
আরব্য
রজনিখ্যাত আলীবাবা উপাখ্যান উপমহাদেশজুড়ে বহুল পঠিত এবং অধিক জনপ্রিয়।
আলীবাবা উপাখ্যান নিয়ে প্রচুর নাটক, যাত্রা, চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে।
উপমহাদেশের নানা ভাষাভাষী মানুষের কাছে নিজ নিজ ভাষায় এই উপাখ্যানের অনুবাদ
গ্রন্থ, যাত্রা-নাটক এবং চলচ্চিত্র নির্মিত হওয়ায় আলীবাবা কাহিনি কারও
কাছেই তেমন অজানা নেই। চলচ্চিত্রে মূল কাহিনির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন
ঘটনা ও উপাদান সংযোজনের মাধ্যমে কাহিনির একটি সুসংহত ও সফল পরিসমাপ্তি তুলে
ধরা হয়েছে। চলচ্চিত্রে বাণিজ্যিক উপাদান অর্থাৎ স্থূলতা পর্যন্ত যুক্ত করা
হয়েছে মুনাফার আশায়। চলচ্চিত্র নির্মাণ অধিক ব্যয়সাপেক্ষ বলেই বিনিয়োগ করা
পুঁজির মুনাফাসমেত ফিরে পাওয়ার আকাক্সক্ষায় পুঁজির লগ্নিকারকরা চলচ্চিত্রে
স্থূলতা প্রদর্শনে কসুর করেনি। আলীবাবা-চল্লিশ ডাকাতের কাহিনির সারাংশ
তাৎক্ষণিকভাবে যে কেউ অনর্গল বলে দিতে পারবে। আমাদের কিশোরকাল থেকে আমরা
আলীবাবা উপাখ্যানের সঙ্গে পরিচিত। আলীবাবা নামটি ব্যক্তির বলেই ভেবে এসেছি
এবং আলীবাবা আমাদের কাছে অত্যন্ত ইতিবাচক একটি চরিত্র। কখনো আলীবাবা
চরিত্রটিকে নেতিবাচকরূপে ভাবার অবকাশ পর্যন্ত পাইনি। সে ভাবনা আমাদের
মনোজগতে কখনো আসেওনি। বরং তার ভাই কাশেম এবং ডাকাত সর্দারকেই উপাখ্যানের খল
চরিত্র বিবেচনা করেছি এবং তাদের পরিণতিতে সন্তুষ্ট হয়েছি।
উপাখ্যানের
মূল চরিত্র আলীবাবা, হতদরিদ্র, বিনয়ী এবং অধিক কায়িক পরিশ্রমে সৎ জীবিকা
নির্বাহ করে। সে তো পাঠক-দর্শকের সহানুভূতি পাবেই। আলীবাবার বড় ভাই কাশেম
বদমেজাজি, ঈর্ষাপরায়ণ এবং বিত্তশালী বলেই অহংকারী। ঔদ্ধত্য আচরণ এবং
বদগুণের কারণে তার প্রতি কারও সহানুভূতি জাগেনি। পাশাপাশি দুই ভাইয়ের বাড়ি।
একজনের জীর্ণ কুটির, অপরজনের অট্টালিকা। শ্রেণি বিভক্ত সমাজে সমানে সমান
না হলে, যত নিকট আত্মীয় হোক না কেন সে আত্মীয়ের সম্পর্ক সুসম্পর্কে স্থায়ী
হয় না। তাদের দুই ভাইয়ের ক্ষেত্রেও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। পরস্পরের অর্থনৈতিক
বৈষম্য প্রকট ছিল বলেই দাঁড়িপাল্লা ধার আনতে গেলে কাশেমের পরিবারে সন্দেহের
উদ্বেগ দেখা দেয়। নিঃস্ব-রিক্ত আলীবাবা দিনমান বনের কাঠ কেটে সে কাঠ
বিক্রি করে কোনোক্রমে জীবন নির্বাহ করে। হঠাৎ তার দাঁড়িপাল্লার প্রয়োজন
হবে-এটা কাশেমের পরিবার সংগত কারণেই সন্দিহান হয়ে ওঠে। এমনই হতদরিদ্র
আলীবাবা। সৎ জীবিকা নির্বাহকারী আলীবাবার প্রতি পাঠক-দর্শকমাত্রই
সহানুভূতিশীল। আলীবাবা সবার মনোজগতে ইতিবাচক চরিত্র রূপেই ঠাঁই পেয়েছে।
উপাখ্যানের নামকরণেই আসল সত্যটি লুকিয়ে রয়েছে। যা ভাষার কারণে আমাদের অজানা
