
অপরিকল্পিত নগরায়ণ, লাগামহীন দখল ও চরম দূষণের কারণে নগরীর খালগুলো আজ মৃতপ্রায়। অথচ এই খালগুলো একসময় ছিল নগরের সৌন্দর্য রক্ষার এক হাতিয়ার। পণ্য পরিবহনও হয়েছে এসব খাল দিয়ে। এসব খালের কারণেই রাজধানী জলাবদ্ধতার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে। বর্তমানে জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য প্রতিবছর জাতীয় বাজেট ও সিটি করপোরেশনের উন্নয়ন পরিকল্পনায় বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নেওয়া হয় খাল খনন, ড্রেনেজ উন্নয়ন ও পানি নিষ্কাশন প্রকল্প। বাজেট বক্তৃতা ও পরিকল্পনায় দেওয়া হয় দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের আশ্বাস। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। খালগুলো দূষণ ও দখলমুক্ত করতে না পারায় অল্প বৃষ্টিতেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। গৃহস্থালি বর্জ্য, পলিথিন, প্লাস্টিক, বাজারের ময়লা, হাসপাতালের আবর্জনা ও কল-কারখানার তরল বর্জ্যে খালের পানি দূষিত হয়ে গেছে। ছড়াচ্ছে তীব্র দুর্গন্ধ। এতে করে জনস্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। কোনো কার্যকর নজরদারি না থাকায় পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ হচ্ছে। কোথাও কোথাও খাল এতটাই ভরাট হয়েছে যে, তার অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাওয়ার উপক্রম। আবার কোথাও অতিরিক্ত আবর্জনা ও পলি জমে খালগুলো ভরাট হয়ে সরু ড্রেনে পরিণত হয়েছে। পত্রিকান্তরে সরেজমিন প্রতিবেদনে এমন তথ্যই উঠে এসেছে।
প্রতিবেদকের তথ্যমতে, দুই সিটি করপোরেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা বলেন, খাল নিয়ে সংস্থাগুলোর পরিকল্পনা ও অগ্রগতি বাস্তবসম্মত নয়। ঢাকায় খালের সংখ্যা নিয়ে সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান কোনো সংস্থার কাছে নেই। তবে বিভিন্ন গবেষণা ও প্রতিবেদন অনুযায়ী, একসময় ঢাকায় ৭৭টি বা তারও বেশি খাল ছিল। ঢাকা জেলা প্রশাসনের তথ্যানুযায়ী, ঢাকায় ৫০টি খাল রয়েছে। ২০২০ সালে জলাবদ্ধতা নিরসনের অংশ হিসেবে ঢাকা ওয়াসা ২৬টি খাল ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে হস্তান্তর করে। অন্যগুলো গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে রয়েছে। বর্তমানে দুই সিটি করপোরেশন দেখভাল করে প্রায় ২ হাজার ২১১ কিলোমিটার নালা। রাজধানীর খালগুলোর প্রায় অর্ধেকই বেদখল ও দূষণের শিকার হয়েছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি পরিকল্পনাবিদ ও অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, সিটি করপোরেশন হাজার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিচ্ছে, কিন্তু খাল রক্ষার্থে যথাযথ কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যায়নি। খাল যে বাসাবাড়ির ময়লা ফেলার জায়গা না, এমন অবস্থা আমরা তৈরি করতে পারিনি। উন্নত বিশ্বে খাল রক্ষা করা হয়। আমাদের দেশের খালগুলো বাসাবাড়ির ময়লা ফেলার স্থান হয়ে গেছে। খাল রক্ষার্থে জনসচেতনতার পাশাপাশি সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণ ও সঠিক পরিকল্পনা করে এগোতে হবে।
নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, খাল দখলমুক্ত না করে শুধু খনন বা পরিষ্কার করার কাজ চালানো মানে অর্থের অপচয়। পাশাপাশি পানি ব্যবস্থাপনায় সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে। দখল-দূষণে নগরীর খালগুলো মৃতপ্রায় অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। এ অবস্থা নিরসনে সরকারকে বাস্তবসম্মত সময়োপযোগী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে এবং সে অনুযায়ী বাস্তবায়ন করতে হবে। খাল রক্ষার্থে জনসচেতনতা এবং অংশগ্রহণ কার্যক্রম বাড়াতে হবে। দখলমুক্ত করতে খাল উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করতে হবে। অভিযোগ রয়েছে ব্যবসায়ীদের চাপে ঢাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা বা ড্যাপের পরিবর্তন করেছে। নদী-খাল, জলাশয়-জলাভূমি দখলকারী কিংবা নগর এলাকায় বিপজ্জনক শিল্প-কারখানার মাধ্যমে বায়ু দূষণকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। সে ক্ষেত্রে সরকারের কাছে আমরা একটি কার্যকর উদ্যোগ প্রত্যাশা করছি। সরকার একটি সমন্বিত টেকসই প্রকল্পের মাধ্যমে খাল রক্ষণাবেক্ষণের জন্য যথাযথ প্রস্তুতি গ্রহণ করবে এটাই প্রত্যাশা।
