কুমিল্লা
নগরীর বিষ্ণুপুর এলাকার চিকিৎসক লিয়াকত আলী খানের পুত্র ঢাকার একটি
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করা সাবাত খানের হত্যাকাণ্ডের ৬
বছরেও হত্যাকারীরা শনাক্ত হয়নি। এ নিয়ে হতাশ তার পরিবারের সদস্যরা। ২০১৯
সালের ৩০ ডিসেম্বর রাত ১২টার পর লিয়াকত আলী খানের ছোট ছেলে শাহাদাত আলী খান
সাবাত নিখোঁজ হন। পরদিন ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি সকালে আদর্শ সদর উপজেলার
ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া গোমতী নদীর পালপাড়া সেতুর নিচ থেকে সাবাতের (৩০) মরদেহ
উদ্ধার করে পুলিশ।
ছেলের মরদেহ দেখে অসুস্থ হয়ে পড়েন বাবা চিকিৎসক
লিয়াকত আলী খান ও তার স্ত্রী, কুমিল্লা মহিলা মহাবিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত
অধ্যক্ষ রাফিয়া আক্তার। ভাই ও মামাকে হারিয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন সাবাতের
বোন ডা. শারমিন খান ও তার সন্তানও।
ছেলের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কান্নায়
ভেঙে পড়েন রাফিয়া আক্তার। তিনি বলেন, “আমার সন্তান খুব ভালো ছিল। সারাক্ষণ
আমার শরীর কেমন আছে, খেয়েছি কি না খোঁজ রাখত। আমার মেয়ের সন্তান, তার
প্রিয় ভাগিনাকে নিয়ে সময় কাটাত। কিন্তু যেদিন শুনলাম আমার সন্তানকে মেরে
ফেলা হয়েছে, সেদিন থেকেই আমাদের পরিবারের সুখ-শান্তি শেষ হয়ে গেছে।
কান্নাজড়িত
কণ্ঠে তিনি বলেন, “আজ ৬বছর পেরিয়ে গেল, এখনো আমার সন্তানের হত্যাকারীদের
শনাক্ত করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। বেঁচে থাকতে কি আর সন্তানের খুনিদের
গ্রেপ্তার ও বিচার দেখে যেতে পারব? কেন আমার সন্তানকে তারা মেরে ফেলল,
সেটাও কি জানতে পারব না?”—এই কথা বলেই হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন সাবাতের মা।
কোতোয়ালি
মডেল থানা ও নিহতের পরিবার সূত্রে জানা যায়, নিখোঁজের পর ২০১৯ সালের ৩১
ডিসেম্বর সন্ধ্যায় সাবাতের বাবা লিয়াকত আলী খান কোতোয়ালি মডেল থানায় একটি
সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। মরদেহ উদ্ধারের পর ২০২০ সালের ২ জানুয়ারি তিনি
থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলাটি দায়েরের এক সপ্তাহের মধ্যে, ১২
জানুয়ারি তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন
(পিবিআই)-কে।
পিবিআই ২০২০ সালের ২৬ আগস্ট রাতে কুমিল্লা নগরীর ফৌজদারি
এলাকা থেকে চান্দিনা উপজেলার মহারং এলাকার আবদুস সামাদের ছেলে মো. মাজহারুল
ইসলাম লিটনকে গ্রেপ্তার করে। পরে তাকে ১০ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ
শেষে আদালতের মাধ্যমে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। তিন মাস
কারাভোগের পর তিনি জামিনে মুক্তি পান। এরপর মামলার তদন্তে আর উল্লেখযোগ্য
কোনো অগ্রগতি হয়নি।
নিহত সাবাতের বড় বোন ডাক্তার শারমিন খান জানান, এখন
পর্যন্ত এই মামলাটির তদন্ত করেছেন ৮ জন কর্মকর্তা। কেউ হত্যাকারীদের শনাক্ত
করতে পারেনি।
বর্তমানে মামলাটি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)-তে
রয়েছে। তদন্তের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা পরিদর্শক আবু জাফর জানান, তিনি
আগের তদন্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং মামলাটি নিয়ে কাজ করছেন। তবে
পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও হত্যাকারীদের শনাক্তের বিষয়ে তিনি কোনো আশাবাদী
সময়সীমা জানাতে পারেননি। তিনি বলেন, “আমি চেষ্টা করছি।
নিহত সাবাত খানের
বাবা লিয়াকত আলী খান ও মা রাফিয়া আক্তার অভিযোগ করে বলেন, মামলায় একাধিক
তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন হলেও ফলাফল শূন্য। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে সাবাতকে
গলাটিপে শ্বাসরোধ করে হত্যার তথ্য থাকলেও এখনো হত্যাকারীদের শনাক্ত করা
যায়নি, যা তাদের কাছে বোধগম্য নয়।
পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও প্রিয় সন্তানের হত্যার বিচার না পাওয়ায় আজও বিচারহীনতার ভার বয়ে চলেছেন সাবাতের পরিবার।