রয়ে গেছে। পাঁচ বছর ইরাক অবস্থানে ইরাকের আরবি শব্দ আলীবাবা, ইংরেজি
ভাষান্তরে ঞযরবভ এবং বঙ্গানুবাদে চোর। আলীবাবা, থিফ অব বাগদাদ ইত্যাদি
আরব্য উপাখ্যান ইরাকেই রচিত হয়েছিল। আলীবাবা চরিত্রটি আমাদের মনোজগতে
ইতিবাচক রূপে প্রতিষ্ঠিত। আদতে চরিত্রটি মোটেও ইতিবাচক নয়। নির্ভেজালরূপেই
চোর। উপাখ্যানটির রচয়িতা তাকে চোর হিসেবেই চিহ্নিত করেছেন উপাখ্যানের
নামকরণে। ইরাকের আরবি ভাষায় চোরকেই আলীবাবা বলা হয়। অহংকারী কাশেম কিংবা
ডাকাতদলের প্রতি আমাদের যেমন ঘৃণা রয়েছে। আলীবাবার ক্ষেত্রেও তদ্রূপ ঘৃণা
থাকত, যদি আলীবাবা ভাষান্তরে যে চোর সেটা আমাদের জানা থাকত। একমাত্র ভাষার
ভিন্নতায় একজন চোর ইতিবাচক চরিত্ররূপে আমাদের পাঠক-দর্শকদের মনোজগতে স্থান
করে নিয়েছে।
ডাকাতদের গুহায় লুকানো ধন-রত্ন চুরি করে নিঃস্ব চোরটি
রাতারাতি বিত্ত-বৈভবের মালিক হয়েছে। একাই সে চুরি করা অর্থে বিত্তবান হয়েছে
এবং নিজ পরিবার নিয়ে ভোগ করেছে। অন্য কাউকে সে অর্থের অংশীদার করেনি।
ডাকাতদের গুহায় চুরি করতে গিয়ে ভাই কাশেমের অপমৃত্যুর পর ভাইয়ের ক্রীতদাসী
মর্জিনাকে কিনে নিজ গৃহে দাসী করেছে। দাসী মর্জিনার বুদ্ধিমত্তায় ডাকাতদের
হাতে নিশ্চিত মৃত্যু থেকে রক্ষা পায় আলীবাবা এবং তার পরিবার। বাগদাদের
কেন্দ্রস্থলে মর্জিনা কর্তৃক ফুটন্ত তেলে ৪০টি মটকায় আত্মগোপনে থাকা
ডাকাতদের গরম তেলে দগ্ধ করে হত্যার বিশাল পাথরের ভাস্কর্য রয়েছে। উঁচুতে
দাঁড়িয়ে মর্জিনার ৪০টি মটকায় তেল ঢালার দৃশ্য জীবন্ত ফুটে আছে ভাস্কর্যে।
আধুনিক আলোকসজ্জায় অপূর্ব ভাস্কর্যটি। এ ছাড়া ইরাকজুড়ে প্রায় সড়ক দ্বীপে
ইরাকের প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন অসাধারণ ভাস্কর্যগুলো স্থাপিত করা হয়েছে,
প্রাচীন সভ্যতার স্মারক হিসেবে। আমাদের উপমহাদেশের অনেক চলচ্চিত্রে
আলীবাবাকে মহানুভব চরিত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে দাসী মর্জিনার সঙ্গে
আলীবাবার পুত্রের বিয়ে পর্যন্ত দেখানো হয়েছে। যা উপাখ্যানের মৌলিক কাহিনির
সঙ্গে মোটেও সংগতিপূর্ণ নয়। দাসী মর্জিনার সঙ্গে ক্রীতদাস আব্দাল্লার
সম্পর্কের ইঙ্গিত শুরুতে থাকলেও-চূড়ান্ত পরিণতিতে দাসী মর্জিনার সঙ্গে
বিত্তশালী আলীবাবার পুত্রের বিয়ে উপমহাদেশীয় বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র ব্যবসার
অনিবার্য পরিণতি হিসেবেই গণ্য করা যায়। দর্শকরা প্রেক্ষাগৃহ ত্যাগ করেছে
পরিতৃপ্ত হয়ে।
তবে আমাদের উপমহাদেশে আলীবাবা অর্থাৎ চোরের কাহিনিটি মূল
উপাখ্যানের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন এবং অসংগতিপূর্ণ। আলীবাবা অর্থাৎ সেই চোর
চুরি করা অর্থে বিত্তশালী হয়েছে। অন্য কাউকে চুরির অর্থ-বিত্তের ভাগীদার
করেনি। ব্যক্তির উন্নতি হয়েছে সত্য। তবে ব্যক্তির উন্নতি কখনো সমষ্টিকে
স্পর্শ করতে পারে না। বরং পিছিয়ে দেয়। এ সত্য যেমন উপাখ্যানে, গল্পে,
উপন্যাসে আমরা দেখি, ঠিক তেমনি দেখে থাকি আমাদের জীবন বাস্তবতায়।
এই যে
হতদরিদ্র থেকে বিত্তবান হওয়ার লক্ষণ বা প্রবণতা এটা আমাদের দেশে অত্যধিক
ক্রিয়াশীল। আমাদের ভূখণ্ডের প্রতিটি রাজনৈতিক বাঁকে হঠাৎ বিত্তবান হয়ে ওঠার
ঘটনা নতুন নয়। ক্ষমতার রাজনীতির সঙ্গে যুক্তদের ক্ষেত্রেও অকস্মাৎ
অর্থ-বিত্তের অধিকারী হবার ঘটনা দেখে দেখে আমরা অভ্যস্ত। এতে প্রতিক্রিয়ার
বিপরীতে বলে থাকি ঈশ্বরের কৃপায় তার উন্নতি ঘটেছে। ঈশ্বর সহায় ছিলেন বলেই
হতদরিদ্র থেকে বিত্তবান হয়েছেন। আমাদের সমাজ-জীবনে ব্যক্তিগত উন্নতি লাভে
নীতি-নৈতিকতা বলে কার্যত কিছু নেই। ব্যক্তিগত উন্নতির জন্য আলীবাবাদের
দৌরাত্ম্যের সীমা-পরিসীমা নেই। আমাদের সমাজ জীবনে এ-যেন স্বাভাবিক বলেই
আমরা মেনে নিয়েছি। অথচ মানুষের সবচেয়ে জরুরি হচ্ছে দেশপ্রেম। ওটা থাকলে
মানুষের মনুষ্যত্বের বিকার ঘটতে পারে না। কেবল দেশপ্রেমের ঘাটতি প্রবল থেকে
প্রবলতর হওয়ার ফলেই রাষ্ট্রীয় অর্থ-সম্পদের বেশুমার লুণ্ঠন আমরা দেখছি।
দেখছি দেশে লুণ্ঠিত টাকা বিদেশে পাচার হতেও। সমাজে এখন মান-মর্যাদা,
যোগ্যতা অর্থবিত্তের মাপকাঠিতে নির্ধারিত। কে কোন উপায় অবলম্বনে
অর্থ-বিত্তের মালিক হয়েছেন, সে বিবেচনাও করা হয় না। স্বয়ং সৃষ্টিকর্তাই
ব্যক্তিটির উন্নতি ঘটিয়েছেন, এমনটিই সর্বাধিক বলা ও ভাবা হয়।
একাত্তরের
পূর্বে যাদের দেখেছি দারিদ্র্যপীড়িত; স্বাধীন দেশে তাদের অনেককে দেখেছি
ফুলে ফেঁপে একাকার। আলাদিনের জাদুর বাতি যেন হাতে পেয়েছে। স্বাধীনতার ৫৪
বছরে প্রতিটি রাজনৈতিক বাঁকে ধারাবাহিকভাবে অমনটি দেখে দেখে এখন প্রায়
অভ্যস্ত হয়ে গেছি।
পাকিস্তানি আমলের বাইশ পরিবারের কথা প্রচলিত ছিল। ওই
বাইশ পরিবারের প্রভাব বলয় ছিল দেশটির অর্থনীতি, রাজনীতি, সাংস্কৃতিক
নিয়ন্ত্রক রূপে। স্বাধীন বাংলাদেশে এখন বাইশ নয় এর কয়েকগুণ বেশি পরিমাণের
পরিবার সৃষ্টি হয়েছে, ক্রমান্বয়ে। এরা অনিবার্য রূপে আমাদের শাসকশ্রেণির
অন্তর্গত। রাজনীতি অর্থনীতি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, সে কারণে রাজনীতিতেও এখন
রাজনীতিকের তুলনায় বিত্তশালীদের কদর এবং দৌরাত্ম্য প্রবলতর। ক্ষমতার
রাজনীতির আনুকূল্যে আলীবাবাদের সাফল্য অর্জনে মোটেও বিলম্ব ঘটছে না।
আলীবাবাদের কর্তৃত্ব দেশেজুড়ে প্রবলভাবে বিরাজ করছে।
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত
