নিজস্ব প্রতিবেদক।।
চট্টগ্রামের
সীতাকুণ্ডে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত র্যাব কর্মকর্তা মোতালেব হোসেনের
জানাজা শেষে দাফন সম্পন্ন হয়েছে। মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) রাত বাদ এশা
কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার কালিবাজার অলিপুর নূরে মদিনা হাফিজিয়া মাদ্রাসা
ও এতিমখানা মাঠে মরহুমের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে নিজ বাড়ির সামনে
মসজিদের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়।
র্যাব কর্মকর্তা মোতালেব হোসেনের
জানাজায় কুমিল্লা জেলা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে
উপস্থিত ছিলেন কুমিল্লা সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, বর্ডার গার্ড
বাংলাদেশ (বিজিবি) পক্ষে ৪ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট
কর্নেল মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন, র্যাব-১১ এর সিও লেফটেন্যান্ট কর্নেল
সাজ্জাদ হোসেন, র্যাব-৭ এর সিও লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান,
কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান, র্যাব-১১ সিপিসি-২ এর কোম্পানি
অধিনায়ক সাদমান ইবনে আলমসহ প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও স্থানীয়
জনপ্রতিনিধিরা।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলার
অলিপুর গ্রামের প্রয়াত আবদুল খালেক ভুইয়ার ১১ সন্তানের মধ্যে মোতালেব হোসেন
ছিলেন সবার ছোট। সন্তানদের লেখাপড়ার সুব্যবস্থার জন্য তিনি ঢাকায় ভাড়া
বাসায় বসবাস করতেন। দুই মেয়ে ও এক ছেলের জনক মোতালেব হোসেন নিজ গ্রামসহ
আশপাশের মানুষের সঙ্গে অত্যন্ত আন্তরিকভাবে মেলামেশা করতেন এবং এলাকায় তিনি
পরিচিত ছিলেন একজন নম্র, ভদ্র ও শান্ত স্বভাবের মানুষ হিসেবে। সন্ত্রাসী
হামলায় নিহত হওয়ার মাত্র দুই দিন আগে ছুটি কাটিয়ে কর্মস্থলে যোগ দেন তিনি।
কর্মস্থলে থাকা অবস্থায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে তিনি নিহত হন। মঙ্গলবার
চট্টগ্রামে সব ধরনের আনুষ্ঠানিকতা শেষে সন্ধ্যায় তার মরদেহ গ্রামের বাড়িতে
পৌঁছালে এক হৃদয়বিদারক পরিবেশের সৃষ্টি হয়। মরদেহ বাড়িতে পৌঁছানোর সঙ্গে
সঙ্গে স্বজনদের কান্নায় আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে এবং প্রিয় মানুষটিকে এক
নজর দেখার জন্য আত্মীয়স্বজন ও এলাকাবাসীর ভিড় জমে। পরে অলিপুর ঈদগাঁও মাঠে
জানাজা শেষে তাকে নিজ বাড়ির সামনে মসজিদের পাশেই দাফন করা হয়। স্থানীয়
বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধি কামরুজ্জামান জানান, মোতালেব হোসেন ছিলেন অত্যন্ত
নম্র, ভদ্র ও শান্ত স্বভাবের একজন মানুষ। তিনি এই সন্ত্রাসী হত্যাকাণ্ডের
সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবি জানান।
মঙ্গলবার (২০
জানুয়ারি) দুপুরে পতেঙ্গা র্যাব ৭ এর কার্যালয়ে কান্না জড়িত কণ্ঠে
কথাগুলো বলছিলেন সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত
র্যাবের নায়েব সুবেদার মো. মোতালেব হোসেন ভূঁইয়ার স্ত্রী শামসুন্নাহার।
এসময় তার সঙ্গে বড় ছেলে মেহেদী হাসান, বড় মেয়ে শামিমা জান্নাত ও ছোট মেয়ে
সিদরাতুল মুনতাহা এবং আত্মীয়-স্বজনরা ছিলেন।
শামসুন্নাহার বলেন, এই
সন্ত্রাস বাংলাদেশে যেন না থাকে। তাদের (সন্ত্রাসী) সবার যেন বড় ধরনের
বিচার হয়, ফাঁসি হয়। আমি আমার স্বামী হত্যার বিচার চাই। আমার স্বামী
দেশদ্রোহী ছিলেন না, তিনি ছিলেন দেশপ্রেমিক। দেশকে অনেক ভালোবেসেছেন।
তিনি
আরও বলেন, ‘‘চাইলেই আমার স্বামী পালিয়ে আসতে পারতেন। কিন্তু তিনি সেটা
করেননি। আমি সঠিক বিচারটা চাই। এই সন্ত্রাসকে নির্মুল করে শেষ করে দিতে
হবে। এই সন্ত্রাস বাংলাদেশে থাকতে পারবে না।’’
নিহত র্যাব সদস্য
মোতালেব এর বড় মেয়ে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী শামিমা জান্নাত বলেন, ‘‘আমার
আব্বুকে যারা মেরেছে তাদের যেন বিচার হয়। আমার আব্বুকে তারা যেভাবে মেরেছে,
সেভাবেই তাদেরকে মারা উচিত। আজকে আমার আব্বু মারা গেছে, কালকে আরও কতজনের
আব্বু মারা যাবে।’’
বাবার স্মৃতিচারণ করে মোতালেবের বড় ছেলে অনার্স
পড়ুয়া শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান বলেন, ‘‘বাবা আমাকে অনেক ভালবাসতেন। তার
সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিল মধুর। তিনি আমাকে ভালোভাবে লেখাপড়া করার পরামর্শ
দিতেন। পাশাপাশি মা-বোনদের দেখে রাখার জন্য বলতেন। আজ আমার বাবা আমাদের
সবাইকে ছেড়ে চলে গেছেন। আমাদের কী হবে, জানি না।’’
জানা গেছে, নিহত
নায়েব সুবেদার মো. মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া কুমিল্লা জেলার সদর অলিপুর গ্রামে
১৯৭৮ সালের ১ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৯৫ সালের ৭ জুলাই বিজিবিতে
যোগ দেন। দেশের বিভিন্ন বিজিবি সেক্টরে চাকরি করেন। ২০২৪ সালের ২৬ এপ্রিল
র্যাব-৭ এ যোগ দেন।
উল্লেখ্য, সোমবার (১৯ জানুয়ারি) র্যাব-৭
চট্টগ্রামের একটি আভিযানিক দল চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুণ্ড থানাধীন জঙ্গল
সলিমপুর এলাকায় অভিযান পরিচালনাকালে দুষ্কৃতিকারীদের অতর্কিত হামলায়
র্যাবের চারজন সদস্য গুরুতর আহত হলে ঘটনাস্থল থেকে তাদের উদ্ধার করে
চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম সিএমএইচ-এর জরুরি বিভাগে আনা হয়। সেখানে কর্তব্যরত
চিকিৎসক নায়েব সুবেদার মো. মোতালেব হোসেন ভূঁইয়াকে মৃত ঘোষণা করেন।
