‘আপন’-
মোতাহার হোসেন মাহবুব সম্পাদিত সাহিত্যের ছোট কাগজ

কাজী মোহাম্মদ আলমগীর।
মোতাহার হোসেন মাহবুব সম্পাদিত আপন নিয়ে কথা বলবো, আপন সম্পাদকের সম্মুখে বলেছিলাম। আপন ত্রিশতম সংখ্যা আমার হাতে। আপনকে লিটল ম্যাগ বলা যায় না। সম্ভবতো সম্পাদক নিজেও এ দাবি করেন না। বিনয় সাহিত্য সংগঠনের মুখপত্র আপন। বিনয় ইতোমধ্যে২০১২ থেকে ২০২৫খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত অনেক কবি সাহিত্যিককে সম্মাননা পদক প্রদান করেছে। পুরস্কারের ছবি ছোট কাগজের মেজাজ ধরে রাখার পথে অন্তরায় । ৩০তম সংখ্যায় গুরুত্বপূর্ণ লেখকদের সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রবীণ। ছোট কাগজ নবীনদের স্থান। আরো বাড়িয়ে বললে কেউ কেউ আছেন খুব জেদি, ছোট কাগজেই লিখেন। তিনি নবীন কি প্রবীণ ধরতব্যের বিষয় নয়। প্রচণ্ড জেদি না হলে এ বন্ধুর পথ অতিক্রম করা যায় না। বিতর্ক আছে, ছোট কাগজে লিখতে লিখতে বড় (দৈনিক) কাগজে ঝম্প দেয়ার ইতিহাসও কম বিস্তর নয়। ত্রিশতম সংখ্যাটি ভিন্ন কারনে গুরুত্বপূর্ণ। প্রবীণদের অনেকের নাম জানি, জানার জন্যই জানি, গভীরে প্রবেশ না করেই চালিয়ে দেই, ইহা চালিয়াতি। অথচ আবুল কাশেম ফজলুল হক বলছেনÑ ‘মোতাহের হোসেন চৌধুরীর লেখার সারসঙ্কলন দুঃসাধ্য। প্রতিটি লেখার অনুচ্ছেদ, প্রতিটিবাক্য ও প্রতিটি শব্দকেই মনে হয় অপরিহার্য।’ ৩০তম সংখ্যার প্রথম প্রবন্ধ মোতাহের হোসেন চৌধুরীর জীবন ও রচনা আলেক্ষ্য। ঠাসবুননে প্রবন্ধটি একসঙ্গে আমাদের অনেক কিছু জানান দেয়।মনকে আলোড়িত করে। আমরা জানতে পারি মোতাহের হোসেন চৌধুরীর জন্ম, বড় হওয়া, লেখাপড়া, চিন্তা ও চৈতন্যের বিস্তৃত বিস্তার। আবুল কাশেম ফজলুল হক বলেনÑ‘ মোতাহের হোসেন চৌধুরী তাঁর সমকালিন বাংলাভাষার আধুনিকতাবাদী পাঠকদের নৈরাশ্যবাদ- চর্চার বিরোধী ছিলেন। তিনি উপযোগবাদী ছিলেন। সেখানেও তাঁর স্বাতন্ত্র আছে: বিষয়ভাবনাকে নিতান্ত গৌন করে মনোজীবনকে সুক্ষ চিন্তা, গভীর অনুভূতি ও সৃষ্টিশীলতাকে অনেক মূখ্য অবস্থান দিয়েছেন।
সংস্কৃতি সম্পর্কে তাঁর যুক্তিপূর্ণ উক্তি-
ধর্ম সাধারণ লোকের কালচার, আর কালচার , শিক্ষিত মার্জিত লোকের ধর্ম। কালচার মানে উন্নততরজীবন সম্পর্কে চেতনা- সৌন্দর্য, আনন্দ ও প্রেম সম্বন্ধে অবহিতি। সাধারণ লোকেরা ধর্মের মারফতেই তা পেয়ে থাকে। তাই তাদের ধর্ম থেকে বঞ্চিত করা আর কালচার থেকে বঞ্চিত করা এক কথা।
তিনি আরও বলেনÑধর্ম মানে জীবনের নিয়ন্ত্রণ। মার্জিত আলোকপ্রাপ্তরা কালচারের মারফতে নিজেদের নিয়ন্ত্রিত করে। বাইরের আদেশ নয়, ভেতরের সুক্ষ্ম - চেতনাই তাদের চালক, তাদের জন্য ধর্মের ততটা দরকার হয় না। বরং তাদের উপর ধর্ম তথা বাইরের নীতি চাপাতে গেলে ক্ষতি হয়। কেননা তাদের সুক্ষ্ম চেতনাটি নষ্ট হয়ে যায়, আর সুক্ষ্ম চেতনার অপর নাম আত্মা।
মোতাহের হোসেন চৌধুরী রাজনীতি সচেতন লোক। ইতিহাসে রাষ্ট্র এবং ধর্ম যতবার মুখোমুখি হয়েছে এর চুরান্ত ফয়সালায় ততবার রক্ত ঝরেছে। অথচ আমরা মোতাহার হোসেন চৌধুরীর সজ্ঞা থেকে সিদ্ধান্ত নিতে পারতাম। কিন্তু নেই না। ইতোমধ্যে আরও অনেক নতুন নতুন তত্ত্ব দর্শন এসেছে। মানুষ যাচাই করে দেখেছে। এর মধ্যে সর্বগ্রাসী পুঁজিবাদ বিভিন্ন রাষ্ট্রে ক্ষত ও ক্ষতি করে চলছে, বহু বাপার স্টেটের মানুষকে গিনিপিগ বানিয়ে ছাড়ছে, মৃত্যু তাতে সবচেয়ে সস্তা হয়ে গেছে। তাতে বিকারহীন দুরদণ্ডতা মনুষ্য বিবেচনার কোন অবশেষ রাখে না। এই বিবেচনায় হতাশার কিছু নেই। যদিও শোনতে হতাশার মতই শোনায়। বাস্তবতা এতই নিষ্ঠুর নির্লজ্জ।
সম্পাদক মোতাহার হোসেন মাহবুব প্রবন্ধ নির্বাচনে প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছেন, দিয়ে থাকেন। ১৯৯৪ সাল থেকে তার প্রজ্জ্বলিত চিন্তায় আলোকিত ইন্ধন জোগিয়েছেন গল্পকার ও গবেষক মামুন সিদ্দিকী। এই জন্য মোতাহার হোসেন মাহবুবের কৃতজ্ঞতার অন্ত নেই। সুযোগ থাকলে অথবা সুযোগের একটা স্পেস তৈরি করে মামুন সিদ্দিকীর নামটা ঠেসে দিতে পারলেই যেনো তিনি দায় মুক্তি লাভ করেন। এমন উদাহরণ তার পত্রিকার যত্রতত্র ছড়িয়ে আছে। অথবা ইহা গভীর ভালোবাসার লক্ষণ। আমরা এ ভালোবাসাকে সাধুবাদ জানাই।
মামুন সিদ্দিকীর মুখে অনেকবার ব্যারিস্টার আবদুল রসুলের কথা শোনেছি। সত্যেন সেন যখন ব্যারিস্টার আবদুল রসুলের উপর লিখেন তখন এ লেখা ভিন্ন দ্যোতনা পায়। চমকে উঠার মত ঘটনা। সত্যেন সেন বলেন, ১৯০৫ সালে জুলাই মাসে বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত ঘোষণার প্রতিবাদে২৩ সেপ্টেম্বর রাজার বাজারে দশহাজার লোকের জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। সেদিন কলকাতার হিন্দু মুসলমান ছাত্ররা পরস্পর হাতে হাত ধরে সেই সভায় যোগদান করতে গিয়েছিল। এই সভায় বক্তৃতা দিতে দাঁড়িয়ে আবদুুল রসুল বলে ছিলেন: ‘আমরা হিন্দু মুসলমান একই বাংলা মায়ের সন্তান।’
রসুল জন্ম গ্রহণ করেন কুমিল্লা জেলায়। লেখাপড়া করেন ময়মনসিংহের কিশোর গঞ্জে, ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে, উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে লন্ডনে যান। সেখানে এক ইংরেজ মহিলাকে বিবাহ করেণ। ব্যারিস্টারি শেষে তিনি কলিকাতায় আইন ব্যবসা করেন। ১৯০৬ সালে বরিশালে প্রাদেশিক সম্মেলনে সরকারের দমন নীতির বিরুদ্ধে সারা ভারতে যে আগুন জ¦লে উঠেছিল, আবদুল রসুল ছিলেন এই সম্মেলনের নির্বাচিত সভাপতি।
জীবনব্যাপী অঙ্গীকার শিরোনামে সরদার ফজলুল করিম সম্পর্কে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী লিখেন, ‘‘সব বড় মাপের মানুষই অন্যদের চাইতে ভিন্ন হন। তারা প্রচলিত ব্যবস্থার মধ্যে খাপ খান না। সরদার ফজলুল করিম অন্যদের চেয়ে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম ছিলেন এবং তিনি খাপ খাননি। ছাত্র হিসেবে ভীষণ মেধাবী ছিলেন। দর্শন বিভাগের একজন ভালো ফলফলের অধিকারী ছাত্র হিসেবে স্বাভাবিকভাবেই বিশ^বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেছিলেন। এটাই সবাই করে। তারপর স্কলারশিপ নিয়ে বাইরে যায়; নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে। মধ্য বিত্তের যেমনটি আকাঙ্খা থাকে।
উনিতো গর্ব করেই বলতেন আমি কৃষক পরিবার থেকে এসেছি। তিনি কৃষক পরিবারের সন্তান, তার আত্মীয়-স্বজনরা তাকে কষ্ট করে লেখাপড়া করিয়েছে। তাদের যে আকাক্সক্ষা- সেটি পূরণ করার জন্য বিশ^বিদ্যালয়ে চাকরির খুব সুন্দর একটা সুযোগ তিনি পেয়েছিলেন। কিন্তু এখানে তিনি থাকলেন না। এখানেই তার ব্যতিক্রম। বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষকতার নিশ্চিত জীবন ছেড়ে দিয়ে তিনি চলে গেলেন রাজণীতিতে। রাজনীতিতে চলে গেলেন বলাটাও ভুল হবে- তিনি সার্বক্ষণিক রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়লেন।’’
আমরা বলতে পারি হালের জাতীয়তাবাদ থেকে উগ্র জাতীয়তাবাদ পন্থী বা ন্যাংটু পুঁজিবাদীরা সরদার ফজলুল করিমকে বুঝার ক্ষমতা পর্যন্ত রাখে না।
...চাকরি ছেড়ে তিনি চলে গেলেন শাখারি বাজারে। মিশলেন নিম্নবিত্তদের সঙ্গে। ১৯৪৯ সালে তিনি ধরা পড়লেন। জেল থেকে বের হলেন ১৯৫৫সালে। তখন যুক্তফ্রন্ট জয়লাভ করেছে। যুক্তফ্রন্ট থেকে তিনি সংবিধান সভার সদস্য নির্বচিত হলেন। যুক্তফ্রন্টের যে সামাজতন্ত্রী অংশটা ছিল- তারাই তাকে প্রার্থী করেছিলেন এবং তাদের ভোটেই তিনি নির্বচিত হয়ে সংবিধান সভায় গেলেন।
১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের সামরিক শাসন শুরু হলে সরদার ফজলুল করিমকে আবার গ্রেফতার করা হলো। ১৯৭১ সালে তিনি বাংলা একডেমির সংস্কৃতি বিভাগের প্রধান, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আবার তাকে গ্রেফতার করা হয়।
তিনি তৈরি করেন দর্শন কোষ। অনুবাদ করেন প্লেটোর রিপাবলিক, প্লেটোর সংলাপ, অ্যারিস্টটলের পলিটিক্স, অ্যাঙ্গেলসের অ্যান্টিডুরিং, রুশোর সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট,দ্য কনফেশনস।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘‘সরদার ভাইয়ের আরেকটা বিশেষ দিক ছিল, তিনি কারও লেখা পড়লে প্রশংসা করতেন। এটা কেউ করে না।একজন সরদার ফজলুল করিম আমাদের কাছে যে উত্তারাধিকার রেখে গেলেন-তা আমাদের জন্য প্রগতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তার জীবন ও কর্ম আমাদের সমাজ ও রাজনৈতিক জীবনে রক্তের মত কাজ করবে যুগে যুগে। তিনি আমাদের জন্য একটা দৃষ্টান্ত। সর্দার ভাই যে দার্শনিক মতদর্শে বিশ^াস করতেন- তা থেকে কখনো তিনি সরে দাঁড়াননি। তার মতো এমন জীবনব্যাপী অঙ্গীকারবদ্ধ মানুষ আমাদের অতীতেও কম, ভবিষ্যতেও দুর্লভ। তিনিই আমাদের প্রগতির শেষ সর্দার।’’
তিনি যে আমাদের প্রগতির শেষ সর্দার তা চলতি রাজনীতির দিকে তাকালেই বুঝা যায়। দেশ প্রেমিক মানুষের বড় অভাব আজ।
শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত সম্পর্কে আনিসুজ্জামান লিখেনÑ তিনি ছিলেন সুরেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়ের শিষ্য, আবদুল রসুলের অনুপ্রেরণায় উজ্জীবিত, গান্ধীর অনুসারী, সুভাষ চন্দ্র বসুর সহকর্মী।
আমরা অনেকে জানি আবার অনেকে জানি না যে, ২৯ মার্চ পাকিস্তানি সৈন্যরা ধীরেন্দ্রনাথকে এবং সেই সঙ্গে তাাঁর কনিষ্ঠ পুত্র দিলীপকে ধরে নিয়ে যায় কুমিল্লা সেনানিবাসে। তাঁরা আর ফিরে আসেননি।
প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণে জানা যায়, অমানুষিক অত্যাচার করে ধীরেন্দ্রনাথকে মেরে ফেলা হয়। ধীরেন্দ্রনাথের কাছে আমাদের রক্তের ঋণ। তাঁর ভূমিকা ঐতিহাসিক। তাঁর স্মৃতি অম্লান। ২রা নভেম্বর তাঁর জন্মদিনে সেই স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করি।
আরো উল্লেখযোগ্য যাঁদের লেখা আপনে রয়েছে, যাঁদের লেখা পড়ার গুরুত্ব বহন করে তাঁরা হলেন-ঐতিহাসিক কৈলাসচন্দ্র সিংহ, লেখকÑ রাসমোহন চক্রবর্তী। অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও গণতন্ত্রের ভূমিকা, লেখকÑ আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী। সৎ সাংবাদিকতাই স্বাধীনতার অতন্দ্র প্রহরী, লেখকÑ কামাল লোহানী। কালের মন্দিরা, লেখক শান্তনু কায়সার। নজরুলের কতিপয় কবিতা ও গানের উৎস সন্ধানে, লেখক Ñ তিতাস চৌধুরী। এ এ এম আতাউল হক স্মৃতিতে ভস্বর একটি নাম, লেখকÑ হেলালউদ্দীন আহমদ।কুমিল্লা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের স্থপতিঃ হালী মোস্তফা, লেখকÑ সুভাষ পাল।
কবিতা রয়েছে যাদেরঃ মোতাহের হোসেন চৌধুরী,শামসুর রাহমান, খুরশেদুল ইসলাম,জাফর আহমেদ চৌধুরী, স্বপ্না রায়,সৈয়দ আহমাদ তারেক,নাজনীন রহমান নাজমা,আনোয়ারুল হক,হাসান ফিরোজ,বাবুল ইসলাম, পরিমল কান্তি পাল, রোকেয়া সুলতানা শীলা। ১৬০ পৃষ্ঠার কাগজটিতে আরো রয়েছে নিবন্ধ, শ্রদ্ধাঞ্জলি, মুক্তিযুদ্ধ এবং সংবাদ।
বিনয় সম্মাননা পদক সম্পর্কে দুটি কথা বলতে হয়। ২০১২ সালে নাট্যশিল্পে প্রথম সম্মাননা পদক পেয়েছেন মো. হাসিম আপ্পু। ২০২৫ সালে গবেষণায় পেয়েছেন প্রফেসর ড. আনোয়ারুল হক। কাগজটির ১৮ পৃষ্ঠা থেকে ২৩পৃ. পর্যন্ত আনোয়রুল হকের রচনাবলির বিশদ পরিচয় দেয়া আছে। আনোয়ারুল হকের শ্মশ্রুমণ্ডিত মুখমণ্ডল, তীব্রদৃষ্টির সঙ্গে হালকা রাগ মিশ্রিত পৌরুষভাব, বেশ দেখার মতো। একেই সঙ্গে ১৫৯ পৃষ্ঠায় আগাতা ফিড মিলসের এক পৃষ্ঠাব্যাপি বিজ্ঞাপন। তারপর ইহাকে সাহিত্যের কাগজ বলাও অ আনন্দপূর্ণ।।
কিন্তু আমি জানি এই শহরে এরকম একটি পত্রিকা ধারাবাহিকভাবে বের করা সত্যি মুখে রক্ত আসার উপক্রম নিশ্চিত। বিনিময়হীন উদার হস্তের প্রকাশনা এখানে অকল্পনীয়। সাহিত্যমনা মানুষেরা নেই অথবা তারা এখন অন্যকিছু কেনাকাটা করেন। পত্রিকা বা ছোট কাগজ যে মনোজগত গঠনে পরোক্ষ ভূমিকা রাখে তারা ভুলে গেছেন। তাই এই দুষ্কালে মোতাহার হোসেন মাহবুবের প্রতি গভীর ভালোবাসা জানাই। বেঁচে থাকুক আপন, বেঁচে থাকুন মাহবুব ভাই। প্রয়োজনে বিজ্ঞাপণ নিয়েই বাঁচুন।।
উত্তর উপনিবেশবাদ: ফিলিস্তিন ও ব্রাজিলের
কবিতায় অস্তিত্বের সঙ্কট

মাসুমুর রহমান মাসুদ ।।
১.
উত্তর
উপনিবেশবাদ তত্ত্বের উদ্ভব ও যাত্রা সাধারণ রাজনৈতিক পরিবেশ এর বিরোধীতা
থেকে যাকে সর্ব প্রথম কেতাবি রূপদেন ‘‘ফ্রঁৎস ফ্যানন’’ (১৯২৫-১৯৬১)। তাঁর
‘‘ব্ল্যাক স্কিন, হোয়াইট মাস্কস’’ ১৯৫২ সালে এবং ‘‘দ্য রেচেড অব দ্য আর্থ’’
১৯৬১ সালে প্রকাশিত হয়। এই দুটি বই প্রকাশের মাধ্যমে তিনি দেখান, উপনিবেশ
বিরোধী সংগ্রাম তিনটি পর্যায়ের মধ্যে দিতে এগোয়। প্রথম পর্যায়: উপনিবেশিক
জাতি রাজনৈতিক চেতনা লাভ করে। দ্বিতীয় পর্যায়: জাতি তার আত্মপরিচয় গড়ে
তুলতে চায় নিজস্ব ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির পুনরাবিষ্কার ও পুনঃপ্রতিষ্ঠার
মাধ্যমে। তৃতীয় পর্যায়: হচ্ছে সরাসরি সংঘর্ষের মধ্যদিয়ে।
ভারতবর্ষে
‘‘সাঁওতাল ও মুন্ডা আন্দোলন’’ কে বৃটিশরা ‘বিদ্রোহ’ বলে আখ্যায়িত করলেও তা
মূলত ছিলো এক ধরনের স্বাধীনতা আন্দোলন। কেবলমাত্র অরণ্যের অধিকার ফিরে
পাওয়া প্রতিবাদ নয়, তাদের আদি সংস্কৃতির ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখার লাড়াইও ছিলো
ওই আন্দোলন। আত্ম ঐতিহ্য চেতনা উদ্ভাবন ও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার এই
বুদ্ধিবৃত্তিক, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে অনন্য ভূমিকা রাখেন
‘গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক’, ‘এডওয়ার্ড উইলিয়াম সাঈদ’, ‘হোমি ভাবা’,
‘স্টুয়ার্ট হল’, ‘অনিয়া লুম্বা’, ‘জ্ঞান প্রকাশ’ সহ আরও অনেকে।
অস্তিত্বের
সঙ্কট আরও প্রকটভাবে ধরা পড়ে নাইজেরিয়ান লেখক ‘আলবার্ট চিনুয়ালুমোগু
আচিবে’ এর নিকট। তিনি পশ্চিমা লেখকদের সান্নিধ্যে থেকে বুঝতে পারেন এসব
লেখক আফ্রিকাকে ‘‘অন্ধকার মহাদেশ’’ হিসেবে উপস্থাপন করছেন। যেখানে মানুষকে
চিহ্নিত করা হচ্ছে অসভ্য, বর্বর ও নির্বোধ। পশ্চিমা সাহিত্যে আফ্রিকার
মানুষকে ‘অমানবিক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার এক গভীর সাংস্কৃতিক রাজনীতি চালাচ্ছে।
এই উপলব্ধি থেকে জন্ম নেয় তাঁর প্রথম ও শ্রেষ্ঠ উপন্যাস ‘থিঙ্কস ফল
এপার্ট’ (১৯৫৮) যা শুধু সাহিত্যিক নয়, রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক প্রতিরোধের এক
দলিল।
২.
ফিলিস্তিনিরাও নিজেদের স্বাধীনতা হারিয়েছে। নিজ দেশে তারা
এখন বন্দীদশায় রয়েছে। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে দেশটির
অস্তিত্ব চরম সঙ্কটে পড়ে। ১৯৮৮ সালে ফিলিস্তিন নিজেদের স্বাধীন রাষ্ট্র
হিসেবে ঘোষণা করলেও দেশটিতে ইসরায়েলের দখলদারত্ব বলবৎ রয়েছে। সেই থেকে
অদ্যাবধি দফায় দফায় যুদ্ধবিরুতী ঘোষণা করা হলেও কিছুদিন পর পর দেশটিতে
ক্ষেপেনাস্ত্র নিক্ষেপ করে ইসরায়েল। গাজা উপত্যকার শিশু, যুবক-যুবতী, বৃদ্ধ
এমনকি কবি ও সাহিত্যিকরাও বোমাহামলায় অহোরহ নিহত হচ্ছে। ফলে দেশটিতে চরম
মানবাধিকার লঙ্ঘণের অভিযোগ উঠেছে।
এরই বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধ হিসেবে
কবি, লেখক ও সাহিত্যিকগণ লেখুনির মধ্য দিয়ে এসব ঘটনার প্রতিবাদ ও নিজেদের
অতীত ঐতিহ্য নিয়ে গর্ববোধ করতে কুণ্ঠাবোধ করেনা। ‘‘মাহমুদ দারবিশ’’ তার
‘‘তদন্ত’’ কবিতায় তুলে ধরেন নিজেদের অস্তিত্বের সংগ্রাম এর কথাÑ
‘‘হ্যাঁ, লেখো/আমি একজন আরব/আমার কার্ড নম্বর হল পঞ্চাশ হাজার/আমার আটটি সন্তান/নবমটি পরবর্তী গ্রীষ্মে জন্মাবে
তুমি কি রাগ করলে ?’’
ঐতিহ্য
সচেতন কবি তার আরবিয় রীতিনীতির উল্লেখ করে তাদের সততার কথাও তুলে ধরেছেন।
একই সাথে অস্তিত্ব রক্ষায় নিজেদের সংগ্রাম এর বিষয়টিও তুলে ধরেছেন বর্ণনার
সূক্ষ্মতার মধ্য দিয়েÑ
‘‘সাথি শ্রমিকের সাথে আমি পাথর ভাঙি/ অমানুষিক পরিশ্রমে আমি পাথুরে পাহাড় ভেঙে নুড়ি করি/এক টুকরু রুটির জন্যে
আমার আট সন্তানের একখানি বইয়ের জন্যে/কিন্তু আমি দয়া দক্ষিণা চাইনা/আর তেহামার কর্তৃত্বের কাছে মাথা নোয়াই না
তুমি কি রাগ করলে ?’’
ফিলিস্তিনিরা
প্রত্যাশা করে দীর্ঘ ভগ্নস্তুপের উপর জন্ম হোক অগ্নিস্ফুলিঙ্গের। যার
মাধ্যমে অত্যাচার, বোমা বর্ষণ এর হাত থেকে রক্ষা পাবে গোটা জাতি:
‘‘মানুষের খুলির ওপর, ধ্বংসের ওপর/সর্বনাশা হায়েনার ছোবলে ছেঁড়াখোড়া জঞ্জালের ওপর/স্ফুলিঙ্গের জন্ম হোক
ভয় নেই, প্রতিটি গৃহে তলোয়ারের টোকা পড়চে।’’
সততার
পাশাপাশি তিনি অস্তিত্ব রক্ষায় চরম আঘাত হানতে পারেন বলেও অত্যাচারীদের
প্রতি সতর্কতা জারি করেন। তিনি কারো সম্পদ লুণ্ঠন করেন না, তবে কেউ তার
সম্পদ লুণ্ঠন করলে তাকেও ছাড় দেননাÑ
‘‘আমি কেড়ে নেইনি কারো সমূহ সম্পদ/কিন্তু, আমি যখন অনাহারী/আমি নির্দ্বিধায় ছিঁড়ে খাই/আমার সর্বস্ব লুণ্ঠনকারীর মাংস’’
অত্যাচারীকে তিনি সাবধান করেছেন:
‘‘অতএব, সাবধান/আমার ক্ষুধাকে সাবধান/আমার ক্রোধকে সাবধান।’’(অনুবাদ: রফিক আজাদ)
৩.
