
স্বাস্থ্যব্যবস্থার
১০ টি মূল সমস্যা চিহ্নিত করেছে মন্ত্রনালয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল-
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় অবহেলা, স্বচ্ছলতার অভাব, দূর্বল নেতৃত্ব,
অতিকেন্দ্রিকরণ ও বরাদ্দে ঘাটতি। ইতিমধ্যে মেডিকেল শিক্ষায় সব ধরনের কোটা
বাতিল, মেডিকেল কলেজের আসন পর্যালোচনা, এক্রিডিটশন কাউন্সিল গঠন, ইজিপি
মাধ্যমে সব ক্রয় বাধ্যতামূলক করা এবং ইডিসিএল শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেয়া
হয়েছে। পাশাপাশি মেডিকেল ইন্টার্ণশীপ ১৮ মাস করার পরিকল্পনাও যুক্ত আছে।
স্বাস্থ্যখাতের সমস্যা ও সমাধানে স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে
উল্লেখযোগ্যভাবে সমস্যা সমাধানের পথ বিবৃত করা হয়েছে। সে আলোকে স্বাস্থ্য
মন্ত্রনালয়ের বর্তমান অথরিটি খাতটিতে আস্থা ফেরারনোর জন্যও
প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কিন্তু সেগুলি বাস্তবায়ন শুরু হয়নি। কারণ পেশাজীবীরা
সুপারিশ দিলেও আমলাতন্ত্র তাহা কাজে রূপান্তর করেননি।
রাজধানী ও
রাজধানীর বাইরের হাসপাতালগুলোর নষ্ট যন্ত্রপাতি এক বছরেও পুরোপুরি চালু
হয়নি। এর বড় কারণ চিকিৎসক ও চিকিৎসা যন্ত্রপাতি বিশেষজ্ঞের সংকট। সারাদেশে
হাসপাতালে ১২,৯৮০ জন চিকিৎসকের পদশুন্য এর মধ্যে ৪৯২ টি উপজেলা স্বাস্থ্য
কমপ্লেক্সে প্রায় সারে সাত হাজার চিকিৎসকের মধ্যে ৫৩ শতাংশই খালি। এর
সরাসরি প্রভাব পড়ছে সেবায়। স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ের তথ্য মতে সারাদেশে রোগী
অনুপাতে ১৫ হাজারের বেশি শয্যার ঘাটতি রয়েছে। এ কারণে বেশির ভাগ রোগীকে
ঢাকায় ছুটতে হয়। তাদের এ ভোগান্তি লাঘবে ৮১ টি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে ১
হাজার শয্যা চালুর উদ্যোগের কথা জানিয়েছিল সরকার। গত এক বছরেও শয্যা
বাড়ানো হয়নি। শহরাঞ্চলের প্রায় ৭ কোটি মানুষকে প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা দিতে
ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য শহরে ‘জেনারেল প্রাকটিশনার (জিপি) ক্লিনিক’ চালুর
উদ্যোগ নেয়া হয় কিন্তু ঢাকাসহ অন্যান্য শহরে একটি ক্লিনিকও দৃশ্যমান হয়নি।
সরকারি-বেসরকারি মিলে মানহীন ২৬ টি মেডিকেল কলেজ চিহ্নিত করা হয়, যা বন্ধের
পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারেনি সরকার।
স্বাস্থ্য বিভাগে
দায়িত্বপ্রাপ্তরা চেয়ারে বসেই এ খাতের মান বৃদ্ধিতে চিকিৎসক নিয়োগ,
হাসপাতালের শয্যা বাড়ানো, মানহীন মেডিকেল কলেজ বন্ধ, রাজধানীতে প্রাথমিক
স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে জেনারেল প্রাকটিশনার (জিপি) ক্লিনিকসহ বেশকিছু
উদ্যোগ নেন। কিন্তু বেশির ভাগ উদ্যোগের বাস্তবায়ন হয়নি। এমনকি স্বাস্থ্যখাত
নিয়ে সংস্কার কমিশনের দেয়া ৩২ টি সুপারিশের কয়েকটি ছাড়া বেশির ভাগই আলোর
মুখ দেখেনি। রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও কৃত্যপেশাভিত্তিক প্রশাসন ছাড়া এ সংকট
কাটবেনা বলেই বিশেষজ্ঞগণের উক্তি।
দুই দফায় পরিবর্তন করা হয় মহাপরিচালক
তবে দায়িত্ব নিলেও বাধাবিপত্তির কারণে বর্তমান মহাপরিচালকের নেতৃত্বে
স্বাস্থ্যখাত ঘুরে দাঁড়াতে পারছেনা। গত বছরের ৮ই আগষ্ট থেকে এখন পর্যন্ত
মোট ১০ হাজারের বেশি চিকিৎসক বদলির ঘটনা ঘটেছে। অতিরিক্ত মহাপরিচালক,
পরিচালক, লাইন ডিরেক্টারসহ গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষপদ/পদসমূহ দখল নিযে দ্বন্ধ ও
কোন্দল ছিল। অন্তবর্তী সরকারের দায়িত্ব পেয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ
মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসাবে যিনি দায়িত্বপ্রাপ্ত, তাঁকে শুরুতেই
সিদ্ধান্ত গ্রহণে চরম বাধার মুখে পড়তে হয়। বিশেষ করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের
মহাপরিচালক নিয়োগ নিয়ে চিকিৎসকদের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচীতে প্রায় দেড় মাস
প্রশাসনিক অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়।
গত বছর মে মাসে প্রধান উদেষ্টার কাছে
স্বাস্থ্য খাতের সমস্যা নিরসনে সংস্কার প্রস্তাব জমা দেয় স্বাস্থ্য সংস্কার
কমিশন। ঐ সময় যে সব সুপারিশ ‘এখনই বাস্তবায়নযোগ্য’, প্রধান উপদেষ্টা ড.
মুহাম্মদ ইউনুস তা দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে নির্দেশ দেন। বছর শেষে
অত্যাবশকীয় ঔষধের তালিকা করা ছাড়া বাস্তবায়ন হয়নি তার নির্দেশ বা কোন
সুপারিশও। জুলাই গনঅভ্যুত্থানে আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন নিয়ে নানা
অভিযোগ ছিল বছর জুড়ে। অনেকক্ষেত্রে সময়মত চিকিৎসা না পাওয়া, বিভিন্ন
দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এবং দীর্ঘমেয়াদি পূর্ণবাসন প্রক্রিয়ার ঘাটতির
কথা জানিয়েছেন জুলাই আহত ও তাদের স্বজনরা। এতে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সক্ষমতা
ও মানবিক দিক নিয়ে প্রশ্ন উঠে। রোগ নিয়ন্ত্রণে বছর জুড়ে কার্যকর কোন
কর্মসূচি দেখা যায়নি। বছরের শুরু থেকেই ঢাকায় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণত দূরের কথা
ডেঙ্গু গোটা দেশে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে বলে অনেকের বিশ^াস। তদারকির অভাবে নীরবে
বেড়েছে এডিস মশাবাহিত এ রোগ। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং
চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের দায়িত্ব থাকলেও দুই বিভাগের
মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসছে না বলে অভিজ্ঞমহলের
ধারণা। জনমনে প্রশ্ন আর কতকাল এ নিয়ন্ত্রণহীনতা ও সমন্বয়হীনতার চিত্র দেখতে
থাকবে দেশবাসী।
লেখক: সাবেক অধ্যক্ষ, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ
