
রাষ্ট্রের
ম‚ল উদ্দেশ্য নাগরিকের সুরক্ষা, শান্তি ও ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা। তবে
ইতিহাসের ধারায় রাষ্ট্র কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষার যন্ত্র হিসেবেই সীমাবদ্ধ
থাকেনি; আধুনিক কালে রাষ্ট্রের ভ‚মিকা ব্যাপকভাবে প্রসারিত হয়েছে। আজকের
পৃথিবীতে একটি রাষ্ট্রের চরিত্র প্রকাশ পায় তার নাগরিকদের প্রতি প্রদত্ত
সেবার ধরন, গুণমান এবং সর্বজনীনতায়।
নাগরিক সেবা কেবল প্রশাসনিক
কার্যক্রম নয়; এটি রাষ্ট্রের দর্শন, রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং নৈতিক অবস্থানের
বহিঃপ্রকাশ। একটি কল্যাণম‚লক রাষ্ট্রে নাগরিক সেবা মানে শুধু ন্যূনতম
নিরাপত্তা প্রদান নয় বরং স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা, কর্মসংস্থান,
ন্যায়বিচার, পরিবেশ ও জীবনমানের সামগ্রিক নিশ্চয়তা।
ইতিহাসে আমরা দেখতে
পাই, উনিশ শতক পর্যন্ত রাষ্ট্রের প্রধান কাজ ছিল রক্ষণশীল ভ‚মিকা পালন-
সীমান্ত রক্ষা, আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং কর আদায়। কিন্তু
শিল্পবিপ্লব-পরবর্তী সময়ে যখন দারিদ্র্য, বৈষম্য ও শোষণ প্রকট হয়ে উঠল, তখন
রাজনৈতিক চিন্তাবিদরা বুঝলেন যে রাষ্ট্রকেবল একটি প্রহরী রাষ্ট্র হিসেবে
কাজ করলে চলবে না। নাগরিকদের জীবনের মৌলিক উন্নয়ন নিশ্চিত না করলে
রাষ্ট্রের বৈধতা টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। এখান থেকেই কল্যাণম‚লক রাষ্ট্র বা
ডবষভধৎব ঝঃধঃব ধারণার উদ্ভব।
বিখ্যাত দার্শনিক থমাস হবস (ঞযড়সধং ঐড়ননবং)
রাষ্ট্রকে এমন একটি খবারধঃযধহ হিসেবে কল্পনা করেছিলেন, যা নাগরিকদের জীবন ও
সম্পদ রক্ষা করে। তবে তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল নিরাপত্তামুখী। পরে জন লক (ঔড়যহ
খড়পশব) ব্যক্তিস্বাধীনতার গুরুত্ব তুলে ধরে রাষ্ট্রকে জনগণের অধিকাররক্ষক
হিসেবে চিত্রিত করেন।
বিশ শতকে এসে কল্যাণম‚লক রাষ্ট্রের ধারণাকে
দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করেন চিন্তাবিদরা যেমন টি.এইচ. মার্শাল (ঞ.ঐ. গধৎংযধষষ),
যিনি নাগরিকত্বকে তিনটি স্তরে ব্যাখ্যা করেছিলেন-সিভিল, পলিটিক্যাল ও
সোশ্যাল রাইটস। তার মতে, কেবল ভোটাধিকার বা আইনের সমান সুরক্ষা যথেষ্ট নয়;
রাষ্ট্রকে অবশ্যই সামাজিক অধিকার, যেমন শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক
নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
অর্থনীতিবিদ জন মেনার্ড কেইনস (ঔড়যহ
গধুহধৎফ কবুহবং) কল্যাণম‚লক রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভিত্তি স্থাপন করেন। তিনি
যুক্তি দেন, বাজার সবসময় নাগরিকের কল্যাণ নিশ্চিত করতে পারে না; তাই
অর্থনৈতিক মন্দা বা বৈষম্য মোকাবিলায় রাষ্ট্রকে সক্রিয় হস্তক্ষেপ করতে হবে।