বর্তমান
ব্রাজিল দেশটি ১৫০০ থেকে ১৮২২ সাল পর্যন্ত পর্তুগাল এর উপনিবেশ ছিল। ১৮২২ এ
স্বাধীন হওয়ার পর দেশটি একজন সম্রাট দ্বারা পরিচালিত হয়। ১৮৮৮ সালে
দেশটিতে দাসপ্রথা নিষিদ্ধ হয়। ১৮৮৯ সালে সামরিক অফিসাররা রক্তপাতহীন কু-এর
মাধ্যমে সম্রাটকে ক্ষমতা থেকে অপসারিত করে ব্রাজিলে একটি যুক্তরাষ্ট্রিয়
প্রজাতন্ত্র স্থাপন করা হয়। পরে সেখানে সামরিক জান্তা শাসন শুরু হয়। ১৯৮৫
সাল পর্যন্ত জান্তা শাসন চলে। এই দীর্ঘ পরাধীনতা সে দেশের কবিদের প্রভাবিত
করে।
‘‘আমাদেউ থিয়াগো দে মেলো’’ (১৯২৬-২০২২) তার কবিতায় তুলে ধরেছেন
অস্তিত্বের সেই সঙ্কটের কথা। ঈশ্বর যে শান্তি তাদের জন্য রেখেছিলো সেই
শান্তি ভোগ করার ভাগ্য তাদের নেই। ‘‘ঘোষণাপত্র’’ কবিতায় মেলো তাই তুলে
ধরেনÑ
‘‘ ধারা ৬/শর্তবদ্ধ হলো যে, দশ শতক ধরে/পরিপূর্ণ হবে ইসা নবীর
স্বপ্ন/পাশাপাশি হাঁটবে নেকড়ে এবং খরগোশ/আহার্য হিসেবে থাকবে প্রতি
প্রভাতের সুমিষ্ট সতেজতা।’’
কিন্তু ঈশ্বরের সেই ঘোষণা রক্ষিত হয়নি। তাই নিষিদ্ধ হলো ভালোবাসাÑ
‘‘বিশেষ ঘোষণা।/নিষিদ্ধ হলো কেবল একটি/ভালোবাসাহীন ভালোবাসা।’’
ব্রাজিলের
মানুষ বারবার স্বাধীনতা হারিয়ে পরাধীনতা ও দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়েছে।
সেই হারানো স্বাধীনতা ফিরে পাওয়ার বাসনা আকুণ্ঠ তাড়া করেছে:
‘‘শেষ ঘোষণা।/নিষিদ্ধ হলো ‘স্বাধীনতা’ নামক শব্দ/তুলে ফেলা হবে তাকে সব অভিধান থেকে/এখন থেকে স্বাধীনতা
অগ্নি অথবা স্রোতস্বিনীর মতো/অথবা শস্যকণার মতো/জীবন্ত সত্য হবে/নিরবধি তা আন্দোলিত হবে/হৃদয়ে মানুষের।’’(অনুবাদ: হাসান ফেরদৌস)
এভাবে
তৃতীয় বিশ্বের কবিরা নিজেদের দেশের, জাতির ঐতিহ্য সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন।
তারে লেখুনিতে উঠে এসেছে উত্তর ঔপনিবেশিক ভাবনা। অস্তিত্বের সঙ্কট যেভাবে
অনুভব করেছেন ঠিক সেভাবে আত্ম, সমষ্টিগত ও জাতিগত জাগরণ প্রত্যাশা নিয়ে
কবিতার মধ্য দিয়ে সর্বাত্মক উত্তোরণের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, লক্ষ্মীপুর আলিম মাদ্রাসা, চান্দিনা
ও
গবেষণা শিক্ষার্থী, উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয়।