী
একটি আসনে যদি ৩০ থেকে ৫০ লাখ টাকাও খরচ করেন কোনো প্রার্থী, তাহলে সেই
টাকার উৎস কী হবে? ২৫-৩০ বছর বয়সী কেউ যদি নির্বাচন করতে চান, একজন সৎ
মানুষ, রাজনৈতিক কর্মী বা শিক্ষক যদি নির্বাচন করতে চান তার টাকার উৎস কী
হবে? নির্বাচন যদি জনগণের কথা সংসদে বলার জন্য, আইন প্রণয়ন করার জন্য,
দেশের নীতি ও পদ্ধতি নিয়ে সংসদে বিতর্ক করার জন্য হয়, তাহলে জনগণের সহায়তা
কি প্রার্থীরা চাইবেন না? জনগণের কাছ থেকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সহায়তা নিয়ে
নির্বাচন করলে শুধু গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে উঠবে তাই নয়, জবাবদিহির
সংস্কৃতিও গড়ে উঠবে। এ শুধু হাত পাতা নয় বরং সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া।
জনগণের অংশগ্রহণে, জনগণের সহায়তায়, জনগণের জন্য কাজ করার মানসিকতা ছাড়া কি
টাকার খেলা বন্ধ করা যাবে? তখনই জনগণ সত্যিকারের ক্ষমতার উৎস হতে পারবেন।
লেখক: সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)