কেইনসের
নীতির ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ইউরোপে কল্যাণম‚লক রাষ্ট্র মডেল
ব্যাপকভাবে গড়ে ওঠে। ব্রিটেনে ১৯৪২ সালের ইবাবৎরফমব জবঢ়ড়ৎঃ আধুনিক
কল্যাণম‚লক রাষ্ট্রের নকশা তৈরি করে। এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, পাঁচটি
‘দৈত্য’ সমস্যা- দারিদ্র্য, রোগ, অজ্ঞতা, বেকারত্ব ও আবাসন সংকট- দ‚রীকরণে
রাষ্ট্রকে সর্বাত্মক ব্যবস্থা নিতে হবে। এরই ফলশ্রæতিতে ব্রিটেনে জাতীয়
স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা (ঘঐঝ) প্রতিষ্ঠিত হয়, যা আজও বিশ্বে নাগরিক সেবার
অনন্য দৃষ্টান্ত।
আধুনিক কল্যাণম‚লক রাষ্ট্র নাগরিক সেবার পরিধিকে
বহুমাত্রিক করেছে। যেমন শিক্ষা সেবা কেবল প্রাথমিক জ্ঞান বিতরণের মধ্যে
সীমাবদ্ধ নয় বরং সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও গবেষণার
সুবিধা নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
ফিনল্যান্ডের শিক্ষা ব্যবস্থা এ
ক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত, যেখানে প্রাথমিক পর্যায় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত
শিক্ষা বিনাম‚ল্যে প্রদান করা হয়। এর ফলে ফিনল্যান্ড শুধু মানবসম্পদ
উন্নয়নে নয়, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায়ও শীর্ষ অবস্থান দখল করেছে।
স্বাস্থ্যসেবা
একটি কল্যাণম‚লক রাষ্ট্রের ম‚ল ভিত্তি। উন্নত দেশগুলোয় স্বাস্থ্যসেবা
নাগরিকের মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত। এই মডেল প্রমাণ করেছে যে রাষ্ট্র
যদি নাগরিকের স্বাস্থ্যখাতে যথাযথ বিনিয়োগ করে, তবে সামাজিক উৎপাদনশীলতা
বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। নাগরিক সেবার ক্ষেত্রে সামাজিক সুরক্ষা ও নিরাপত্তা
আরেকটি গুরুত্বপ‚র্ণ দিক।
উত্তর ইউরোপীয় দেশগুলো যেমন সুইডেন, নরওয়ে ও
ডেনমার্ক-এক্ষেত্রে মডেল হিসেবে বিশ্বে স্বীকৃত। তাদের কল্যাণম‚লক
রাষ্ট্রব্যবস্থায় নাগরিকরা শিশুকাল থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় সহায়তা
পান-শিশুভাতা, মাতৃত্বকালীন ছুটি, বেকার ভাতা, পেনশন ইত্যাদি। এভাবে
রাষ্ট্র নাগরিককে জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে সেবা এবং নিরাপত্তা দেয়।
তবে
কেবল অর্থনৈতিক ও সামাজিক সেবা নয়, সুশাসন কল্যাণম‚লক রাষ্ট্রের আরেকটি
অপরিহার্য অংশ। অমর্ত্য সেন (অসধৎঃুধ ঝবহ) তার ‘ঈধঢ়ধনরষরঃু অঢ়ঢ়ৎড়ধপয’-এ
বলেছেন, উন্নয়ন মানে শুধু আয়ের বৃদ্ধি নয়; বরং মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধি।
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা ছাড়া রাষ্ট্র কখনোই নাগরিক সেবায় আদর্শ হতে পারে না।
অমর্ত্য
সেন আরও একটি গুরুত্বপ‚র্ণ বিষয় সামনে আনেন-দুর্বল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর
অন্তর্ভুক্তি। কল্যাণম‚লক রাষ্ট্রের সেবা যদি কেবল শহুরে মধ্যবিত্তের জন্য
সীমাবদ্ধ থাকে, তবে সেটি প্রকৃত কল্যাণ নয়। রাষ্ট্রকে এমনভাবে নাগরিক সেবা
দিতে হবে যাতে গ্রামীণ দরিদ্র, নারী, শিশু, প্রতিবন্ধী ও প্রবীণ সবাই
সমানভাবে উপকৃত হয়। যেমন, মাতৃত্বকালীন ভাতা বা বয়স্কভাতা শুধু টাকার হিসাব
নয়; বরং এটি নারী ও প্রবীণদের সামাজিক মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার একটি মাধ্যম।
এইভাবেই নাগরিক সেবা মানুষের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
একটি
কল্যাণম‚লক রাষ্ট্র তাই নাগরিক সেবাকে কেবল প্রশাসনিক কার্যক্রম হিসেবে
দেখে না। এটি আসলে রাষ্ট্রের দর্শন, নৈতিকতা ও রাজনৈতিক অঙ্গীকারের
প্রতিফলন। নাগরিক সেবা তখনই প‚র্ণতা পায় যখন তা মানুষের স্বাধীনতা ও বিকল্প
বাড়ায়, সক্ষমতা উন্নত করে এবং মর্যাদাপ‚র্ণ জীবনযাপনের সুযোগ তৈরি করে।
অমর্ত্য
সেনের তত্তে¡ আমরা বুঝতে পারি যে, কেবল আয়ের বৃদ্ধি নয় বরং মানুষের জীবনের
গুণগত মান বাড়াতে হবে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক
নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, ন্যায়বিচার- সবই একে অপরের সাথে জড়িত এবং একটি
কল্যাণম‚লক রাষ্ট্রের অপরিহার্য অংশ।
তাই বলা যায়, কল্যাণম‚লক রাষ্ট্রের
নাগরিক সেবার মডেলকে আমরা কেবল সংখ্যাগত অর্জনে সীমাবদ্ধ রাখতে পারি না।
এটি হতে হবে মানবিক, অন্তর্ভুক্তিম‚লক ও মর্যাদাপ‚র্ণ।
উন্নত
রাষ্ট্রগুলো যেভাবে নাগরিকের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও সক্ষমতা বৃদ্ধিকে
প্রাধান্য দিয়ে সেবা প্রদান করছে, বাংলাদেশসহ অন্যান্য উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের
জন্য সেটিই হতে পারে দিকনির্দেশনা। একটি রাষ্ট্র তখনই সত্যিকার অর্থে
কল্যাণম‚লক হয়, যখন তার নাগরিক সেবা প্রত্যেক মানুষকে সম্ভাবনার প‚র্ণ
বিকাশের সুযোগ দেয়, বৈষম্য কমায় এবং ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা
প্রতিষ্ঠা করে।
আবার জন রলস (ঔড়যহ জধষিং) তার ঞযবড়ৎু ড়ভ ঔঁংঃরপব-এ
উল্লেখ করেছেন, সমাজে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার জন্য রাষ্ট্রকে এমনভাবে সেবা
প্রদান করতে হবে যাতে সবচেয়ে অবহেলিত ও দুর্বল মানুষও সমান সুযোগ পায়। তার
‘উরভভবৎবহপব চৎরহপরঢ়ষব’ অনুযায়ী, বৈষম্য থাকলেও তা তখনই গ্রহণযোগ্য হবে যদি
তা দুর্বল শ্রেণির কল্যাণে কাজে আসে।
রলস আরও বলেন, একটি রাষ্ট্র যদি
নাগরিক সেবা এমনভাবে সাজায় যাতে ধনী শ্রেণি সুবিধা ভোগ করলেও দরিদ্র শ্রেণি
অবহেলিত না হয় বরং সেই প্রক্রিয়ায় তারা আরও উপকৃত হয়, তবে সেটিই হবে
