
আমানতকারীরা মুনাফার আশায় ব্যাংকে টাকা গচ্ছিত রাখেন। প্রয়োজনের সময় যাতে তারা এই টাকা কাজে লাগাতে পারেন সেজন্য ব্যাংকই তাদের ভরসা। কিন্তু লক্ষ করা যাচ্ছে, আমানতকারীদের ব্যাংকের প্রতি তাদের আস্থা ও স্বস্তি এখন রীতিমতো অস্বস্তিতে পরিণত হয়েছে। এখন তাদের বারবার ভাবতে হচ্ছে কোথায় টাকা রাখলে নিরাপদ থাকবে। ব্যাংকের কাছে মুনাফা পাওয়া তো দূরের কথা এখন আসল টাকা ফেরত পাওয়াই দুরূহ হয়ে উঠেছে। আমানতকারীদের সঙ্গে ব্যাংকের লেনদেন হবে নিয়মিত ও সুরক্ষার। কিন্তু একীভূত পাঁচ ব্যাংকের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে তার উল্টো চিত্র। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদিত ব্যাংকে আমানতকারীরা টাকা জমা রেখেও টাকা তুলতে পারছে না। এর সঙ্গে নতুন করে গত বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংক আমানতকারীদের দুই বছরের মুনাফা ‘হেয়ারকাট’ (আমানতের একটি অংশ কেটে রাখা) করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই দিনে এই সিদ্ধান্তের কথা পাঁচ ব্যাংকের প্রশাসককে চিঠি দিয়ে জানিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর সব আমানতকারীর আমানত হিসাব আবার গণনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নৈতিকতার দিক থেকে বৈষম্যমূলক ও অমানবিক। অনেকে অভিযোগ করে বলছেন, ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশের বাইরে গিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্ষমতাবলে অনেক সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, পাঁচ ব্যাংকে বর্তমানে ৭৫ লাখ আমানতকারীর প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা জমা রয়েছে। তার বিপরীতে এসব ব্যাংকের ঋণ রয়েছে ১ লাখ ৯৩ হাজার কোটি টাকা, যার বড় অংশ ইতোমধ্যে খেলাপি হয়ে গেছে।
একীভূত পাঁচ ব্যাংক হচ্ছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক। এই পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক নামে নতুন ব্যাংক গঠন করা হয়েছে। একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকের বিনিয়োগকারীরা ২০২৪ ও ২০২৫ সালে তাদের স্থিতির ওপর কোনো মুনাফা পাবেন না। বাংলাদেশ ব্যাংকের এমন সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আমানতকারীরা। তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। অনেকেই সশরীরে ব্যাংকে গিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এতে কোনো কোনো ব্যাংক শাখায় অপ্রীতিকর ঘটনারও খবর পাওয়া গেছে। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডেকে বলেন, ‘সম্পূর্ণ শরিয়াহ আইন মেনেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে আমাদের পুনর্মূল্যায়নে দেখা গেছে, এই ব্যাংকগুলোতে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ফলে শরিয়াহ আইন মেনে তাদের মুনাফা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ২০২৪ সালের আগ পর্যন্ত যে মুনাফা দেওয়া হয়েছে সেটিও প্রশ্নবিদ্ধ।’ আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষার নামে গভর্নরের দেওয়া বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে আমানতকারীরা গভর্নরের পদত্যাগের দাবিতে তীব্র আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
বিষয়টিকে অনৈতিক উল্লেখ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, নৈতিকতার দিক থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা উচিত। কেননা যদি বাংলাদেশ ব্যাংকের বিবেচনায় ব্যাংকগুলো লস করার পরও মুনাফা দেয়, তাহলে এর দায় সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালকদের, যা কোনোভাবেই বিনিয়োগকারীদের ওপর বর্তায় না। এটা একটা অনৈতিক সিদ্ধান্ত। এটা অনেকটা উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপানোর মতো অবস্থা। এই সিদ্ধান্ত বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বড় ধরনের বৈষম্য সৃষ্টি করবে।
একীভূত পাঁচ ব্যাংকের আমানতকারীরা এমনিতেই তাদের জমা করা অর্থ প্রয়োজনে তুলতে পারছে না তার ওপর মুনাফা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। সরকারও মুনাফার ওপর ট্যাক্স কেটে নিয়েছে। আমানতকারীরা প্রশ্ন করেছে, তাহলে সরকার কি কেটে নেওয়া টাকা ফেরত দেবে? এতে করে তাদের ওপর বড় ধরনের বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। নৈতিকতার দিক থেকে এটি সমর্থনযোগ্যও নয়। সরকার আমানতকারীদের অসহায় অবস্থা বিবেচনা করে নৈতিক দিক থেকে বিষয়টির সুরাহা করবে।
