
বাড়ির
উঠানে শত শত মানুষের ভিড়। কেউ আয়শাকে কোলে তুলে নিচ্ছেন, কেউ মাথায় হাত
বুলিয়ে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু নিষ্পাপ শিশুটি ফ্যালফ্যাল
করে তাকিয়ে থাকে সবার মুখের দিকে। “আমার আব্বুরে কেডায় যেন মাইরা ফালাইছে।
আমার আব্বু আর আইবো না, আমারে কোলে নেবো না। যারা আমার আব্বুকে মারছে, আমি
তাদের ফাঁসি চাই” গণমাধ্যমকর্মীর সামনে প্রতিবেশীদের শেখানো এই কথাটুকুই
বারবার বলছে পাঁচ বছরের শিশু আয়শা। সে এখনো ঠিকমতো কথা বলতে শেখেনি, বুঝতেও
পারেনি তার বাবা আর কোনোদিন ফিরবে না। এই হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখা গেছে
কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার জাফরগঞ্জ ইউনিয়নের হোসেনপুর গ্রামে।
নিহত
ব্যক্তি মো. আলাউদ্দিন (২৮)। তিনি ওই গ্রামের মো. সুলতান আহমেদের ছেলে।
জীবিকার তাগিদে রাতে অটোরিকশা চালাতেন। গত ১ জানুয়ারি রাতে অটোরিকশাসহ তিনি
নিখোঁজ হন। এ ঘটনায় পরিবার দেবিদ্বার থানায় একটি নিখোঁজ ডায়েরি করে এবং
বিভিন্ন গণমাধ্যমেও সংবাদ প্রকাশিত হয়। নিখোঁজের ১২ দিন পর মঙ্গলবার
দুপুরে কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার বাঙ্গরা বাজার থানাধীন হিরাপুর এলাকার
বুড়ি নদী থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। নদীর কচুরিপানার ভেতর থেকে
উদ্ধার করা ওই মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে
পাঠানো হয়। বিকেলে ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ গ্রামে পৌঁছালে পরিবার ও স্বজনদের
কান্নায় আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। নিহতের বাবা বৃদ্ধ মো. সুলতান আহমেদ
কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “এই ছেলেটাই ছিল আমাদের পরিবারের একমাত্র
উপার্জনক্ষম মানুষ। অটোরিকশা চালিয়ে সে তার স্ত্রী-সন্তান আর আমাদের খরচ
চালাত। এখন আমার তিনটা অবুঝ নাতি-নাতনিকে কে দেখবে?”
নিহতের স্ত্রী
রাজিয়া আক্তার শোকে ভেঙে পড়ে বলেন, “আমার স্বামীর শরীরে কেউ মানুষি আচরণ
করে নাই। চোখ তুলে ফেলছে, কানে ছিঁড়ে ফেলছে। কারা এত নির্দয়ভাবে আমার
স্বামীকে কষ্ট দিয়ে মারল? একদিন কাজ করলে ঘরে চাউল আসে, না করলে আসে না।
এখন এই তিনটা সন্তান নিয়ে আমি কীভাবে বাঁচব?” কান্নায় ভেঙে পড়ে তিনি আরও
বলেন, “যারা আমার স্বামীকে এভাবে হত্যা করেছে, আমি তাদের দৃষ্টান্তমূলক
শাস্তি চাই।”
প্রতিবেশী মো. আরিফুল ইসলাম বলেন, “আলাউদ্দিন কারও সঙ্গে
কোনো শত্রুতা রাখত না। সে শান্ত প্রকৃতির মানুষ ছিল। এমন নির্মম
হত্যাকাণ্ডের সঠিক তদন্ত ও দ্রুত বিচার দাবি করছি।”
এ বিষয়ে দেবিদ্বার
থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, “নিখোঁজের ১২ দিন পর
মুরাদনগর উপজেলার বাঙ্গরা বাজার থানা এলাকার একটি নদী থেকে আলাউদ্দিনের
মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। লাশ উদ্ধারের পর তাঁর পরিবারের লোকজন লাশ শনাক্ত
করেন। পরে মরদেহটি কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে
পরিবারের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের
শনাক্তের চেষ্টা চলছে। এ ঘটনায় বাঙ্গরা বাজার থানায় হত্যা মামলার প্রস্তুতি
নেওয়া হচ্ছে এবং দ্রুত আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
