শনিবার ২৪ জানুয়ারি ২০২৬
১১ মাঘ ১৪৩২
শান্তির নোবেল, নোবেলের অশান্তি
আলমগীর খান
প্রকাশ: শনিবার, ২৪ জানুয়ারি, ২০২৬, ১২:৫৪ এএম আপডেট: ২৪.০১.২০২৬ ১:২৯ এএম |

 শান্তির নোবেল, নোবেলের অশান্তি
নোবেল শান্তি পুরস্কার কি বিশ্বযুদ্ধের কারণ হতে পারে? সময়টা বিংশ শতাব্দী হলে এমন একটা প্রশ্নকে হাস্যকর মনে করা হতো। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীটা অন্য জিনিস। এ শতাব্দীতে হাসি কান্নায় আর কান্না হাসিতে, হালকা গভীরে আর গভীর হালকায়, সত্য মিথ্যায় আর মিথ্যা সত্যে, ভণ্ড সাধুতে আর সাধু ভণ্ডে রূপান্তরিত হয়ে যাচ্ছে। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরেরও যে এতে কিছু হাত আছে তা স্পষ্ট বোঝা যায়। না হয় তিনি তখন লিখবেন কেন-‘তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ, আমি আজ চোর বটে।’ তার ফল এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি।
রবীন্দ্রনাথের অনেক দুষ্টুমি এখন ধরা পড়ে যাচ্ছে। ১৯০৫ সালে তিনি এক বাউল কবির একটা গান নকল করে আমাদের জন্য একখান জাতীয় সংগীত লিখে ফেললেন, অথচ তাকে তখন কেউ জাতীয় সংগীত লেখার জন্য অনুরোধ করেনি। একই বলে গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়ল। কেবল তাই নয়, জাতীয় সংগীতটিকে আমাদের গেলানোর জন্য ১৯১৩ সালে আবার সাহিত্যে একটা নোবেল পুরস্কার বাগিয়ে নিলেন। এভাবে তার গানটাকেই জাতীয় সংগীত হিসেবে গ্রহণ করতে তিনি আমাদের প্ররোচিত করলেন। আর এমন কায়দা করেছেন যে এখন তার লেখা গানটিকে অনেকে ফেলতেও পারছেন না। চেষ্টা চলছে অনেক। কিন্তু লোকটি চালাকি করে গানটির মাঝে এমনসব বৈশিষ্ট্য ঢুকিয়ে দিয়েছেন যাতে করে জাতীয় সংগীতের সব উপদান এখানে পাওয়া যায়। ফলে এর সমতুল্য বা এরচেয়ে ভাল ভাল অনেক গানও আর আমাদের মনের মনের মত হচ্ছে না।
তখন ‘আমার সোনার বাংলা’ লেখা না হলে এখন আমরা ঠিকই একখান জাতীয় সংগীত ঠিক করে ফেলতাম, অথবা লিখে ফেলতাম। আর বাঙালির সাহিত্যে নোবেল পাওয়ার পথটাও আটকে দিলেন। লক্ষণীয় যে, এরপর থেকে বাঙালি আরও কিছু বিষয়ে নোবেল পেল, কিন্তু সাহিত্যে পেল না! ফলে বাংলা সাহিত্যের জীবনের স্বার্থে তাকে ফেলে দেওয়া খুবই জরুরি হয়ে উঠেছে। একবার পঞ্চপাণ্ডব বলে পরিচিত আধুনিক পাঁচ কবি আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন। অথচ রবীন্দ্রনাথ পড়ে না গিয়ে বাঙালির জাতীয় জীবনে আরও শক্ত হয়ে গেড়ে বসলেন। এখন আমরা এ কাজে কবিদের ওপর থেকে সব ভরসা হারিয়ে ফেলেছি। তাই অ্যক্টিভিস্টদের লাগিয়েছি তার পশ্চাতে, আর অ্যাক্টিভিস্টদের নেতৃত্বে বসিয়ে দিয়েছি কয়েকজন পিলে চমকানো পাণ্ডিত্যের ধ্বজাবাহীকে।
তবে রবীন্দ্রনাথের দুর্বুদ্ধির ফলে সাহিত্যে আর না পেলেও ২০০৬ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়ে আমরা আবার বিশ্বকে চমকে দিয়েছি। কিন্তু এই নোবেল শান্তি পুরস্কার মুহাম্মদ ইউনূসের জীবনে অশান্তির এক উৎস হয়ে উঠল। কারণ আমাদের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ঠিক এই পুরস্কারটিরই স্বপ্ন দেখছিলেন, অন্তত দুবার তিনি আশা করেছিলেন পুরস্কারটি, প্রথমে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি করে, পরে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে। ফলে অধ্যাপক ইউনূসকে কী যে নাকানি-চুবানি খেতে হলো তা সবারই জানা। তাকে পদ্মার পানিতে চুবানোর সাধ পূরণ হওয়ার আগে অবশ্য শেখ হাসিনাকেই গণজোয়ারে খড়ের টুকরোর মত ভেসে যেতে হলো।