প্রকৃত শাসনের সত্যিকারের রূপ। উদাহরণস্বরূপ, উচ্চ আয়ের মানুষের ওপর বাড়তি
কর আরোপ করে সেই অর্থ দিয়ে দরিদ্রদের জন্য বিনাম‚ল্যে শিক্ষা বা
স্বাস্থ্যসেবা চালু করা-এটি রলসীয় ন্যায্যতার সেরা উদাহরণ।
কল্যাণম‚লক
রাষ্ট্রে জন রলসের এই দর্শন একটি নৈতিক ভিত্তি তৈরি করে। এটি রাষ্ট্রকে মনে
করিয়ে দেয়, উন্নয়ন কেবল সংখ্যার খেলা নয়; বরং নাগরিক সেবার প্রকৃত মানদÐ
হলো দুর্বল ও অবহেলিত মানুষ কতটা উপকৃত হচ্ছে। যদি উন্নয়ন কেবল ধনী শ্রেণির
জন্য হয়, তবে সেটি কল্যাণ নয়; বরং অন্যায্যতার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। কিন্তু
যদি রাষ্ট্র এমন নীতি গ্রহণ করে যাতে প্রতিটি সেবার কেন্দ্রবিন্দু হয়
প্রান্তিক মানুষ, তবে সেটিই হবে প্রকৃত কল্যাণম‚লক রাষ্ট্র।
এই তত্ত¡ ও
মডেলগুলো বাস্তবায়নে উন্নত রাষ্ট্রগুলো যে উদাহরণ সৃষ্টি করেছে তা প্রমাণ
করে, নাগরিক সেবার মানই রাষ্ট্রের আসল চরিত্র নির্ধারণ করে। সুইডেন বা
নরওয়ের মতো দেশগুলোয় সামাজিক আস্থার উচ্চ মাত্রা দেখা যায় কারণ রাষ্ট্র তার
প্রতিটি নাগরিককে সমান মর্যাদা দিয়ে সেবা প্রদান করে। অন্যদিকে যেখানে
রাষ্ট্র সেবায় বৈষম্য করে, সেখানে গণঅসন্তোষ, দারিদ্র্য ও অশান্তি বাড়তে
থাকে।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্যও কল্যাণম‚লক রাষ্ট্র একটি
স্বপ্ন নয় বরং একটি বাস্তব প্রয়োজন। দারিদ্র্য হ্রাস, শিক্ষা ও
স্বাস্থ্যসেবার প্রসার, সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি টেকসই হবে না। ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ, স্বাস্থ্যখাতে
বিনিয়োগ বৃদ্ধি, দুর্নীতি হ্রাস এবং স্থানীয় পর্যায়ে নাগরিকদের অংশগ্রহণ
নিশ্চিত করার মাধ্যমে আমরা কল্যাণম‚লক রাষ্ট্রের দিকে অগ্রসর হতে পারি।
সবশেষে
বলা যায়, নাগরিক সেবার ধরনই রাষ্ট্রের সত্যিকারের পরিচয়পত্র। রাষ্ট্র যদি
শুধু ধনী বা প্রভাবশালীদের জন্য সেবা নিশ্চিত করে, তবে সেটি কল্যাণম‚লক নয়
বরং একটি শ্রেণিভিত্তিক ক্ষমতার কাঠামো। কিন্তু রাষ্ট্র যদি প্রতিটি
নাগরিককে সমান মর্যাদায়, বৈষম্যহীনভাবে এবং মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে সেবা
প্রদান করে, তবে সেটিই হবে প্রকৃত কল্যাণম‚লক রাষ্ট্র।
নাগরিক সেবাকে
কেন্দ্র করে রাষ্ট্রের নৈতিকতা, বৈধতা এবং ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয়। সেই
দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, আদর্শ কল্যাণম‚লক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হলে নাগরিক
সেবা শুধু প্রশাসনিক কাজ নয়, বরং রাষ্ট্র দর্শনের মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে
হবে।
লেখক: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
