বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন
করপোরেশন (বিআরটিসি) যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি আধা স্বায়ত্তশাসিত
প্রতিষ্ঠান। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এ প্রতিষ্ঠানটিতে অনিয়ম-দুর্নীতির
অভিযোগ নিত্যদিনের। গত কয়েক বছরে বিআরটিসি কিছুটা লাভের মুখ দেখলেও বিভিন্ন
ডিপো ব্যবস্থাপক, চালক, চালকের সহকারীরা রাজস্ব আত্মসাৎ করেছেন বলে
অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। রাজস্ব এজমার প্রধান কারণ হলো বাসের
টিকিট ও ভাড়া আদায়ে অনিয়ম। রাজধানীতে চলাচল করা বিআরটিসির সব বাসে টিকিট
দেওয়া হয় না। যদিও কিছু দেওয়া হয় তা ম্যানুয়াল সিস্টেমে। বাসচালক, চালকের
সহকারীরা হিসাবের খাতায় টিকিট কম বিক্রি হয়েছে বলে তথ্য দেন। প্রতি ট্রিপে
কত সংখ্যক যাত্রী পরিবহন করা হচ্ছে তার সঠিক তথ্য পান না ডিপো ব্যবস্থাপক।
বিআরটিসির কিছু এসি বাসে ই-টিকিটের ব্যবস্থা চালু করা হলেও অধিকাংশ
ক্ষেত্রে ম্যানুয়াল সিস্টেমে টিকিট বিক্রি করা হয়। অনুসন্ধানে দেখা যায়,
ইউনিট-প্রধানরা দায়িত্ব নেওয়ার সময় যে আর্থিক হিসাব দেখান এবং দায়িত্ব
ছাড়ার সময় যে হিসাব দেন এই দুইয়ের মধ্যে মিল থাকে না। এতে দায়িত্বকালীন
অর্থ ও সম্পদের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। বাজেট ব্যবস্থাপনাতেও গুরুতর অনিয়ম লক্ষ
করা গেছে। খাতভিত্তিক অনুমোদিত বাজেটের বাইরে অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। এক
খাতের অর্থ অন্য খাতে ব্যয় করার প্রবণতাও দেখা গেছে। জ্বালানি খাতে অনিয়ম
সবচেয়ে বেশি হয়েছে। বাসের প্রকৃত চলাচলের চেয়ে বেশি কিলোমিটার চলা দেখিয়ে
অতিরিক্ত জ্বালানির বিল তোলা হয়েছে। একইভাবে কয়েকটি ডিপোর ব্যবস্থাপক দৈনিক
মজুরিভিত্তিক কর্মচারীদের কর্ম দিবস বেশি দেখিয়ে অতিরিক্ত বিল আদায়
করেছেন।
কারিগরি বিভাগের তদন্তে দেখা গেছে, বিভিন্ন ইউনিট-প্রধান এবং
ডিপো ব্যবস্থাপকরা ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি সঠিকভাবে অনুসরণ করেননি। অর্থাৎ
চুক্তির শর্ত ভেঙে ইচ্ছামতো দামে যন্ত্রাংশ কিনেছেন। আবার অনেক সময় ভ্যাট ও
আয়কর কর্তন না করে বিল পরিশোধ করা হয়েছে। এতে বিআরটিসির আর্থিক দায় বহু
গুণ বেড়েছে। আয়-ব্যয়ের হিসাবেও বড় ধরনের অনিয়ম এবং গরমিল পাওয়া গেছে।
চালকদের মধ্যেও অনিয়মের প্রবণতা দেখা গেছে। বাসের অর্জিত কিলোমিটারের চেয়ে
বেশি কিলোমিটার দেখিয়ে অতিরিক্ত ছাড়পত্র নেওয়া হয়েছে। ডিপোগুলোর নিজস্ব
জ্বালানি পাম্প থাকা সত্ত্বেও অনেক ডিপো বাইরে থেকে জ্বালানি কিনে ব্যয়
অযথা বাড়িয়েছে। নানা সমস্যার মধ্যেও আয়-ব্যয়ের হিসাবে ডিপোগুলোকে লাভজনক
দেখিয়েছেন বিভিন্ন ইউনিট ও ডিপো-প্রধানরা। এরপরও কার্যালয় থেকে আর্থিক
সহায়তা নেওয়ার প্রবণতা আগের তুলনায় বেড়েছে। আয়-ব্যয় ও নিট লাভের হিসাব
পরবর্তী দিন অপারেশনস বিভাগে পাঠানোর নির্দেশনা থাকলেও সব বাস ডিপোতে তা
যথাযথ প্রক্রিয়ায় মানা হচ্ছে না।
তথ্য মতে, সারা দেশের ১২টি ডিপো থেকে ৭
কোটি ১৮ লাখ ৩৮ হাজার ৪৯ টাকার রাজস্ব আহরণ করতে পারেনি বিআরটিসি।
পাশাপাশি দীর্ঘ মেয়াদে বিআরটিসির বাস ইজারা নিয়ে দেশের ছয়টি ডিপোয় ৩ কোটি
১৪ লাখ ৬৫ হাজার ৯৯ টাকা বকেয়া রেখেছেন বিভিন্ন মালিক ও বেসরকারি
প্রতিষ্ঠান। সব মিলিয়ে গত বছর ১০ কোটি ৩৩ লাখ ৩ হাজার ১৪৮ টাকার রাজস্ব
আদায় করতে পারেনি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বিআরটিসি।
বিআরটিসির হিসাবে
গরমিল ও অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে সরকারকে কঠোর আইনানুগ
ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে যে পরিমাণ অনিয়ম ও দুর্নীতির
জঞ্জাল বাসা বেঁধেছে তা কঠোর হস্তে নির্মূল করতে হবে। বিআরটিসি কর্তৃপক্ষ,
ডিপো ব্যবস্থাপক, চালক ও চালকের সহকারী সবার কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি
নিশ্চিত করতে হবে। বিআরটিসিকে যুগোপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে। এজন্য ভেহিকেল
ট্রাকিং সিস্টেম (ভিটিএস) প্রযুক্তি সংযুক্ত করতে হবে। এতে বিআরটিসিতে
স্বচ্ছতা ফিরবে। আশা করছি, সরকার বিআরটিসিকে আধুনিকায়ন ও গতিশীল করে একটি
লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে সক্ষম হবে।