নোবেল শান্তি পুরস্কার পেতে এবার চরম উতলা হয়ে উঠেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। তিনি ক্ষেপেছিলেন কালো রঙের মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা নোবেল পুরস্কার পাওয়ায়। ওবামা যা-যা পেয়েছেন তার সব তাকে পেতে হবে, কিংবা তারচেয়েও বেশি কিছু! বিশ্বে নানারকম যুদ্ধ পরিস্থিতিকে তিনি ব্যবহার করতে থাকলেন নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার জন্য একটা দরকষাকষি হিসেবে। কেউ কেউ ঘুষ হিসেবে হলেও একটা নোবেল দিয়ে তার মাথা ঠান্ডা করতে রাজি ছিলেন। তবে ওবামাকে নোবেল দিয়ে একবার ঠকবার পর নোবেল কমিটি সঠিকভাবেই ট্রাম্পকে আর সেটা দিতে চায়নি। কিন্তু সমস্যাটাও আবার তারাই বাধিয়েছে। এবারকার নোবেলটা তারা ট্রাম্পকে না দিয়ে তাকে আরও ক্ষেপাবার উদ্দেশ্যেই যেন দিল তারই পদলেহী ভেনেজুয়েলার মারিয়া কোরিনা মাচাদোকে।
এর ফল এখন বিশ্ববাসী দেখছে আর ভেনেজুয়েলার জনগণ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। মাচাদো নিজেও চেয়েছিলেন নোবেল পুরস্কারটা ট্রাম্পকে দেওয়া হোক। কারণ তার লোভ ভেনেজুয়েলার ক্ষমতায় আরোহণ। তার পুরস্কার পাওয়াটা বিশ্বের অনেককেই বিস্মিত করেছে। যে ব্যক্তি নিজের দেশকে আক্রমণ করতে বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানকে অনুরোধ করে, আবার নেতানিয়াহুর মত এক গণহত্যাকারী প্রেসিডেন্টের কাছে সামরিক সাহায্য চায়-তার নামের সঙ্গে শান্তি পুরস্কারটা কিছুতেই মানানোর কথা না। চতুর মাচাদো তার নোবেল পুরস্কার ট্রাম্পকে উৎসর্গ করলেন। ট্রাম্পের কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা লাগল এতে। তার স্বপ্নের পুরস্কারটি কিনা তারই পদলেহী এক নারীর হাতে! তিনি একেবারে মধ্যযুগের ডাকাতের মত করে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরো ও তার স্ত্রী ফ্লোরেসকে অপহরণ করে সোজা নিউ ইয়র্কে নিয়ে এলেন। বাহাদুর বটে! ট্রাম্প এখন বিশ্বের সকল মাস্তান বাহিনীর সর্বস্বীকৃত নেতা। মাদুরো ও ফ্লোরেস দুজনই ট্রাম্পবাহিনীর হাতে শারীরিক নির্যাতনের শিকার।
মাদুরোর ওপর ট্রাম্পের ক্ষেপবার বড় কারণ তিনি হুগো শাভেজের পথ অনুসরণ করে ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদকে রক্ষা করেছেন, মার্কিন ও পশ্চিমা শক্তির হাতে তুলে দেননি। অতএব ট্রাম্পের ‘তেল , তেল, তেল’ প্রলাপ বকে পাগল হওয়ার অবস্থা। ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন এখন থেকে তিনিই ভেনেজুয়েলা চালাবেন, অর্থাৎ তিনি এখন ভেনেজুয়েলারও প্রেসিডেন্ট। বিশ্ব রাজনীতিকে ডনাল্ড ট্রাম্প চরদখলের রাজনীতিতে উন্নীত করেছেন, এ তার এক উল্লেখযোগ্য অবদান! মধ্যযুগের পর তিনি আবার প্রতিষ্ঠা করলেন ‘জোর যার মুল্লুক তার নীতি।’
