
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে দেশব্যাপী হঠাৎ উত্তাপ ছড়িয়েছে। এতে করে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সংঘাতের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ নির্বাচনের আপিল শুনানি শেষ হয়েছে গত রবিবার। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন ছিল মঙ্গলবার। বৃহস্পতিবার চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ ও প্রতীক বরাদ্দের পর প্রার্থীরা আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু করবেন। সম্প্রতি উদ্বেগজনকভাবে লক্ষ করা যাচ্ছে, বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির তেমন একটা উন্নতি হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচন কমিশন এখন পর্যন্ত সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি। এরই মধ্যে গত সোমবার চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে অভিযানে গিয়ে সন্ত্রাসীদের গুলিতে র্যাবের এক কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। বিষয়টি খুবই শঙ্কার। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানি ও অপপ্রচার, মব সহিংসতা এবং নানাবিধ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে জননিরাপত্তা নিয়ে একধরনের প্রশ্ন উঠেছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা নানাভাবে সতর্ক করলেও সরকার সেভাবে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেনি; যা গোটা নির্বাচনি পরিবেশকে অস্থির করে তুলতে পারে এবং বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি এবং ১০-দলীয় জোটভুক্ত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)- এই চার পক্ষের পারস্পরিক অভিযোগ ও অবস্থান নির্বাচনি পরিবেশকে আরও জটিল করে তুলেছে। একদিকে বিএনপি নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতমূলক আচরণের অভিযোগ তুলছে, অন্যদিকে এনসিপি প্রকাশ্যে বলছে, বর্তমান নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের সক্ষমতা হারিয়েছে। নির্বাচন পেছাতে একটি গোষ্ঠী ষড়যন্ত্র করছে বলেও আশঙ্কার কথা বড় দলগুলোর পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে উচ্চারিত হচ্ছে। নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরুর পর থেকেই বিভিন্ন সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর বিরোধ বাড়তে থাকে। ভোটের কার্যক্রম চলাকালে বিএনপির প্রার্থী ও এনসিপি নেতাদের মধ্যে দফায় দফায় বাগ্বিতণ্ডার ঘটনাও ঘটেছে। জামায়াতের অভিযোগ, প্রশাসন একটি বিশেষ দলের (বিএনপি) প্রতি ঝুঁকে পড়েছে। সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ নেই। একই সঙ্গে পোস্টাল ব্যালটের মাঝখানে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীক যেভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, তা নিয়েও নির্বাচন কমিশনে আপত্তি জানিয়েছে দলটি। এর পেছনে একটি বিশেষ দলের রাজনৈতিক অপকৌশল রয়েছে বলে মনে করছে বিএনপি।
পত্রিকান্তরে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা গেছে, রাজনৈতিক উত্তাপ শুধু কেন্দ্রেই সীমাবদ্ধ নেই। কেন্দ্রীয় পর্যায়ের এ সংকট ও অনিশ্চয়তা এখন তৃণমূল পর্যায়েও স্পষ্টভাবে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। বিভিন্ন এলাকায় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী বড় দলগুলোর প্রার্থীরা একে অন্যের সঙ্গে প্রকাশ্যে বিতণ্ডায় জড়াচ্ছেন। কয়েকটি স্থানে এ বিতণ্ডা সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। নির্বাচনি প্রচার শুরু হলে এসব সংঘাতে প্রাণনাশের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যেতে পারে। এসব ঘটনায় এখন পর্যন্ত প্রশাসনের কোনো দৃশ্যমান ও কার্যকর ভূমিকা লক্ষ করা যায়নি; যা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে। এদিকে জোটের রাজনীতিতেও ভাঙনের সুর স্পষ্ট হয়েছে। এতে করে তৃণমূল পর্যায়ে জামায়াতের সঙ্গে ইসলামী আন্দোলনের নেতা-কর্মীরা দ্বন্দ্বে জড়িয়েছেন; যা ভোটের মাঠে উত্তেজনা বাড়াবে বলে মনে করছেন অনেকেই। আমরা লক্ষ করেছি, নির্বাচন কমিশনের ভেতরে ও আশপাশে সহিংসতা সৃষ্টির চেষ্টা চলছে, যা গণতান্ত্রিক পরিবেশকে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে। চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা ও প্রতীক বরাদ্দ চূড়ান্ত হওয়ার পর প্রার্থীরা যাতে নির্বিঘ্নে তাদের প্রচার-প্রচারণা চালাতে পারেন, সে জন্য সরকারকে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে হবে। উৎসবমুখর নির্বাচনি পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার রোধ করা জরুরি। এখনো অনেক অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার হয়নি এবং সন্ত্রাসীদেরও গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। এগুলো জননিরাপত্তায় চরম বাধা। এ পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন-পূর্ব ও নির্বাচনোত্তর সরকারকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সরকার পরিস্থিতি মোকাবিলায় কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হবে, এটাই প্রত্যাশা।