নোবেল শান্তি পুরস্কারটা মাচাদোর গলার কাঁটা হয়ে উঠলো যখন মাদুরো ও তার স্ত্রীকে অপহরণ করে ট্রাম্প তার দিকে ফিরেও তাকালেন না। উল্টো বলে বসলেন, দেশের মানুষের কাছে মাচাদোর গ্রহণযোগ্যতা নেই। মাচাদোর হাতের নোবেল পুরস্কারের ওপর ট্রাম্পের চোখ ঘুরতে লাগলো। বুঝলেন তিনি, আর তাই দৌড়ে গেলেন হোয়াইট হাউসে। ভাবে গদগদ হয়ে তিনি পুরস্কারটা ট্রাম্পকে উপহার দিয়ে বললেন, “এটি ভেনেজুয়েলাবাসীদের জন্য একটি ঐতিহাসিক দিন।” তাকে ভেনেজুয়েলার ক্ষমতায় বসানোর ব্যাপারে ট্রাম্পের ওপর তার আস্থা লজ্জাহীনভাবে বিশ্ববাসীকে জানালেন।
ট্রাম্পও লজ্জাহীনভাবে পুরস্কারটা নিলেন। কাক্সিক্ষত পুরস্কারটা হাতে পেয়ে এবার তিনি ‘চমৎকার মহিলা’ মাচাদোর প্রশংসায় পঞ্চমুখ হলেন। পুরস্কার নিয়ে সবাইকে বললেন, “এ হলো পরস্পরিক সম্মানের নিদর্শন!” এদিন বিশ্ববেহায়াদের মাঝে যুগ্ম চ্যাম্পিয়ন হয়ে উঠলেন তারা দুজন।
তবে নোবেল পুরস্কার কমিটি যে কতখানি লজ্জা পেল তা বোঝা গেল না। তারা সোজাসাপ্টা বলে দিল নোবেল পুরস্কারের পদক একজন আরেকজনকে দিতে পারে, কিন্তু সম্মানটা হস্তান্তর করা যায় না। অর্থাৎ তুমি মাচাদো যতই চেষ্টা করে না কেন, নোবেল পুরস্কারের যে সম্মান আমরা তোমাকে দিয়েছি তা অব্যাহত থাকবে, সেটা তুমি কিছুতেই ট্রাম্পকে হস্তান্তর করতে পারবে না।
তবে নরওয়েজিয়ান পিওপল’স এইডের মহাসচিব রেমন্ড জনসন তার ফেইসবুকে লিখেছেন, “এটি অবিশ্বাস্যরকম বিব্রতকর এবং বিশ্বের সবচেয়ে খ্যাতিমান ও গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কারের জন্য ক্ষতিকারকও। এ পুরস্কার এখন এতটাই রাজনীতিকৃত ও গভীরভাবে বিপজ্জনক যে এ থেকে একটা শান্তি পুরস্কার বিরোধী আন্দোলনও জন্ম নিতে পারে।” (গিভিং ট্রাম্প দ্য নোবেল পিস প্রাইজ মেডাল ইজ অ্যাবসার্ড, সে নরওয়েজিয়ান পলিটিশিয়ানস, মিরান্ডা ব্রায়ান্ট, দ্য গার্ডিয়ান, ১৬ জানুয়ারি ২০২৬)
ট্রাম্প এবার গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি দিয়েছেন। ইরানকে সরাসরি আক্রমণের জন্য গোপনে প্রস্তুতি গ্রহণ করছেন। চোখ রাঙাচ্ছেন মেক্সিকো ও কানাডাকে। বর্তমানে মাত্র দুই দেশের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প-যার কিনা স্থান হওয়ার কথা হেগে! এত সামান্যতে তার লোভ পূরণ হওয়ার নয়-চাই আরও দেশের ক্ষমতা। ট্রাম্পের সীমাহীন লোভের মাঝে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আভাস দেখছেন অনেকেই।
লেখক: সম্পাদক, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি (ছোটকাগজ)।












http://www.comillarkagoj.com/ad/1752266977.jpg
সর্বশেষ সংবাদ
ছুটির দিনে জমজমাট প্রচারণা
ফ্যামিলি কার্ড ভুয়া-বেআইনি
দিনব্যাপী মনিরুল হক চৌধুরীর গণসংযোগ
ভোট কেন্দ্র দখলের চেষ্টা হলে জনগণ জবাব দিতে প্রস্তুত
সমাবর্তন পেয়ে পাহাড়কাপানো উল্লাসে মেতে উঠলো সিসিএন বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটরা
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
প্রচারণার প্রথম দিনেই সংঘর্ষ
কুমিল্লায় উৎসবমুখর নির্বাচনি প্রচারণায় প্রার্থীরা
প্রার্থিতা ফিরে পেতে এবার আপিলে যাচ্ছেন মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী
অস্ত্র-গুলি উদ্ধার অভিযানে আইনজীবীসহ গ্রেপ্তার ২
সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষ্যে কুমিল্লা এরিয়া পরিদর্শনে সেনাপ্রধান
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: newscomillarkagoj@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২